মো: আশরাফুল আলম মাসুদ
একজন প্রধানমন্ত্রীকে সবসময়ই দেশের কল্যাণ সাধনের দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হয়। সবকিছু ঠিকঠাক চলছে কি না, সে ব্যাপারেও খোঁজখবর নিতে হয়। সারা সপ্তাহ দেশের জন্য দিন-রাত একাকার করে খেটে চলেন তো বটেই, এমনকি সপ্তাহান্তেও কোনো বিশ্রাম নেন না। ফিরে যান তার পূর্বের পেশা তথা ডাক্তারিতে। সাদামাটা কোনো চিকিৎসা নয়, রোগীদের অস্ত্রোপচার পর্যন্তও করেন সেসব দিনে! বলছিলাম ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী ভুটানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং এর কথা। প্রবাস মেলা’র নিয়মিত ফ্যাক্ট এবাউটের এবারের পর্বে লোটে শেরিং এর আদ্যোপান্ত নিয়ে আমাদের আয়োজন।
প্রাথমিক জীবন ও শিক্ষা: ডা. লোটে শেরিং ১৯৬৮ সালে ভুটানের রাজধানী থিম্পুর এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। প্রাথমিক জীবনে তিনি শেরুবসের পুনাখা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে পড়াশুনা করেন। ১৯৯১ সালে তিনি বাংলাদেশের ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। ১৯৯৮ সালে এমবিবিএস শেষ করেন। এমবিবিএস পাশ করার পরে ঢাকায় অধ্যাপক ডা. খাদেমুল ইসলামের অধীনে জেনারেল সার্জারি বিষয়ে এফসিপিএস করেন। ২০০৩ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশে ছিলেন। ময়মনসিংহ মেডিকেলের পাশাপাশি কিছুদিন হাতে কলমে কাজ করেছেন ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজেও।
এরপর লোটে শেরিং ২০০২ সালে দেশে ফিরে কয়েক বছর চাকরি করার পর রাজনীতিতে আসেন বন্ধু টান্ডি দর্জির প্রতিষ্ঠিত দলে যোগ দেয়ার মাধ্যমে। মি. দর্জি বর্তমানে ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, তিনিও লোটে শেরিংয়ের মতো ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকেই এমবিবিএস পাশ করেছেন।

রাজনীতিতে লোটে শেরিং: ২০০৮ সালে ভুটানে পরম রাজতন্ত্রের সমাপ্তি ঘটে এবং দেশটি একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্র ও সংসদীয় গণতন্ত্রে রূপ নেয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ২০১৩ সালে অনেকটা আকস্মিকভাবেই ‘ড্রাক নামরূপ শকবা’ দলের হয়ে দেশটির জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেন তিনি। কিন্তু ভাগ্য সহায় হয়নি। নির্বাচনে হার মেনে নিয়ে আবার মনোনিবেশ করেন ডাক্তারি পেশায়। এসময় গ্রামে-গঞ্জে চিকিৎসা দিয়ে বেড়িয়েছেন মানুষকে। তারপর ২০১৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হন তিনি। সে নির্বাচনে তার রাজনৈতিক দল ‘ড্রাক নামরূপ শকবা’ ক্ষমতায় আসে এবং লোটে শেরিং ৭ নভেম্বর, ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন।
একটি দিন স্বাস্থ্যসেবায়: প্রধানমন্ত্রী হয়েও নিজ হাতে রোগীদের সেবা দিয়ে যাওয়ার ব্রত ত্যাগ করতে পারেননি লোটে শেরিং। আর তাই ভাগ করে নিয়েছেন সপ্তাহের দিনগুলো। পাঁচ দিন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর সামলে প্রতি শনিবার সশরীরে হাসপাতালে উপস্থিত থেকে রোগী দেখেন, নিজ হাতে করেন অস্ত্রোপচার! সপ্তাহের অবশিষ্ট দিন, অর্থাৎ রবিবার সারা দিন কাটান পরিবারের সাথে। এ বিষয়ে বার্তা সংস্থা এএফপিকে তিনি বলেছিলেন,

‘ছুটির দিনে কেউ গলফ খেলতে পছন্দ করে, কেউ আবার তীরন্দাজি করে। কিন্তু আমি পছন্দ করি অসুস্থ রোগীর অস্ত্রোপচার করতে। এর মাধ্যমেই আমি আমার সারা সপ্তাহের উদ্বেগ কাটাই। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমি এ কাজই করে যাব। প্রতিদিন এখানে (হাসপাতালে) আসতে না পারাটাকে আমি খুব মিস করি। সপ্তাহের অন্য দিনগুলোতে আমি যখন গাড়ি চালিয়ে কাজে যাই, আমার বারবার মনে হতে থাকে, যদি আমি গাড়িটা ঘুরিয়ে হাসপাতালের দিকে যেতে পারতাম!’
দেশ পরিচালনা আর ডাক্তারি একই রকম: ডাক্তারি এবং প্রধানমন্ত্রীত্ব দুটোকেই এক চোখে দেখেন শেরিং। এক মনে করার একটা ব্যাখ্যাও দিয়েছেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী। হাসপাতালে একজন ডাক্তার রোগীকে সারাতে ঔষধ দেন কিংবা শরীরের বিভিন্ন অংশ পরীক্ষা করে দেখেন। প্রধানমন্ত্রীর কাজও একই, কারণ তাঁকে সরকারের বিভিন্ন পলিসি পরীক্ষা করে দেখতে হয়, সার্বিক অবস্থার উন্নতির চেষ্টা করতে হয়।
মনযোগ দেন স্বাস্থ্যখাতে: প্রধানমন্ত্রী হয়ে দেশের স্বাস্থ্যখাতকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করেন তিনি, নেন নানামুখী পদক্ষেপ। নাগরিকদের সুন্দর স্বাস্থ্য আর সুখ-স্বাচ্ছন্দকে দেশের উন্নয়নের মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করেন লোটে শেরিং। তিনি বলেন, ‘ভুটানের চারটি দল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলো যারা মোটামুটি সমমানের ভালো অথবা খারাপ’। ‘কিন্তু আমরা (নির্বাচনে) জিতেছি শুধুমাত্র আমাদের হেলথ ম্যানিফেস্টোর জন্য’।
বাঘমারা মেডিকেল ছাত্রাবাসের ২০ নম্বর কক্ষের শিক্ষার্থী: লোটে শেরিং এর সাথে বাংলাদেশের একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তিনি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ২৮তম ব্যাচের সাবেক শিক্ষার্থী। ১৯৯১ সাল থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত ময়মনসিংহে কাটান তিনি। অন্যান্য সহপাঠী এবং ভুটানের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী টান্ডি দর্জির সাথে বাঘমারা কলেজ হোস্টেলের ২০ নম্বর রুমে থাকতেন তিনি। সেখান থেকে এমবিবিএস পাশ করে জেনারেল সার্জারি নিয়ে এফসিপিএস করেছিলেন ঢাকাতে।
‘আপনার পান্তাভাত খাইয়েছেন’: চলতি বছর পয়লা বৈশাখের দিন সকালে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে লোটে শেরিং বাংলায় বলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে আপনাদের সবাইকে আমার মন থেকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। আপনারা পান্তাভাত খাইয়েছেন? আমি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করার পর ঢাকায় এফসিপিএস করেছি। আসলে আমার মন উত্তেজনাপূর্ণ, মুহূর্ত অনুভব করছে কখন ময়মনসিংহ যাব।’

প্রধানমন্ত্রী হয়ে ময়মনসিংহে লোটে শেরিং: চলতি বছরে বাংলাদেশের নববর্ষ উদযাপনের নতুন মাত্রা ছিল ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর আগমণ। এসময় তিনি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে আসেন এক বিশেষ সংবর্ধনায় যোগ দিতে। এসময় তিনি শিক্ষার্থীদের সাথে নিজের শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন স্মৃৃতিচারণা করেন। যার অধিকাংশই ছিলো বাংলায়!
তিনি বলেন, ‘শিক্ষক পরের দিন যে বিষয়টি পড়াবেন, সেটি আমি আগের রাতেই একবার চোখ বুলিয়ে নিতাম। পরদিন ক্লাসে গেলে স্যার ডেমো দিতেন। এবং এরপর বন্ধুদের নিয়ে আবারো সেটি নিয়ে আলোচনা করতাম। ফলে বিষয়টি দু-তিনবার পড়া হয়ে যেত। এ থেকে শিক্ষাটা হলো আমরা যদি শিখতে চাই, সেটা পড়িয়ে নয়, আলোচনা করতে হবে। শেখার সেরা উপায় হলো আলোচনা করা।
তিনি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে উপস্থিত নবীন শিক্ষার্থীদেরকে আরো একটি বিশেষ উপদেশ দেন, যা তাদের ভবিষ্যৎ ডাক্তারি জীবনের পথ চলায় খুবই উপকারী হতে পারে। তিনি বলেন, ‘যদি রোগী দেখতে চাই, তবে ভালো করেই দেখতে হবে। হুট করে প্রেসক্রিপশন দিলে ডায়াগনোসিস মিস হতে পারে এবং আমরা আমাদের কাজ হালকাভাবে নিলে আরেকজনের জীবনের ক্ষতি হতে পারে। রোগীর সাথেই আমাদেরকে সকাল-সন্ধ্যা, রাত-দিন উঠাবসা করতে হয়। তবু আমরা মানিয়ে নিই, কারণ এটাই আমাদের কাজ।”
এছাড়াও সেদিন বক্তৃতায় নানা উদাহরণ তুলে ধরে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যে আরও যেসব পরামর্শ দেন তা হলো:
* সার্জন হওয়া বা না হওয়া গুরুত্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভালো সার্জন হওয়া।
* আর ভালো সার্জন হতে হলে প্রথমে ভালো মানুষ হতে হবে।
* আমাদের সবার মতামত দেয়ার অধিকার আছে। কোন বক্তব্য ভুল বা সঠিক বলে চূড়ান্ত রায় দেয়ার কিছু নেই, যেকোন বিষয়ে ভিন্নমত থাকতেই পারে।
* আমরা শুধু মানুষের জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে কাজ করি। এটা মনে রাখতে পারলে তা হবে সেরা অর্জন।
* শিক্ষকেরা সবসময়ই শিক্ষার্থীদের জন্য আছেন। শিক্ষার্থীদেরও শিক্ষকদের জানতে ও বুঝতে হবে।
* উচ্চাভিলাষী হওয়ার দরকার নেই।
* নিজের সেরাটা দিন, বাকীটা আল্লাহই আপনাকে দেবেন।