শহিদুল ইসলাম
বিজ্ঞানের জগতে যার নাম আইনস্টাইন ও নিউটনের পরে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয় তিনি হলেন স্টিফেন হকিং। মহাবিজ্ঞানী গ্যালিলীও পৃথিবী থেকে বিদায় নেন ১৬৪২ সালের ৮ জানুয়ারি। ঠিক তার ৩০০ বছর পর জন্মগ্রহণ করেন হকিং ১৯৪২ সালের ৮ জানুয়ারি। তার মা বাবা দুই জনই পড়াশোনা করেছেন অক্সফোর্ডে। বাবা ফ্যাঙ্ক হকিং এবং মা ইসোবেল। তারা দুইজনই বাস করতেন উত্তর লন্ডনের শহরতলি হাইগেটে। লন্ডনের চেয়ে অক্সফোর্ডের পরিবেশ ভালো বলে সন্তান সম্ভাবা ইসোবেল বসবাস করতে লাগলেন অক্সফোর্ডে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলে জন্ম বলে তার প্রভাব হকিং এর জীবনে পড়তে দেখা দেয়। তিনি যুদ্ধকে সব সময় ঘৃণা করতেন।
১৯৫২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর স্টিফেনকে সেস্ট অ্যালবাম স্কুলে ভর্তি করা হয়। বাজনীয় পরিবারের লোকজন সেখানে তাদের সন্তানদের ভর্তি করে থাকেন। তাই বিদ্যালয়টি ছিল গর্ব করার মতো। তার বন্ধু-বান্ধব ছিল ছয়-সাতজন। তারা দল বেঁধে ঘুরে বেড়াতেন। তারা মহাকাশ এবং ধর্মতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা সমালোচনায় মশগুল থাকতেন। তারা আলবার্ট হলে গান শুনতে যেতেন এবং বিবিসির সংগীত ও সংবাদ উপভোগ করতেন। হকিং তার সাথে তার বন্ধুরা কিংসলি আমিজ, অ্যালডাস গলডিং প্রমুখ চৌকস লেখকের বই পড়তেন। তাদের আদর্শের নেতা ছিলেন বার্ট্রান্ড রাসেল। হকিং এর পড়ার রুমটা তেমন গোছালো থাকত না। বিদেশ থেকে আনা আজব জীব যন্তু, বিমানের যন্ত্রাংশ, আসবাবপত্র, ঠান্ডা কফি এবং পাঠ্যবই থাকত কার্পেটের উপর ছড়ানো ছিটানো।

হকিং এর মা কমিনিস্ট আন্দোলন করতেন মায়ের প্রভাব ছেলের উপর গভীরভাবে লক্ষ্য করা যায়। হকিং এর মা পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার আন্দোলনে শিশু হকিংকে নিয়ে অংশগ্রহণ করেন। তার বয়স তখন সতেরো তখন স্টিফেন অক্সফোর্ডে স্নাতক শ্রেণীতে ভর্তি হলেন। পিতামাতার সখ ছিল ছেলে ডাক্তারী পড়বেন। কিন্তু স্টিফেনের আগ্রহ ছিল পদার্থবিদ্যা, গণিত এবং মহাকাশের প্রতি।
অক্সফোর্ড এবং ক্যামব্রিজের মাঝে নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা চলত। স্টিফেন মাঝে মধ্যে নৌকায় চালকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতেন। অক্সফোর্ড এর ক্যামব্রিজ দুটো বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল দ্বাদশ শতকে। অক্সফোর্ডের ভিন্ন মতাবলীয় অধ্যাপকরা মিলিত হতেন ক্যামব্রিজে। স্টিফেন স্নাতক সম্মান পরীক্ষা দিলেন। তিনি যদি প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন তাহলে যাবেন ক্যামব্রিজে। আবার যদি দ্বিতীয় বিভাগ পান তাহলে থাকবেন অক্সফোর্ডে। পরীক্ষার আগের রাতে ভালো ঘুম হয়নি। ফলাফল প্রকাশ হলে দেখা গেল দ্বিতীয় ও প্রথম শ্রেণীর মধ্যাবর্তী অবস্থানে অবস্থান করছেন। হকিং একটি ভাইভা বোর্ডের আয়োজন করা হলো তাতে তিনি প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। অক্সফোর্ডের গ্র্যাজুয়েট স্টিফেন ক্যামব্রিজে পদার্পণ করলেন ১৯৬২ সালের অক্টোবরে। তিনি গবেষণায় জন্য বেছে নিলেন মহাকাশ ও মহাবিশ্ব।
একুশ বছর বয়সে তিনি অসুস্থ্যবোধ করলে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালে তার দুই সপ্তাহ কাটে। এ সময়ে তার বাহু থেকে মাংসপেশী কেটে নিয়ে গায়ে ইলেকট্রোড ঢুকিয়ে নিয়ে শিরদাঁড়ায় অস্বচ্ছ তরল পদার্থ ঢুকিয়ে নেড়ে বেড়ে সেগুলোর ওপর নিচ ওঠানামা করে রঞ্জনরশ্মির সাহায্যে দেখাসহ পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হল।

তাকে এক কঠিন রোগে ধরেছে। রোগটার নাম মোটর নিউরন ডিজিজ। যা থেকে নিস্কৃতির উপায় নেই। এ রোগের লক্ষণ হলো শরীর পক্ষাঘাতের শিকার হয়ে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মৃত্যুর মুখে পতিত হয়। ডাক্তাররা তার জীবনের আয়ু বেঁধে দিলেন দুই বছর। তিনি শত্রæর মুখে ছাই দিয়ে মৃত্যুর মুখে চুনকালি দিয়ে তেইশ বছর বয়সে পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করলেন। তার পিএইচডি ডিগ্রীর বিষয় ছিল Properties of Expanding Universes (1966) যার উপদেষ্টা ছিলেন ডেনিস শিয়ামা।
ক্যামব্রিজে স্টিফেন যখন স্নাতক শ্রেণীর শিক্ষার্থী তখন জেন ওয়াইণ্ডের সাথে তার সম্পর্ক গড়ে উঠে। ১৯৬৪ সালে অক্টোবরে তাদের বাগদান সম্পন্ন হয় এবং ১৯৬৫ সালে ১৪ জুলাই তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। স্টিফেন ও জেন দম্পত্তি জীবনে রবার্ট, লুসি, স্টিমোথি নামক তিন সন্তানের জনক জননি ছিলেন।
পদার্থবিজ্ঞানে হকিং এর অবদান সর্বত্র স্বীকৃত। প্রথম জীবনে সতীর্থ রজার পেনরোজের সঙ্গে মিলে সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের সিংগুলারিটি সংক্রান্ত তত্ত¡আবিস্কার করেন। হকিং প্রথম কৃষ্ণবিবরের ঘটনা দিগন্তে প্রয়োগ করে দেখান যে কৃষ্ণবিবর থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে কনা প্রবাহ। এই বিকিরণ এখন হকিং বিকিরণ নামে খ্যাত। হকিং A Brief History of Time গ্রন্থে Big Bang এবং Black hole সম্পর্কে বলতে যেয়ে বলেন-
The work of lifshity and khalatnikov was valuable become it showed that the universe could have has a singularity, a big bang, if the general thory of relativity was currect. However, it did not resolve the crucial questions: does general relativity predict that our universe showed have had a big bang, a biginning of time? The answer of this come out of a completely different opproach introduced by a British mathematician and physicist Roger Renrose in 1965. Using the way light comes behave in general relativily togethen with the fact that gravily is always attractive, he showed that a star collapsing under its own gravity is trapped in a region whose sarface eventually shrinks a yero si“e. And since the surface of the region shrinks to yero, So too must its volume. All the matter into a the star will be compressed into a region of yero volume. So the density of matter and the curvature of space time become infinite. In other words one has a singularity contained within a region of space time known as a black hole.’
স্টিফেন হকিং রয়্যাল সোসাইটি অব আর্টসের সম্মানিত ফেলো এবং পন্টিফিক্যাল একাডেমী অব সায়েন্সের আজীবন সদস্য ছিলেন। ২০০৯ সালে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরষ্কার প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম খেতাবে ভূষিত হন। ২০০২ সালে বিবিসি এর সেরা ১০০ ব্রিটেনস্ জরিপে তিনি ২৫তম স্থান অধিকার করেন। তার নিজের তত্ত¡ ও বিশ্বতত্ত¡ নিয়ে রচিত বই ‘A brief history of time’ বইটি প্রকাশিত হলে আড়াই কোটি কপি বিক্রির রেকর্ড অর্জন করে। তার অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে আছে- Black holes baby universes and other Essays, The universe in a nutshell, Super space and super gravity, brief History প্রভৃতি।

আইনস্টানের জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস হকিং এর সম্পাদনায় প্রকাশ করে General Relativity: An Einstein Century survey – নামক বইখানি। বইটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। স্যার আইজ্যাক নিউটন যে পদ ১৬৬৯ সালে অলংকৃত করেছিলেন ঠিক তার তিনশত বছর পরে গণিত শাস্ত্রের লুকেশিয়ান প্রফেসর পদটি লাভ করেন হকিং। ১৯৮১ সালে ভ্যাটিক্যানে অনুষ্ঠিত বিশ্ববিখ্যাত মহাবিশ্ব সৃষ্টি তত্ত¡ সম্মেলন (Cosmology Conference) হকিং স্বস্ত্রীক যোগদান করেন। ১৯৮১ সালে ব্রিটিশ রানী তাকে Commander of the British Empire CBE খেতাবে ভূষিত করে। ১৯৮২ সালে ব্রিটেন, আমেরিকা ও ফ্রান্সের ৪টি বিশ্ববিদ্যালয় University of Ieiuster, Nwe York University, Princeton University এবং Notre Dame University – তাকে সম্মানজনক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে। ২০০৫ সালে গার্ডিয়ান পত্রিকায় এক সাংবাদিক তাকে জিজ্ঞাসা করেন সময়ের সাথে উল্টো পথে যদি অতীতে ফিরে যান তাহলে কার সাথে সাক্ষাতে আগ্রহী হবেন? নিউটন না মেরিলিন মনরো? উত্তরে হকিং জানান অবশ্যই মেরিলিন মনরো। কেননা নিউটন একজন বেরসিক চরিত্রের মানুষ। হকিং ভবিষ্যতবাণী করেন যে আগামী সহস্রাব্দের মধ্যে মাতৃ জরায়ুর বাহিরেও মানুষ জন্মগ্রহণ করবে। তিনি বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও পারমাণবিক যুদ্ধের আশংকায় সব সময় শংকিত ছিলেন। তিনি বলেন, মানজাতির ভবিষ্যতের জন্য মহাশূণ্যে ভ্রমণ ও মহাশূণ্যে উপনিবেশ স্থাপন করার প্রয়োজন। নইলে মানবসভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে। তিনি আণবিক যুদ্ধাস্ত্র উৎপাদনের বিরোধী ছিলেন। এক বক্তৃতায় তিনি বলেন, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জন্য ৪ টনের সমপরিমাণ উচ্চ বিষ্ফোরক দ্রব্য মজুত আছে। অথচ মাত্র অর্ধ পাউন্ড বিষ্ফোরকই একজন মানুষকে হত্যার জন্য যথেষ্ট। সুতরাং পৃথিবীর সকল মানুষকে হত্যার জন্য যা প্রয়োজন তাদের হাতে রয়েছে তার চেয়ে ১৬০০০ গুণ বেশি বিষ্ফোরক।
শারীরিকভাবে অসমর্থ ব্যক্তি মহাবিশ্বের জট খুলেছেন এবং হয়েছেন অপরাজিত বৈজ্ঞানিক ব্যক্তিত্ব। তিনি মৃত্যুকে ভয় না করে মৃত্যুবরণ করেন ১৪ মার্চ ২০১৮ সালে ক্যামব্রিজে। হকিং এর A brief History of Time গ্রন্থ সম্পর্কে বলতে যেয়ে বিখ্যাত লেখক রে পর্টার The Sunday Times এ বলেন- Hawking makes the science clear and thrilling. This book marries child’s wonder a genius is intellect. We journey into Hawking’s Universe while marvelling at his mind.
(লেখক: প্রাবন্ধিক- প্রভাষক, দর্শন বিভাগ,
সরকারি ইস্পাহানি কলেজ, কেরাণীগঞ্জ, ঢাকা)।