
এবিএম সালেহ উদ্দীন:
১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয় দিবস। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের শৌর্যবীর্য ও বীরত্বমূলক মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত ফসল হচ্ছে বিজয় দিবস। এই বিজয় দিবসের ৫০ বছর অতিবাহিত হচ্ছে এবং বর্তমানে আমরা একই সঙ্গে উদযাপন করছি স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। কিন্তু বাংলাদেশের এই মহান বিজয় দিবসের প্রেক্ষাপট এবং পূর্বাপর ইতিহাস আমরা কতটুকু মূল্যায়ন করি। কোনো দেশ কিংবা অঞ্চলে যখন সর্বস্তরের জনগণের ওপর রাষ্ট্রীয় বৈষম্য, শোষণ, নিপীড়ন, অত্যাচার ও নিষ্প্রেষণ তুঙ্গে ওঠে; রাষ্ট্রপুঞ্জে স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা স্থায়িত্ব লাভ করে, তখন স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে। সে রকমই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধ।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে তৎকালীন পাক হানাদার বাহিনী ঢাকা শহরের সাধারণ মানুষের ওপর আকস্মিকভাবে ভারী অস্ত্র ও কামান-গোলার মাধ্যমে বর্বর হামলা চালায়। ঢাকা শহরসহ সমগ্র দেশে সাধারণ মানুষের ওপর বর্বর হানাদার বাহিনী কর্তৃক সেই গণহত্যার কলঙ্ক পৃথিবীর ইতিহাসে একটি ঘৃণিত ও ধিক্কৃত অধ্যায়রূপেই চিহ্নিত হয়ে আছে। তখন পাকিস্তানি দস্যুদের নৃশংস হত্যাযজ্ঞে সমগ্র ঢাকা শহর পরিগণিত হয়েছিল এক মৃত নগরীতে।
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ২৫ মার্চের বর্বরোচিত গণহত্যায় সমগ্র বিশ্ব স্তম্ভিত ও হতবাক হয়ে যায়। সমগ্র বিশ্বের নিউজ মিডিয়া ও গণমাধ্যমে পাকিস্তানিদের নির্মম বিভীষিকাময় হত্যাযজ্ঞ ও গণহত্যার বীভৎস চিত্র সম্প্রচারিত হয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট এবং তার ইতিহাস আমাদের জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ। ভারতবর্ষে গোলামি যুগের সৃষ্টি হয়েছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অপশাসনের মধ্য দিয়ে। বাংলার সর্বশেষ রাষ্ট্রনায়ক মানবতাবাদী নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার মর্মান্তিক পতন ও নৃশংস হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের যাত্রা শুরু হয়। তারপর ১৯০ বছর গোলামি যুগে চরম অমানবিকতা ও শোষণ-নিপীড়নের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশরা ভারতবর্ষ শাসন করে। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে ব্রিটিশবিরোধী বহুমাত্রিক আন্দোলন এবং গণমানুষের মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্য দীর্ঘমেয়াদি সংগ্রাম চলতে থাকে।
অতঃপর ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তি এবং খণ্ডিত স্বাধীনতার অংশ হিসেবে পাকিস্তান নামক দেশটি আত্মপ্রকাশ করে। তৎকালীন পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল পূর্ব পাকিস্তানে নানা রকম বৈষম্য, রাষ্ট্রীয় অনাচার, জুলুম-নিপীড়নের সময়কালে স্বাধীনতাসংগ্রাম ত্বরান্বিত হতে থাকে। তারা আমাদের ভাষা, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানে। মাতৃভাষা বাংলার স্বাধিকার আদায়ের জন্য ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৫২ সালের মহান ভাষা শহীদ দিবসের মধ্য দিয়ে বাংলার স্বাধীনতাসংগ্রাম বেগবান ও ক্ষিপ্রতর হতে থাকে। এভাবেই দীর্ঘ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতাসংগ্রামের চূড়ান্ত পর্যায় হলো বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ।
প্রকৃতপক্ষে একাত্তরের মার্চ মাসটি ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ মাস। সাতই মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের মধ্য দিয়েই মহান স্বাধীনতাসংগ্রাম চূড়ান্ত দিক পায়। সেদিন উত্তাল জনসমুদ্রের মাঝে তিনি বলেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম।’
বঙ্গবন্ধুর সেই অবিস্মরণীয় ভাষণের মধ্য দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের আভাস পাওয়া যায়। ফলে সমগ্র বাংলায় ক্ষিপ্রতর হয়ে ওঠে স্বাধীনতাসংগ্রাম। সারা দেশে হরতাল, অবরোধ, বিক্ষোভ মিছিল ও সভা-সম্মেলনের মাধ্যমে পাকিস্তানি স্বৈরতন্ত্রের বিদায়ের ঘণ্টাধ্বনি বেজে উঠতে থাকে।
২৫ মার্চের কালো রাতে স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানি আর্মি দ্বারা গ্রেফতার হয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে স্থানান্তরিত হন। একদিকে গণহত্যা, অন্যদিকে মহান স্বাধীনতার স্থপতি জনগণের প্রাণপ্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতার এই দুটি ঘটনায় সমগ্র জাতি এক অন্ধকারে নিপতিত হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে। অতঃপর ২৬ মার্চ মহান মুক্তি আদায়ের চূড়ান্ত লক্ষ্যে স্বাধীনতার ঘোষণা ধ্বনিত হলে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য শুরু হয় সর্বাত্মক মুক্তিযুদ্ধ। সেই ঐতিহাসিক আহ্বানে সকল দেশপ্রেমিক যোদ্ধাসহ সর্বস্তরের মানুষকে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার উদাত্ত আহ্বান জানানো হয়।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের পুলিশ, আনসার, আর্মি, ইপিআরসহ প্রায় অধিকাংশ সরকারি কর্মচারী তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রদান এবং বিদ্রোহ ঘোষণা দিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। যদিও সে সময় কোনো কোনো সুবিধাভোগী লোক পাক সরকারের অধীনেই কর্মরত থাকে। তেমনি রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতাকর্মী, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, ছাত্র-জনতা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর তাঁবেদার রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী তথা স্বাধীনতাবিরোধী ছাড়া দেশের সর্বস্তরের জনগণই মূলত মুক্তিযুদ্ধের অংশীদার।
কেননা মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে (যুদ্ধের সময়) সমগ্র দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় প্রদানসহ প্রত্যেকেই নিজ নিজ সংগতি অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্নভাবে সাহায্য প্রদান করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সুশৃঙ্খল রণকৌশল অবলম্বন করে কর্নেল আতাউল গনি ওসমানীকে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধকে শাণিত করার লক্ষ্যে তৎকালীন পাকিস্তান আর্মির নয়জন চৌকস সেনানায়কের নেতৃত্বে (যারা তৎকালীন পাকিস্তান আর্মির গুরুত্বপূর্ণ পদে ও সর্বোচ্চ র্যাঙ্কের বড় অফিসার হিসেবে অধিষ্ঠিত ছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে তারা পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন) সমগ্র দেশে মুক্তিযুদ্ধের নয়টি সেক্টর ঘোষণা করা হয়। দেশের সেরা নয়জন সেক্টর কমান্ডারের অধীনে সমগ্র দেশের মুক্তিযুদ্ধের সফল পরিচালনা হয়।
ভারতে পালিয়ে যাওয়া কতিপয় ব্যক্তি এবং পাক হানাদার বাহিনীর দোসর ছাড়া সমগ্র জাতি জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তৎকালীন আওয়ামীলীগের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা তাজউদ্দীন আহমদকে রাষ্ট্রপতি করে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার ঘোষণা দেওয়া হয়। তখনই স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের সরকার ব্যবস্থাপনার যাত্রা শুরু হয়। স্বাধীনতার পর সেই অনুপাতে বঙ্গবন্ধুর দেশে ফিরে আসার পূর্ব পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে বাংলাদেশ রাষ্ট্র পরিচালিত হতে থাকে।
এভাবেই লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অতঃপর দীর্ঘ নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তান আর্মির আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বিজয় দিবসের সূচনা হয়। ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে ঐতিহাসিক বিজয়ের মধ্য দিয়ে বিশ্বে আরও একটি নতুন স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। সমগ্র দেশ আনন্দ ও উৎসবের উল্লাসধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে।
দেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়া তাদের স্বজনদের শোক ও বেদনার কথা ক্ষণিকের জন্য ভুলে গিয়ে হলেও স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের বিজয়ের আনন্দে অংশ নেন। আগামী দিনের উন্নত ভবিষ্যতের কল্যাণে সবাই সকল ভেদাভেদ ভুলে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে একযোগে কাজ করার প্রত্যয়ে উদ্বেলিত হয়ে ওঠেন। দুই লক্ষাধিক মা-বোনের ইজ্জত লুণ্ঠনকারী বর্বর পাকিস্তান আর্মি এবং তাদের দোসর রাজাকারদের জনগণ ধিক্কার দেয়। বলা বাহুল্য, দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর যে মহান গৌরব নিয়ে বিজয়ের সূচনা হয়, তা ছিল সমগ্র বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের ফসল।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি সুদীর্ঘ ইতিহাস আছে, যা আমাদের জাতিসত্তার জন্য বিরাট গৌরবের। ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলন, মহান ভাষা আন্দোলন এবং পরবর্তী সময়ে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলার মানুষের মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্য চূড়ান্ত পর্যায়ে দীর্ঘ নয় মাসের বিরতিহীন রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ এসব আমাদের বীরত্বপূর্ণ গৌরবেরই অংশ।
বাংলাদেশের মানুষ ত্যাগ করতে জানে। তেমনি ত্যাগের মূল্যায়ন ও সম্মান করতে জানে। তাই তারা সকল ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে নতুন বাংলাদেশ গড়ার দৃপ্ত প্রয়াসে সবাই একযোগে দেশের উন্নয়নে আত্মনিয়োগ করার জন্য উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু দেশে পাকিস্তান থেকে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। নতুন সরকার ব্যবস্থাপনায় দেশ এগিয়ে যায়। তার পরের ঘটনাপ্রবাহ এবং দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে সবাই অবগত।
১৯৭১ সালের মহান বিজয়ের পর থেকে বহু চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে বিভিন্ন সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে রাষ্ট্রপুঞ্জে অনেক ঘটনাপ্রবাহের অবতারণা হয়। বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীনদের গণবিরোধী কাজ এবং স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকিমূলক কার্যক্রমের অবতারণাও ঘটে। উন্নয়ন-প্রক্রিয়ার পাশাপাশি বিশ্বাসঘাতকতা, স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতাপ্রসূত কার্যক্রম চালু হয়ে যায়। যেমন গণনিপীড়নমূলক বিধির প্রচলন এবং গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রাকে হত্যা করে একদলীয় শাসনব্যবস্থা, সামরিক ক্যু এবং স্বৈরশাসনের মতো গণধিক্কৃত কাজও বাংলাদেশে ঘটেছে। পঁচাত্তরে সামরিক ক্যুর মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের বেশির ভাগ সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের স্থপতি হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে এমন নির্দয় ও নৃশংসভাবে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে একটি কলঙ্কজনক ইতিহাসেরই জন্ম দেওয়া হলো। বঙ্গবন্ধু শহীদ হলেন।
অতঃপর মোশতাক সরকার, ৩ নভেম্বরের ব্যর্থ সামরিক ক্যু এবং জেলখানায় জাতীয় চার নেতার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে ইতিহাসে আরেকটি কলঙ্কের অবতারণা ঘটে। পরবর্তী সময়ে ৭ নভেম্বর সিপাহি বিপ্লব এবং জেনারেল জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা। তারপর নির্মম পদ্ধতিতে প্রেসিডেন্ট জিয়ার নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে ক্ষমতা দখলের অপচেষ্টা। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠিত বিচারপতি সাত্তারের সরকারকে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে উৎখাত করে জেনারেল এরশাদের ক্ষমতা দখল এবং নয় বছরের স্বৈরশাসন।
এরশাদের ক্ষমতা দখলের পর থেকে দীর্ঘ নয় বছর এরশাদবিরোধী আন্দোলন এবং পরে নব্বইয়ের গণ-অভ্যুথানের মাধ্যমে জেনারেল এরশাদের পতন। নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচন এবং বিএনপির বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সরকার গঠন ও গণতন্ত্রের পুনর্যাত্রা। একই নিয়মে নির্বাচনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের (১৯৯৬) সরকার গঠন। অতঃপর আবারও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন, আবারও বেগম খালেদা জিয়ার সরকার প্রতিষ্ঠা। অতঃপর আবারও বিশ্বাসঘাতকতা। কুখ্যাত জেনারেল মইনের ক্ষমতা দখল এবং অনেক নির্যাতনমূলক আচরণ বহুবিধ নাটকের মধ্য দিয়ে কথিত নির্বাচনের ব্যবস্থা করে তিন উদ্দিনের সরকারের বিদায়পর্ব এবং শেখ হাসিনার সরকার গঠন।
এভাবেই স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রতন্ত্রের ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে। কত মানুষ গুম, নির্যাতন ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। কত ঘটনা-দুর্ঘটনার অবতারণা ঘটেছে।
বিজয় দিবস ও স্বাধীনতা দিবস এলে আমরা মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবের কথা ভেবে যেমন গৌরববোধ করি, তেমনি গণতন্ত্রের অধঃপতন এবং বাংলাদেশে অবক্ষয়ী সমাজের কথা ভেবে বেদনায় আপ্লুত ও ভারাক্রান্ত হই। কেননা বিভিন্ন সময়কার প্রতিটি সরকারের ছত্রচ্ছায়ায় স্বাধীন বাংলাদেশের উন্নয়নের পাশাপাশি দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও সর্বোপরি সামাজিক অবক্ষয় বেড়েছে সমানভাবে। রাষ্ট্রীয় বখাটেপনা ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় স্বাধীন বাংলাদেশে ঘটেছে দলন-নিপীড়ন ও গণনির্যাতনমূলক কার্যক্রম। নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বেশির ভাগ সময়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ছড়িয়ে অযাচিত রক্তপাতের সূচনা করে ক্ষমতাকে স্থায়ীকরণের অপপ্রয়াসও চালানো হয়েছে অনেকবার। রাষ্ট্রীয় অনাচার ও শ্রেণিবৈষম্যের ফলে দেশে আর্থসামাজিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে বারবার। ধর্মের নামে অধর্মের কাজ হয়েছে। ধর্মের অপব্যাখ্যা ও দোহাই দিয়ে সব ধর্মের মধ্যে মৌলবাদী তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশব্যাপী মানববিধ্বংসী উন্মাদনা, নৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়, শিশু ও নারী নির্যাতনের মতো পাশবিকতা, মানবতাবিরোধী কাজ, গুম-হত্যা-খুনখারাবি ইত্যাকার বিষয় তো আছেই। তেমনি বল্গাহীনভাবে বেড়েছে দুর্নীতি ও সন্ত্রাস।
মনে রাখা দরকার, নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থার অভাব এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার থাকলে স্বাধীন দেশের মর্যাদা থাকে না।
একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ পৃথিবীর বুকে একটি আত্মনির্ভরশীল উন্নয়নমুখী দেশ। দীর্ঘ ৫০ বছরে বহু চড়াই-উতরাইয়ের মধ্যেও বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে। আমাদের শিল্প-সহিত্য ও সংস্কৃতির উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু নৈতিকতার মান কমেছে। সামাজিকভাবে মানুষের ভেতর থেকে দয়াদাক্ষিণ্য ও সম্মানবোধ কমে গেছে। দুর্নীতি ও সামাজিক অবক্ষয় ও পাশবিকতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এটা দুঃখজনক।
আমরা জানি, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে আগামী দিনের বাংলাদেশকে উন্নত করার লক্ষ্যে সরকারের অনেক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিক্ত হলেও সত্য, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে স্থায়ীকরণের জন্য নির্দয় ও নির্মম পদ্ধতিতে অযাচিত রক্তপাতের মাধ্যমে পিচ্ছিল রাজনীতির উন্মেষ ঘটিয়ে প্রতিটি সরকারের মাধ্যমেই স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতি কলুষিত হয়েছে। মনে রাখা দরকার, কোনো দেশ ও জাতির স্বার্থবিরোধী অনাচারি ব্যবস্থাপনার অপনোদন না ঘটিয়ে একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব হয় না।
অযাচিত রাজনৈতিক প্রতিহিংসাকে উসকে দিয়ে সমাজ ও গণবিরোধী নীতি বলবৎ রেখে হয়তো আংশিক উন্নয়ন হতে পারে কিন্তু সামগ্রিক উন্নয়ন সাধন করা যায় না। যত সমস্যাই থাকুক না কেন, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং আইনের প্রতি সকল নাগরিককে শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। কারণ, আইনের মর্যাদাসম্পন্ন সৎ ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা থাকলে সেখানে দুর্নীতি, কুশিক্ষা, অনাচারি ব্যবস্থাপনার অপনোদন সম্ভব। এতে জনসাধারণের কল্যাণ ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা হবে। সামাজিক, অর্থনৈতিক তথা মানবিক উন্নয়ন বাড়বে। আমাদের মনে রাখতে হবে, জনগণের স্বাভাবিক জীবনের নিরাপত্তাই আইনের মূল দর্শন।
তবে সুখের বিষয়, এসব সত্ত্বেও বাংলাদেশের উন্নয়নপ্রক্রিয়া অব্যাহত আছে। হাজারো সংকট ও প্রতিকূলতার মধ্যেও বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে সামগ্রিক উন্নয়নের দিকে। উন্নয়নের পাশাপাশি রাজনৈতিক সহনশীলতা, মানবিকতা ও সামাজিক উন্নয়নের বিকল্প নেই। এ জন্য রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক আন্দোলন ও আত্মসংগ্রামী হতে হবে।
দার্শনিক ফ্রিতস ল্যাং এর একটি বিখ্যাত উক্তি হলো : ‘জীবনের সবচাইতে মূল্যবান বস্তু হচ্ছে সংগ্রাম।’ যেকোনো সাধনা ও চিন্তার স্বাধীনতার জন্য চেষ্টা করা এবং সংগ্রাম করা জরুরি। প্লেটো বলেছেন, ‘স্বাধীনতা হচ্ছে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের গৌরব। সুতরাং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই মানুষ স্বাধীনভাবে বসবাস করতে পারে।’
গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সামগ্রিকভাবে তথা শিক্ষা, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়, মানবিক ও নৈতিক উন্নয়নের মধ্য দিয়ে দুর্নীতিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করতে হবে। দুর্নীতিমুক্ত হওয়ার জন্য রাষ্ট্রক্ষমতা জরুরি নয়। দরকার সদিচ্ছাবোধ ও নাগরিক মর্যাদাসম্পন্ন আত্মসংগ্রামে ব্রতী হওয়া। তাহলেই স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে আমরা আশাবাদী যে উন্নয়নের পাশাপাশি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় সকল দল ও মতের সহনশীল রাজনীতির সুশীল ধারার প্রচলন ঘটবে এবং সকল নাগরিক জীবনে গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করা হবে। সবার মাঝে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করতে হবে।
বিজয় দিবস এলে আজও চোখের সামনে ভেসে আসে অনেক রক্তাক্ত স্মৃতি। মুক্তিযুদ্ধের সময়কালীন দুঃসহ দিনগুলোর কথা কস্মিনকালেও ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। এ-যাবৎ স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে অসংখ্য মানুষ শহীদ হয়েছেন। অনেক নারী ও শিশুর অকালপ্রয়াণ ঘটেছে, কত মা-বোনের ইজ্জত লুণ্ঠিত হয়েছে। অকালে হারিয়ে গেছেন দেশের অগণিত সূর্যসন্তান। বিজয় দিবসের মাত্র দুই দিন আগে পাক হানাদারদের দোসরের সহযোগিতায় দেশের বুদ্ধিজীবীরা নির্মমভাবে শহীদ হয়েছেন। বিজয় দিবস এলে সেই সব হারিয়ে যাওয়া মহান মানুষের স্মৃতি ও ছবিগুলো আমাদের চোখের পাতায় ভেসে ওঠে। আমরা কীভাবে মহান মুক্তিযুদ্ধের সেই রক্তাক্ত ইতিহাসের কথা ভুলে যাব। তেমনি স্বাধীন দেশে নাগরিক মর্যাদা ও নিরাপত্তার অভাব এবং সন্ত্রাস ও রাজনৈতিক সহিংসতায় দীর্ঘ ৫০ বছরে অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। আমরা তাদেরও আত্মার শান্তি কামনা করি এবং তাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাই।
মহান বিজয় দিবসে আমাদের প্রত্যাশা, শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবার এবং সকল শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সঠিক পরিসংখ্যান ও তালিকা প্রকাশের মাধ্যমে সরকার তাদের প্রতি সহযোগিতা বাড়িয়ে দেবে। বিজয়ের ৫০ বছর পূর্তি এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর এই দিনে সকল শহীদেরÑযাঁদের রক্তদান, ত্যাগ ও প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এসেছেÑপ্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। সকল শহীদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। সবাইকে মহান বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।