প্রবাস মেলা ডেস্ক: বাংলাদেশের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, কবি, সাহিত্যিক, গবেষক, অনুবাদক ও সাংবাদিক অধ্যাপক সিরাজুল হকের স্মরণে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে এক মহতী স্মরণসভার আয়োজন করা হয়েছে। শনিবার (৩০ আগস্ট ২০২৫) বিকাল ৪টায় অনন্য সাহিত্য সংস্কৃতি সংসদের উদ্যোগে জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে (জহুর হোসেন চৌধুরী হল) এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন মরহুমের বড় জামাতা, বিশিষ্ট কবি ও সাংবাদিক এবং নিউইয়র্ক বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের উপদেষ্টা এবিএম সালেহ উদ্দীন। প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, সাবেক চেয়ারম্যান এবং গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান।
স্মরণসভা শুরু হয় পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে। সঞ্চালনায় ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আহসানুল হাদী এবং একই বিভাগের শিক্ষার্থী মুশাররাত তাইয়্যেবা মুশকান। ইসলামী নজরুল সংগীত পরিবেশন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মেহেদী হাসান।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মুমিত আল রশিদ, অধ্যাপক ড. আবদুস সবুর খান, নজরুল ইনস্টিটিউটের শিক্ষক ও সংগীতজ্ঞ সালাউদ্দিন আহমেদ, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সাপ্তাহিক বিক্রম পত্রিকার সাবেক সম্পাদক হাফেজ সুলতান আহমদ, জাতীয় প্রেসক্লাবের স্থায়ী সদস্য ও কলামিস্ট এলাহী নেওয়াজ খানসহ দেশের নামকরা শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা। অধ্যাপক সিরাজুল হকের পরিবারের সদস্য, বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরাও এতে অংশ নেন।
অনুষ্ঠানের স্বাগত বক্তব্য দেন মরহুমের পুত্র এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. তারিক জিয়াউর রহমান সিরাজী। তিনি তাঁর বাবার কর্মময় জীবনের নানা দিক তুলে ধরেন। অধ্যাপক সিরাজুল হকের সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত পাঠ করেন বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী সুজন পারভেজ।
অধ্যাপক ড. মুমিত আল রশিদ বলেন, ছাত্রজীবনে অধ্যাপক সিরাজুল হকের পরামর্শেই তিনি প্রথম লেখালেখি শুরু করেন। তিনি শুধু লেখালেখি নয়, জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোতেও দিকনির্দেশনা দিতেন। অধ্যাপক ড. আবদুস সবুর খান স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, তাঁর সাহিত্যচর্চায় যাঁদের অবদান সবচেয়ে বেশি, তাঁদের মধ্যে অধ্যাপক সিরাজুল হক অন্যতম। তিনি ইসলামের চর্চা করেছেন গভীরভাবে, পাশাপাশি আধুনিক জ্ঞানকেও সমানভাবে গ্রহণ করেছেন। বিশিষ্ট ব্যবসায়ী হাফেজ সুলতান আহমদ অধ্যাপক সিরাজুল হকের মানবিক গুণ ও কর্মদক্ষতার কথা উল্লেখ করে বলেন, তিনি ছিলেন সত্যিকারের মানবপ্রেমিক। নজরুল ইনস্টিটিউটের শিক্ষক উস্তাদ সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, অধ্যাপক সিরাজুল হকের সাংস্কৃতিক বোধ ছিল প্রবল। তাঁর স্মৃতিগুলো আমাদের অনুপ্রাণিত করে।
মানবাধিকার কর্মী সেহলী পারভীন বলেন, অধ্যাপক সিরাজুল হক নিঃসন্দেহে একজন আধ্যাত্মিক শক্তির অধিকারী ছিলেন। তাঁর অনুসারী শুধু দেশে নয়, বিদেশেও ছড়িয়ে রয়েছে। প্রধান অতিথি অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান বলেন, অধ্যাপক সিরাজুল হক ছিলেন আমাদের সময়ের অন্যতম মেধাবী ছাত্র। শিক্ষা, সাংবাদিকতা ও সংস্কৃতিতে তাঁর অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি অধ্যাপক হককে নিয়ে একটি স্মারকগ্রন্থ প্রকাশের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সভাপতি এবিএম সালেহ উদ্দীন বলেন, অধ্যাপক সিরাজুল হক ছিলেন বহুভাষাবিদ—বাংলা, ইংরেজি, আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষায় তিনি সমান পারদর্শী ছিলেন। তাঁর কবিতাসমগ্র প্রকাশের কাজ শুরু হয়েছে। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। সাংবাদিক এলাহী নেওয়াজ খান বলেন, জাতীয় প্রেসক্লাব ও সাংবাদিক ইউনিয়নে অধ্যাপক সিরাজুল হকের অবদান অসামান্য। আশির দশকে সাংবাদিক ইউনিয়নের নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। সভায় উপস্থিত অতিথিরা একমত হন যে, অধ্যাপক সিরাজুল হকের জীবন ও কর্ম নিয়ে একটি স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করা জরুরি। ব্যবসায়ী হাফেজ সুলতান আহমদ এই গ্রন্থ প্রকাশের দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দেন।
অনুষ্ঠানের শেষাংশে অধ্যাপক সিরাজুল হকের আত্মার মাগফেরাত কামনায় দোয়া ও মুনাজাত করা হয়। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নাতনি খিলখিল কাজী হঠাৎ অসুস্থতার কারণে উপস্থিত হতে না পারায় অনুপস্থিতির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন।
স্মরণসভায় ছাত্র-শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশার বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতি মরহুম অধ্যাপক সিরাজুল হকের প্রতি সর্বস্তরের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।