মুহম্মদ শামসুল হক, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র:
পররাজ্য দখলের পর যুগ যুগ ধরে আগ্রাসী শক্তি অধিকৃত রাজ্যের চিরায়ত কৃষ্টি-সংস্কৃতি-ধর্ম-স্বদেশপ্রেম উপড়ে ফেলার এবং স্থানীয়দের সেবাদাসে পরিণত করার চূড়ান্ত উদ্যোগ নেয়। আর শিক্ষা ব্যবস্থাকেই নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। আমেরিকার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটিশ সরকার শিক্ষা বিস্তারের নামে ফেডারেল সরকারের অর্থে পরিচালিত ন্যাটিভ আমেরিকানস বোর্ডিং স্কুলের ছদ্মাবরণে ন্যাটিভ আমেরিকান শিশু-কিশোরদের চরমভাবে বিপথগামী ও ধর্মান্তরিত করেছিল। স্থানীয় শিশু-কিশোরদের ইউরো-আমেরিকানে পরিণত করতে গিয়ে বোর্ডিং স্কুলগুলো তাদের উপর নিষ্ঠুর নির্যাতন চালিয়েছিল এমনকি অমানুষিক বর্বরতা চালিয়ে অনেককে খুনও করেছিল। আমেরিকায় প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠার পর ব্রিটিশ বেনিয়ারা এ দেশে নিজেদের আধিপত্য চিরস্থায়ী করার মানসেই ন্যাটিভ আমেরিকান শিশু-কিশোর এবং উঠতি বয়সী যুবক-যুবতীদের দেশিয় জাতীয়তাবোধের পরিবর্তে ইউরো-আমেরিকান (ইউরোপীয় ধাছের আমেরিকান) সংস্কৃতি অনুশীলনে বাধ্য করেছিল। এতদউদ্দেশ্যে ব্রিটিশ সরকার আমেরিকান ইন্ডিয়ান বোর্ডিং স্কুল কিংবা সম্প্রতি আমেরিকান ইন্ডিয়ান রেসিডেন্সিয়াল স্কুল নামে সমধিক খ্যাত বিশেষ ধরনের বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিল উর্ণনাভের মত ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করে।

ফেডারেল সরকারের অর্থায়নে এবং পরিচালনায় সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি থেকে বিংশ শতক পর্যন্ত সমগ্র আমেরিকায় কমপক্ষে ২৫টি ন্যাটিভ আমেরিকান বোর্ডিং স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল বলে সাম্প্রতিক প্রকাশিত এক জরিপ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়। এ সকল আবাসিক বা বোর্ডিং স্কুল প্রতিষ্ঠার পেছনে মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল ন্যাটিভ আমেরিকান শিশু-কিশোরদের অন্তর্নিহিত সহজাত সুকুমার বৃত্তিরাজির সমূল উৎপাটনপূর্বক তাদেরকে ইউরো-আমেরিকান ধর্ম-কৃষ্টি-সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের ছাঁচে ঢালাই করে পুতুল তৈরি করা। পরিকল্পিত উপায়ে প্রস্তুত পাঠক্রম এবং পাঠ্যসূচির মাধ্যমে এ সকল স্কুলে স্থানীয় ভাষা ও কৃষ্টির পরিবর্তে ইউরো-আমেরিকান বিষয়াদির মৌলিক শিক্ষা দেয়া হয়েছিল। ফলশ্রুতিতে ন্যাটিভ আমেরিকান শিশু-কিশোর এবং যুবক-যুবতীরা নিজস্ব ভাষা-কৃষ্টি-সংস্কৃতি ও ধর্ম অনুশীলন ভুলে গিয়ে এক পর্যায়ে ব্রাউন কালার বা বাদামী রঙের ইউরোপীয় ধর্মাবলম্বী আমেরিকানে পরিণত হল। মোদ্দাকথা, আকার-আকৃতি এবং অবয়বে তারা ন্যাটিভ আমেরিকান থাকলেও ভাষা-জীবনাচরণ এবং আহার-বিহার-চিন্তা-চেতনায় ইউরো-আমেরিকান বনে গেল। পরিণতিতে তারা স্বদেশীয় ধর্ম-ভাষা-কৃষ্টি-সংস্কৃতিকে মনে-প্রাণে ঘৃণা করতে শুরু করল এবং রাতারাতি ইউরো-আমেরিকান হয়ে ওঠার মরণ খেলায় মেতে উঠল। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, গোড়ার দিকে প্রধানত ফেডারেল সরকারের অনুমোদনক্রমে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের খ্রিস্টান মিশনারীগুলো প্রধানত রিজারভেশন বা সংরক্ষিত এলাকায় এ ধরনের মিশন ও বিদ্যালয় উভয় প্রতিষ্ঠা করেছিল। আর ওয়েস্টের কম জনবসতিপূর্ণ এলাকার রিজারভেশনগুলোতেই প্রথমপাদে মিশন ও বিদ্যালয় উভয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ন্যাটিভ আমেরিকান শিশু-কিশোরদের খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত করার লক্ষে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগ এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে সরকার রিজারভেশনের ন্যাটিভ আমেরিকান শিশু-কিশোরদের ধর্মীয় মৌলিক শিক্ষাদানের আদেশ জারি করা হয়। অতঃপর নিজেদের অভিপ্রায় ষোলকলা পুরো করার খাতিরে সরকার রিজারভেশনগুলোতে নিজস্ব স্কুল প্রতিষ্ঠা করল। সম্প্রতি দ্য ব্যুরো অব ইন্ডিয়ান অ্যাফেয়ার্স (বিআইএ) এর এক পর্যবেক্ষণে আরও প্রমাণ মিলেছে যে সরকার অ্যাসিমিলেশন (অনুরূপ বা সদৃশ) মডেলের অতিরিক্ত অফ-রিজারভেশন (রিজারভেশন বহির্ভূত) বোর্ডিং স্কুলও প্রতিষ্ঠা করেছিল। বিভিন্ন ট্রাইব বা উপজাতীয় শিশু-কিশোরদের এ সকল বোর্ডিং স্কুলে জোর করে নিয়ে আসা হত এবং অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে তাদেরকে নিজেদের ছাঁচেঢালা পুতুলে পরিণত করা হতো। অফ-রিজারভেশন বোর্ডিং স্কুলেও সরকারি আদেশে ধর্মীয় শিক্ষা চালু করার বিষময় পরিণতি হিসেবে অবশেষে শিশু-কিশোররা ইউরোপীয়-আমেরিকান সংস্কৃতির গড্ডলিকা প্রবাহে আকন্ঠ নিমজ্জিত হতে বাধ্য হয়েছিল।

বিদ্যালয়গুলো ছাত্রদের দেশিয় সংস্কৃতির পরিচয় বহনকারী নিদর্শনগুলো গায়ের জোরে ছেঁটে দিয়েছিল, চুল কাটার ধরনে পরিবর্তন আনায়ন করল, শিশু-কিশোরদের আমেরিকান স্টাইলের ইউনিফর্ম পরিধানে বাধ্য করল, দেশিয় ভাষায় আলাপ-আলোচনা নিষিদ্ধ করা হল। সর্বোপরি গায়ের জোরে ছিনিয়ে আনা ন্যাটিভ আমেরিকান শিশু-কিশোরদের খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত করার মানসে উপজাতীয় নামের স্থলে বিদ্যালয়ে ইংরেজি নামের ব্যবহার চালু করল। আর নতুন প্রবর্তিত নিয়ম-কানুন কার্যকর করতে গিয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অসহায় শিশুদের নির্মম প্রহার করা ছাড়াও ক্ষেত্রবিশেষে ডুবিয়ে হত্যা করেছিল বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিশেষত গায়ের জোরে পিতা-মাতার কাছ থেকে ছিনিয়ে আনা শিশু-কিশোরদের ন্যাটিভ আমেরিকান পরিচিতি এবং সংস্কৃতি বর্জনে বাধ্য করার বেলায় সকল ধরনের পাশবিক নির্যাতন চালানো হত। কথায় বলে ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। সময়ের অগ্রযাত্রায় ন্যাটিভ আমেরিকানস বা আমেরিকান ইন্ডিয়ান বোর্ডিং স্কুলগুলোর নিষ্ঠুর বর্বরতার কাহিনীও রাষ্ট্র হয়ে পড়ে। ফলে বিংশ শতকের শেষের দিকে ব্যাপক অনুসন্ধান এবং গণ-কবরের সন্ধানে খননকার্যও শুরু হয় রিজারভেশন এলাকাগুলোতে। অনুসন্ধানে প্রধানত চার্চ-পরিচালিত বিদ্যালয়গুলোতে সেক্সুয়াল, পাশবিক, দৈহিক নির্যাতনের দালিলিক প্রমাণাদির সন্ধান পাওয়ায় দেশজুড়ে শুরু হয় তোড়জোড় আয়োজন। খ্যাতনামা অনুসন্ধকারী এবং গবেষক ড. জুলি ড্যাভিসের বর্ণনানুসারে, বোর্ডিং স্কুলগুলো মূলত নির্যাতনাগার হিসেবে এবং ন্যাটিভ আমেরিকানদের চিরায়ত কৃষ্টি-সংস্কৃতির সমূল উৎপাটনের লক্ষে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। আর বিদ্যালয়গুলো দেশিয় সংস্কৃতির গোরস্থান এবং ইউরোপীয় সংস্কৃতি ও খ্রিস্টান ধর্মের লালন কেন্দ্রের ভূমিকা পালন করেছিল।

যাহোক, বিংশ শতাব্দীতে সমগ্র আমেরিকাজুড়ে ন্যাটিভ আমেরিকানদের আত্মজাগরণের গণজোয়ার বইতে শুরু করে এবং শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক নীতি-নির্ধারণীর জ্বালানি শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। তখন থেকেই ট্রাইবাল ন্যাশনস (উপজাতীয় জনগোষ্ঠী) রাজনৈতিক কর্মকান্ডের প্রতি বিশেষভাবে ঝুঁকে পড়ে এবং নিজেদের ভবিষ্যত গড়ার প্রত্যয়ে ফেডারেল সরকার ও আদালতের কাছ থেকে আইনী মর্যাদা লাভ করে। এখন আইনী ক্ষমতা বলে ফেডারেল শিক্ষা বরাদ্দ, নিজেদের সন্তান-সন্ততিদের শিক্ষাদানের নীতিমালা নির্ধারণ এবং নিজস্ব কমিউনিটি ভিত্তিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার একচ্ছত্র অধিকার ন্যাটিভ আমেরিকানদের রয়েছে। ইতোমধ্যে উপজাতীয় জনগোষ্ঠী নিজেদের অসংখ্য কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছে। ফেডারেল আইনকানুন নিজস্ব বিদ্যালয়ের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অধিকার এবং বিআইএকে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনয়নের ক্ষমতা প্রদান করেছে। এদিকে ২০০৭ সালে অধিকাংশ ন্যাটিভ আমেরিকান বোর্ডিং স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে এবং এগুলোর ছাত্রসংখ্যাও হ্রাস পেয়ে সাড়ে ৯ হাজারে নেমে এসেছে। উল্লেখ্য, ফেডারেল সরকার পরিচালিত সর্ববৃহৎ ন্যাটিভ আমেরিকান বোর্ডিং স্কুলটি অবস্থিত ছিল নেব্রাস্কার গেনোয়ায়।

১৮৮৪ সাল থেকে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত পরিচালিত এই সর্ববৃহৎ বোর্ডিং স্কুলে সর্বাধিক গণহত্যা সংঘটিত হওয়ার অভিযোগ উঠায় এখানে গণ-কবরের সন্ধানে খননকার্য পরিচালনা করা হয়। ভূমি বিদীর্ণকারী রাডারের সাহায্যে বিদ্যালয়ের তলদেশে খননকার্য চালিয়ে গবেষকগণ ১০২ জন নিহত শিক্ষার্থীর নাম-ধামসহ আনুষঙ্গিক প্রমাণ পেয়েছেন বলে জানা গেছে। গেনোয়া ইন্ডিয়ান স্কুল ডিজিটাল রিকনসিলিয়েশন প্রজেক্টের সহকারি পরিচালক মার্গারেট জ্যাকব বলেন, বাহ্য দৃষ্টিতে কিছু কিছু নাম-ধাম ডুপ্লিকেটে প্রতীয়মান হলেও প্রকৃত প্রস্তাবে নিহত শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি হবে। মার্গারেট জ্যাকব বলেন, সম্ভবত কিছু সংখ্যক শিক্ষার্থী যক্ষ্মায় মারা গেছে। আবার অনেককে ডুবিয়ে মারা হয়েছে। ১৯৩৪ সালে বিদ্যালয়টি বন্ধ করে দেয়ার সময় কর্তৃপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে অনেক প্রমাণাদি বিনষ্ট করে ফেলেছে কিংবা অন্যত্র সরিয়ে ফেলেছে বলেও তার ধারণা। অবশ্য বাদবাকি ন্যাটিভ আমেরিকানস বোর্ডিং স্কুল আঙ্গিনায় গণ-কবরের সন্ধানে খননকার্যের খবর এ মুহূর্তে আমাদের জানা নেই। তবে সময়ে যে থলে কেটে বিড়াল বেরিয়ে আসে তার ভুরি ভুরি প্রমাণ ইতিহাসের পাতায় পাওয়া যায়। এবং নিহত শিশু-কিশোরের নাম-ধামের তালিকা পাওয়া অবাস্তব নয়।

লেখক: সহযোগী সম্পাদক, সাপ্তাহিক ঠিকানা, নিউইয়র্ক।