মুহাম্মদ আনোয়ার শাহাদাত, রিয়াদ, সৌদিআরব:
বায়ান্ন থেকে দুই হাজার বাইশ দীর্ঘ পথচলা। ভাষা আন্দোলন থেকে ‘শহীদ দিবস’ তারপর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা অর্জন। বাংলা ভাষার সাথে বাংলাদেশের মর্যাদাকে নতুন করে সমুন্নত করেছে এই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি। ফেব্রুয়ারি মাস এলেই বাঙালির হৃদয়ে মাতৃভাষা বিকাশের অঙ্গীকার জেগে উঠে এবং অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার চেতনা শাণিত হয়। স্মরণ করিয়ে দেয় আমাদের গৌরবোজ্জ্বল আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের কথা। সাথে সাথে আমাদেরকে মুখোমুখি করে আত্মজিজ্ঞাসার! এই আত্মজিজ্ঞাসা হলো- মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় বুকের তাজা রক্ত দিয়ে স্বাধিকার ও আত্মপরিচয়ের যে দৃঢ় প্রত্যয় প্রকাশিত হয়েছিল তার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয়েছে কি? মাতৃভাষার জন্য বুকের তাজা রক্ত বিসর্জন, বাঙালি জাতি দৃঢ় ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামে যেভাবে অংশ নিয়েছিলেন অস্তিত্ব রক্ষার অন্তর্গত অতল তাগিদে পরবর্তীতে কিন্তু শহীদদের আত্মত্যাগ ও স্বপ্নের বাস্তবায়নে সেভাবে আর সর্বোত প্রচেষ্টা কিংবা সুদূরপ্রসারী কার্যপরিকল্পনা নেয়া হয়নি। যার কারণে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর বিষয়টি এখনও পুরোপুরি সম্ভব হয়ে উঠেনি। বাংলা ভাষার উৎকর্ষ সাধন কিংবা মাতৃভাষাকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে কাজ যে হয়নি তা কিন্ত নয় তবে তা সময়ের তুলনায় যথেষ্ট নয়। বায়ান্ন সালে মাতৃভাষা বাংলার প্রতি আমাদের যে গভীর মমত্ববোধ আর ভালোবাসা ছিল কালের পরিক্রমায় তাতে যেন ভাটা পড়েছে। মাতৃভাষার প্রতি আমাদের বর্তমান ভালোবাসা যেন ভাসা ভাসা।

বাংলা ভাষা যে আমাদের প্রাণস্পন্দন, আমাদের স্বাধীনতা ও স্বকীয়তার উৎসমূল তা যেন আমরা ভুলতে বসেছি বা অবহেলায় যেন-তেন ভাবে সময় পার করছি। আমাদের পেশাগত ও কর্মময় জীবনে এখনও সর্বোতভাবে বাংলার ব্যবহারকে কাজে লাগাতে পারিনি। শিক্ষার মাধ্যম হিসেবেও সর্বস্তরে মাতৃভাষার ব্যবহারকে ব্যাপকতর করতে পারিনি। বিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্র কিংবা প্রকৌশলবিদ্যায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা ভিন্ন ভাষার উপর নির্ভরশীল। আইন-আদালত কিংবা বিচার ব্যবস্থায়ও তেমনই। অনেক ক্ষেত্রে আমরা বাংলাকে ব্যবহার করতে পারলেও আমাদের মানসিক দীনতার কারণে মাতৃভাষার পরিবর্তে ভিন্ন ভাষাকে প্রাধান্য দিচ্ছি। অথচ বিশ্বের অগ্রসরমান দেশগুলো তাদের মাতৃভাষাকে উচ্চ শিক্ষার বাহন বানিয়ে অগ্রসর হয়েছে। ভাষার বিবর্তন হবে, এটা স্বাভাবিক।
ভাষা এক বহতা নদীর মতো, এতে বিভিন্ন ভাষার শব্দের সম্মিলন ঘটবে তাতে কোন সমস্যা নেই। সমস্যা হচ্ছে মাতৃভাষা বাংলাকে ‘বাংলিশ’ বানিয়ে ফেলা। তথ্য-প্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ আর বিশ্বায়নের উন্মুক্ত স্রােতধারায় আমরা কোনটি গ্রহণ করব আর কোনটি বর্জন করব তা আমাদের ভাষা, শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিবেচনায় ঠিক করতে হবে। নতুন কিছু শিখতে গিয়ে, নতুন কিছু গ্রহণ করতে গিয়ে নিজেদের অস্তিত্বকে শঙ্কার মধ্যে ঠেলে দিলে তা সময়ের স্রােতে আমাদেরকে ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির বলয়ে নিয়ে যাবে। আজকে শুধু ফেব্রুয়ারি মাস আসলেই দেখা যায় ইংরেজি লেখা সাইনবোর্ড পরিবর্তনের হিড়িক। ফেব্রুয়ারির শেষে আর কোন খবর থাকে না। বাংলা বানান আর বাংলা ভাষার উৎকর্ষতা সাধন এবং পেশাগত জীবনে এর ব্যাপক প্রচলনে সকলের সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।
বাংলা একাডেমি এবং বাংলা ভাষাবিদ বা গবেষকদের নিয়ে একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা থাকা দরকার। মাতৃভাষার প্রতি নিজেদের গভীর ভালোবাসা অক্ষুন্ন রাখতে হলে নিজের ঘর থেকে শুরু করতে হবে মাতৃভাষার শুদ্ধতম চর্চা। আমরা আমাদের সন্তানদের যেভাবে ইংরেজি শেখানোর জোর দিই তার ছিটেফোটাও বাংলার জন্য ভাবি না। মনে করি বাংলা আবার শিখতে হয় নাকি? আর তাই অনেকেই উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও বাংলা ভাষার সুন্দর ও শুদ্ধ উচ্চারণ করতে পারিনা বা প্রমিত বানানে ভালো করে লিখতেও পারি না। আমাদের সুশীল সমাজ, রাজনীতিবিদ আর আমলা বা বুদ্ধিজীবীরা যতই সভা-সমাবেশে, সেমিনারে, আলোচনায় মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসার কথা বলুক প্রকৃতপক্ষে তাঁদের অধিকাংশদের সন্তানরা পড়ালেখা করে ইংরেজি মাধ্যমে এবং নিজেরাও প্রাত্যহিক জীবনে বা পেশাগত জীবনে বিনা প্রয়োজনে বাংলার চাইতে ইংরেজি চর্চা করেন বেশি, যা মাতৃভাষার প্রতি অবজ্ঞার নামান্তর।

মাতৃভাষার প্রতি আমাদের মানসিক দৈন্যতা এতই প্রকট যে, আমরা যে কোন প্রতিষ্ঠানের নাম বাংলার পরিবর্তে ইংরেজিতে রাখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। আমাদের মানসিক অবস্থা এমন হয়ে গেছে যেন, কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম ইংরেজিতে হলেই মনে করি সেখানে ভালো পড়ালেখা চলে। কোন খাবারের দোকানের নাম যদি ইংরেজিতে হয় সেখানে যেন অন্যরকম এক চমক থাকে বলে আমরা মনে করি এবং ঐসব ইংরেজি নামের দোকানে বসে খাবার খেতে, আড্ডা দিতে যেন গর্ববোধ করি!

এই রকম মনোবৈকল্য থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। বাংলা ভাষার শব্দ ভান্ডার অত্যন্ত সমৃদ্ধ তারপরও ভিন্ন ভাষার শব্দ খুঁজি বৈচিত্রতার দোহাই দিয়ে। অথচ বাংলা ভাষার মতো বৈচিত্রময় এবং সমৃদ্ধ শব্দভান্ডার পৃথিবীর খুব কম ভাষায় আছে। আমাদের জ্ঞানের দৈন্যতা এবং মাতৃভাষা চর্চার অভাবে আমরা তা খুঁজে পাই না। এখনো দেশের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অন্যান্য পাঠ্যের উপর যেভাবে গুরুত্বারোপ করা হয় সেভাবেই অবহেলা করা হয় মাতৃভাষা বাংলাকে। আর বেসরকারি বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে তো বাংলার চর্চা নেই বললেই চলে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেভাবে ভাষার বিকার ও দূষণ ছড়িয়ে দিচ্ছি তাতে করে মাতৃভাষার প্রতি আমাদের দরদ কত তলানিতে গিয়ে পৌঁছেছে তা সহজে অনুমেয়। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে প্রয়োজন আমাদের সার্বিক ও সামগ্রিক সদিচ্ছা এবং সর্বোচ্চ প্রয়াস। মাতৃভাষার প্রতি আমাদের দরদ যেন একটি মাস বা দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। সারা বছর যেন গভীর মমত্ববোধ দিয়ে বাংলাকে ভালোবাসি এবং বাংলা চর্চা করি, তাহলেই কেবল প্রাণের বাংলা ভাষা নিজস্ব স্বকীয়তায় এগিয়ে যাবে এবং ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ সার্থক হবে।