আহসান নবাব:
আজ পর্যন্ত দু’বার আমেরিকা যাওয়া হয়েছে। বলতে দ্বিধা নেই- মানুষ যে আমেরিকাকে স্বপ্নের দেশ বলে তা হয়তো একটু অতিরঞ্জিত, কিন্তু সত্যও কম নয়। আমার ভালো লেগেছে জর্জ ওয়াশিংটন, আব্রাহাম লিংকন, জন এফ কেনেডি, মার্টিন লুথার কিং এর আমেরিকা। ছেলে ও বউমার টানেই যাওয়া। ওরা থাকতো সাউথ ক্যারোলিনার কলাম্বিয়ায়।
একদিন আমরা তিনজন বাসে করে চলে যাই জর্জিয়ার আটলান্টায়। আমাদের প্রিয় ঝাপ্পুর মেহমান হয়ে। ঝাপ্পু আমার ছোট ভাই রাজার শৈশবকালের জানিদোস্ত। সাগরের মতো উদার ভাইটি আমাদের পরিবারের সবারই ভীষণ প্রিয়। দীর্ঘ দিন ধরে আটলান্টায় আছে। ঝাপ্পুর নির্দেশনায় আটলান্টার দর্শনীয় এটা ওটা দেখে এক সকালে আমরা যাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের অবিসংবাদিত নেতা মার্টিন লুথার কিং এর সমাধিতে। আফ্রিকান-আমেরিকান এই মানবাধিকারকর্মী আমেরিকার নাগরিক ও মানবাধিকার আন্দোলনের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ নেতা। আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার আদায়ে তিনি মহাত্মাগান্ধীর অহিংস আন্দোলনে অনুপ্রাণিত হয়ে নাগরিক অধিকার আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়েছিলেন। এজন্য তিনি ১৯৬৪ সালে ‘নোবেল শান্তি পুরষ্কার’ পেয়েছিলেন। মানুষকে সাহসী আর তেজোদীপ্ত করতে মন্ত্র-মুগ্ধকর বক্তৃতা দিতে জানতেন তিনি। ১৯৬৮ সালে একজন শ্বেতাঙ্গ উগ্রপন্থী যুবক তাকে গুলি করে হত্যা করলেও তার দেখানো পথ ধরেই আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের ভোটের অধিকার, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো।
আমরা ঘুরে ফিরে তার ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী, বিভিন্ন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দলিল, তার বিভিন্ন সময়ের ছবি দেখে নিচ্ছিলাম। এরপরে আমরা যে রুমটার সামনে এসে দাঁড়ালাম- সে কক্ষটি মহাত্মা গান্ধীর জন্য নিবেদিত। দিল্লিতে শুধুই এককভাবে বাপুজির (গান্ধীকে আদর করে এ নামে ডাকতো ভারতবাসী) মিউজিয়াম আমি দেখেছি। তার তুলনায় এটি অতি ক্ষুদ্র হলেও ভিনদেশে এর অবস্থান এবং রাষ্ট্রীয় মার্যদা বা আয়োজন, স্বীকৃতি দেখে শিহরিত হয়েছি। আনন্দিত হয়েছি। গান্ধীজীর ব্যবহৃত কিছু সামগ্রী এবং তার জীবনাচারের কিছু দুষ্প্রাপ্য নিদর্শন এখানে সুন্দর করে উপস্থাপন করা হয়েছে। ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষ হিসেবে এসব দেখে আত্মশ্লাঘায় আমরা তিনজনই অভিভূত হই। এই মিউজিয়ামের আরেকটি বড় কক্ষে কৃষ্ণাঙ্গ নারী নেত্রী ‘রোজা পার্ক’-এর কিছু প্রদর্শনীও আছে। রোজা পার্ক সেই নেত্রী যার ধারাবাহিক আন্দোলনের ফলেই বাস সহ সকল পরিবহনে কৃষ্ণাঙ্গদের সমভাবে বসার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এর আগে কালো মানুষদের বসতে হতো পিছনের সংরক্ষিত সিটে।
মার্টিন লুথার কিং এর আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গদের আজ রাষ্ট্রীয় সমসুযোগ, অনেক স্বীকৃতি, তাদের অনেক অবদান স্বীকার করা হয়। তারপরও এখনো আমেরিকায় হঠাৎ হঠাৎ একজন কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্রয়েড যখন ‘I Can’t Breath’ বলে আর্তনাদ করে, মাটিতে লুটিয়ে পড়ে মারা যায় (রাষ্ট্র অপরাধীকে যথাযথ সাজা দিয়েছে) তখন বেশ মনে পড়ে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র কে, মনে পড়ে মহাত্মা গান্ধীকে, মনে পড়ে রোজা পার্ক- কে।
দেশে দেশে সামাজিক, রাষ্ট্রিক অধিকার আদায় আন্দোলনের সকল নেতাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই।