আমেরিকার গোল্ডেন স্টেট খ্যাত ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের লস এঞ্জেলস গোটা আমেরিকা তথা সারা বিশ্বে একটি মনোরম সৌন্দর্য্যরে শহর হিসেবে পরিচিত। এখানে অনেক জাতির ভিড়ে বাংলাদেশিরা আজ একটি মর্যাদাশীল জাতি হিসেবে পরিগণিত। ওই শহরের মধ্যখানে রয়েছে ‘লিটল বাংলাদেশ’ নামে এক টুকরো বাংলাদেশ এর উজ্জ্বল উপস্থিতি। আর এই লিটল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অন্যতম রূপকার হলেন কর্মবীর কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব মুজিব সিদ্দিকী। সম্প্রতি তিনি এসেছিলেন প্রবাস মেলা কার্যালয়ে। শোনালেন তার প্রবাস জীবন এবং লিটল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার গল্প। সেসবের চুম্বক অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

বাংলার গর্বিত সন্ধান মুজিব সিদ্দিকীর জন্ম ১৯৫৬ সালে কক্সবাজার জেলায় টেকপাড়ায়। সেখানকার প্রাইমারি স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষার গন্ডি পেরিয়ে কক্সবাজার জেলা হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করেন। তার পর চট্টগ্রাম কমার্স কলেজ থেকে আই.কম, বি.কম পাশ করে চলে আসেন রাজধানী শহর ঢাকায়, ভর্তি হন প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্বিবদ্যালয়ে। এমবিএ পাশ করেন ১৯৭৯ সালে।
প্রবাস জীবন কিভাবে শুরু করলেন, এমন প্রশ্নের জবাবে মুজিব সিদ্দিকী বলেন, ১৯৮১ সালের দিকে একটা জব ভিসা নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সমৃদ্ধ ধনী দেশ কাতার যাই। সেখানে একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে পারসোনেল ম্যানেজার হিসেবে প্রায় ৫ বছর চাকরি করি। তারপর ১৯৮৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে গমণ করি এবং সেখানকার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ভ্রমণ শেষে ক্যালিফোর্নিয়ার লস এঞ্জেলস-এ স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করি।
লিটল বাংলাদেশ কিভাবে প্রতিষ্ঠা করলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ২০০৭ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অফ ক্যালিফোর্নিয়ার পক্ষে লস এঞ্জেলস এর তদানিন্তন মেয়র অ্যন্তনিও ভিয়েরাগোসা বরাবরে এ ব্যাপারে আমরা একটি পিটিশন সাবমিট করি। তাদের সাথে যোগাযোগ করার জন্য উপস্থিত সকলের অনুমোদনক্রমে মুখপাত্র হিসেবে প্রকৌশলী জলীল খান, জনাব মশহুরুল হুদা, ড. জয়নুল আবেদিন ও আমি কাজ করতে থাকি। পরে আমরা লস এঞ্জেলস এর বাংলাদেশি কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে ১১ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করি। উক্ত কমিটির সমন্বয়কারী হিসাবে আমাদের আবেদন অনুমোদনের জন্য আমি প্রায় দুই বছর সিটি অব লস এঞ্জেলস এর সাথে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাই। অনেক চড়াই-উৎরাই, দেন-দরবারের পর ২০১০ সালের ২০ আগস্ট সিটি অব লস এঞ্জেলস চূড়ান্তভাবে লিটল বাংলাদেশ অনুমোদন করে। তিনি আরও বলেন, সিটি অফিস থেকে যেদিন এই আদেশ ঘোষণা করা হয়, সেদিন লস এঞ্জেলস এ প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়।

কোন প্রেরণা থেকে লিটল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করলেন এমন প্রশ্নের জবাবে কৃতি এ প্রবাসী বলেন, মুলত দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে একাজে হাত দিয়েছি। দেখুন আমরা যারা বিদেশে থাকি নিজ মাতৃভূমি বাংলাদেশকে নিয়ে আমরা বেশ স্মৃতি কাতর থাকি। দেশের জন্য কিছু একটা করতে পারলে নিজেকে খুব গর্বিত মনে হয়। আমি প্রথম যখন এ দেশে আসি তখন নিউইয়র্ক, শিকাগো, ফ্লোরিডা সহ আরও বিভিন্ন স্টেটে অনেক ঘোরাঘুরি করেছি। তখন আমার চোখে পড়তো কোরিয়া টাউন, চায়না টাউন, লিটল টোকিও, লিটল ইতালি, থাই টাউন, ঐতিহাসিক ফিলিপিনো টাউন, লিটল আরমানিয়া, লিটল ইথিওপিয়া ইত্যকার ছোট ছোট আঞ্চলিক পরিচিত এলাকা। আমারও মনে হলো আমিও যেহেতু লস এঞ্জেলস এ স্থিতু হয়েছি এখানে আমার প্রিয় জন্মভুমি বাংলাদেশের নামে এরকম একটি জায়গার নামকরণ করা যায়। কাজটি করা আমাদের জন্য সহজ ছিলনা। কারণ ২০০৮ সাল পর্যন্ত এ ব্যাপারে ক্যালিফোর্নিয়ায় বিধিসম্মত কোন আইন ছিলোনা। আবার লস এঞ্জেলস হচ্ছে এমন একটি শহর যেখানে বিশ্বের বহু দেশের মানুষ বাস করে। এর মধ্যে অন্যতম হল কোরিয়ান কমিউনিটি।

আমরা যখন লিটল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আবেদন করলাম তখন তারা তাৎক্ষণিক ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায় ফেটে পড়লো। কোরিয়ানরা লিটল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অনুমদন না দিতে কাউন্সিলের ওপর প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করলো। ফলে অচলাবস্থা যখন তুঙ্গে তখন দু-পক্ষ সম্মত হল আলোচনায় বসার। প্রায় সাত শতাধিক আবাসিক বাংলাদেশিদের মতামতের ভিত্তিতে আমাকে এ্যাটর্নী-এট-ল হিসেবে সিটি কর্তৃপক্ষ এবং কোরিয়ানদের প্রতিনিধি মি: চেং লী এর সাথে পূর্ণ গণসংযোগে বাংলাদেশিদের প্রতিনিধিত্ব করার দায়িত্ব দেয়া হয়। অবশেষে মি: চেং লী ও আমি আইনগতভাবে সুনির্দিষ্ট ‘কোরিয়া টাউন’ ও ‘লিটল বাংলাদেশ’ এর সীমানা নির্ধারণসহ স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর করি। ২০ আগস্ট ২০১০ মাননীয় মেয়র এরিক গারসিটি তা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন।
মুজিব সিদ্দিকী একজন মুক্ত মনের সৃজনশীল মানুষ। পেশা হিসাবে বর্তমানে তিনি বেছে নিয়েছেন সৃজনশীল অনুবাদ এবং পরিসেবা। আলাপচারিতায় জানা যায় একাধারে তিনি একজন ল্যাঙ্গুয়েজ কনসালটেন্ট, লবিস্ট, অনুবাদক, ফান্ড রাইজার হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের বাংলা কমিউনিটি এবং মূলধারার অ্যামিরিকানদের কাছে সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব।
বাংলা ভাষা ছাড়াও তিনি হিন্দি, উর্দু, আরবি, স্পেনিশ, ফেঞ্চ ভাষায় সমান পারদর্শী। তাই যুক্তরাষ্ট্রের অনেক খ্যাতনামা ল ফার্ম ইন্সুরেন্স কোম্পানির সাথে তিনি পেশাদার অনুবাদ কনসালটেন্ট হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে কাজ করছেন।

আলাপকালে আরো জানা যায়, তার হাত ধরে অনেকগুলি কমিউনিটি সংগঠন গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ইউনিটি ফেডারেশন অব লস এঞ্জেলস-বাফলা এর তিনি কো-ফাউন্ডার। ২০০৬ সালে তিনি এই সংগঠনের বোর্ড অব ট্রাস্ট্রির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলার বিজয় বহর নামে আরেকটি প্রভাবশালী সংগঠন যার মাধ্যমে প্রতিবছর বাংলাদেশের মহান বিজয় দিবস এবং লিটল বাংলাদেশ এর প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী জাঁকজমকভাবে একযোগে উদযাপন করা হয়। বর্তমানে তিনি এ সংগঠনের চেয়ারম্যান এবং লিটল বাংলাদেশ ইমপ্রুভমেন্ট ইনক এর প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন।
কমিউনিটি কাজ করার সুবাদে তিনি লোকাল কাউন্সিল স্টেট এবং ফেডারেল গভর্মেন্টের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং তাদেরকেও বাংলাদেশি সংস্কৃতি প্রসারে সম্পৃক্ত করেন। বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের কার্যকরী ও কৌশলগত পদক্ষেপ নেবার জন্য ২০১৭ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন অ্যাফেয়াস কমিটির চেয়ারম্যান কংগ্রেসম্যান এডওয়ার্ড রয়েস এর সাথে আলোচনা করেন। ২০০১ সালে ৯/১১ ঘটনার পর লস এঞ্জেলস কমিউনিটিতে বসবাসরত বিভিন্ন দেশের অভিবাসীর উদ্বেগ উৎকণ্ঠা দূর করার জন্য মুজিব সিদ্দিকী সেখানকার ইমিগ্রেশন বিভাগের পরিচালক জেইন এরিলানোর সাথে বৈঠক করেন।

প্রাজ্ঞ এই কমিউনিটি লিডার কমিউনিটি সার্ভিসে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ২০১৪ সালে সিটি অব লস এঞ্জেলস কাউন্সিলের কমিশনার নিযুক্ত হন। তিনি অনেক এ্যাওয়ার্ড এন্ড এপ্রিসিয়েশনও লাভ করেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সিটি অব লস এঞ্জেলস থেকে ২০১১ সালে সার্টিফিকেট অব এপ্রিসিয়েশন, ২০১০ সালে কোহ্জি রুস্তমজি বে এ্যাওয়ার্ড, কাউন্টি বোর্ড অব সুপারভাইজার্স থেকে সার্টিফিকেট অব কোমেনডেশন, কংগ্রেসম্যান ব্র্যাড সারম্যান থেকে সার্টিফিকেট অব স্পেশাল কনগ্রেশনাল রিকোগনিশন। এছাড়া ২০১২ সালে এশিয়া প্যাসিফিক অ্যামেরিকান কমিউনিটি লিডার হিসেবে কনগ্রেসম্যান জেভিয়ার বিসেরা থেকে তিনি সার্টিফিকেট অব কনগ্রেশনাল এ্যাওয়ার্ড লাভ করেন।
(আলাপচারিতায় অংশ নিয়ে লেখাটি তৈরি করেছেন: মো: মোস্তফা কামাল মিন্টু)