তপন দেবনাথ, লস এঞ্জেল্স, যুক্তরাষ্ট্র
অবশেষে দেখা মিলল। বস্তুটির দেখা পাওয়ার জন্য তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে আঠার বছর। এই আঠার বছর রহমানের এক দিনের জন্যও নিশ্চিন্তে কাটেনি। বস্তুটির দেখা মিলবে কি মিলবে না এমন আশংকা যেমন ছিল তেমনি ছিল ফেলে আসা পরিবার পরিজনের জন্য মর্মবেদনা। একটি সমস্যা হলে হয়তো সে সামাল দিতে পারতো কিন্তু অগণিত সমস্যা হলে সামাল দেয়া দুস্কর। গত আঠার বছর রহমান যেন সমস্যার সাগরেই হাবুডুবু খাচ্ছিল। বহু প্রতীক্ষার পরে অবশেষে সে পরম বস্তটির দেখা পাওয়া গেল। না, অষ্ঠাদর্শী কোনো অস্পরার দেখা নয়, বহু কাংখীত আমেরিকার গ্রীণ কার্ডের দেখা মিলল। আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতিপত্র যাকে বলে।
দালালকে এককাড়ি টাকা দিয়ে, বহুদেশ ঘুরে জীবনকে হাতের মুঠোয় নিয়ে রহমান লস এঞ্জেলসে এসে আবাস গাড়ে। প্রথম কয়েক দিন অর্ধাহারে অনাহারে কাটানোর পর স্বদেশের এক দোকান মালিকের শরণাপন্ন হলে ভাগ্য কিছুটা সুপ্রশন্ন হয়। মালিক তার দোকানে একটি কাজের ব্যবস্থা করে দেন এবং স্বদেশের একজনের সাথে রুমমেট হিসাবে থাকার ব্যবস্থাও করে দেন। যেহেতু রহমানের কোনো কাগজপত্র নেই, কাজ করার অনুমতি পত্র নেই সেহেতু দোকান মালিক কিছু সুবিধা নিবেন- এটা প্রায় অবধারিত। রহমান মানে আবদুর রহমান- জীবনের যাতাকলে পিষে পিষে তার নামটাও এখন অর্ধেক হয়ে গেছে। আবদুর বাদ দিয়ে এখন সে রহমান নামেই পরিচিত। নাম অর্ধেক গেছে যাক, সে নিয়ে সে ভাবছে না। দমটা যে আছে এটাই ঢের বেশি।
মালিক যে রহমানের থেকে সুবিধা নিচ্ছে সেটা সে ভালোভাবেই বোঝে কিন্তু করার কিছু নেই। মালিক গ্রীণকার্ডের জন্য আবেদন না করলে অবৈধভাবে এদেশে থাকা তার জন্য দুস্কর হয়ে যেত। যদিও গ্রীণকার্ডের বরাদ দিয়ে মালিক প্রতিমাসে তার থেকে বেতন কেটে রাখে তথাপি ভালো যে একদিন না একদিন তো গ্রীণকার্ডের দেখা মিলবে। গত আঠার বছরে রহমানের মা-বাবা মারা গেল- সে যেতে পারেনি। আরো কত নিকট আত্মীয় যে পৃথিবী থেকে বিদায় নিল তার হিসেব নেই। আর কত নতুন মুখের যে আগমন হলো তারও কোনো হিসাব নেই।
জীবন খাতার হিসেবের গড় মিলের মধ্যে বড় গড়মিল হলো-রহমান যখন দেশ ত্যাগ করে তখন ছেলের বয়স ছিলো দু’বছর। আর তার আজকে আঠার বছরের মেয়েটি ছিল তার মায়ের পেটে। নিয়তির নির্মম পরিহাস এই আঠার বছর সে দেশে যেতে পারেনি। কন্যার মুখ দেখতে পায়নি। সে মেয়ে আজ বিয়ে যোগ্য। এবার সে উচ্চমাধ্যমিক দিবে। কেমন হবে পিতা-কন্যার প্রথম মিলনের দৃশ্যটি। ভাবে রহমান- মেয়ে আমাকে চিনতে পারবে তো? যে জমানা এসেছে আমাকে দেখে কোনো উদ্ভট লোক ভেবে মুখ ফিরিয়ে নিবে না তো মেয়ে?
গত আঠার বছরে সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে আবদুর রহমানের। ভাবনাগুলো এখন আর তেমন স্থায়ীত্ব লাভ করে না। ভাবনারা মাথায় আসে, কোনো সমাধান ছাড়াই আবার মিলিয়ে যায়। আবার আসে বিক্ষিপ্তভাবে। দেশে গেলে কার জন্য কি নিবে এ নিয়ে গত একমাস ভেবেছে রহমান। ছেলে ও মেয়ের জন্য একটা করে ল্যাপটপ সে আগেই কিনে রেখেছে। মালিক এক মাসের বেশি ছুটি দিতে রাজী নয়। বলে কয়ে তাকে ২ মাসের জন্য রাজী করিয়েছে। বাংলাদেশে একই জেলার পাশাপাশি থানার লোক বলে এতটা সদয় হয়েছেন মালিক। যদিও নতুন লোক দিয়ে তার স্টোর চালানো বেশ কষ্টকর হবে তবুও মানবিক কারণে তিনি রাজী হয়েছেন। আকার ইঙ্গিতে এ-ও বলে দিলেন যে এর বেশি দেরী হলে তিনি অন্য ব্যবস্থা করবেন। আবদুর রহমান করুণ দৃষ্টিতে মালিকের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল, কোনো কথা বলেনি।
আমিরাত এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে আবদুর রহমান যখন ঢাকা অবতরণ করল তখন সকাল দশটা। আকাশে কোনো মেঘ নেই তারপরও সূর্যের আলোটা কেমন যেন ম¬ান লাগছে। মনে হয় মুখ ভার করে আছে। মোর্শেদা, তার ছেলে আবির ও মেয়ে নুসরাতকে নিয়ে বিমান বন্দরে এসেছে স্বামীকে স্বাগত জানাতে। গতকাল রাতেই তারা ঢাকা এসে একটি হোটেলে উঠেছে। আঠার বছর পর স্বামীর আগমনে মোর্শেদার মধ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে গেলেও আবির ও নুসরাতের মধ্যে কোনো প্রকার ভাবান্তর নেই। শুধু ফোন টিপাটিপি করেই তাদের সময় কাটে। যদিও রহমানই ছেলেমেয়ের জন্য সেট দু’টি পাঠিয়ে ছিল।
বিমানবন্দরের বাইরে এসে রহমান চারিদিকে তাকাচ্ছে। পরিচিত কাউকে দেখছে না। বাড়ি থেকে কেউ এসেছে কিনা সেটা রহমান জানে না। তবে তাদের আসবার কথা ছিল এটা সে জানে। একটু পরেই হন্তদন্ত হয়ে মোর্শেদা এসে সামনে দাঁড়াল। আসসালামাইকুম, বলেই মোর্শেদা রহমানের পা ছুয়ে সালাম করল। অপ্রিয় হলেও সত্য যে গত আঠার বছর রহমান কেউ কাউকে পা ছুয়ে সালাম করতে দেখেনি। এই কালচারটির কথা সে প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। স্ত্রীকে তার একটি চুমো দিতে ইচ্ছে করছিল কিন্তু সাথে ছেলেমেয়ে এবং অন্য মানুষ রয়েছে বিধায় তার সে ইচ্ছে পরিত্যাগ করতে হলো। তাছাড়া প্রথম সাক্ষাতেই মোর্শেদা রহমানের পা ছুয়ে সালাম করাতেই তার মনে পড়ে গেল- দিস ইজ রিয়েল বাংলাদেশ।
রহমানকে সরিয়ে দিয়ে মোর্শেদা ট্রলি ঠেলতে শুরু করল। মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, তোঁয়ার আব্বারে সেলাম কর নুসরাত।
নুসরাত আব্বার চোখের দিকে তাকাল। আব্বা বলতে যে একটা বস্তু আছে সেটা সে জানত কিন্তু সেটা দেখতে যে এমন হয় সেটাই বোধ হয় সে দেখে নিল। নুসরাত মায়ের হাতের উপর হাত রেখে আলতো করে ট্রলি ঠেলতে লাগল। সে আব্বাকে সালাম করলো না।
মায়ের পাশাপাশি হাঁটছে আবির। মোবাইল টিপাটিপি নিয়ে সে খুব ব্যস্ত। ছেলের দিকে তাকিয়ে মোর্শেদা বললেন- কিরে তোর আব্বারে অন সেলাম করস ন?
আবির মুখ তুলে মায়ের দিকে তাকাল। কোনো কথা বলল না। আব্বাকে সালামও করলো না।
চারজনকে নিয়ে মাইক্রোবাসটি দেশের দক্ষিণ পূর্ব অভিমুখে ছুটে চলল। কার সাথে কি কথা বলবে রহমান, চারিদিকে সব দেখতেই ব্যস্ত সে। চেনাজানা সব কিছু কেমন যেন অচেনা লাগছে। ঢাকা শহরের মধ্যে দিয়ে সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী পার হয়ে গাড়ি যখন বিশ্বরোড ধরে ছুটে চলছে তখন তার মনে হচ্ছে- এ তার নিজের দেশ নয়, অজানা দেশের অচেনা কোনো শহর। সব কিছু বদলে গেছে, শুধু মোর্শেদা বদলায়নি এ-ই যা সান্ত¡না।
মাইক্রোবাসের সামনের সিটে আবির। মাঝের সিটে নুসরাত একা এবং পিছনের সিটে রহমান ও মোর্শেদা। রহমান বারবার মোর্শেদার একটি হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে চেপে রাখছে আর মোর্শেদা তা সরিয়ে নিচ্ছে। আবির এবং নুসরাত তাদের মোবাইল ফোন নিয়েই ব্যস্ত। জগৎ সংসারে যা কিছু ঘটছে তা যেন তাদের মোবাইল থেকেই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।
বাড়ির সামনে গিয়ে মাইক্রোবাস থামলো। চারিদিকে অবাক বিস্ময়ে তাকালো রহমান। কিছুই চেনা যাচ্ছে না। আঠার বছর আগে পায়ে হেঁটে বা রিকশায় করে থানা সদরে গেলে তবেই বাসের দেখা মিলত। আর আজ বাড়ির সামনেই মাইক্রোবাস চলে এলো? মাইক্রোবাসের শব্দ পেয়ে আশপাশের কয়েক বাড়ির ছেলেমেয়ে, বৌ, ঝি-রা ভিড় করল। নিয়তির এমন পরিহাস যে আগতদের একজনকেও রহমান চিনতে পারলো না। অথচ তারা তার প্রতিবেশি এবং কেউ কেউ তার আত্মীয়ও বটে। এক, দুই, তিন এভাবে চলে গেছে আঠার বছর। রহমান যা কিছু মনে করার চেষ্টা করছে তা কেবল আঠার বছর আগে যা দেখেছিল তা-ই। মাঝে দিয়ে যে দেড় যুগ চলে গেছে এবং ধীরে ধীরে সব কিছু পরিবর্তন হয়েছে রহমান তা দেখেনি বলে স্মরণে আনতে পারছে না। আঠার বছর আগে এবং আঠার বছর পরে- মাঝে দিয়ে এক বিরাট গ্যাপ তৈরি হয়ে গেছে সেটা রহমান ভাবতে পারছে না। স্ত্রীর মৃদু ধমকে সম্বিত ফিরে পায় রহমান- কীয়া এত ভাবেন? ঘরে চলেন।
নিজের মেয়ের দিকে বার বার তাকায় রহমান। সে ভাবতেই পারছে না এটি তারই মেয়ে। কত বড় হয়ে গেছে। পিতার চোখে চোখ পড়লেই নুসরাত চোখ নামিয়ে নেয়। যেন অচেনা কোনো লোক অনধিকারভাবে তার দিকে বার বার তাকাচ্ছে।
ঘরে প্রবেশ করল রহমান। নিজের ঘরকেও চিনতে পারছে না সে। অথচ এ ঘরেই ত্রিশটি বসন্ত পার হয়েছিল। নুসরাত মাঝায় ওড়না বেধে রহমানের সামনে দিয়ে টেনে লাগিজগুলো ঘরে তুলছে। আবির কোথায় যেন চলে গেছে। মোর্শেদা রান্না ঘরে ঢুকে তার মায়ের সাথে শলা পরামর্শ করল কী কী রান্না হয়েছে। দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়ে গেছে। রহমানের দুচোখ জুড়ে ঘুম আসছে। এ-সময় লস এঞ্জেল্স ভোর। তার গভীর স্বপ্ন দেখার সময়।
আন্নে গোসল কইরবেন নি? মোর্শেদা বলল।
মোর্শেদার কথার কোনো জবাব না দিয়ে রহমান তার মেয়ের লাগেজ টানাটানি দেখছে। সে ভাবছে- শিশুকালে নুসরাত কেমন ছিল, কেমন করেছে সে? একবারও কি সে আব্বা আব্বা ডেকেছিল? আব্বার হাত ধরে তো সে একদিনও হাঁটতে পারেনি। একদিনও আব্বার কাছে লজেন্সের বায়না ধরেনি। একটি বারের জন্যও সে নিজ মেয়েকে কোলে নিতে পারেনি। এক, দুই, তিন, চার এভাবে আঠার বছরে আঠার চেহারায় নুসরাতকে কল্পনা করতে চেষ্টা করল রহমান। ধুর ছাই, কোনো কিছুই মিলছে না। আজ সকালে মেয়েকে প্রথম দেখার ছবি ছাড়া আর কোনো ছবিই তার কল্পনায় আসে না। আসবে কী করে? এর আগে যে মেয়েকে আর একবারও দেখেনি সে। শুধু ছবি দেখেছে। তা-ও কয়েক বছর পর পর।
কলের গোড়াত গরম হানি থুইছি। তাড়াতাড়ি গোসল করি আইয়েন। মোর্শেদা তাগাদা দিল। এবার স্ত্রীর দিকে তাকাল রহমান। স্ত্রীর বয়সটাই যা শুধু বেড়েছে কিন্তু প্রাণচাঞ্চল্য আগের মতোই আছে। সবকিছু বদলালেও মোর্শেদা বদলায়নি।
লাগিজগুলো সব ঘরে তুলে নুসরাত মাকে টেনে রান্না ঘরে নিয়ে গেল। নুসরাত বলল- এগো আম্মা, বেটা ইগা কন? হেতে খালি আঁর মুই চাই থায়।
মেয়ের মুখ টিপে ধরলেন মোর্শেদা। কিয়া রে কয় হেতি? ইগা ত তোর আব্বা।

আন্নে কেমনে জানেন হেতে আঁর আব্বা? কথাবার্তা ছাড়া আৎকা মানুষ ইগ্গা আইছে আর আন্নে হেতেরে কন আঁর আব্বা? কথা খাডেনি?
মেয়েকে থাপ্পর দিতে গিয়েও মোর্শেদা থাপ্পর দিলেন না।
আঠার বছর পর বলতে গেলে এই প্রথম আবির তার পিতাকে দেখল। বিশ বছর বয়সে প্রথম পিতা দর্শণের আনন্দ কেমন হতে পারে সে রকম কোনো ভাবান্তরই নেই আবিরের মধ্যে। কোথা থেকে ঘুরে ফিরে এসে গা গোসল করে, খেয়ে নিজের ঘরে শুয়ে পড়ল আবির।
রান্না ঘরে ঢুকে শ্বাশুড়ীকে কদমবুচি করল রহমান। তারপর লুঙ্গি পরে, গামছা কাঁধে নিয়ে কল পাড় গেল গোসল করতে। ইতোমধ্যে পাশের বাড়ির লোকজন এসে ভিড় করেছে রহমানকে একনজর দেখার জন্য। বার বার একই বিভ্রম হচ্ছে রহমানের। সবাইকে আঠার বছর আগের দেখা আর আজকের দেখায় কিছুতেই হিসাব মিলাতে পারছে না সে।
মগ দিয়ে চাপ কলের জল গায়ে ঢালতেই কেমন শান্তি শান্তি লাগছে রহমানের। আহারে কি শান্তি, নিজের কলের হানি দি গোসল কইত্তে কত বছোর হর।
খাওয়া দাওয়া শেষে শুয়ে পরল রহমান। সন্ধ্যা হতে এখনো ঢের বাকি। দুচোখে জুড়ে ঘুম আসছে রহমানের। এ ঘুম কোনো নিয়মিত ঘুম নয়, শান্তির ঘুম। আঠার বছর জমিয়ে রাখা ঘুম। বাড়ি ভর্তি মানুষের কোলাহল। সবাইকে মোর্শেদা বলে দিয়েছে, ২/১ দিন পর রহমান সকলের সাথে দেখা করবে।
রহমানের মাথার কাছে এসে বসল মোর্শেদা। খপ করে মোর্শেদার একটি হাত ধরল রহমান। মোর্শেদা আপত্তি করলো না। আপত্তি করবে কেন? নিজেরে স্বামী-ই তো। আঠার বছর পর একটি হাতই না ধরছে, আর কিছু তো ধরেনি।
এরই আন্নের মাথা টিপি দিমু নি কোনো?
মাথা টিপন লইগত ন। আজ রাইচ্চা খবর আছে।
আন্নে কি কন? অন্নের ইতা খবররে আমি ডরাই? উল্টা অন্নে আঁর ডরে আঠার বোচর পলাই রইছেন। মোর্শেদার চোখ থেকে দুফোটা জল রহমানের হাতে পড়ল। রহমান নিজের হাতের দিকে এবং মোর্শেদার চোখের দিকে তাকাল। মনে মনে বলল সে- যত হানি আঁর চোখ দি গড়াইছে হশান্ত সাগরেও এত হানি নাই
আন্নে ঘুমান, আঁই দুয়ার বন করি দিলাম।
গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল রহমান। আঠার বছর জমিয়ে রাখা নিজের বাড়ির ঘুম।