এবিএম সালেহ উদ্দীন, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র
ছবির প্রতি আমার দুর্বলতা সেই ছোটবেলা থেকে। বাজারে বিক্রির জন্য নানারকমের ছবি টানানো থাকত। সিনেমার নায়ক-নায়িকাসহ বিখ্যাত লোকদের ছবি। চাহিদা মোতাবেক বাবা আমাকে এমন অনেক ছবি কিনে দিতেন। তবে কোন সিনেমা নায়ক-নায়িকার ছবি নয়। একসময় আমি একটি বড় ছবির আবদার করলে তিনি কিনে দিয়েছিলেন। ছবিটি আমি খুব যত্নসহকারে রেখে দিয়েছিলাম। একবার স্কুল থেকে এসে আমার পড়ার টেবিলে ছবিটি না পেয়ে চেঁচামেচি শুরু করে দিলাম। কোনভাবেই সন্ধান পাওয়া
গেল না। ছবিটি না পেয়ে খুব কষ্ট পেলাম।
পরের দিন আমার ভাই আমাকে বলল তোর কাছে যে ৫০ টাকার নোট আছে সেটি আমাকে দিলে সেই ছবির সাথে আরও একটি ভালো ছবি দেয়া হবে। ঐ টাকাটা বড় দুলাভাই আমাকে ঈদ উপলক্ষ্যে দিয়েছিলেন।
আমি রাজি হয়ে গেলাম। ওই টাকার চেয়ে আমার কাছে ছবিটির মূল্য অনেক বেশি। এখনো মনে আছে আমি কায়েদে আজম- এর ছবিযুক্ত ৫০ টাকার নোটটি ভাইয়াকে দিয়ে দিলাম। সত্যি সে আমাকে দু’টি ছবি দিলো না।
আমি আমার হারিয়ে যাওয়া প্রিয় ছবিটি পেয়ে খুব খুশি। রাগে ক্ষোভে ভাইয়াকে বললাম, তুমি আমার প্রিয় ছবিটি চুরি করে মিথ্যা কথা বলেছিলে! কেন বলেছিলে তুমি কিচ্ছু জানো না!
শুধু আমার সংগে নয়, আম্মার সাথেও মিথ্যে বলেছো। ভাইয়া আমাকে ধমক দিয়ে বলেছিল, যা ভাগ! তারপর অনেকদিন আমি ওর সাথে কথা বলিনি।
১৯৭০ এর জাতীয় নির্বাচনের সময় চরফ্যাশন কলেজ মাঠে আমার প্রিয় ছবির সেই মহানায়ককে দেখেছি। আমার বাবার ইউনিয়নের অনেক মানুষ তার ভাষণ শুনতে গিয়েছিলেন। নদীমার্তৃক ভোলার দক্ষিণাঞ্চলের বড় থানা হচ্ছে চরফ্যাশন। সেই জনসভায় হাজার হাজার মানুষের ঢল নেমেছিল। এত সহস্ত্র মানুষ দেখে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। শীতকালের রৌদ্রস্নাত সকালে দীর্ঘ রাস্তা, আইল-বিলের খেত মাড়িয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে পঙ্গপালের মতো যোগদান করা জনস্রোত দেখার কিশোর বেলার সেই স্মৃতির কথা আজীবন মনে থাকবে। ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে রেডিওতে মহানায়কের প্রেরণাবাহী বজ্রকণ্ঠ যেন আজও কানে ভাসে।
৭৩ এর শেষদিকে ঢাকার লালমাটিয়ায় বোনের বাসায় বেড়াতে যাওয়ার পর আমার ভগ্নিপতি মুক্তিযোদ্ধা ডা. মফিজুর রহমান (লালামাটিয়া বাস্তুহারা সমিতির তৎকালীন সভাপতি) বেশ কয়েকজন রাজনীতিকের সাথে ৩২ নম্বরের বাড়িতে আমাকেও নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে মহানায়ককে (কাছে থেকে) দেখতে পেয়ে বিস্মিত হয়েছিলাম। তাঁর সম্মোহনী দৃষ্টির প্রখরতা যেন আজও চোখে ভাসে।
দেশ স্বাধীনের পর ঢাকায় আসলে টিভিতে স¤প্রসারিত মহানায়কের ভাষণ দেখেছি। পাকিস্তান আমলের একেবারে শেষদিকে আমার কিশোরবেলায় যে ছবিটি আমার ছোট্ট রুমে শোভা পাচ্ছিল। বুঝ হবার পর সেই ছবি দেখি বাংলাদেশের মানুষের ঘরে ঘরে। ৭৩-৭৪ এ দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের কষ্ট ও দুর্দশা যখন দেশময় চরম অরাজকতার সময়ও বজ্রকন্ঠ নিয়মিত শোনা যেতো। সকাল-বিকাল- রাত্রিতেও সেই কণ্ঠ যেন এখনও কানে বাজে। মনে হতো অচিরেই মানুষের হাহাকার থেমে যাবে। জনদরদী মহানায়ক কখনো গণমানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন কোন সত্ত্বা নয়। বাংলার মাটি ও মানুষের সাথে একীভূত এক কিংবদন্তি।
পাকিস্তানী শাসকদের শোষণ- নির্যাতনের যে বীজ বাঙালি জীবনে বপন করা হয়েছিল, তা থেকে মুক্তির উপায় সম্পর্কে তিনি বাতিয়েছিলেন। স্বাধীনতা আন্দোলন ও গণমানুষের স্বার্থে রাজনীতি করতে গিয়ে তিনি বহুবার জেল খেটেছেন।
বিশ্ববিখ্যাত বিপ্লবী শিল্পী জর্জ হ্যারিসন এবং বব ডিলানের গানের মতো মহানায়কের সেই প্রতিবাদী কন্ঠ সমস্ত মানুষকে জাগিয়েছিল।
মহানায়কের পক্ষ থেকে ১৯৭১ এর ২৬ মার্চ আরেক মহান মুক্তিযোদ্ধা ও সেনানায়কের মাধ্যমে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পরবার আহ্বান জানানো হয়েছিল। তারও আগে ৭ মার্চ ঢাকার জনসমুদ্রে আমাদের মহানায়ক ঘোষণা দিয়ে বলেছিলেন-‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম’। মূলত: সেই ঐতিহাসিক ভাষণটি স্বাধীনতার আগাম বার্তা।
২৬ মার্চের পর থেকে সমগ্র দেশব্যাপী শুরু হয়েছিল রক্তক্ষয়ী মহান মুক্তিযুদ্ধ। কতিপয় স্বাধীনতা বিরোধী ছাড়া সমগ্র দেশের সর্বস্তরের মানুষ স্বাধীনতা ও মুক্তির ডাকে উদ্দীপ্ত হয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।
৭৩ ও ৭৪ এর সময়টি ছিল মহানায়কের জন্য কঠিন সময়। একদিকে দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের হাহাকার অন্যদিকে দলের ভিতর ও বাহিরের সুবিধাভোগী লোকদের চাটুকারবৃত্তি। একদিকে মানুষের জন্য নিজেকে নিবেদনের প্রত্যয়, অন্যদিকে দলীয় স্বার্থপর চোর- বাটপারদের সামাল দেয়ার চেষ্টা, একদিকে দেশ গড়ার উদ্যোগ ও চেষ্টা অন্যদিকে দুষ্টচক্রের ষড়যন্ত্র।
একদিকে গণতন্ত্র রক্ষার প্রচেষ্টা, অন্যদিকে গণতন্ত্র হত্যা করবার কূটকৌশল!
৭৫ এর ১৫ আগস্ট স্নিগ্ধ ভোরের সূর্যালোকের পরশ যেন ম্লান হয়ে যাচ্ছিল। এমন সময় ইথারযোগে খবর ছড়িয়ে পড়ল মহানায়কের মহাপ্রয়াণের কথা। আমি তখন স্কুলে পড়ি। গজারিয়ার মধ্যবাজারের গদিঘরের পিছনের রুমে থাকতাম। রেডিও’র খবরটি শুনে আমার কচিমন ও হৃদয়ের ভেতরকার সবকিছু যেন দুমড়ে মুচড়ে স্তব্ধ ও স্থবির হয়ে গেল।
জীবনের সকল কঠিন ও দুর্ভেদ্য পথের নিত্যসহচর সুদৃঢ় মনোভাবের গণমানুষের প্রিয় সেই সাহসী মানুষটি নেই ?
জীবনের অন্তিমলগ্ন অবধি এই মহানায়ক মানুষের কল্যাণ ও মুক্তির জন্য ব্যাপৃত ছিলেন। গণমানুষের কল্যাণ চিন্তার বাইরে কোন গড্ডালিকায় তিনি গা ভাসিয়ে দেননি। মহানায়কের নৃশংস হত্যাকান্ডের ঘটনার পর
বড় হতে হতে এ পর্যন্ত আমার অনুভব ও উপলব্ধিতে যতটুকু বুঝলাম, আমাদের এই নশ্বর পৃথিবীতে মানুষের ভেতরকার পশুবৃত্তিতে নৃশংসতা ও পাশবিকতার সবকিছুই বিবেকহীনদের মাধ্যমে সংঘটিত হওয়া সম্ভব। এমনকি পৃথিবী ধ্বংস করে মানবিকতার কবর দিতেও অমানুষদের কাছে অসম্ভব কিছু নয়। আমার চিরকালের পরম
শ্রদ্ধাভাজন সেই মহানায়কের নাম-
যিনি সকল অনুভবে বহমান..
তিনি ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’।