মো: শাহজাহান বাবুল, হলিউড, যুক্তরাষ্ট্র:
প্রকৃতির লীলাভূমির দেশ বাংলাদেশ। ষড়ঋতুর দেশের নাম বাংলাদেশ। এ-দেশের মতো এমন ঋতুবৈচিত্র্য পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে দেখতে পাওয়া যায় না। সবুজে ভরা বনজঙ্গল, গাছপালা, লতাপাতা, নদীনালা, হাওড় বাওড়- এ যেন স্রষ্ট্রার অফুরন্ত দান, এক আশীর্বাদ। প্রকৃতির এমন আশীর্বাদময় সৌন্দর্যপিপাসু পর্যটকরা যে আহ্বানে কতখানি সাড়া দেবেন, সে অবশ্য নির্ভর করে কিছু বিষয়ের ওপর।
ইকোট্যুরিজম:
বাংলাদেশের প্রকৃতি, মাটি ও লোকালয়ের সাধারণ মানুষের আন্তরিকতা-এক কথায় বলতে গেলে ভরপুর- আনন্দ ও অকৃত্রিম সুখ পিয়াসু পর্যটকদের যা আকর্ষণ করে। কারণ পাশ্চাত্য সভ্যতার যান্ত্রিকতা ও ভোগবাদের মাঝে তারা হৃদয়ের উষ্ণ ছোঁয়া থেকে বঞ্চিত। যেসব দেশে প্রকৃতির এই অফুরন্ত ছোঁয়া আছে- প্রকৃতি ও সাধারণ মানুষের আন্তরিকতার ছোঁয়া নিতে মানুষ উন্নত বিশ্বের দেশ থেকে ওসব দেশে যায়। ইকোট্যুরিজম বাংলাদেশের জন্য স্বর্ণদ্বার উন্মুক্ত করে রেখেছে- যা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিরাট অবদান রাখতে পারে। পৃথিবীর অনেক দেশের হাতের কাজ করা ঐতিহ্যবাহী স্যুভিনির, ঘর সাজানোর তৈজসপত্র ডেকোর টুরিস্টরা কিনে নিয়ে যায় স্মৃতি হিসেবে। বাংলাদেশও এ সুযোগ নিতে পারে। এটা বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিরাট অবদান রাখতে পারে। কারণ বাংলাদেশের মানুষ বিশেষ করে গ্রামীণ নারী জনগোষ্ঠী হাতের কাজে খুব সৃষ্টিশীল। এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার যেসব দেশ ইকোট্যুরিজমে এগিয়ে আছে-তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে আমাদের দেশের ঐতিহ্য, কৃষ্টির ওপর নির্ভর করে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে আমাদের ইকোট্যুরিজমটি পরিবেশন করে সাজাতে হবে। এ ব্যাপারে দেশি ও প্রবাসী অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিশেষজ্ঞদের মতে পৃথিবীর অনেক দেশ বাংলাদেশ থেকে অনেকদিক দিয়ে পিছিয়ে থেকেও ইকোট্যুরিজমের মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে মিয়ানমার, নেপাল, লাওস, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, শ্রীলংকা, ইকুয়েডর, পেরু, কোস্টারিকা, প্যারাগুয়ে এবং প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগরের ছোটো ছোটো দ্বীপপুঞ্জ। ইকোট্যুরিজম দিয়ে ওসব দেশ পর্যটক আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে আর সেই আকর্ষণে প্রচুর পর্যটকের আনাগোনাও রয়েছে ওসব দেশে।
হাওড় ট্যুরিজম:

বাংলাদেশের জন্য প্রকৃতির বিশেষ এক আশীর্বাদ হচ্ছে হাওড়। বাংলাদেশে বিশাল বিশাল সব হাওড় রয়েছে। বর্ষা মওসুমে হাওড় এলাকার বিস্তীর্ণ জলরাশি পানিতে থইথই করে। টাঙ্গুয়ার হাওড়, নিকলি হাওড়, নলুয়ার হাওড়, হাকালুকি হাওড়সহ কত যে হাওড় রয়েছে এ দেশে! এসব হাওড় অনায়াসে পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র হতে পারে। হাওড়কে কেন্দ্র করে পর্যটনশিল্প গড়ে উঠেছে পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা কিংবা কাশ্মীরে।
অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম:

তরুণ প্রজন্মের কাছে অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম সবসময়ই আকর্ষণীয়। রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজমের অপার সম্ভাবনা রয়েছে বাংলাদেশে। পাহাড়, সমুদ্র, নদী ঘিরে অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম গড়ে তুলতে পারলে দেশে পর্যটনশিল্পের বিকাশ ঘটবে ব্যাপকভাবে। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেটে পাহাড় রয়েছে। আর তিন হাজার ফুটের বেশি উচ্চতার পাহাড় রয়েছে ১২টি। এসব পাহাড়কে ঘিরে হাইকিং, ট্র্যাকিং, ক্লাইম্বিং, মাউন্টেনিয়ারিং-এর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এছাড়া রয়েছে তীব্র খরস্রোতা পাহাড়ি নদী। ওসব নদীতেও অ্যাডভেঞ্চার পর্যটনের সম্ভাবনা রয়েছে।
রিলিজিয়াস ট্যুরিজম:

বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় পুরাতন সভ্যতার নিদর্শন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ সভ্যতার অনেক মসজিদ, মন্দির ও বৌদ্ধ বিহার আছে। এসব নিদর্শনের রয়েছে ঐতিহ্যময় সমৃদ্ধ ইতিহাস। বয়সের দিক থেকে এসব নিদর্শন সুপ্রাচীন। সুপ্রাচীন এমন নিদর্শন পৃথিবীর অনেক দেশেই বিরল। শ্রীলংকা, ভারত, পাকিস্তান, তুরস্ক, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার বৌদ্ধ অধ্যুষিত দেশ ছাড়াও জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের মতো দেশ সঠিক পরিকল্পনা ও প্রচারণার মাধ্যমে পর্যটক আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে রিলিজিয়াস ট্যুরিজমের মাধ্যমে। এ সুযোগ বাংলাদেশও নিতে পারে অনায়াসে।
ওয়াইল্ড লাইফ ট্যুরিজম:

সুন্দরবন, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে রয়েছে বিশাল বুনো অঞ্চল। আর এই বুনো অঞ্চলকে আফ্রিকান দেশগুলোর ওপেন সাফারির আদলে তৈরি করা গেলে এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলে ওয়াইল্ড লাইফ ট্যুরিজমের অপার সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশেও।
ব্যাক ওয়াটার ট্যুরিজম:
নদীমাতৃক বাংলাদেশ। প্রচুর নদী ছাড়াও রয়েছে অসংখ্য খাল-বিল, ছোটো ছোটো নদী-নালা, জলাশয়, দিঘি। দেশের নানান অঞ্চলে এগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। এসব জলাশয়ের আবার নানান রকম ব্যতিক্রমী প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রয়েছে। আর এ সৌন্দর্য ও প্রাচুর্যকে কাজে লাগিয়ে প্রকৃতির এই আশীর্বাদকে সম্ভাবনাময় ব্যাক ওয়াটার ট্যুরিজম গড়ে তোলা যেতে পারে। যেমনভাবে ব্যাক ওয়াটার ট্যুরিজমে এগিয়ে রয়েছে কেরালা, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া, পশ্চিমবঙ্গ ও শ্রীলংকা।
মাইস ট্যুরিজম:

মিটিংস, ইনসেনটিভস, কনভেনশনস ও এক্সিবিশনস। আর এসব মিলে সংক্ষেপে মাইস। আন্তর্জাতিক মেলা, প্রদর্শনী, আঞ্চলিক গুরুত্বপূর্ণ, রাষ্ট্রীয় ও ব্যবসায়িক সম্পর্ককে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পর্যটনই হচ্ছে মাইস ট্যুরিজম। ব্যবসাকেন্দ্রিক পর্যটনের এ নতুন ধারাকে কেন্দ্র করে বিশে^র অনেক দেশ পর্যটনশিল্পে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশ, যেখানে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য ভরপুর- সেখানে মাইস ট্যুরিজমের সম্ভাবনা অনেক বেশি। কারণ এটা সুলভে গাইডেড গ্রুপ ট্যুর বা আন্তর্জাতিক বড় বড় ট্যুর অর্গানাইজেশনের মাধ্যমে হয়ে থাকে। পর্যটন কর্পোরেশন ও প্রাইভেট ট্যুর কোম্পানিগুলো ওদের সঙ্গে চুক্তি করে বাংলাদেশে মাইস ট্যুরিজম সম্প্রসারণ করতে পারে। পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য, দক্ষিণ আমেরিকার অনেক দেশ, প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগরের ছোট্ট ছোট্ট দ্বীপপুঞ্জসহ অনেক দেশ ট্যুরিজমের এ নতুন ধারায় প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে।
পর্যটনশিল্পের চ্যালেঞ্জ:
বাংলাদেশ পর্যটনশিল্পে হাঁটি হাঁটি পা পা করে এ সরকারের সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে অনেক চ্যালেঞ্জই মোকাবেলা করে এগিয়ে যাচ্ছে।
বিদেশি ট্যুরিস্টদের নিরাপত্তা, হোটেল রিসোর্টের সেবার মান, আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পরিবেশনের পাশাপাশি আমাদের ঐতিহ্যবাহী খাবার পরিবেশন করতে হবে। কারণ দেশের ঐতিহ্যবাহী খাবার পর্যটকদের কেবল মুগ্ধই করবে না, বাংলাদেশের জনপ্রিয় খাবারগুলোকে আন্তর্জাতিক ফুড মার্কেটে পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিতও করবে এবং একসময় দেখা যাবে এই খাবারের আকর্ষণেই পর্যটক আকৃষ্ট হতে শুরু করেছে।
ইংরেজিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ভাষায় পর্যটন ট্যুর গাইড প্রকাশ করা দরকার। আর দরকার দেশে একটা আন্তর্জাতিক মানের ট্যুরিজম বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা। দেশি বা প্রবাসীদের নিয়ে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে হতে পারে এ বিশ্ববিদ্যালয়। যেখানে গবেষণা, আধুনিক ট্যুরিজম, ট্রেন্ড, আমাদের ঐতিহ্য, কৃষ্টি, খাদ্য ও বিদেশি ট্যুরিস্টদের উন্নত সেবা দেওয়ার জন্য তরুণ-তরুণীদের ট্যুর গাইডের ট্রেনিং কোর্স থাকবে। এছাড়া ভবিষ্যতের ট্যুরিজম ইন্ডাস্ট্রির জন্য ও প্রবাসে ট্যুরিজম মার্কেটের জন্য কোর্স থাকবে।
মাল্টা, গ্রিস, সাইপ্রাস, সিসিলিস, পূর্ব ইউরোপীয় দেশ, প্রশান্ত মহাসাগরের ছোট্ট ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রতে এ ধরনের কোর্সের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
বিপণন ও প্রচার:
পর্যটনশিল্পের জন্য বিপণন ও প্রচার খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং খুব কঠিন কাজও বটে। পৃথিবীর যে দেশ এই বিপণন ও প্রচারে যত এগিয়ে, সে দেশে পর্যটকের আনাগোনা তত বেশি। তবে বিপণন ও প্রচার হতে হবে সৃজনশীল এবং উপস্থাপন হতে হবে ব্যতিক্রম।
আন্তর্জাতিক ডিজিটাল মার্কেটিং এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট, আন্তঃমহাদেশীয় ক্রুজশিপ ও রেলওয়েতে বিজ্ঞাপন দিতে হবে। এসব মাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচার হলে আন্তর্জাতিক ট্যুরিস্টরা বাংলাদেশকে জানতে পারবে। আর সবচেয়ে জরুরি যা দরকার, সেটা হচ্ছে বাংলাদেশে পর্যটনের জন্য একটা আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং তৈরি করা। এ জন্য রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে বেছে নিতে পারে বাংলাদেশ। পুরো দুনিয়া জানে পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো বাঘ রয়েল বেঙ্গল টাইগার। এই রয়েল বেঙ্গল টাইগারকেই বাংলাদেশের পর্যটনের ব্র্যান্ডিং করা যেতে পারে। আর এটা ক্রিয়েটিভ ও ডিজিটাল প্রচার মাধ্যমে প্রচারও করতে হবে।
উপরোক্ত বিষয়গুলো সঠিকভাবে ও সময়মতো কার্যকর করলেই তবে আমরা প্রচুর পর্যটন আকর্ষণ করতে পারব।