মোস্তফা ইমরান রাজু, কুয়ালালামপুর, মালয়েশিয়া প্রতিনিধি: মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের উদ্যোগে ‘বাংলাদেশ উৎসব’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাজধানী কুয়ালালামপুরের ক্রাফট কমপ্লেক্সে এ উপলক্ষে বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। গান, নাচ, ফ্যাশন শো এবং ঐতিহ্যবাহী দেশীয় খাবারের মাধ্যমে আবহমান বাংলার ঐতিহ্য ও সমৃদ্ধ সংস্কৃতি তুলে ধরা হয় এ বর্ণিল আয়োজনে। তবে এই আয়োজনে সর্বস্তরের প্রবাসীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল না।
বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী রিকশাসহ অন্যান্য দেশীয় কারুপণ্য দিয়ে সাজানো হয় অনুষ্ঠানস্থল। এছাড়া বাংলাদেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রা নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্রও প্রদর্শিত হয়।
মালয়েশিয়ার ট্যুরিজম, আর্টস অ্যান্ড কালচার মন্ত্রণালয়ের সেক্রেটারি জেনারেল ওয়াইবিএইচজি দাতো শাহারুদ্দিন বিন আবু সহত (YBhg. Dato’ Shaharuddin bin Abu Sohot) অনুষ্ঠানে “গেস্ট অব অনার” হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, কুয়ালালামপুরে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, বিপুল সংখ্যক কূটনীতিক ছাড়াও শিক্ষাবিদ, প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক, হাইকমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা এ আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন।
হাইকমিশনার মোঃ শামীম আহসান ও তাঁর সহধর্মিণী পেন্ডোরা চৌধুরী আমন্ত্রিত অতিথিদের উষ্ণভাবে বরণ করে নেন এবং সবার সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
সেক্রেটারি জেনারেল তাঁর বক্তৃতায় বাংলাদেশ-মালয়েশিয়ার দ্বিপাক্ষিক চমৎকার সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মালয়েশিয়ার মতো বাংলাদেশও একটি সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও বহু জাতিগোষ্ঠীর দেশ। ‘বাংলাদেশ ফেস্টিভাল’ বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের চিত্র তুলে ধরেছে, যা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তিনি বাংলাদেশের সার্বিক সাফল্য কামনা করেন।
হাইকমিশনার শামীম আহসান তাঁর বক্তৃতায় শুরুতে ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ’২৪-এর জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের সকল শহিদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান এবং বীর যোদ্ধাদের অবদান কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন। এছাড়া তিনি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে মালয়েশিয়ার বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের বিষয়টি গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন।
জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেওয়ার পরপরই মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ড. আনোয়ার ইব্রাহিম প্রধান উপদেষ্টাকে ফোন করে শুভেচ্ছা জানান এবং প্রথম সরকার প্রধান হিসেবে বাংলাদেশ সফর করেন। বিপ্লব-পরবর্তী প্রথম সরকার প্রধান হিসেবে ৪ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে দাতো সেরি আনোয়ার ইব্রাহিমের বাংলাদেশ সফর, অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্ব এবং “নতুন বাংলাদেশ”-এর জন্য তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি মালয়েশিয়ার দৃঢ় সমর্থন প্রদর্শন করে। এ বছরই বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার মালয়েশিয়ায় ফিরতি সফরের প্রস্তুতি চলছে বলে হাইকমিশনার জানান।
তিনি বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে পারস্পরিক মূল্যবোধ, বিশ্বাস ও ঐতিহাসিক বন্ধনের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা চমৎকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহায়তা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, জ্বালানি, পর্যটন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদার করেছে।
আলোচনা সভার পরে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, প্রবাসী বাংলাদেশি ও হাইকমিশন পরিবারের সদস্যদের অংশগ্রহণে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অতিথিদের মুগ্ধ করে। বিশেষত বাংলাদেশের জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী মেহরিনের পরিবেশনা অনুষ্ঠানে বাড়তি মাত্রা যোগ করে।
আমন্ত্রিত অতিথিদের ঐতিহ্যবাহী রকমারি বাংলাদেশি খাবার দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে কর্মরত দুজন পেশাদার শেফ কর্তৃক রান্না করা খাবার, বিশেষত ‘স্মোকড ইলিশ’ বিদেশি অতিথিদের দ্বারা প্রশংসিত হয়।
অনুষ্ঠানস্থলে স্থাপিত বাংলাদেশ কর্নার, রিকশা, ফুচকা, চা ও ঝালমুড়ির স্টল এবং পিঠাঘর উপস্থিত বিদেশি অতিথিদের মাঝে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়। এছাড়া বাংলাদেশি প্রখ্যাত কোম্পানি প্রাণ, মৈত্রী এবং হোপ তাদের পণ্য ও সেবা প্রদর্শন করে এবং ন্যাশনাল ব্যাংক ও সিটি ব্যাংক রেমিট্যান্স হাউজ বুথ স্থাপন করে প্রবাসীদের অবহিত করে।
অনুষ্ঠানস্থলের সুসজ্জিত ‘বাংলাদেশ কর্নারে’ ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন, রপ্তানিযোগ্য পণ্য ও হস্তশিল্প প্রদর্শন করা হয়। এছাড়া মহান মুক্তিযুদ্ধ, জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থান, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ইত্যাদি বিষয়ক প্রকাশনাগুলোর জন্য একটি কর্নার রাখা হয়, যা অতিথিদের আগ্রহ আকর্ষণ করে।
ক্রাফট কমপ্লেক্সকে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির নানা উপাদান দিয়ে সুসজ্জিত করা হয়, যা সহজেই সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি করে। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পর্যটন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ওপর প্রামাণ্যচিত্রও প্রদর্শিত হয়।
মালয়েশিয়ার সেক্রেটারি জেনারেলকে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী জামদানি ফ্রেম উপহার দেওয়া হয়।
এদিকে, বিশাল এই কমপ্লেক্সে স্বল্প সময়ের এই আয়োজন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মালয়েশিয়া বিএনপির সভাপতি প্রকৌশলী বাদলুর রহমান খান। তিনি বলেন, এ ধরনের আয়োজনে সর্বস্তরের প্রবাসীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল। হাইকমিশন এখানে শুধুমাত্র তাদের স্টাফ ও তাদের স্ত্রী-সন্তানদের গুরুত্ব দিয়েছে, সর্বস্তরের প্রবাসীদের নয়। এত টাকা খরচ করে, বিদেশিদের দাওয়াত দিয়ে যে ‘ব্র্যান্ডিং বাংলাদেশ’-এর প্রয়াস চালানো হয়েছে, তার স্থায়িত্ব মাত্র দুই ঘণ্টা। হাইকমিশনে এখনো ফ্যাসিস্ট আওয়ামী দোসর রয়েছে উল্লেখ করে, এ আয়োজনের পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে কি না, তা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান প্রকৌশলী বাদলুর রহমান খান।