মালেক ফরাজী ত্রিশালের ছোট একটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পড়াশোনার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছেন ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে পশ্চিমা বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ ফ্রান্সে। সেখানে গিয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি জীবনের তাগিদে নানা কাজে যুক্ত হন। প্রায় ৩ দশক ধরে তিনি ফ্রান্সে বসবাস করছেন। দেশটির মাটিতে পা রাখার পরমুহূর্ত থেকেই সাক্ষী হয়েছেন মজার মজার নানা অভিজ্ঞতার। ফ্রান্সের মাটিতে তাঁর হাত ধরেই গড়ে উঠেছে কয়েকটি বাংলাদেশি প্রবাসী সংগঠন। ফরাসীদের কাছে বাংলাদেশকে তুলে ধরতে তাঁর অবদান একদমই নগন্য নয়। তার উদ্যোগে ফ্যান্সের মাটিতে প্রথম বাংলাদেশের বিজয় দিবস উদযাপিত হয়।

তিনি প্রায়ই দেশ মাতৃকার টানে বাংলাদেশ সফরে আসেন। সম্প্রতি তিনি ‘প্রবাস মেলা’ অফিস পরিদর্শনে এসে স্মৃতিচারণ করেছেন প্রবাস জীবনের নানান অভিজ্ঞতার কথা। সাক্ষাতকার নিয়েছেন মো: বাছের আলী।
প্রবাস মেলা: এতোদিন ফ্রান্সে ছিলেন ফরাসীদের সম্পর্কে আপনার মনোভাব কী?

ড. আব্দুল মালেক ফরাজী: ফরাসিদের সবচেয়ে বড় গুণ এরা মানুষের সাথে সহজেই মিশতে পারে। সহজেই আপনার সাথে বন্ধুসুলভ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়বে। তাছাড়া তাদের সবচেয়ে বড় গুণ তারা অন্যের সাহায্যে খুব দ্রুতই এগিয়ে আসেন। আমার নিজেরও এমন অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফরাসীরা অনেক বেশি সংস্কৃতমনা এবং উদার মনের অধিকারী।
প্রবাস মেলা: ফ্রান্সের প্রথম দিককার অভিজ্ঞতা যদি বলতেন।
ড. আব্দুল মালেক ফরাজী: একবার হয়েছিলো কী আমি একটি ঠিকানা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। সাধারণত আমাদের দেশে রাস্তার পাশে থাকা বাড়ির নাম্বার গুলো এক-দুই এভাবে সাজানো থাকে। কিন্তু ফ্রান্সে রাস্তার এক পাশে জোড় নাম্বার এবং অপরপাশে বিজোড় নাম্বার দিয়ে সাজানো থাকে। সে জন্যই মূলত ঠিকানা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। ঠিকানা জানতে একজন বয়স্ক মহিলার সাহায্য নিতে হয়েছিলো। সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে কী আমি তখন ফ্রেঞ্চ ভাষাটা বেশি জানতাম না, উনাকে ঠিকঠাকভাবে বলতেও পারছিলাম না। কিন্তু উনি নিজ থেকেই ঠিকানাটা হাতে নিয়ে আমাকে উক্ত ঠিকানাতে নিয়ে গিয়েছিলেন।

প্রবাস মেলা: প্রবাসের মাটিতে বেশ কয়েকটা কাজের অভিজ্ঞতা আপনার রয়েছে। আপনার প্রথম কাজের অভিজ্ঞতা যদি শেয়ার করতেন।
ড. আব্দুল মালেক ফরাজী: বিদেশে আমার প্রথম চাকরি পত্রিকা বিক্রেতা হিসেবে। পড়াশোনার মাঝে সময় পেলে রাস্তায় গিয়ে বসে থাকতাম। সেখানে একটি ছেলে পত্রিকা বিক্রি করত। কয়েকদিন তার সাথে কথা বলতে বলতে বেশ সখ্য গড়ে উঠেছিলো। এমনকি সে মাঝে মধ্যে আমাকে স্যান্ডইউচ অফার করত। একদিন সে আমাকে জিজ্ঞাসা করল আমি খেয়েছি কি না। আমি না বলাতে কারণটা জানতে চাইল। আমি বললাম টাকা শেষ হয়ে গেছে। এরপর সে আমাকে কাজের অফার করল আমিও রাজি হয়ে গেলাম। তখন থেকেই আমার কর্মজীবনের শুরু এবং খুব মজার মজার অভিজ্ঞতার সাক্ষী হই।
প্রবাস মেলা: পত্রিকা বিক্রেতা হিসেবে আপনার কোন মজার অভিজ্ঞতা হয়েছিল কী?
ড. আব্দুল মালেক ফরাজী: হ্যাঁ, সেটাকে আপনি মজার বা শিক্ষণীয় দুই ধরণের অভিজ্ঞতাই বলতে পারেন। একবার একজনকে পত্রিকা দিয়েছিলাম, তিনি গাড়িতে ছিলেন। ইতিমধ্যে সিগন্যাল ছেড়ে দেয়ায় তিনি টাকা দিয়ে যেতে পারেন নি। এরপর উনি আমাকে তিন দিন পর পর খুঁজেও পান নি। যখন পেলেন তখন পত্রিকার দাম ছাড়াও কয়েক ফ্রাঙ্ক বেশি দিয়ে বললেন এটা তোমাকে আমার ফাইন হিসেবে দিলাম।

প্রবাস মেলা: আর কোন কোন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন?
ড. আব্দুল মালেক ফরাজী: এছাড়া আমি অনুবাদক হিসেবেও কাজ করেছি। এরপর আস্তে আস্তে নোটারি পাবালিক ও ট্রান্সলেটের এর কাজ করতে শুরু করি। মূলত চলার খাতিরেই একজন আফ্রিকানের কাছ থেকে ফ্রেঞ্চ ভাষা শিখতে শুরু করি। আস্তে আস্তে দক্ষতা অর্জন করে আমিই ফ্রান্সের মাটিতে প্রথম বাঙালি পুরোদস্তর হিন্দি-ঊর্দু ভাষার দোভাষী বনে যাই।
প্রবাস মেলা: দোভাষী হিসেব কতোদিন কাজ করেছেন?
ড. আব্দুল মালেক ফরাজী: আসলে কী বলতে গেলে দোভাষী হিসেবে এখনোও কাজ করছি। ভিন দেশে থাকতে গেলে দু-এক জনকে মাঝে মধ্যেই সাহায্যের জন্য হলেও দোভাষীর ভূমিকা পালন করতে হয়। মূলত পেশা হিসেবে বলতে পারেন প্রায় একযুগেরও বেশি সময় ধরে দোভাষী হিসেবে কাজ করেছি।
প্রবাস মেলা: নোটারী ও ট্রান্সলেশন পেশার সাথে কিভাবে জড়ালেন?
ড. আব্দুল মালেক ফরাজী: সত্যি বলতে কী নোটারী ও অনুবাদের মাধ্যমে অনেক টাকা পয়সা আয় করেছি। কিন্তু পেশা হিসেবে এটাকে বেছে নেয়ার পেছনে কিছুটা মানুষকে সাহায্য করার মনোভাবও কাজ করেছে। অনেক সময় সে দেশের অফিসিয়াল কাজকর্মে প্রবাসীদের বাংলাদেশি সার্টিফিকেট প্রদান করতে হতো এবং সেটি নোটারি করে তারপর জমা দিতে হতো। এতো ভালো আয়ও করা যেতো।
প্রবাস মেলা: আমরা যতোদুর জানি আপনি বেশ কয়েকটি বাংলাদেশি সংগঠনের সাথে জড়িত আছেন সে সম্পর্কে যদি বলতেন।

ড. আব্দুল মালেক ফরাজী: দেখেন আপন জনের কাছ দেকে দুরে থাকলেই দেখবেন তাদের জন্য মায়াটা বাড়ছে। তেমনি করে যারা বিদেশে থাকেন দেশের জন্য তাদের অনুভূতিটুকুও তেমন। আসলে তখন পুরোপুরি ছাত্র বলাই চলে। ১৯৮০ সালে আমার উদ্যোগে আমরা ১৭ জন ছাত্র মিলে ১৬ ডিসেম্বরে বিজয় দিবস উদযাপনের পরিকল্পনা করি এবং সেটাকে বাস্তবায়ন করি। এরপূর্বে দেশটিতে সাংগঠনিকভাবে বাংলাদেশের বিজয় দিবস উপদযাপিত হয়নি। এছাড়া ফ্রান্সের মাটিতে প্রথম বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ স্টুডেন্ট এ্যাসোসিয়েশন ইন ফ্রান্স’ ছাড়াও ১৯৮৫ সালে প্রবাসী বাংলাদেশি সমিতি নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলি।
প্রবাস মেলা: নতুন যারা ফ্রান্সে পড়াশোনার জন্য যেতে চাই তাদেরকে কি পরামর্শ দিতে চান?
ড. আব্দুল মালেক ফরাজী: ফ্রান্স একটি উন্নত, উদার দেশ। বাংলাদেশের ছাত্র-ছাত্রীরা উচ্চশিক্ষার জন্য ফ্রান্সকে বেছে নিতেই পারেন। নতুন যারা যাবেন তাদেরকে বলবো ফ্রেঞ্চ ভাষাটা একটু শিখে যাবেন। তাহলে সেখানে গিয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করতে পারবেন এবং প্রয়োজনীয় যোগাযোগ করতে তেমন অসুবিধা হবে না। সবাইকে বলবো যত কষ্টই হোক পড়াশোনা শেষ করলে আপনি ফ্রান্সে বা বিশে^র যেকোন জায়গায় ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে পারবেন।
প্রবাস মেলা: প্রবাস মেলা অফিসে আসার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
ড. আব্দুল মালেক ফরাজী: আপনাদের ধন্যবাদ।