সিকদার গিয়াসউদ্দিন:
বছর খানেক যাবৎ ফেসবুকে তেমন কোন পোষ্ট লিখিনি বললেই চলে। মেমোরি শেয়ার করেছি। কখনো কখনো অন্যের পোষ্টে লাইক কিংবা মন্তব্য ইত্যাদি তাও মাঝে মাঝে। অনেকেরই অভিযোগের শেষ নেই। করোনা ভাইরাস তথা কোভিড-১৯’য়ের ধাক্কায় যত্রতত্র বিশেষ করে ফেসবুকের ঝড় তুফান দেখে ফেসবুক দেখা অনেকটা বন্ধই করে দিয়েছিলাম। তবে গত দু’দিনে দুজন আপনজন, শুভাকাঙ্খীর (যথাক্রমে বন্ধু ও বড় ভাইসম) মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কিছু না লিখে পারলামনা। একজন ক্যান্সারে অন্যজন অকস্মাৎ হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া স্তব্দ হয়ে।
খোরশেদুল আমিন:

ছাত্রজীবনে আমার একবছর সিনিয়র। জুনিয়র হলেও আমার সাথে গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক অটুট ছিলো। ছাত্রাবস্থায় আমরা চট্টগ্রাম শহরে আসলেই কখনো আশকার দীঘির পাড় ও কখনো চেরাগী পাহাড়ের ক্যাফে আল হেলাল সহ আরো অনেক জায়গায় আড্ডা হতো। আমুদে ও হাঁসিমাখা মুখ প্রকৃতিদত্ত। বন্ধুদের মনে কখনো আঘাত দিয়ে কথা বলতে দেখিনি। কানাডার মন্ট্রিয়েলেও ছিলেন। ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নিয়ে কথা বলতে ভালবাসতেন। বন্ধুদের সাথে কখনো রাজনৈতিক আলাপ করতেননা। নিজেকে কখনো আপন সহোদর বড় ভাই চট্টগ্রামের আওয়ামীলীগ নেতা বা সাবেক মন্ত্রী আফসারুল আমিনের পরিচয় দিয়ে কথা বলতে দেখিনি। বড় মাপের ক্রীড়ানুরাগী ছিলেন। তিনি দূরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে গত ১২ জুলাই চট্টগ্রাম মেডিকেল সেন্টার হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। ফেসবুকের মাধ্যমে মৃত্যু সংবাদটি জানতে পারি। উনার জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয় চট্টগ্রামের হালিশহরের বাসভবনের পাশেই। উনার পবিত্র রুহের মাগফেরাত কামনা করি। আল্লাহপাক খোরশেদ ভাইকে বেহেস্ত নসীব করুন।
রেজাউল হক চৌধুরী মুশতাক:

১৯৬৭, ১৯৬৮, ১৯৬৯, ১৯৭০, ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের পক্ষে ঢাকা কলেজ, ঢাকা শহর ও পরবর্তিতে পূর্ব পাকিস্তান কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬২ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গঠিত নিউক্লিয়াসের সাথে পরবর্তিতে সম্পৃক্ত হওয়ার বিষয়টি এখন সর্বত্র আলোচিত হতে দেখা যায়। চট্টগ্রামের কৃতি সন্তান। আনোয়ারা থানায় জন্ম। ১৯৭২ সালে ছাত্রলীগ দ্বিধাবিভক্তির পর রব-সিরাজ (আ স ম আবদুর রব ও শাজাহান সিরাজ) গ্রুপের সদস্য হিসাবে চট্টগ্রামে যে দু’জন ছাত্রের নাম স্থানীয় ছাত্র রাজনীতিতে গর্বের সাথে উচ্চারিত হতো-তাঁদের মধ্যে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের রায়হান ফেরদৌস মধু ভাই ও রেজাউল হক চৌধুরী মোশতাক ভাইয়ের নাম ছিলো অগ্রভাগে। তিনি ঢাকাস্থ চট্টগ্রাম সমিতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্র বিজ্ঞান এলামনাই এসোসিয়েশনের নেতৃত্ব প্রদান করেন অত্যন্ত দক্ষতা ও আন্তরিকতার সাথে। তাছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৬৯ সালে সতীর্থদের নিয়ে সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানকে সফল করার জন্য ব্যাপক ভূমিকা গ্রহণের বিষয়টি জানা যায় সতীর্থদের ফেসবুক পোষ্ট থেকে।
ছাত্রজীবনে অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রীদের রাজনৈতিকভাবে উজ্জীবিত করেছিলেন। সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে নতুন প্রজন্মকে দ্রোহের বিপ্লবের শিক্ষা দিতে ভালবাসতেন। বিশেষ করে ফেসবুকের মাধ্যমে আমাদের সম্পর্ক গভীর হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করতে হবে। তিনি প্রায় সময় দেশে গেলে আমাকে অব্যশই যে কোন মূল্যে দেখা করার কথা বলতেন। অনেকবার সম্ভব হয়নি। নিউক্লিয়াস, স্বাধীনতা আন্দোলনের সুতিরাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা হতো। মূলত: আমি প্রায়সময় ভিন্নমত পোষণ করলে উনি হেসে উড়িয়ে দিতেন। চরম ভিন্নমত পোষণকারীদেরও কাছে টানার একটা অসাধারণ ক্ষমতা ছিলো তার। বঙ্গবন্ধু শব্দটির উদ্ভাবক হিসাবে কোথায় কোন স্থানে কোন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে-সে বিষয়ে এখন অনেকেই জ্ঞাত। মৃত্যুর পর তা এখন আরো বেশি করে সর্বত্র প্রকাশিত।

২০১৫ সালের আগে শেখ ফজলুল হক মনি ও শেখ কামালের সাথে ঘনিষ্ঠতা নিয়ে উনাকে কিছু বলতে শুনিনি। আমরা সবাই জানতাম উনি রব-সিরাজ সমর্থিত ছাত্রলীগের সাথে সম্পর্কিত ছিলেন। যারা সরাসরি স্বাধীনতা অর্জনের পক্ষে কাজ করতেন। নিউক্লিয়াস সদস্য হিসাবে সিরাজুল আলম খানের ঘনিষ্ট ছিলেন। পরবর্তিতে জাসদ রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। তাই ফেসবুক পেজে উনার লেখা পোস্ট দেখে আমি কি যেনো মন্তব্য করেছিলাম-যা দেখে তিনি সম্ভবত: মন:ক্ষুন্ন হয়েছিলেন। তিনি আমার সাথে ম্যাসেঞ্জারে কথা বলেন।

অবশ্য প্রায়সময় ‘পূঁজিবাদী গন্ধ পাওয়ায় যায়’ বলে ক্ষেপিয়ে তোলার চেষ্টা করতাম। অবশেষে শেষবার আমার ছোটভাই সহ ২০১৮ সালে বাংলাদেশে গেলে কনকর্ড টাওয়ারে উনার অফিসে দেখা করি। তিনি অনেক আয়োজন করেছিলেন। অনেকক্ষণ ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আলোচনা ছাড়াও রামু-কক্সবাজার এবং আনোয়ারা-চট্টগ্রামের স্থানীয় বিষয়ে কথা বলার পর আমরা মূল আলোচনায় ফিরে আসি। উনি একগাদা কাগজপত্র, সাময়িকী ও ছবি নিয়ে হাজির হন।
কথা প্রসঙ্গে বলেন- ঢাকা কলেজের সাময়িকী’তে সারথী ছদ্মনামে বঙ্গবন্ধু শব্দটি প্রকাশ পেলে তা ঢাকা কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে আলোচিত হতে থাকে। অবশ্য সেসময় পাকিস্তান সরকারবিরোধী আন্দোলনে ছাত্রলীগের ভূমিকার জন্য সমগ্র দেশে ছাত্রলীগের জয়জয়াকার। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাকে কেন্দ্র করে শেখ মুজিবুর রহমানের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। আমরা সিরাজুল আলম খানের সাথে শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেয়া নিয়ে আলোচনা করি। তখনকার সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে ঢাকা কলেজের ছাত্রলীগের সাথে সম্পর্কিত সকল ছাত্রনেতাদের গ্রেফতার এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়া হয় হয়। পরবর্তিতে সিরাজুল আলম খান ও শেখ ফজলুল হক মনি আমাদের ‘সঠিক সময়ে এলে বঙ্গবন্ধু শব্দটিকে কাজে লাগাবেন বলে আশ্বস্থ করেন। উনারা কথা রেখেছিলেন।
ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ নেতা ও ডাকসু ভিপি তোফায়েল ভাইকে দিয়ে বঙ্গবন্ধু উপাধি ঘোষণা দেয়ার পর আমি ভীষণ খুশি হই। কারণ তোফায়েল ভাই ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যূত্থানের অন্যতম নায়ক। পরবর্তীতে তোফায়েল ভাই বিষয়টি বিশদ জানার পরও কখনো কোথাও আমার নামটি সামনে নিয়ে আসেননি। চেষ্টা সেতো আরও দূরের ব্যাপার। তারপর শাজাহান সিরাজ ভাই সহ অনেকের লেখা দেখালেন-যাতে উনারা বঙ্গবন্ধু শব্দটির উদ্ভাবনে উনার কর্মের স্বীকৃতি ও কৃতিত্ব প্রদান করেন।

পরবর্তিতে তিনি দুটি ছবি দেখালেন। ছবি দুটি খুবই অথেনথিক মনে হয়েছে আমার কাছে। ছবি দুটি ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রথম পতাকা উত্তোলনের দিন ও ক্ষণের। তিনি বলেন, সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথমবারের মত ছাত্র-ছাত্রীদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত ভিপি ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা রব ভাইয়ের পাশে আমরা ছিলাম। রব ভাইয়ের পূর্ণ নিরাপত্তা সহ জাহিদ হোসেন নীচ থেকে পতাকা উঠিয়ে দেয়ার সময় আমরা রব ভাইয়ের হাতে পতাকাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে সহায়তা করেছিলাম। তিনি উপরে উঠে দুহাত দিয়ে ধরে জনসমক্ষে পতাকা দুলিয়ে দুলিয়ে তা প্রদর্শন করেন।
তখন তিনি দুটি ছবি দেখালেন। একটিতে রব ভাই পতাকা উত্তোলন করে তা প্রদর্শন করেন এবং নীচে পেছনের দিকে রেজাউল হক চৌধুরী ভাইয়ের চশমা পরিহিত চেহারা স্পষ্ট দেখা যায়। তিনি বলেন, এসব ছবি আর্কাইভে থাকার কথা। অনেক নেতারাও জানেন। কিন্তু ব্যক্তিগত পর্যায়ে হোক কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠান হোক অথবা রেডিও টেলিভিশন টক’শোতে নেতারা আমাদের কথা বলেননা। কথাগুলো বলার সময় আমি উনার চোখ ও চেহারায় নেতাদের কারো প্রতি ক্ষোভ বা ঘৃণার কোন লক্ষণ দেখিনি। বরং নেতাদের প্রতি প্রচন্ড ভালবাসা ও এক ধরনের নীরব অভিমানকে প্রত্যক্ষ করেছি। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের সত্যিকার ইতিহাস জানার উপায় আদৌ আছে কি? আমাদের নেতারা কখনো কি কর্মী সমর্থক সহ তৃণমূলের নেতাদের মূল্যায়ন করেন? এসব কিছুর সূযোগ নিয়েইতো যখন যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকে-রাজনৈতিক কারণে তাদের মত করে ইতিহাস তৈরী করার চেষ্টা করে।

তিনি আরও বলেন- তখনকার সামগ্রিক পরিবেশ ও সময়ের আলোকে সিরাজুল আলম খানের নির্দেশমত ৬৯-এ তোফায়েল ভাই ও ৭০/৭১ সালে রব ভাইয়ের নেতৃত্বকে সুদৃঢ় করার জন্য আমরা নিজেদের দিকে তাকানোর সময় পর্যন্ত পাইনি। অত্যন্ত আবেগঘন পরিবেশ তৈরী হয়ে যায়। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর আমি উনাকে বড় আকারে অনেকগুলো খন্ডে লেখা Annuls in America’র উদাহরণ দিয়ে বললাম-শতবছর পরে হলেও ইতিহাসের ছোটখাট বিষয়ও একদিন স্বীকৃতি পাবে। আগামীর সন্তানেরা সমুদ্রমন্থন করে এসব কিছু বের করবেই। চিন্তার কোন কারণ নেই। কিছুদিনের জন্য ইতিহাসকে সাময়িক স্তব্ধ করা গেলেও ইতিহাস নির্মম। সত্যকে একদিন তুলে ধরবেই। কথায় কথায় আমাদের দেশে মরনোত্তর পদকের কথা বললে তিনি হেসে ফেলেন। আমি সেদিন টেলিফোনে বেশ কিছু কথা বলবো বলে উনার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসি। তিনি পুস্তিকা ও কিছু কাগজপত্র দিয়ে শুধু বলেছিলেন- যত্ন করে রাখবে তা আমি জানি।
পরবর্তী দিন টেলিফোনে উনার সাথে কথা বলি। উনাকে বললাম উনি চাইলে বিষয়টি সরাসরি তোফায়েল ভাই ও রব ভাইদের জানিয়ে তদনুযায়ী আলাপের ব্যবস্থা গ্রহণ করার বিষয়টি ভেবে দেখতে বলি। তোফায়েল ভাইয়ের সাথে সরাসরি দেখা করা বা আলোচনা করার জন্য উনার স্নেহধন্য আস্থাভাজন ও আপনজন গার্মেন্টস মালিক সমিতি এবং ঢাকাস্থ ভোলা সমিতির কর্মকর্তা বন্ধু শহীদুল হক মুকুলের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারি। ছাত্রাবস্থায় শহীদুল হক মুকুল আমার জুনিয়র হলেও ব্যক্তিগতভাবে আমরা অত্যন্ত ঘনিষ্ট। রব ভাইকে সম্ভব হলে নিজে জানাবো কিংবা অন্যদের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা বললে উনি বলেন- ‘কি লাভ! আমাদের নেতাদের কি সে সময় আছে!’
আমি বললাম আপনি অনুমতি না দিলেও আমি চেষ্টা করবো। বলবো। আমার সূদীর্ঘ প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে যতটুকু বুঝেছি-সমস্যা বা পারস্পরিক সম্পর্কের ভীত যতই নড়বড়ে হোক না কেনো অথবা মিডিয়াসহ নানা কারণে নেতা ও কর্মী সমর্থকদের মাঝে যতবড় ভুল বুঝাবুঝি বা অভিমান থাকুকনা কেনো সরাসরি আলাপ হলে অনেক কিছুই না চাইতেই সমাধান হয়। পুরোপুরি না হলেও অন্তত: কিছুটা ভুলবুঝাবুঝির অবসান হওয়ার কথা। পরে আমেরিকায় ফিরে এলে একদিকে কাজ ও অন্যদিকে প্রবাসীদের অধিকার আদায় বিষয়ক সাংগঠনিক কর্মকান্ডে জড়িত হয়ে পরি। তাছাড়া পারিবারিক ও স্থানীয় সামাজিক নানা ঝুটঝামেলা প্রবাসীদের নিত্যদিনের।

২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে বিশ্ব প্রবাসীদের সংগঠন কানেক্ট বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনালের পক্ষে আমেরিকা, কানাডা, ইউরোপের ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, ইতালী ও সুইজারল্যান্ড থেকে সর্বমোট আটজন বাংলাদেশে গমণ করি। আমরা প্রবাসীদের বিভিন্ন অধিকার, সমস্যা ও ইনভেস্টমেন্ট সংক্রান্ত বিষয়ে দুদকের সাবেক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ, প্রবাসী কল্যাণ ও কর্মসংস্থান বিষয়ক মাননীয় মন্ত্রী ইমরান আহমেদ এমপি, সচিব সলিম রেজা অত:পর BIDA’র এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম সহ সকলের সাথে একান্ত ঘরোয়া, আনন্দঘন সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ পরিবেশে প্রবাসীদের নানা ধরনের সমস্যা, অধিকার, সমাধানের প্রক্রিয়া ও প্রবাসে প্রবাসীগণের সচেতনতা বিষয়ক আলোচনা ও মতবিনিময় সম্পন্ন হলে আমরা বাংলাদেশে স্ব-স্ব জেলায় যার যার ঘরে চলে যায়। আমি কক্সবাজার থেকেই চৌধুরী মুশতাক ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করি। দেখা করার দিন তারিখও ঠিক করে ফেলেছিলাম। তারপরই হঠাৎ সমগ্র বিশ্বে নিকষ কালো অন্ধকার নেমে আসে। করেনাভাইরাস তথা কোভিড-১৯’য়ের করাল গ্রাসে সমগ্র বিশ্বকে টালমাটাল করে তোলে। কথা হলেও আর সরাসরি দেখা হয়নি ভাইয়ের সাথে।

১৪ জুলাই ২০২১। মুক্তিযুদ্ধের আরেক বীর সেনানী লুৎফা হাসীন রোজীর ফেসবুকে অতর্কিত রেজাউল হক চৌধুরী মোশতাক ভাইয়ের মৃত্যুবরণের পোস্ট দেখে চমকে উঠি। হতভম্ব হয়ে পড়ি। কারণ কিছুক্ষণ আগে চট্টগ্রামের পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে তিনি যে প্রতিরোধ ও প্রতিবাদ করার পোস্টটি দেন তা পড়েছিলাম। তিনি পোস্টটি আমাকেও ট্যাগ করেছিলেন। অবশেষে মেনে নিলাম অবিশ্বাস্য মনে হলেও মৃত্যুই সত্য। আমাদের সকলকে একদিন মৃত্যুর ডাকে সাড়া দিতেই হবে। আমাদের রেজাউল হক চৌধুরী মুশতাক ভাই ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া স্তব্দ হলে সকলকে চমকে দিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন। ইতিমধ্যেই জানাজা সম্পন্ন করে ঢাকার মীরপুর বুদ্ধিজীবি কবরস্থানে উনাকে দাফন করার কথা।
রেজাউল হক চৌধুরী মোশতাক ভাইয়ের মৃত্যুতে আমরা প্রবাসীগণ গভীর শোক ও সমবেদনা জ্ঞাপন করছি। আমরা উনার পবিত্র রুহের মাগফেরাত কামনা করি। মহান আল্লাহপাক উনাকে বেহেস্ত নসীব করুন।
আমাদের স্মরণ রাখা দরকার যে, বাংলাদেশের দলীয়, সামাজিক ও পেশাজীবি সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতাগণ সৎ ও ত্যাগী কর্মী সমর্থক ও তৃণমূলের নেতাদের কর্মের প্রকাশ্য জয়গান বা প্রশংসা না করলে জনমতকে যেমন প্রভাবিত করা সম্ভব নয়-অন্যদিকে সুযোগ বুঝে সংগঠনে বা দলে সৎ ও ত্যাগীদের পরিবর্তে সুবিধাবাদীরা সব ছিনিয়ে নেবে। শুধু সরকারী দলে নয়-সকল ক্ষেত্রে দানবরা জন্ম নেবে। এভারেস্ট শৃঙ্গকে সমুন্নত রাখতে হলে হিমালয়ের পাহাড়গুলোর অবদান অস্বীকার করা যাবে কি? অনুরূপভাবে দেশের শহর-বন্দরের রাস্তাঘাট আর গ্রামগঞ্জের পাহাড়গুলোকে সাজিয়ে তোলার দায়িত্ব কাঁদের উপর বর্তায়? মৃত্যুর মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলনের অনন্য সেনানী রেজাউল হক চৌধুরী মোশতাক ভাই তা জানান দিয়ে গেলেন। সবচাইতে বড় কথা মৃত্যুকে আলিঙ্গণের পূর্ব মুহুর্তে তিনি পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ আন্দোলনেরও ডাক দিয়ে গেলেন। বীরের মৃত্যু নেই।
লেখক: লাস ভেগাস, নেভাদা, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী।