মো: বাছের আলী
সাধারণ অর্থে স্বাধীনতা বলতে একটি নির্দিষ্ট ভূখন্ডে একটি নির্দিষ্ট জনসমষ্টির নিজস্ব শাসনব্যবস্থায় সবকিছু নির্ধারণের একচ্ছত্র ক্ষমতাকে বোঝায়। ব্যাপক অর্থে স্বাধীনতা বলতে রাজনৈতিক থেকে অর্থনৈতিক এমনকি সাংস্কৃতিক স্বাধীনতাকেই বুঝায়। স্বাধীনতার বিপরীত পরাধীনতা; এই পরাধীনতার শিকল থেকে মুক্তি পেতে ৭১-এ বাঙালিরা হানাদার পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। যে শিকল শুধু রাজনৈতিক শিকল ছিলো না- ছিলো অর্থনৈতিক আর শোষণের শিকল। বঙ্গবন্ধু তাঁর ৭ মার্চের ভাষণে দুটি বিষয় বড় করে তোলেন একটি স্বাধীনতার সংগ্রাম অন্যটি মুক্তির সংগ্রাম। মুক্তির সংগ্রাম বলতে তিনি এখানে অর্থনৈতিক এবং সামাজিক মুক্তির সংগ্রামকে বুঝিয়েছেন। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লক্ষ লক্ষ প্রাণ ও দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে বাঙালিরা স্বাধীনতাকে ছিনিয়ে আনে।
স্বাধীনতা সংগ্রামে আমাদের মা-বোনদের অবদান অনস্বীকার্য। বাবা-ভাইয়ের সাথে স্বাধীনতা অর্জনে তাঁরা সমানতালে সক্রিয় ছিলেন। নিজের সম্ভ্রম আর জীবনের বিনিময়ে মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করেন। যার দরুণ আমরা পেয়েছি একটি স্বাধীন ভূখন্ড আর লক্ষ আত্মত্যাগী মা-বোনের মধ্যে গুটি কয়েক (বীরাঙ্গনাদের সঠিক তালিকা এখনও পর্যন্ত তৈরী হয়নি) আত্মত্যাগী মা বোন কেবল বীরাঙ্গনা অভিধায় ভূষিত হয়েছেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে জয় লাভের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের বীরত্বপূর্ণ অধ্যায় শেষ হলেও মুক্তির সংগ্রাম এখনো চলমান। যার প্রধান লক্ষ্য অর্থনৈতিক মুক্তি লাভের মধ্যদিয়ে সত্যিকারের সোনার বাংলা গড়ে তোলা। স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি অধ্যায়ে আমাদের মা-বোনদের যেমন রয়েছে বীরত্বপূর্ণ পদচারণা তেমনি মুক্তির সংগ্রামেরও তাদের সমান পদচারণা রয়েছে। গোটা বিশ্বের সাথে তালমিলিয়ে আমাদের দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে নারীর অবদান বাড়ছে। এখন আমাদের নারীরা অনেক প্রতিষ্ঠানে পুরুষের সমান ভূমিকা রাখছেন। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা পুরুষদেরও ছাড়িয়ে যাচ্ছেন।
বর্তমানে আামদের কর্মক্ষেত্রে প্রায় ১ কোটি নারীকর্মী রয়েছেন। বিদেশে কর্মসংস্থানে নারীদের সংখ্যা গত এক দশকে প্রায় ১০ গুণ বেড়েছে। আমাদের দেড় কোটি প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে প্রায় দশ লাখ নারী কর্মী রয়েছেন। এসব নারী অভিবাসী উপসাগরীয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশ মূহে গৃহকর্মী, পোশাকশিল্প, হাসপাতালসহ বিভিন্ন কলকারখানায় কর্মরত। যাদের হাঁড়ভাঙ্গা খাটুনির ফলশ্রুতিতে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার পাল্লা দিনদিন ভারী হচ্ছে। কিন্তু অতি দুঃখের বিষয় হলেও সত্য আত্মীয় স্বজন ছেড়ে দুরে থাকা এই সব মা বোনদের জন্য আমরা তেমন কিছু করতে পারছি না। এমনকি তাদের ন্যূনতম নিরাপত্তাও আমরা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছি। ব্রাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্যানুযায়ী ২০১৬ থেকে চলতি বছরের জুন মাসের মধ্যে উপসাগরীয় দেশসমূহ থেকে ৩১১ টি নারী শ্রমিকদের মৃতদেহ দেশে এসেছে। যাদের অধিকাংশই সৌদি আরব থেকে। এছাড়া গত কয়েক বছরের মধ্যে যৌন এবং শারীরিক নির্যাতনের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহ থেকে প্রায় এক হাজার নারীকর্মী দেশে ফিরে এসেছেন। শুধু এবছরই সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশি ৪৮ জন নারীগৃহকর্মীর মৃতদেহ দেশে আনা হয়েছে। যাদের মধ্যে ২০ জনই সৌদি আরবে নির্যাতনের অভিযোগ তুলে আত্মহত্যা করেছেন।
অন্যদিকে তাদের শারীরিক নির্যাতন অনেকটা আদিম এবং জাহেলি যুগের বর্বরতার সমতুল্য। শারীরিক নির্যাতনে শিকার হওয়া অধিকাংশের বৈদ্যুতিক শক সিগারেটের আগুন দিয়ে ছেঁকাসহ অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করার নারকীয় অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়ে যেতে হয়েছে। এ ধরণের অমানবিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে অনেকেই মৃত্যুর কাছে হার মেনেছেন। এক অর্থে তাঁরা মরে গিয়ে বেঁচেই গেছেন, অন্যদিকে যারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে অন্তঃসত্তা হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন তাঁরা এসেছেন একধরনের লাশ হয়ে। এদের অনেকে পরিবারের কাছে প্রকৃত সত্যটাও বলতে পারেন না। যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে আসা নারী শ্রমিকদের কেউ কেউ চাকরির নাম করে ঢাকার আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন যাতে করে গর্ভের সন্তানকে পৃথিবীর আলোর মুখ দেখাতে পারেন।
সন্দেহাতীতভাবে সৌদি আরব আমাদের বন্ধুপ্রতীম দেশ। এছাড়া আমরা মুসলিম সংখ্যা গরিষ্ঠ হওয়ায় দেশটির প্রতি আমাদের বিশ্বাসের মাত্রাটাও অত্যন্ত প্রখর। কিন্তু এটিও দুঃখের বিষয় যে, যেদেশে প্রেমের অপরাধে শিরোচ্ছেদ করা হয়, চুরির অপরাধে হাত কেটে ফেলা হয়, সেদেশে অন্যদেশ থেকে আসা বিদেশি অসহায় নারীদের যৌন থেকে শুরু করে নানা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে এবং এসব নির্যাতনে কোন বিচার হচ্ছে না। যেখানে সিডও (কনভেনশন অন দ্যা এলিমিনেশন অব অল ফরমস্ অব ডিসক্রিমিনেশন অ্যাগেইন্সট ওমেন) সনদের ১১.৫ নং ধারায় অভিবাসী নারী শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সমধিকার সমমর্যাদা সম্পর্কেও খেয়াল রাখতে বলা হয়েছে। এমনকি স্বাক্ষরকারী সদস্য রাষ্ট্রসমূহকে নারীকর্মীদের প্রজনন স্বাস্থ্যসহ স্বাস্থ্য সুরক্ষার এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করার উপর তাগিদ দেয়া হয়েছে; সেখানে এধরনের নির্যাতন কখনোই মেনে নেয়ার নয়। অবশ্য এ জন্য এককভাবে সৌদি কর্তৃপক্ষকে দায়ী করা যায় না। এ ধরনের ঘৃণ্য অপরাধের জন্য আমাদের দেশের কিছু অসাধু দালাল এবং এজেন্সীগুলোও সমভাবে দায়ী। । ৭১-এ যারা জীবন আর সম্ভ্রম হারিয়েছিলেন তাঁরা ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের বীরাঙ্গনা। অন্যদিকে যারা কর্মের উদ্দেশ্যে প্রবাসে পা বাড়িয়ে জীবন-সম্ভ্রম হারাচ্ছেন তাঁরা হচ্ছেন মুক্তির সংগ্রামের (অর্থনৈতিক মুক্তি) বীরাঙ্গনা। যাদের নিদারুণ পরিশ্রমের উপর ভর করে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের চাকা দিন দিন সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে তাদের এমন অসহায়ত্বের গন্ডি থেকে মুক্তি দিতে সংশ্লিষ্ট মহলদের আরো তৎপর হতে হবে। অন্যথায় বিদেশ বিভুঁইয়ে কাজ করতে গিয়ে নিজের সম্ভ্রম হারানো মা-বোনেরা ৭১-এ নিজের সম্ভ্রমহারানো মা-বোনদের কাতারে নিজের শামিল করেও বীরাঙ্গনার তকমাটুকুও নিজের নামের পাশে লেখাতে সক্ষম হবেন না। এ নির্যাতনের যাতাকল থেকে মুক্তি পেতে হতে হলে শক্তহস্তে কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে হবে।

জনশক্তি পাঠানোর সময় বিশদভাবে ঠিকঠাক চুক্তি করে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এগুলোর মাধ্যমে কঠোর মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া ভাষাগত সমস্যা সমাধানের জন্য কর্মী পাঠানোর আগে সংশ্লিষ্ট দেশের এবং ইংরেজি ভাষা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দেয়ার জন্য প্রশিক্ষণ প্রদান করা যেতে পারে। এমনকি সংশ্লিষ্ট দেশের রীতি-নীতি সম্পর্কেও প্রাথমিক ধারণা দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। চুক্তিতে উল্লিখিত কাজের ব্যাপারে প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করে প্রশিক্ষণ প্রদান করে কর্মী পাঠানো নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোতে নারী কর্মকর্তা-কর্মচারীর হার বৃদ্ধি করা যেতে পারে যাতে করে নারী শ্রমিক নির্দ্বিধায় ও খোলাখুলি তাদের সমস্যার কথা তুলে ধরতে পারেন।
তাছাড়া উল্লিখিত দেশ সমূহের থাকা আমাদের দূতাবাসগুলোর সাথে প্রবাসী কর্মীদের তাৎক্ষণাত যোগাযোগের ব্যবস্থা আরো সহজসাধ্য করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। দূতাবাসের উদ্যোগে কমিউনিকেশন সেল গঠন করে নারীকর্মীদের সাথে নির্দিষ্ট সময় পর পর যোগাযোগের ব্যবস্থা চালু করা দরকার। এর পরেও কাংখীত ফল পাওয়া না গেলে সৌদিসহ অন্যান্য দেশসমূহের উপর ক‚টনৈতিক চাপ প্রয়োগ করতে হবে। কূটনৈতিক পদক্ষেপের পরেও যদি আশানুরূপ ফল না পাওয়া যায় প্রয়োজনে যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে সেসব দেশে নারীকর্মীদের পাঠানো বন্ধ করে দিতে হবে।
উল্লেখ্য ফিলিপাইন-ইন্দোনেশিয়া এধরনের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করার পরেও যখন ইতিবাচক ফল পায়নি বাধ্য হয়ে সৌদিতে নারী গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার দেশে শ্রীলঙ্কাও বাধ্য হয়ে সৌদিতে গৃহকর্মী না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অবশ্য আমাদের জন্য এধরনের কঠোর সিদ্ধান্তে যাওয়া অনেকটা কঠিন বিষয় মনে হলেও নারীকর্মী পাঠানোর জন্য বিকল্প দেশের সন্ধান পেলে পথটা অনেক সহজ হয়ে যাবে।
বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে প্রচুর দক্ষ নারী শ্রমিকের চাহিদা রয়েছে। এগুলো হলো- নার্স, আয়া, শিশু পরিচর্যাকারী, রিসিপসনিস্ট, ক্যাশিয়ার, বিউটিশিয়ান, হাসপাতাল ও শপিংমলের পরিচ্ছন্নতা কর্মী ইত্যাদি। এসব অঞ্চলের হাতে গোনা কয়েকটি দেশেও যদি দক্ষ এবং আধাদক্ষ নারী শ্রমিকদের পাঠানো যায় তাতে করে সৌদিসহ উল্লিখিত দেশ সমূহের উপর নির্ভরশীলতা অধিকাংশে কমে আসবে। কেননা দক্ষ ও আধাদক্ষ শ্রমিকদের বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও যেমন বেশি দক্ষ ও শিক্ষিত নারীদের বিদেশে পাঠানো গেলে তেমনি করে তারা মর্যাদার সঙ্গে কাজ করতে পারবেন।