একটি দেশের নামকরণ বেশ গুরুত্বপূর্ণ। একটি পতাকা এবং একটি জাতীয় সঙ্গীতের পাশাপাশি, আমেরিকা এবং ফ্রান্সের মতো দেশের নামগুলো ঐসব দেশের একটি সম্পূর্ণ জাতীয় পরিচয় সংজ্ঞায়িত করে। দেশের নাম যেকোনো কিছু দ্বারা বিশিষ্ট হতে পারে। আলজেরিয়া দেশকে মোটামুটিভাবে অনুবাদ করলে দাঁড়ায়- ‘দ্বীপগুলি’ আবার কেপ ভার্দে মানে ‘সবুজ কেপ’ এবং কোস্টারিকা মানে ‘সমৃদ্ধ উপকূল’ বুঝায়। তবে, আপনি জেনে অবাক হতে পারেন, পৃথিবীতে এমন অনেক দেশ আছে যেগুলোর নামকরণ করা হয়েছিল বিখ্যাত ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের নামে। আমেরিকা, চীনসহ অন্যান্য বেশ কিছু দেশের নামকরণ করা হয়েছে কোন না কোন ব্যক্তির নামে। এ লেখায় সেসব দেশের নামকরণের বিবরণ তুলে ধরেছেন প্রবাস মেলার সম্পাদক শরীফ মুহাম্মদ রাশেদ।
১) চীন: বর্তমান বিশ্বে চীন অর্থনৈতিক পরাশক্তির অন্যতম দেশ। এটি এরিয়ায় বিশ্বের চতুর্থ এবং জনসংখায় এক নম্বর দেশ। বিশাল এ দেশটির এরিয়া ৯৫,৯৬,৯৬১ বর্গ কিলোমিটার এবং দেশটিতে প্রায় ১৪৪ কোটির বেশি লোক বাস করে। সম্রাট কিন (Qin) এর নামে চীনের নামকরণ করা হয়েছে। চীনা ভাষায় (Qin) এর উচ্চারণ ‘চিন’। সম্রাট কিন-এর পুরো নাম কিন শি হুয়াং (Qin Shi Huang)। তিনি ছিলেন একীভূত চীনের প্রথম সম্রাট। দেশটির রাজধানী বেইজিং।
২) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র: অর্থনীতি, প্রযুক্তি বা মহাকাশ গবেষণায় বিশ্বের এক নম্বর দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এটি ইউনাইটেট স্টেট অব আমেরিকা বা ইউএসএ নামে পরিচিত। এর এরিয়া ৯৮,৩৩,৫১৬ বর্গ কিলোমিটার। এ প্রভাবশালী দেশটি বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম দেশ এবং লোকসংখ্যা ৩৩,১৪,৪৯,২৮১জন। দেশটির নামকরণ করা হয়েছে একজন ইতালীয় অভিযাত্রী আমেরিগো ভেসপুচি’র (Amerigo Vespucci) নামে। আমেরিগো ভেসপুচি নিউ ওয়ার্ল্ড বা আমেরিকা নিয়ে প্রচুর গবেষণা করেছিলেন। দেশটির রাজধানী ওয়াশিংটন।

৩) কলাম্বিয়া: কলাম্বিয়া দক্ষিণ আমেরিকার একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র। এটি জাতিগত এবং ভাষাগতভাবে বিশ্বের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় দেশগুলির মধ্যে একটি। ১১,৪১,৭৪৮ বর্গ কিলোমিটার এরিয়ার এ দেশটিতে প্রায় ৪৪,০৬৫,০০০ জন লোক বাস করে। ইতালীয় অভিযাত্রী ক্রিস্টোফার কলম্বাসের নামে কলম্বিয়ার নামকরণ করা হয়েছে। তার আমেরিকা অভিযাত্রা ঐ অঞ্চলে ইউরোপীয়দের উপনিবেশ স্থাপনের সূচনা করেছিল। দেশটির রাজধানী বোগোতা।
৪) বলিভিয়া: সম্পূর্ণ স্থলবেষ্টিত এ দেশটি দক্ষিণ আমেরিকায় অবস্থিত এবং এটি একসময় স্পেনের উপনিবেশ ছিল। দেশটির নামকরণ করা হয়েছে সিমন বলিভার (Simón Bolívar) এর নামে যিনি একজন ভেনেজুয়েলান সামরিক ও রাজনৈতিক নেতা ছিলেন। তিনি দক্ষিণ আমেরিকার অনেক দেশের স্বাধীনতার জন্য অনেক সংগ্রাম ও প্রচারণা চালিয়েছিলেন। ১০,৯৮,৫৮১ বর্গ কিলোমিটার এরিয়ার দেশটির জনসংখ্যা ১,১২,১৭,৮৬৪ জন এবং রাজধানীর নাম সুক্রে।

৫) ডোমিনিকান রিপাবলিক: ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্র ক্যারাবিয়ান সাগরের হিস্পানিওলা দ্বীপে অবস্থিত একটি স্বাধীন দেশ। এটি ৭ম শতাব্দী থেকে তাইনো (Taino) জনগণের দ্বারা অধ্যুষিত ছিল। দেশটির নামকরণ করা হয়েছে সেন্ট ডোমিনিক (Saint Dominic) এর নামে। তিনি একজন কাস্টিলিয়ান ক্যাথলিক ধর্মযাজক এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের পৃষ্ঠপোষক সন্ত ছিলেন। ৪৮,৭৩৪ বর্গ কিলোমিটার এরিয়ার দেশটির জনসংখ্যা ৯৭,৬০,০০০ জন এবং দেশটির রাজধানী সান্তো দোমিঙ্গো।
৬) ফিলিপাইন: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় হাজার হাজার দ্বীপ নিয়ে গঠিত একটি দ্বীপপুঞ্জময় দেশ ফিলিপাইন। দেশটি ৭হাজার ৬শ টিরও বেশি দ্বীপ নিয়ে গঠিত। স্পেনের রাজা দ্বিতীয় ফিলিপের নামানুসারে ফিলিপাইনের নামকরণ করা হয়েছে। তিনি তার সাম্রাজ্য ফিলিপাইন সহ ইউরোপীয়রা পৌঁছতে পারে এমন প্রতিটি মহাদেশে প্রসারিত করেছিলেন। প্রায় ৩,০০,০০০ বর্গ কিলোমিটার এরিয়ার দেশটির জনসংখ্যা ৯৮,৬৩০,০০০ জন এবং দেশটির রাজধানী ম্যানিলা।

৭) ইসরায়েল: ইসরায়েল দেশটি ভূমধ্যসাগরের পূর্বে অবস্থিত। এটি ১৯৪৮ সালে একটি স্বাধীন দেশ হিসাবে গড়ে ওঠে। খ্রিস্টীয় ধর্ম গ্রন্থ বাইবেলে বর্ণিল জ্যাকব এর অপর নাম ইসরাইল যার নামানুসারে দেশটির নামকরণ করা হয়েছে। বাইবেলে তাকে একজন দেবদূতের সাথে কুস্তি করছে বলে চিত্রিত করা হয়েছে। প্রায় ২২,০৭২ বর্গ কিলোমিটার এরিয়ার দেশটির জনসংখ্যা ৯৩,৪৮,৮৫০ জন এবং দেশটির রাজধানী জেরুজালেম।
৮) লিচেনস্টাইন: লিচেনস্টাইন মধ্য ইউরোপে অবস্থিত একটি স্থলবেষ্টিত ক্ষুদ্র স্বাধীন দেশ। মাত্র ১৬০ বর্গ কিলোমিটার এরিয়ার দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার হলেও দেশটি অর্থনৈতিক ভাবে বেশ সমৃদ্ধ। দ্য হাউস অফ লিচেনস্টাইন নামে একটি পরিবার এখানে প্রথম বসবাস শুরু করে। ফলে দেশটি হাউস অফ লিচেনস্টাইন এর প্রধান ব্যক্তি লিচেনস্টাইন এর নামানুসারে নামকরণ করা হয়েছে। এর রাজধানী ফাডুৎস (ভাদুজ)।

৯) সেন্ট ভিনসেন্ট এবং গ্রেনাডাইনস: এই দেশটি ওয়েস্ট ইন্ডিজের একটি দ্বীপ নিয়ে গঠিত হয়েছে। দেশটি একসময় ফ্রান্স ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল।
সারাগোসার সেন্ট ভিনসেন্ট (Saint Vincent of Saragossa) এর নামে এই দেশের নামকরণ করা হয়। তিনি লিসবন এবং ভ্যালেন্সিয়ার পৃষ্ঠপোষক সাধু ছিলেন। অভিযাত্রীরা ২২ জানুয়ারি সেন্ট ভিনসেন্টের ভোজের দিন এই দ্বীপে এসেছিলেন বলে কথিত আছে। ৩৮৯ বর্গ কিলোমিটার এরিয়ার দেশটির জনসংখ্যা ১,১১০, ৯৪৭ জন এবং রাজধানীর নাম কিংসটাউন।
১০) রাশিয়া: এরিয়া বিবেচনায় রাশিয়া বিশ্বের বৃহত্তম দেশ। ১,৭০,৯৮,২৪২ বর্গ কিলোমিটার এরিয়ার দেশটির জনসংখ্যা ১৪,৩৯,৭৫,৯২৩ জন। রুশ (Rus) নামের একজন পৌরাণিক দেবতার নামে রাশিয়ার নামকরণ করা হয়েছে যার নামের অর্থ ডান (Rus-ডান)। রাশিয়ার পৌরাণিক গল্পে বলা আছে রুশ’রা তিন ভাই ছিলেন তাদের একজন ছিলেন রুশ (Rus) যিনি বিশ্বজুড়ে ভ্রমণ করেছিলেন এবং বহু বিস্তৃত জায়গা জুড়ে বসতি স্থাপন করেছিলেন। তারা স্লাভিক ধর্মে বিশ্বাস করতেন। বেলারুশও এই স্লাভিক কিংবদন্তি থেকে এর নামকরণ করেছে। মস্কো রাশিয়ার রাজধানী।

১১) সেন্ট লুসিয়া: সেন্ট লুসিয়া ক্যারিবীয় অঞ্চলের একটি দ্বীপ রাষ্ট্র। মাত্র ৬১৭ বর্গ কিলোমিটার এরিয়ার এ দেশটিতে প্রায় ১ লক্ষ ৮০ হাজার লোক বাস করে। দেশটির প্রাচীন স্থানীয় অদিবাসি আমেরিন্ডিয়ানরা এর নাম রেখেছিল আইওনোলা। পরবর্তীতে দেশটির নামকরণ করা হয় সেন্ট লুসি (Saint Lucy) নামে একজন নারী ধর্মযাজকের নামে যিনি একজন খ্রিস্টান শহীদ ছিলেন। তিনি এখানে প্রথম শতাব্দীতে বসবাস শুরু করেছিলেন। খ্রিস্ট ধর্ম সম্পর্কে কথিত ভুল ব্যাখ্যা দেয়ার অপরাধে তার চোখ দুটো উপড়িয়ে ফেলা হয়েছিল। ক্যাস্ট্রিজ দেশটির রাজধানী।

১২) সলোমন দ্বীপপুঞ্জ: প্রশান্ত মহাসাগরের ওশেনিয়া অঞ্চলে অবস্থিত ৯শ’টিরও বেশি দ্বীপ নিয়ে এই সার্বভৌম রাষ্ট্রটি গঠিত হয়েছে। ইসরাইলের একজন রাজা সলোমন (Solomon) এর নামে এ দেশটির নামকরণ করা হয়েছে, যিনি রাজা ডেভিডের উত্তরাধিকারী ছিলেন। ২৮,৪০০ বর্গ কিলোমিটার এরিয়ার দেশটির জনসংখ্যা ৬,৫২,৮৫৭ জন এবং রাজধানীর নাম হোনিয়ারা।

১৩) সান মারিনো: সান মারিনোকে পৃথিবীর সবচেয়ে নির্মল প্রজাতন্ত্র বলা হয়। দেশটির এরিয়া ৬১.২ বর্গ কিলোমিটার এবং জনসংখ্যা ৩৩, ৯৩৮ জন। রাজধানী সানমারিনো। রৌদ্রোজ্জ্বল এই ক্ষুদ্র দেশটি ইতালি দ্বারা পরিবেষ্টিত। ৩০১ সালে সেন্ট মারিনাস (Saint Marinus) নামে একজন ধর্মযাজক এখানে একটি মঠ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার নামানুসারে সান মারিনোর জন্ম হয়েছিল।
১৪) উজবেকিস্তান: মধ্য এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে উজবেকিস্তানকে একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস এবং সংস্কৃতির দেশ হিসাবে গণ্য করা হয়। দেশটির এরিয়া ৪,৪৮,৯৭৮ বর্গ কিলোমিটার এবং জনসংখ্যা ৩২,৯৭৯,০০০ জন, রাজধানী তাসখন্দ। ওজ বেগ খান (Öz Beg Khan) নামে একজন রাজার নামে দেশটির নামকরণ করা হয়। জানা যায়, তিনি ছিলেন ঐতিহাসিক গোল্ডেন হোড় অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী রাজা।
১৫) সেন্ট কিটস এবং নেভিস: সেন্ট কিটস এবং নেভিস ওয়েস্ট ইন্ডিজে অবস্থিত একটি ছোট দ্বীপ দেশ। দেশটির এরিয়া ২৬১ বর্গ কিলোমিটার এবং জনসংখ্যা ৫২, ৪৪১ জন, রাজধানী বাসেতের। সেন্ট ক্রিস্টোফার (Saint Christopher) এর নামে দেশটির নামকরণ করা হয়। তিনি ছিলেন ভ্রমণকারীদের পৃষ্ঠপোষক সন্ত। কথিত আছে যে তিনি একবার যিশু খ্রীষ্টকে নদী পার করে নিয়ে গিয়েছিলেন।

১৬) আয়ারল্যান্ড: আয়ারল্যান্ড ইউরোপ মহাদেশের উত্তর পশ্চিমে অবস্থিত একটি দ্বীপ রাষ্ট্র এবং শতাধিক দ্বীপ ও দ্বীপপুঞ্জ দিয়ে আবেষ্টিত। আয়ারল্যান্ডের পূর্বে রয়েছে গ্রেট বৃটেন যা আইরিশ সাগর দিয়ে পৃথক। দেশটির আয়তন ৭০, ২৭৩ বর্গ কিলোমিটার এবং জনসংখ্যা ৪৬, ১০, ৪৪১ জন, রাজধানী ডাবলিন। প্রাক সেলটিক বা কেলটিক ভাষাভাষী মানুষদের উর্বরতার দেবী আয়ারা বা ইরু’র নামানুসারে আয়ারল্যান্ড এর নামকরণ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। সেলটিক ভাষায় আয়ারল্যান্ড এর অর্থ আয়ারা বা ইরু’র ভূমি। অর্থাৎ উর্বরতার দেবী আয়ার বা ইরুর স্থান। উল্লেখ্য, পৃথিবীতে দুইটি দেশ নারীর নামে নামকরণ করা হয়েছে। একটি আয়ারল্যান্ড অন্যটি সেন্ট লুসিয়া।