প্রবাস মেলা ডেস্ক: একদিনে বাংলাদেশের তিনজন বিশিষ্ট সাহিত্যিক চলে গেলেন না ফেরার দেশে। তারা হলেন- দেশের রহস্য রোমাঞ্চ উপন্যাসের অন্যতম প্রধান লেখক ও অনুবাদক শেখ আবদুল হাকিম, কথা সাহিত্যিক বুলবুল চৌধুরী, রম্য লেখক আতাউর রহমান। তারা তিনজনই গতকাল ২৮ আগস্ট ২০২১, শনিবার মৃত্যুর কোলে ঢলে পরেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
শেখ আবদুল হাকিম গতকাল বেলা একটায় রাজধানীর মাদারটেকের নান্দিপাড়ায় বড় মেয়ের বাড়িতে ইন্তেকাল করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। শেখ আবদুল হাকিম মৃত্যুকালে ছেলে শেখ পুলক হাসান, দুই মেয়ে শেখ সাদিয়া হাকিম, শেখ আপালা হাকিমসহ আত্মীয়স্বজন এবং সারা দেশে তাঁর লেখার অসংখ্য গুণমুগ্ধ পাঠক রেখে গেছেন।
তিনি দীর্ঘদিন থেকেই শ্বাসকষ্টের রোগী ছিলেন। সম্প্রতি রোগের তীব্রতা বেড়ে গিয়েছিল। গত মাসে তাঁকে চিকিৎসার জন্য বক্ষব্যাধি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছিল। প্রায় মাসখানেক হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পরে অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়। বাড়িতে আনার পর আবার গত দু–এক দিন থেকে শ্বাসকষ্ট কিছুটা বেড়েছিল। দুপুরের দিকে অনেকটা আকস্মিকভাবেই দ্রুত অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই তিনি ইন্তেকাল করেন। বাদ মাগরিব নন্দিপাড়া মসজিদে তাঁর জানাজা সম্পন্ন হয়। এরপর নন্দিপাড়া কবরস্থানেই তাঁকে দাফন করা হয়।
পারিবারিক সূত্র থেকে জানা যায়, শেখ আবদুল হাকিমের জন্ম ১৯৪৬ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলায়। তাঁর বাবার নাম শেখ আবদুর রফিক। তাঁরা পাঁচ ভাই, তিন বোন। দেশভাগের পর তাঁরা ঢাকায় চলে আসেন। শেখ আবদুল হাকিম গত শতকের ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে দেশের অন্যতম প্রকাশনা সংস্থা সেবা প্রকাশনীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পেশাদার লেখক হিসেবে কাজ করছিলেন। এই প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের জনপ্রিয় রহস্য রোমাঞ্চ উপন্যাস সিরিজ ‘কুয়াশা’ ও ‘মাসুদ রানার’ অনেক বইয়ের নেপথ্য লেখক ছিলেন তিনি। এ ছাড়া নিজ নামেও তিনি এই ধারার বহু জনপ্রিয় রোমাঞ্চ উপন্যাসের অনুবাদ এবং মৌলিক উপন্যাস রচনা করে পাঠকসমাজে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করেন। বিশেষ করে তাঁর অনুবাদে মারিও পুজোর গডফাদার এ দেশের পাঠক সমাজে অত্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করে।
উল্লেখ্য, বইয়ের লেখক সম্মানি নিয়ে একটা পর্যায়ে সেবা প্রকাশনীর প্রকাশক কাজী আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে শেখ আবদুল হাকিমের মতান্তর ঘটে। এই নিয়ে তাঁদের প্রায় সাড়ে চার দশকের প্রীতিময় সম্পর্কের অবনতি হয়। বিষয়টি অদালত পর্যন্ত গড়ায়। শেখ আবদুল হাকিম ‘কুয়াশা সিরিজ’–এর ৫০টি বই ও ‘মাসুদ রানা সিরিজ’–এর ২৬০ বইয়ের লেখক দাবি করে কপিরাইট অফিসে অভিযোগ দায়ের করেন। গত বছর জুনে কপিরাইট অফিস তাঁর দাবির পক্ষে রায় দিয়েছিল। এই রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে প্রকাশকের পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে আপিল করা হয়।
সেবা প্রকাশনী থেকে বেরিয়ে এসে শেখ আবদুল হাকিম দেশের বিভিন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নিয়মিত অনুবাদ ও মৌলিক গ্রন্থ রচনার কাজ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা বিপুল।
কথা সাহিত্যিক বুলবুল চৌধুরী হেরে গেলেন ক্যান্সারের কাছে। ২৮ আগস্ট ২০২১, শনিবার সন্ধ্যা ৬ টায় নিজ বাসভবনে তিনি মারা যান। বয়স হয়েছিলো ৭৩ বছর। মাত্র ছয় মাস আগে ধরা পড়ে তার ক্যন্সার। আজ রোববার সকাল ১১টায় বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গনে শ্রদ্ধা জানাতে তার মরদেহ আনা হলে তার গুণগ্রাহীরা তাকে শ্রদ্ধা জানান।
‘টুকা কাহিনী’ নামে একটি গল্প লিখে সবাইর দৃষ্টি কেড়েছিলেন বুলবুল চৌধুরী। সত্তর দশকে স্বাধীনতার পর পর একজন গল্পকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। সে সময় হাতে গোনা গল্প লেখকদের একজন বুলবুল চৌধুরী প্রায় পাঁচ দশক ধরে লিখে গেছেন অসংখ্য গল্প এবং একজন সফল কথা সাহিত্যিক হয়ে উঠেন। ২০১১ সালে বাংলা একডেমী পুরস্কার, এবছর ২০২১ সালের ভাষা ও সাহিত্যে একুশের পদক পান তিনি।
তার লেখা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বিশিষ্ট লেখক প্রয়াত আব্দুল মান্নান সৈয়দ বলেন, কোন তত্বীয় পরকলার মধ্য দিয়ে জীবনকে দ্যাখেননি বুলবুল চৌধুরী। খোলা চোখে দেখেছেন প্রবহমান জীবনকে মানুষ ও মানুষীকে, ধাবমান নদী আর আঁধার করে আসা বৃষ্টিধারাকে।
অন্যদিকে রম্য লেখক আতাউর রহমান করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তিনি ডাক বিভাগের মহাপরিচালক ছিলেন। গতকাল শনিবার সকাল ৬টায় সিলেটের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর। পরিবার ও ঘনিষ্ঠরা জানিয়েছেন, রাজধানীতে বসবাসকারী সিলেটের বাসিন্দা আতাউর রহমান বেশ কিছুদিন আগে সিলেটে ছিলেন। এ অবস্থায় তিনি করোনা আক্রান্ত হন। শারীরিক অবস্থার অবনতিতে সিলেটেই চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। গতকাল বাদ মাগরিব গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঢাকা দক্ষিণ মাদ্রাসা মাঠে নামাজে জানাজা এবং নিজ গ্রাম নগরে তার দাফন করা হয়। মৃত্যুকালে তিনি দুই ছেলে, স্ত্রীসহ অনেক আত্মীয়স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
১৯৪২ সালে গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঢাকা দক্ষিণ ইউনিয়নের নগর গ্রামে জন্মগ্রহণকারী আতাউর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ডিগ্রি নেয়ার পর সিলেটের দুটি প্রতিষ্ঠান এমসি কলেজ ও মদনমোহন কলেজে কিছুদিন শিক্ষকতা করেন। তিনি সেখানে ইংরেজি সাহিত্য পড়াতেন। পরবর্তীতে তৎকালীন পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সুপিরিয়র সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পাকিস্তান ডাক বিভাগে যোগ দেন। সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় প্রেষণে তিনি লন্ডন ও রিয়াদস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করেন। ২০০২ সালে বাংলাদেশ ডাক বিভাগের সর্বোচ্চ পদ মহাপরিচালক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।
বরেণ্য ওই লেখক আমৃত্যু ঢাকাস্থ সিলেটবাসীদের সংগঠন জালালাবাদ এসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। জালালাবাদের কার্যনির্বাহী কমিটিতেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। অবসর জীবনের পুরোটা সময় তিনি শিক্ষকতা ও লেখাজোখায় কাটিয়েছেন। পড়িয়েছেন দেশের বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমলা, লেখক, শিক্ষক, কূটনীতিক- বহু পরিচয়ে পরিচিত আতাউর রহমানের জীবদ্দশায় ২৪টি সুখপাঠ্য বই প্রকাশিত হয়েছে।
‘দুই দুগুণে পাঁচ’ শিরোনামে বাস্তব অসঙ্গতি তুলে ধরে সংবাদপত্রে তার রম্য রচনা ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অসাধারণ বক্তৃতার জন্যও প্রশংসিত ছিলেন তিনি। তার মৃত্যুতে জালালাবাদ এসোসিয়েশনের সভাপতি ড. একে আবদুল মুবিন, সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট জসিম উদ্দিন আহমেদ, জালালাবাদ ভবন ট্রাস্টের চেয়ারম্যান আবদুল হামিদ চৌধুরী ও সেক্রেটারি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী এবং জালালাবাদ শিক্ষা ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন ও সেক্রেটারি জালাল আহমদ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। যুক্ত বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, জীবদ্দশায় জালালাবাদ এসোসিয়েশনের কার্যনির্বাহী কমিটির কর্মকর্তা হিসেবে আতাউর রহমান সমাজ কল্যাণ এবং শিক্ষায় যে অবদান রেখেছেন তা তাকে চিরস্মরণীয় করে রাখবে। নেতৃবৃন্দ তার রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং পরিবারবর্গের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।
প্রয়াত এই তিনজন সাহিত্যিকের প্রতি প্রবাস মেলা পরিবারের পক্ষ থেকে বিনম্র শ্রদ্ধা।