জাহাঙ্গীর আলম শিকদার, লন্ডন, যুক্তরাজ্য প্রতিনিধি: সম্প্রতি কুমিল্লা শহরের নানুয়া দীঘির উত্তরপাড় পূজা মন্ডপে প্রকাশ্যে কুরআনে কারিমকে মূর্তির পায়ে রেখে অসম্মান করার অভিযোগ উঠেছে। তাই উত্তাল সারা বাংলাদেশ। পৃথিবীর সব ধর্মই শান্তির কথা বলে কিন্তু কোন ধর্মকে অবজ্ঞা বা ছোট করে অশান্তি ছাড়া শান্তি আশা করা যায়না, তাই সন্দেহ এখানে এ কোন রাজনীতি? অবশ্যই এই অরাজগতা কিংবা রহস্যময় নাটকের নায়কদের ধরে আদালতের রায়ে সঠিক বিচার করা সারা বাংলাদেশের মানুষের দাবী। এমনকি প্রবাসের গ্রেট বৃটেনের পার্লামেন্ট ও বিবিসি হেড কোয়ার্টারের সম্মুখে সম্মিলিত হিন্দু সংগঠনের বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ।

জ্ঞানতাপস ও ভাষাসৈনিক ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ,র লিখেছিলেন, আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙ্গালী। মা প্রকৃতি আমাদেরকে এমন ভাবে সাজিয়েছেন যেন দাঁড়ি টুপি লুঙ্গীতে কিংবা তিলক টিকা টিপ্পনীতে ঢাকবার জো নেই।

তাই বাংলাদেশ হিন্দু এসোসিয়েশন ইউকের উদ্যোগে ২৭ অক্টোবর ২০২১, বুধবার সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৪টা অবদি বৃটিশ পার্লামেন্ট ও বিবিসি হেড কোয়ার্টারের সম্মুখে প্রায় সহস্রলোকের সমাগমে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়। যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বাঙালী হিন্দু সম্প্রদায়ের এই বিশাল সমাবেশে বিভিন্ন শহর থেকে হিন্দু সংগঠনের সদস্যবৃন্দ সপরিবারে সবান্ধব অংশগ্রহণ করেন। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, বৃটেনে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের শিশু কিশোর, যুবক যুবতীদের স্বতস্ফুর্তভাবে অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মত।
বাংলাদেশে হিন্দুদের সর্ববৃহৎ উৎসব দুর্গাপূজা চলাকালীন কুচক্রিমহল পরিকল্পিতভাবে কোরাআন অবমাননার নাটক সাজিয়ে কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দুদের উপর অত্যাচার, নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যা, মন্দির ভাঙ্গা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লুটপাট, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগসহ ধ্বংসাত্বক কার্যকলাপ সপ্তাহব্যাপী অব্যাহত রাখে। অত্যন্ত দু:খজনক যে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ সময়োপযোগী যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।

প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তারা এইসব অমানবিক কার্যকলাপ ও অত্যাচারে জড়িত দুষ্কৃতিকারী ও ইন্ধনদাতাদের সুষ্ঠু তদন্ত, সনাক্তকরণ, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও ভোক্তভূগীদের পূর্ণাঙ্গ ক্ষতিপূরণ দাবী করেন। একই সাথে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ও যুক্তরাজ্য সরকারের হস্তক্ষেপ করার জন্য দাবী জানান। এই ব্যাপারে সংসদ সদস্যদের সমীপে লিখিত স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। সমাবেশের সার্বিক পরিচালনায় ছিলেন বাংলাদেশ হিন্দু এসোসিয়েশনের সভাপতি প্রশান্ত দত্ত পুরকায়স্থ বিইএম। সহযোগিতায় ছিলেন বিএইচএ ইয়োথ ফোরামের অমিত দেব, বিপ্লব দত্ত, হিমানীশ গোস্বামী, রাজ দাশ ও বিভিন্ন সংগঠনের সেচ্ছাসেবকেরা। অংশগ্রহণকারী সংগঠনগুলো হচ্ছে- সনাতন এসোসিয়েশন, ইউনাইটেড হিন্দু কালচারাল সোসাইটি, (ব্রাডফোর্ড), ব্রাডফোর্ড বেঙ্গলী হিন্দুসোসাইটি, অগ্রজ্যোতি সংঘ (হাইড), শ্রী শ্রী বাবা লোকনাথ ভক্ত পরিষদ, ওম শান্তি এসোসিয়েশন, ইউরোপিয়ান হিন্দু ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন, মধুরিমা আর্টস্ ইউকে,সরস্বতী কালচারাল অর্গানাইজেশন (বার্মিংহাম), গৌরী চৌধুরীর সুরালয়, সেক্যুলার বাংলাদেশ মুভমেন্ট ইউকে, সি পি আর এম বি, ইউনাইটেড হিন্দু কালচারাল এসোসিয়েশন, হিন্দু এইড ইউ কে, নর্থ লন্ডন প্রভাতী সংঘ, ইউকে হিন্দু ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন, বাঙালি হিন্দু আদর্শ সমিতি ইউকে, মার্সি সাইড হিন্দু বাঙ্গালী এসোসিয়েশন (লিভারপুল) ও এসবিএলএ ইউকে।

উপরোক্ত সংগঠনগুলোর নেতৃবৃন্দ ও উপস্থিত মানবাধিকার কর্মীবৃন্দ তাদের বক্তব্যে বাংলাদেশে চলমান সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দুষ্কৃতিকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করেন। উল্লেখ্য যে, বৃটিশ পার্লামেন্টের সদস্য বীরেন্দ্র শর্মা বিক্ষোভ সমাবেশে উপস্থিত হয়ে বিক্ষোভকারীদের সাথে সহমত প্রকাশ করেন ও পার্লামেন্টের অন্যান্য সদস্যদের অবহিত করার পরামর্শ দেন। তিনি আরো জানান যে, এই ব্যাপারে সচেতন পার্লামেন্ট সদস্যরা ‘আর্লী ডে মোশন’ উত্থাপন করেছেন। ইতিমধ্যে স্টিফেন টিমস্ ও রোশনারা আলীসহ ২০জন এম পি মোশন প্রস্তাবে স্বাক্ষর করেছেন।
পার্লামেন্ট স্কোয়ারে সমাবেশ শেষে বিক্ষোভ মিছিল সহকারে অংশগ্রহণকারীরা প্লাকার্ড নিয়ে দীর্ঘ দুইমাইল পদযাত্রা করে বিবিসি প্রদান কার্যালয়ের সম্মুখে অবস্থান ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। তারা সোচ্চার শ্লোগানে বাংলাদেশে ধারাবাহিকভাবে চলে আসা সাম্প্রদায়িক নির্যাতনের সংবাদ প্রচারে বিবিসির নীরবতায় অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এজন্যে বিক্ষোভে অংশগ্রণকারী সদস্যরা বক্তৃতা ও শ্লোগানে বিবিসিকে বাংলাদেশে চলমান সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের উপর প্রতিবেদন প্রচারের দাবী জানান।

বিক্ষোভকারীদের দাবীতে বিবিসির একজন কর্মকর্তা এসে প্রশান্ত দত্ত পুরকায়স্থ ও অমিত দেবের নিকট থেকে স্মারকলিপি গ্রহণ করেন। বিবিসি কর্মকর্তার আশ্বাসের প্রক্ষিতে দিনব্যাপী বিক্ষোভের সমাপ্তি ঘটে।

উল্লেখ্য বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী গৌরী চৌধুরীর নেতৃত্বে জাগরণের গান ও ড: সুদীপ চক্রবর্তীর পরিচালনায় বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী ইউকে পথনাটক ‘তোল আওয়াজ’ এর পরিবেশনা ছিল দর্শনার্থীদের বিশেষ আকর্ষণ।