নৃত্যকলার মতো গুরুমুখী বিদ্যা মননে গেঁথে তিনি পথ হাঁটছেন আশৈশব। লক্ষ্য বহুদূর যাবেন, ভালো নৃত্যশিল্পী হবেন। সেজন্য পরিশ্রমও করছেন। জীবনের লক্ষ্য নিয়ে এরকমই বললেন নৃত্যশিল্পী মনিরা পারভীন হ্যাপী। সম্প্রতি এক সন্ধ্যায় প্রবাস মেলাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে জানালেন নৃত্য নিয়ে তার আশার কথা, জীবন নিয়ে তার ভাবনার কথা।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রবাস মেলা’র নির্বাহী সম্পাদক শহীদ রাজু।

প্রবাস মেলা: আপনার জন্ম, বেড়ে উঠা, শিক্ষাজীবন এবং পেশা সম্পর্কে কিছু বলুন
মনিরা পারভীন হ্যাপী: আমার জন্ম খুলনা জেলায়। আমার বাবা আবুল হোসেন ও মা লাকী হোসেন দম্পত্তির দু’সন্তানের মধ্যে আমি বড়। শৈশব কৈশোর খুলনাতেই কেটেছে। খুলনা ফাতেমা হাই স্কুল থেকে এসএসসি এবং সরকারি মজিদ মেমোরিয়াল সিটি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। সেখান থেকে আরবান এন্ড রিজিওনাল প্ল্যানিং বিষয়ে অনার্স পাশ করি ২০০৯ সালে। তারপর ভারতের রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নৃত্য বিভাগ থেকে পুনরায় অনার্স এবং মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করি। নৃত্যশিল্পীর পাশাপাশি বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃত্যকলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে নিয়োজিত আছি।

প্রবাস মেলা: নাচে কিভাবে এলেন?
মনিরা পারভীন হ্যাপী: নাচের প্রতি আগ্রহ আমার ছোটবেলা থেকেই ছিলো। আমার মায়ের নাচ শেখার আগ্রহ থাকলেও বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশের কারণে তা হয়ে ওঠেনি। তাই তিনি আমাকে ছোটবেলা থেকেই নাচ শেখাবার জন্য শহীদ আলতাফ মাহমুদ সংগীত ভবনে ভর্তি করে দেন। আমার ওস্তাদ ছিলেন মোস্তাক সেলিম পপলু। তার কাছে দীর্ঘ ১২ বছর নাচের তালিম নিই।

প্রবাস মেলা: আরবান এ্যান্ড রিজিওনাল প্ল্যানিং ছেড়ে নৃত্যকলায় কেন এলেন?
মনিরা পারভীন হ্যাপী: হ্যাঁ, আসলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবান এ্যান্ড রিজিওনাল প্ল্যানিং-এ পড়লেও নাচ আমি কখনো ছাড়িনি। ঢাকায় এসেও আমি বরাবরই নাচের অনুশীলন করে গেছি। ২০০৩ সাল থেকে ঢাকা নৃত্যাঞ্চলে নাচ শিখেছি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. সোমা মুমতাজের কাছেও কিছু ভরত নাট্যম এর তালিম নিয়েছি। এছাড়া নাটক ও নাট্যকলা বিভাগে অধ্যাপক আফসার আহমেদ স্যারের কাছেও অনেক উৎসাহ পেয়েছি। সবার উৎসাহ আমাকে নৃত্যের সাথে থাকতে অনেক অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। ২০০৯ সালে ভারত সরকার প্রদত্ত ICCR বৃত্তি নিয়ে রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃত্য বিভাগে ভর্তি হই। সেখানে রেকর্ড মার্কস পেয়ে ফার্স্ট হই। স্নাতকোত্তরে কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফলের জন্য আমি স্বর্ণপদক লাভ করি।
প্রবাস মেলা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কবে জয়েন করেছেন?
মনিরা পারভীন হ্যাপী: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি যোগদান করি ২০১৫ সালে। ২০১৫ সালের ৫ মার্চ এখানে নৃত্যকলা বিভাগের চেয়ারপার্সন অধ্যাপক রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা এবং শিক্ষক হিসেবে তামান্না রহমান, বেলায়েত হোসেন খান, আমি এবং সিনিয়র ডেমনেস্ট্রেটর দীপক পাল, লুতফর মোর্শেদ রাজিব ও ১০ জন ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে ওরিয়েন্টশনের মাধ্যমে নৃত্য বিভাগ আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে। ৮ মার্চ প্রথম ক্লাশ অনুষ্ঠিত হয়। আমি নিজেকে অনেক সৌভাগ্যবান মনে করি যে ঐদিন প্রথম ক্লাশটা আমাকে দিয়েই শুরু হয়েছিল।

প্রবাস মেলা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ছাড়া নৃত্য নিয়ে অন্য কোথাও যুক্ত আছেন কিনা?
মনিরা পারভীন হ্যাপী: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি আমি শ্রদ্ধেয় শিবলী মোহাম্মদ ও শামীম আরা নিপা আপা পরিচালিত নৃত্যাঞ্চলে এবং আমার বিভাগের সম্মানিত চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা পরিচালিত সুরের ধারায় নৃত্য প্রশিক্ষক হিসেবে এবং বাংলাদেশ দূতাবাসের সম্মানিত কূটনীতিক জামাল হোসেন পরিচালিত ভারত-বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক বিনিময় কেন্দ্রের সাংস্কৃতিক বিভাগের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।
প্রবাস মেলা: দেশের বাইরে কোথায় কোথায় পারফর্ম করেছেন?
মনিরা পারভীন হ্যাপী: কোলকাতা, দিল্লী, আগ্রা, জয়পুর, সিমলা, মানালী, সিকিম, গ্যাংটক, নাথুলাপাস, ত্রিবানদ্রাম, এলিপ্পি, কোচিন, কন্যাকুমারী, পুরি সহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে নৃত্য পরিবেশন করেছি।

প্রবাস মেলা: বাংলাদেশে নৃত্যকলার ভবিষ্যত সম্পর্কে বলুন- সমাজে এর কোন প্রভাব আছে কি?
মনিরা পারভীন হ্যাপী: একজন শিক্ষক হিসাবে বলবো বাংলাদেশে নৃত্যকলার ভবিষ্যত উজ্জ্বল। কারণ একাডেমিক্যালি এর প্রসার বাড়ছে। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃত্যকলা বিভাগ চালু আছে। শোনা যাচ্ছে অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নৃত্যকলা বিভাগ খোলার চিন্তাভাবনা চলছে। কিন্তু মূল সংকট হলো শিক্ষক পাবে কোথায়? আবার সরকারি চাকরি প্রথম পছন্দ বিসিএস-এও নৃত্যকলা বিষয় অন্তভূক্ত করার প্রস্তাব পাশের অপেক্ষায় আছে। সব মিলিয়ে বলা যায় নৃত্যকলায় পড়ে পাশ করে বেরুলে কর্মসংস্থান লাভ করা খুব কঠিন হবেনা। এবার আসুন নৃত্যকলার সামাজিক প্রভাব এর কথায়- নৃত্যকলা নিজেই স্বতন্ত্র শিল্প মাধ্যম। সঙ্গীত, সাহিত্য, চিত্রকলার মতো এরও সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলার ক্ষমতা রয়েছে। আমি মনে করি আজকের ডিজিটাল যুগে যেসকল ছেলে মেয়ে, মাদক সেবন, সন্ত্রাসসহ নানা অপরাধে জড়াচ্ছে শিল্পের পরশ পেলে তারাও নানা বিপদগামীতা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে বা রাখতে পারবে। কারণ শিল্পবোধ মানুষকে যুক্তিবোধে উদ্বুদ্ধ করে, উদার করে। তাই আমি মনে করি সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া একজন শিল্পবোধসম্পন্ন মানুষ কখনো কোন অপরাধ করতে পারেনা।

প্রবাস মেলা: জীবনের এ পর্যায়ে এসে কার কার কাছে ঋণ স্বীকার করবেন বলে মনে করেন?
মনিরা পারভীন হ্যাপী: আমি সবার কাছে ঋণী। তবে প্রথমেই আমার মা-বাবা, আমার খালামনি মুমু, আমার নাচের প্রথম প্রশিক্ষক মোস্তাক সেলিম পপলু, বাংলাদেশে আমার গুরুজি শিবলী মোহাম্মদ, শামীম আরা নিপা এবং কোলকাতায় আমার গুরুজি শ্রী সন্দীপ মল্লিক ও রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল অধ্যাপক যাদের কাছে আমি একাডেমিক নাচ শিখেছি। সেই সাথে কথক নৃত্যের জনক ও জীবন্ত কিংবদন্তি পন্ডিত বিরজু মহারাজজী ও বিদুষী শ্রীমতি শাশ্বতী সেন এর কাছে আমি কৃতজ্ঞ। ২০০৯ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত আমার সৌভাগ্য ঘটেছিল ওনাদের ওয়ার্কশপ এ অংশগ্রহণ করার। সেই সাথে আমার বিভাগের সম্মানিত চেয়ারপার্সন অধ্যাপক রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান স্যার, আইসিসিআর এর প্রাক্তন পরিচালক শ্রী প্রশান্ত ব্যানার্জী উপ-হাইকমিশন অব বাংলাদেশ, উপ-হাইকমিশন কোলকাতার কাছে আমি চির কৃতজ্ঞ। নৃত্য গুরুমুখী বিদ্যা, তাই সকল গুরুজীদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন করছি, প্রতি নিয়ত চর্চা আর অনুশীলন এর মাধ্যমে একজন সঠিক নৃত্যশিল্পী হিসেবে আমি যেন আমার পরিবেশনা বাংলাদেশ ছাড়িয়ে সমগ্র বিশ্বের মঞ্চে উপস্থাপন করতে পারি, এই আশীর্বাদ চাই সবার কাছে।
প্রবাস মেলা: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
মনিরা পারভীন হ্যাপী: প্রবাস মেলাকেও আমার অনেক ধন্যবাদ। এর সুদীর্ঘ পথচলা কামনা করছি।