ইসরাত জেবিন:
পেরুর ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ ও উত্তেজনাপূর্ণ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে পেদ্রো কাস্তিলো পেরুর প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন। তার পুরো নাম জোসে পেদ্রো কাস্তিলো টেরোনেস। তিনি মূলত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং মার্কসবাদী রাজনৈতিক দল পেরু ফ্রি পার্টির একজন সদস্য। তার বিজয় মহামারী দ্বারা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত গভীরভাবে মেরুকৃত দেশ পেরুর রাজনৈতিক এবং ব্যবসায়িক অভিজাতদের ব্যাপকভাবে নাড়া দিয়েছে।

পেরুর দরিদ্রতম এলাকার একটি ছোট্ট গ্রাম পুনাতে ১৯ অক্টোবর ১৯৬৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন পেদ্রো কাস্তিলো। তার নিরক্ষর বাবা-মাকে খামারের কাজে সাহায্য করতে করতে তিনি বড় হয়েছেন। বড় হয়েও তিনি হাল চাষ করেছেন। ছোট বেলায় ছাত্র হিসেবে তাকে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে হেঁটে স্কুলে পৌঁছতে হয়েছে। পিতামাতার নয়টি সন্তানের মধ্যে তৃতীয় কাস্তিলো ১৯৯৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসাবে কাজ করেছিলেন। তিনি ২০০২ সালে তার রাজনৈতিক কর্মজীবন শুরু করে। তখন তিনি মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে খুব বাজেভাবে পরাজিত হয়েছিলেন। তবে প্রথমবারের মতো ওই সময় নির্বাচনে অংশ নিয়েও পেরুর জনগণের কাছে পরিচিতি অর্জন করেছিলেন। ২০১৭ সালে শিক্ষকদের বেতন এবং কর্মক্ষমতা মূল্যায়ন নিয়ে পরিচালিত ধর্মঘটের সময় তিনি দেশব্যাপী ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। কারণ প্রতিবাদ প্রতিরোধের নেতৃত্বে তখন তিনি ছিলেন সকলের মধ্যমণি।

শহর এলাকায় খুব কম পরিচিত হওয়া সত্ত্বেও তিনি ২০২১ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য ১৭ জন প্রার্থীকে অপ্রত্যাশিতভাবে পরাজিত করে প্রথম রাউন্ডে জয়লাভ করেন। তিনি পেরুর সাবেক প্রেসিডেন্ট আলবার্তো ফুজিমোরির মেয়ে এবং পেরুর ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় কেইকো ফুজিমোরিকে পরাজিত করেন।
দীর্ঘ এক সপ্তাহব্যাপী ভোট গণনা প্রক্রিয়ার পরে নিশ্চিত করা হয়েছিল যে, পেদ্রো কাস্তিলো মাত্র ৪৪ হাজার ভোট বেশি পেয়ে তিনি ফুজিমোরিকে পরাজিত করেছেন। কিন্তু ফুজিমোরি কর্তৃপক্ষ শিবির থেকে ভোট গণনায় স্বচ্ছতা নিয়ে বেশ কয়েকটি প্রশ্ন তোলা হয়েছিলো। পরে পেরুর নির্বাচন কমিশন ওইসব অভিযোগ পর্যালোচনা করে কাস্তিলোকে বিজয়ী ঘোষণা করে।
অফিশিয়াল কাজে অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও ক্ষমতার আকস্মিক পরিবর্তনের ফলে ২০২১ সালে তিনি পেরুর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তার সমর্থকদের বেশির ভাগই গ্রামের খেটে খাওয়া জনসাধারণ। মূলত তারাই তাকে ভোট দিয়েছেন যাদের সাথে তিনি একই গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে উঠেছিলেন।

প্রচার সমাবেশে তার একটি নিয়মিত বার্তা ছিল, ‘আর কখনো ধনী দেশে গরীব হবে না!’ কারণ তিনি সংগ্রামী পেরুর হতাশার কথা বলেছিলেন। তিনি একবার বলেছিলেন, ‘আমি জানি একটি স্কুলে ঝাড়– দেওয়ার অর্থ কি’? নিজেকে তিনি জনগণের জন্য নিবেদিত একজন মানুষ হিসাবে মনে করতেন। উল্লেখ্য তিনি স্কুলে তার ছাত্রদের পড়ানোর পাশাপাশি তাদের জন্য রান্না করতেন এবং তাদের ক্লাসরুম পরিষ্কার করার কাজও করতেন।
কাজে কর্মে তিনি সবসময় তার আদর্শকে ধারণ করতেন। কাস্তিলো তার কাজামার্কা অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী সাদা, প্রশস্ত-রিমযুক্ত টুপি পরে থাকতেন। একটি বিশাল স্ফীত পেন্সিল ছাড়া তাকে খুব কমই দেখা যেত। যা ছিল তার মার্কসবাদী ফ্রি পেরু পার্টির প্রতীক এবং তিনি মনে করতেন এটি শিক্ষার ক্ষেত্রে তার কর্মকাণ্ডের প্রতিনিধিত্ব করে।

নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি যুক্তি দেন যে পেরু দেশটি বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের স্বার্থে শাসিত হয়নি। তাই তিনি পেরুর সংবিধানের বিতর্কিত অংশগুলো বাদ দিয়ে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়নের অঙ্গীকার সহ দারিদ্র্য ও অসমতা মোকাবেলায় এর আমূল পরিবর্তন করার আহ্বান জানিয়েছেন।
তার বিরোধীরা তাকে কমিউনিস্ট গেরিলা গোষ্ঠীর সাথে সম্পর্কযুক্ত একজন বাম চরমপন্থী হিসাবে চিত্রিত করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তার নির্বাচনী প্রচারণায় বিরোধীদের অভিযোগগুলো নাকচ করে তিনি অত্যন্ত যুক্তিশীল এবং নিয়ন্ত্রিত বক্তব্য দিয়েছেন। কিন্তু সমালোচকরা উদ্বিগ্ন যে তার কিছু পরিকল্পনা লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে স্থিতিশীল দেশগুলোর অন্যতম দেশ পেরুকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করতে পারে।
পেদ্রো কাস্তিলো আরও বলেন, পেরু এখন সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে। করোনা মহামারিতে পেরুর মাথাপিছু বিশ্বের সর্বোচ্চ কোভিড-১৯ মৃত্যুর হার এর রেকর্ড রয়েছে। এর ফলে উদ্ভূত অর্থনৈতিক সংকট লক্ষ লক্ষ মানুষকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে। তিনি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ সরকারি পরিষেবাগুলোর অর্থায়নের জন্য খনির কর বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছেন এবং এক বছরে এক মিলিয়ন নতুন কর্মসংস্থান তৈরির প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেন।
পেরুর অর্থনৈতিক অবস্থান উন্নত করতে তিনি আরও কিছু ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তনের কথা বলেন। যেমন খনি, তেল, জলবিদ্যুৎ এবং গ্যাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাত জাতীয়করণের প্রস্তাব এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে সম্মান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
তার প্রধান প্রতিশ্রুতিগুলির মধ্যে একটি ছিল আলবার্তো ফুজিমোরির অধীনে ১৯৯৩ সালে প্রণীত বর্তমান পাঠ্যসূচি প্রতিস্থাপনের জন্য একটি নতুন সংবিধান রচনা করা। এজন্য তিনি প্রয়োজনে গণভোট আহ্বান করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন ‘আমাদের এমন একটি সংবিধান প্রণয়ন করতে হবে যেখানে পেরুর মানুষের রঙ, গন্ধ এবং স্বাদ সন্নিবেশিত থাকবে’। কাস্তিলো একজন রোমান ক্যাথলিক এবং তিনি তীব্রভাবে সমকামী বিবাহ এবং গর্ভপাতের বিরোধিতা করেন।

পেদ্রো কাস্তিলোর বিজয়ের অনেকগুলো কারণ খুঁজে পেয়েছেন বিশ্লেষকরা। তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল তার সময়োপযোগী প্রচারণা ও প্রতিশ্রুতি। নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি বলেন ‘সমাজের সকল ক্ষেত্রকে একত্রে গড়ে তোলার আহ্বান জানানোর সময় এসেছে। এখন আমাদের উচিত একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পেরু, একটি ন্যায্য পেরু, একটি মুক্ত পেরু, গড়ে তোলা।’ কাস্তিলো দুর্নীতি কেলেঙ্কারিতে বিরক্ত অনেক পেরুভিয়ানদের সমর্থন আদায় করতে সক্ষম হন যা বছরের পর বছর ধরে পেরুর রাজনীতিকে ছাপিয়ে রেখেছে।
তার বিজয়ের আরও একটি কারণ রয়েছে। জানা যায়, পেদ্রো কাস্তিলো যে স্কুলে শিক্ষকতা করতেন সেটি কোনোরূপ সরকারি সাহায্য ছাড়াই স্থানীয় জনসাধারণের উদ্যোগে নির্মাণ করা হয়েছিল। পেরুতে গ্রামীণ শিক্ষার জন্য খুব কম বেতন দেওয়া হয় কিন্তু স্থানীয় জনগণের কাছে শিক্ষকতা অত্যন্ত সম্মানিত এবং প্রভাবশালী পেশা হিসেবে বিবেচিত। শিক্ষক হবার সুবাদে কাস্তিলো শিক্ষক ইউনিয়নের সাথে জড়িত হবার সুযোগ পান। তিনি রোন্ডা ক্যাম্পেসিনার (Ronda Campesina- ১৯৮০ এর দশকের শুরুর দিকে ম্যানুয়েল গঞ্জালো পরিচালিত মাওবাদী সশস্ত্র গেরিলা গ্রুপ শাইনিং পাথ- Shining Path এর বিরুদ্ধে পরিচালিত গ্রামীণ কৃষকদের প্রতিরক্ষা দল) জন্য একজন কর্মী হিসাবে কাজ করেছেন। এটিও পেরুর জনগণের কাছে সম্মান ও গৌরবের কাজ। সেকারণে একজন স্কুল শিক্ষক এবং রোন্ডা ক্যাম্পেসিনার টহলদার হওয়ার মতো-পেরুর সমাজের দুটি সবচেয়ে সম্মানিত কাজের সাথে যুক্ত থেকে কাস্তিলো পেরুর সাধারণ জনগণের কাছে উচ্চস্তরের রাজনৈতিক সমর্থন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এটাও তার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথকে সুগম করেছে বলে ধারণা করা হয়।

২৮ জুলাই, ২০২১ প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিষেক অনুষ্ঠান শুরুর কিছুক্ষণ আগে কাস্তিলোর পরিবারটি রাজধানী লিমায় এসে পৌঁছে। দিনটি ছিল পেরুর স্বাধীনতার ২০০ বছর পূর্তির দিন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণের পর তিনি বলেছেন যে, তিনি নিজেকে আরও সমৃদ্ধ করতে চান। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি কোন অতিরিক্ত বেতন নিবেন না বলেও জানান। তিনি শুধুমাত্র একজন শিক্ষক হিসাবে তাকে যে বেতন দেওয়া হতো তার সমতুল্য বেতন নেওয়ার অঙ্গীকার করেন। তিনি লিলিয়া পেরেদেসকে বিয়ে করেছেন, যিনি নিজেও একজন শিক্ষক এবং তাদের দুটি সন্তান রয়েছে।