রাশেদ কাদের, আম্মান, জর্ডান প্রতিনিধি: জর্ডানস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের উদ্যোগে শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২০২২ উপলক্ষ্যে দিনব্যাপি আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। দিবসের প্রত্যূষে এই উপলক্ষ্যে দূতাবাসে জাতীয় সঙ্গীতের সাথে মান্যবর রাষ্ট্রদূত জাতীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ করেন। জাতীয় পতাকা উত্তোলন শেষে ভাষা শহিদদের স্মরণে দাড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
আম্মানের স্পোর্টস সিটির জেনারেশন ফর পিস অডিটোরিয়ামে বিকেলে দিবসটি উপলক্ষ্যে আয়োজিত আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব আসাদুজ্জামান খান এম.পি। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আম্মানের গভর্নর জনাব ইয়াসের আল এদোয়ান আব্দেল রহমান এবং জর্ডানের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহকারী মহাসচিব ড. আহমেদ রাশেদ। অনুষ্ঠানের শুরুতেই মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব আসাদুজ্জামান খান এম.পি’র নেতৃত্বে উপস্থিত রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিকবৃন্দ মঞ্চে স্থাপিত অস্থায়ী শহিদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পুস্পস্থবক অর্পণ শেষে ভাষা শহিদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের পাসপোর্ট ও ইমিগ্রেশন অধিদপ্তরের মহা পরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আইয়ুব চৌধুরী ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জনাব মো: আব্দুল্লাহ আল মাসুদ চৌধুরী। আলোচনা অনুষ্ঠান শেষে এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় যেখানে আম্মানস্থ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, কূটনীতিক, জর্ডানের সাধারন নাগরিক ও বাংলাদেশ কমিউনিটি’র সদস্যবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যের শুরুতেই মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব আসাদুজ্জামান খান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন এবং বলেন বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক, সাহিত্য, সভ্যতা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে গভীর তাৎপর্যপূর্ণ চেতনাবাহী একটি স্মরণীয় দিন একুশে ফেব্রুয়ারি। এদিন বাঙালি সমাজের রাজনৈতিক ও সামজিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দিন। একুশে ফেব্রুয়ারির সাথে অবিচ্ছেদ্য হয়ে আছে লাখো শহীদের নাম, যাদের স্মৃতি চির ভাস্বর ও অনন্তকালের পথ পরিক্রমায় মৃত্যুহীন। তিনি বলেন, পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশনে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিটি প্রথম উত্থাপন করেন। কিন্তু শাসকচক্র বাঙালির প্রাণের দাবীর প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে বৈষম্যমূলক আচরণ শুরু করে। ১৯৫২ সালের ৩০ জানুয়ারি ঢাকার এক জনসভায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করলে, বিক্ষোভে ফেটে পড়ে সমগ্র বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী। গঠিত হয় ‘তমদ্দুন মজলিস’ ও ‘ভাষা সংগ্রাম পরিষদ’। সর্বস্তরের বাঙালির অংশগ্রহণে মিছিল, মিটিং স্লোগানে মুখরিত হয় বাংলার আকাশ বাতাস এবং তা চূড়ান্ত রূপ লাভ করে ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি। অনেক রক্ত ও প্রাণের বিনিময়ে শেষ পর্যন্ত শাসকগোষ্ঠী ‘বাংলা’কে পূর্ব বাংলার রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দানে বাধ্য হয়। তিনি আরও বলেন, আরবীর মত একটি ঐতিহাসিক প্রাচীন ভাষা হিসেবে আজ বাংলা ও পৃথিবীর অন্যতম একটি ভাষা। ৩০০ মিলিয়নেরও অধিক লোক এই ভাষায় কথা বলে। আরবিসহ অনান্য ভাষার সংমিশ্রণে বাংলা ভাষা ক্রমাগত সমৃদ্ধ হয়েছে। ভাষা ও সংস্কৃতির মেল বন্ধন বাংলা ও আরবি ভাষাভাষী বাংলাদেশ ও জর্ডান এই দুই দেশের মানুষের মধ্যে চমৎকার যোগসূত্র তৈরি করেছে। ভাষার জন্য বাঙ্গালীর সংগ্রাম পৃথিবীর সকল ভাষার মর্যাদাকেই প্রতিষ্ঠিত করেছে।

অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি জর্ডানের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহকারী মহাসচিব ড. আহমেদ রাশেদ তাঁর বক্তব্যে বলেন আরবি পৃথিবীর একটি অন্যতম বহুল কথিত ভাষা। পবিত্র কোরান নাজিল হয়েছে আরবি ভাষায়। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পৃথিবীর সকল ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন ও সংরক্ষণের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। তাই বাংলাদেশের ভাষা শহিদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে সকল ভাষার প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্যে রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহান ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন এবং ভাষা আন্দোলনের প্রতি আলোকপাত করে বলেন ১৯৫২ সালের এই দিনে পাকিস্তানের শাসকদের দ্বারা আমাদের মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বিলুপ্ত করার প্রতিবাদে একদল ছাত্র রাজপথে নেমেছিল। সামরিক বাহিনী ছাত্রদের উপর গুলি চালালে তাদের মধ্যে কয়েকজন ঘটনাস্থলেই মারা যায়। ভাষার এই আন্দোলন ও আত্মত্যাগ আমাদের মাতৃ ভাষার অধিকারকে প্রতিষ্ঠা করে এবং একই সাথে ঘটনাটি আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে পরবর্তীতে বাংলাদেশের মুক্তির আন্দোলনকেও শক্তিশালী করেছে। তিনি আরও বলেন ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে প্রয়াত রাষ্ট্রদূত সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলীর নেতৃত্বে ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ কর্তৃক ইউনেস্কোতে আবেদনের প্রেক্ষিতে ইউনেস্কো কর্তৃক এটি স্বীকৃতি লাভ করে এবং পরবর্তীতে জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃতি দানের ফলে ২০০০ সাল হতে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। তিনি আরও বলেন, মাতৃভাষা অন্যতম শান্তির উপাদান যার মাধ্যমে আমরা বিশ্বব্যাপী পারস্পরিক সমঝোথা ও বৈচিত্র্যপূর্ণ অন্তর্ভুক্তি মূলক সমাজ গড়ে তুলতে পারি।
আলোচনা অনুষ্ঠান শেষে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ, শ্রীলংকা ও জর্ডানের বিভিন্ন শিল্পিবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন। উক্ত অনুষ্ঠানে জর্ডানের মিউজিক কনজারভেটরি, বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তাবৃন্দ এবং প্রবাসী বাংলাদেশি শিশু কিশোরদের অংশগ্রহণে নাচ ও গান পরিবেশন করা হয়। অনুষ্ঠানের শেষে সকলের অংশগ্রহণে একুশের গান “ আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি” গানটি বাংলা ও আরবী ভাষায় পরিবেশন করা হয়। বিভিন্ন ভাষাভাষীর অংশগ্রহনে আয়োজিত মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি সকলের প্রশংসা লাভ করে।