আখি সীমা কাওসার, রোম, ইতালি প্রতিনিধি: বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ঢাকা-রোম রুটের একটি ফ্লাইটে দুর্গন্ধযুক্ত খাবার ও পঁচা মাছের গন্ধের কারণে অন্তত চার ঘণ্টা বিলম্ব হয়। এর পর ফ্লাইটটি ঢাকার উদ্দেশে উড্ডয়নের অনুমতি পেয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার রোমের স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিটে বিজি ৩৫৫ ফ্লাইটটি ঢাকার উদ্দেশে ছাড়ার কথা থাকলেও সেটি রাত সোয়া ১১টায় উড্ডয়নের অনুমতি দেয় রোমের ফিউমিচিনো (Fiumicino aeroporto) বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। ওই সময় যাত্রীরা বিমানের ভেতরে আটকে ছিলেন।
ঘন্টার পর ঘন্টা ফ্লাইট সিডিউল দেরি দেখে যাত্রীদের মধ্যে হৈচৈ পড়ে যায়। অনেকে নাকে হাত দিয়ে এদিক-ওদিক দৌড়াতে থাকেন, কী হয়েছে ভিতরে তা বুঝতে না পেরে। একটু পর পর বিমানবালারা এয়ার প্রেসনার স্প্রে করছিলেন। এরই মধ্যে এয়ার কার্গোর ভিতরে অর্থাৎ ওই ফ্লাইটে যারা ঢাকা থেকে এসেছে তাদের লাগেজ বেল্টে চলে গেছে। রোম এয়ারপোর্টের পুলিশ দুর্গন্ধের কারণ খতিয়ে দেখছিলো, তারা ফ্লাইটের কার্গো চেক করছিল। ততক্ষণে যাত্রীরা বেল্টে চলে গেছেন, যাত্রীদের কিছু বোঝানো হচ্ছিলো না। এত পঁচা গন্ধ বিমানের ভিতরে — চিন্তা করা যায়?
বাংলাদেশি মহিলারা বিদেশ থেকেও আইন-কানুন মানতে চায় না, গায়ের জোরে সবকিছু চালানোর চেষ্টা করেন। বিমানে উঠলেই মাথা খারাপ হয়ে যায়। ছোট ছোট বাচ্চাদের মা-মায়েরা তাদের বাচ্চাকে সামলাতে পারেন না, বাচ্চাদের চিৎকারে যাত্রীরা বিরক্ত হন। তাদের গায়ে থাকা দুর্গন্ধ এবং বাচ্চাদের পাম্পার ঠিকমতো পরিবর্তন না করায় দুর্গন্ধ ছড়ায়। আবার পঁচা মাছের গন্ধও প্রচণ্ড। বাংলাদেশের মতো গরমে ফ্লাইট দেরি হলে ভেতরে এসি ভালো কাজ করে না।
যদি প্যাকেটিং ভালোভাবে করে নিয়ম-কানুন মেনে আনা যেত, হয়তো এমন ঘটনা ঘটত না। একজনের কারণে পুরো বিমান যাত্রীদের খরচ বেড়ে যায়। কেউ কেউ বিমান নিয়ম কানুন মেনে দেশে থেকে কিছু নিয়ে আসেন, তবে সেটা নিয়মমাফিক হয়। যারা এ কাজটি করেছেন, তাদের কারণে ভবিষ্যতে রোম এয়ারপোর্টে বাংলাদেশিদের অনেক তল্লাশি ও হয়রানি হতে পারে।
ঠিক যেমন দালালরা নানান রকম দালালি করে মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নিয়েছেন, স্পন্সর জমার নামে প্রচুর টাকা আদায় করেছেন। যেখানে পাসপোর্ট জমা দেওয়া যাবে পাঁচটি, সেখানে জমা দেওয়া হয়েছে ৫০০ পাসপোর্টের কপি। পাসপোর্টের সাথে কোথাও কারো কাছ থেকে এক লাখ টাকা, কারো কাছ থেকে দুই লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। যার যার মতো টাকা নিয়েছে দালালরা। ইতালি প্রশাসন এই বিষয়গুলো জেনে গেছে। তাই কোনো কাগজ জমা হলেও মোট অংকের টাকা ছাড়া ভিসা দিচ্ছে না। কখনো কখনো টাকা দিলেও ভিসা দেয় না। কারণ ইতালি প্রশাসন বিষয়গুলো জানে।
মাঝখান দিয়ে যারা সবকিছু মেনে লিগ্যাল ওয়েতে স্পন্সর জমা দিয়েছেন, তারা বিপদে পড়েছেন।
বিমান কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করব, ইতালিতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স দ্বিতীয়বার চালু হওয়ার জন্য আমরা অনেক জায়গায় আন্দোলন ও আবেদন করেছি। অনেক কিছুর পর এই ফ্লাইট চালু হয়েছে। কিছু দুষ্টু মানুষের কারণে মনে হয় ফ্লাইট আবার বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কেউ যেন বিমান চালানোর সময় খাবার আনা-নেওয়া না করতে পারে সে ব্যাপারে কঠোর আইন করা হোক। টিকিট এজেন্সিগুলোকে টিকিটের গায়ে স্পষ্ট লেখা রাখতে হবে যে, কাঁচা খাবার আনা-নেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ইমিগ্রেশনে ধরা পড়লে টিকিট বাতিল করা হবে। এমন আইন জরুরি।
বিস্তারিত বললে, সেদিন চার ঘণ্টা বিলম্বের কারণ ছিল সেই পঁচা গলানো খাবারের দুর্গন্ধ।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, ফ্লাইটটি মঙ্গলবার সকালে ঢাকা থেকে রোম যাওয়ার সময় একাধিক যাত্রী রান্না করা খাবার ও কাঁচা মাছ নিয়ে গিয়েছিলেন। রোমে পৌঁছানোর পর ওই খাবার ও মাছ পচে দুর্গন্ধ ছড়ায়। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের রোম স্টেশনের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের নজরদারির অভাবে পচন ধরা সেই পণ্যবোঝাই লাগেজ কার্গো হোল্ড থেকে নামিয়ে বেল্টে দেওয়া হয়। ফলে অন্য এয়ারলাইন্সের যাত্রীদের লাগেজেও মাছ ও রান্না করা খাবারের তেল লেগে যায়। বেল্টের আশপাশেও দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। ততক্ষণে ঢাকামুখী যাত্রীরা উড়োজাহাজে উঠে বসেন। পুরো উড়োজাহাজে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে ঝামেলা হওয়ায় ফ্লাইট বিলম্বিত হয়।
বিমানের রোম স্টেশনের কর্মীদের সূত্র জানায়, ওই ঘটনার পর ফিউমিচিনো বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট উড়োজাহাজের কার্গো হোল্ড পরিদর্শন করে রান্না করা খাবারের ঝোলসহ পচনশীল নানা খাবারের উৎস খুঁজে পায়। পরে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালিয়ে চার ঘণ্টা পর উড্ডয়নের অনুমতি দেওয়া হয়।
অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন ঘটনায় বিমানের দায়দায়িত্বের পাশাপাশি দেশের সুনামও ক্ষুণ্ণ হয়। মূলত ডিপারচার স্টেশনের (যেখান থেকে ফ্লাইট উড্ডয়ন করেছে) দায়িত্বরত কর্মীদের অবহেলা ও নজরদারির অভাবে এমন ঘটনা ঘটে। তবে অ্যারাইভাল (যে বিমানবন্দরে অবতরণ করেছে) স্টেশনের দায়িত্বরতদের নজরদারির অভাবও রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে, রোমের ফিউমিচিনো বিমানবন্দরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কান্ট্রি ম্যানেজার আব্দুল্লাহ আল হুসাইন বলেন, মঙ্গলবার রাতে বিজি ৩৫৫ ফ্লাইটে ঢাকা থেকে ফিউমিচিনো এয়ারপোর্টে আসার সময় বাংলাদেশি যাত্রীদের লাগেজে কিছু পচনশীল খাবার পাওয়া যায়। এরপর বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ আগত যাত্রীদের লাগেজ নিয়ে তদন্ত চালায়। এ কারণেই ফ্লাইট বিলম্বিত হয়।
রোমে দায়িত্বরত বিমানকর্মীদের সূত্র জানায়, ওই ফ্লাইটে এক যাত্রীর লাগেজে কাঁচা ১১টি ইলিশ পাওয়া গেছে। নিয়ম অনুযায়ী তাকে জরিমানা করা হয়েছে।
ঢাকায় ফেরার পথে চার ঘণ্টা বিলম্বের কারণে ওই উড়োজাহাজের যাত্রীরাও বিড়ম্বনায় পড়েন। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন এবং বিমানের মধ্যে ক্ষোভ প্রকাশ পায়। প্রবাসী যাত্রীরা রোমে দায়িত্বরত বিমানকর্মীদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তোলেন। তারা বলেন, রোম এয়ারপোর্টে দায়িত্বরত বিমানকর্মীদের কাছ থেকে সময়মতো সেবা পাওয়া যায় না, ফ্লাইট বিলম্বের তথ্য সহায়তা চাইলেও দেওয়া হয় না। এমনকি প্রবাসী যাত্রীরা তাদের কাছ থেকে ন্যূনতম সৌজন্যও পান না। তাদের অবহেলার কারণে এমন ঘটনা ঘটেছে।
অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, এমন ঘটনা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের গাফিলতির প্রমাণ। এতে দেশের সম্মান নষ্ট হয়। ডিপারচার এয়ারপোর্টে কর্মীদের গাফিলতির কারণে অনুমোদনহীন পণ্য নিয়ে যাত্রীরা উড়োজাহাজে ওঠার সুযোগ পায়। ঠিকমতো স্ক্যান করলে এমন হওয়ার কথা নয়। অ্যারাইভাল এয়ারপোর্টেও দায়িত্বরত কর্মীদের নজরদারির অভাব দেখা গেছে।
তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা এড়াতে ডিপারচার এয়ারপোর্টে বিমানকে স্পষ্ট ঘোষণা দিতে হবে কোন পণ্য নেওয়া যাবে এবং কী নেওয়া যাবে না। অনুমোদনহীন পণ্য নিয়ে যাত্রীরা বোর্ডিং স্ক্যানিংয়ে ধরা পড়লে প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট যাত্রীকে বোর্ডিং থেকে নামিয়ে দিতে হবে।
আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান পরিবহন সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, পচনশীল দ্রব্য, বিশেষ করে তরল, ঝোলযুক্ত খাবার, দুধ-মাছ জাতীয় দ্রব্য পরিবহনের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট শর্ত ও নিরাপত্তা বিধি রয়েছে। অথচ অনেক সময় যাত্রীদের অজ্ঞতা, অবহেলা এবং সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্স কর্মীদের অবহেলার কারণে তা উপেক্ষিত হয়।