ডা. মো: মুশফিকুল আলম পাশা
চীনের উহান (Wuhan) শহরে ডিসেম্বর ২০১৯ থেকে নতুন এক করোনা ভাইরাসের (Novel Coronavirus)প্রকোপ দেখা দিয়েছে। দিন দিন আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে চলছে। ২০১৯ এর ৩১ ডিসেম্বর এই শহরে নিউমোনিয়ার মতো একটি রোগ ছড়াতে দেখে প্রথম চীনের কর্তৃপক্ষ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে অবহিত করেন। এরপর ১১ জানুয়ারি প্রথম একজনের মৃত্যু হয়। ঠিক কীভাবে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরু হয়েছিল তা এখনও বিশেষজ্ঞরা চিহ্নিত করতে পারেননি। এক দশক আগে যে ভাইরাস সংক্রমণের ফলে সৃষ্ট সার্স (severe acute respiratory syndrome)-এর কারণে পৃথিবীতে ৮০০ লোকের মৃত্যু হয়েছিল, সেটিও এক ধরণের করোনা ভাইরাস দিয়েই ঘটেছিল। সার্সে আক্রান্ত হয়েছিল ৮ হাজারের বেশি লোক। একই ধরণের আর একটি ভাইরাসজনিত রোগ ছিল মার্স (Middle East Respiratory Syndrome)। ২০১২ সালে এতে মৃত্যু হয় ৮৫৮ জনের।

কোথা থেকে এলো এই ভাইরাস?
করোনা ভাইরাস আমাদের অতি পরিচিত। ইলেকট্রনিক মাইক্রোস্কোপের নীচে করোনা ভাইরাসকে দেখতে মুকুট (crown) বা সৌররশ্মির (solar corona) মতো মনে হয়। এজন্য এর নাম করোনা ভাইরাস। এই ভাইরাস বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। স্তন্যপায়ী প্রাণি এবং পাখীরা এর দ্বারা বেশি আক্রান্ত হয়। শীতকাল এবং বসন্তের শুরুর দিকে প্রতিবছরই কমবেশি যে সর্দি-গর্মি হয়, তার কারণ এই অতি পরিচিত করোনাভাইরাস। সমস্যা হচ্ছে মাঝে-মধ্যে করোনা ভাইরাসের চেহারা-চরিত্র বদলে যায়। সাধারণত অন্য কোন প্রাণির শরীর থেকে মিউটেশন হয়ে এই ভাইরাসটি মানুষের শরীরে ঢুকলে এটি মারাত্মক রূপ ধারণ করে। প্রথম থেকেই মনে করা হচ্ছিল এবারও ভাইরাসটি কোনো প্রাণির শরীর থেকে এসেছে। এবারের ভাইরাসটির আরেক নাম দেওয়া হয়েছে ২০১৯-এনসিওভি (2019-nCoV)। প্রশ্ন হচ্ছে কোন প্রাণী থেকে এলো? অনেক রকম করোনা ভাইরাসের সঙ্গে আমরা পরিচিত। কিন্তু এখন যেটির সংক্রমণ ঘটছে তা নতুন। বিশেষজ্ঞদের ধারণা চীনের উহান বাজারের কোন প্রাণিই এর উৎস ছিল। এসব প্রাণি থেকে প্রথমে ভাইরাসটি কোন মানুষের দেহে ঢুকেছে, এবং তারপর মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়েছে।
অতীতের সার্স এবং মার্স দুটোই প্রাণিবাহিত ভাইরাস রোগ। এর অর্থ মানুষের শরীরে এ দুটো রোগ প্রথমে কোন প্রাণি থেকে ঢুকেছিল। প্রমাণিত হয়েছে যে এর আগে চীনে সার্স ভাইরাস (SARS virus) প্রথমে বাদুড়ের শরীরে ছিল এবং পরে তা খট্টাশ বা গন্ধগোকুলের শরীরে প্রবেশ করে। সেখান থেকে এটা মানুষের দেহে ঢুকেছিল। মধ্যপ্রাচ্যের মার্স ভাইরাস (MERS virus) উটের শরীর থেকে এসেছিল; অর্থাৎ বাদুড় থেকে উটের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করেছিল। ২০১৯ সালের করোনাভাইরাস সংক্রমণের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে উহানের আক্রান্ত সকল রোগী একটি বাজারের দোকানদার অথবা ক্রেতা ছিলেন। ওই বাজারে সামুদ্রিক মাছ, মুরগী, ভেড়া, কুকুর, শিয়াল, ইঁদুর, বাদুড়, সাপ এবং খরগোশসহ নানারকম বন্যপ্রাণি বিক্রী করা হয়। এ পর্যন্ত সামুদ্রিক কোন জীব থেকে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের নজির নেই। এজন্য সকলে ওই বাজারের অন্যান্য প্রাণিদের বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছিলেন। ইতোমধ্যে উহান বাজারের বিভিন্ন প্রাণির শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করে করোনা ভাইরাস সনাক্ত করা হয়েছে এবং তাদের জেনেটিক কোড নির্ণয় করা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে ২০১৯-এনসিওভি-র সঙ্গে চীনের বাদুড়ের সার্স-জাতীয় করোনা ভাইরাসের গভীর মিল রয়েছে এবং এটা মানুষের শরীরে আক্রমণ করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। এরজন্য দ্বিতীয় আরেকটি প্রাণির সহায়তা দরকার। বিজ্ঞানীরা সম্ভাব্য সকল প্রাণির শরীরের করোনা ভাইরাসের জেনেটিক কোড বিশ্লেষণ করে খুবই অবাক হয়েছেন। কারণ এবারের করোনা ভাইরাসের প্রোটিন কোডের মিল পাওয়া যাচ্ছে সাপের শরীরে বাসকারী ভাইরাসের সঙ্গে। সাপ অনেক সময় বাদুড়কে শিকার করার চেষ্টা করে। বিজ্ঞানীদের ধারণা চীনে বাদুড় থেকে ভাইরাস সাপের শরীরে এসেছে। এমন সাপ উহান বাজারে বিক্রী করার সময় বিক্রেতা এবং ক্রেতাদের শরীরে তা প্রবেশ করেছে। দক্ষিণ-পূর্ব চীনে প্রধানত দু’ধরণের সাপ পাওয়া যায়- বাঙ্গারুস মাল্টিসিঙ্কটাস (Bungarus Multicinctus) বা কালাচ এবং নাজা আত্রা (Naja Atra) বা চীনা গোখরো। সাপের মাংস চীনের উহানের খাবারের বাজারে বিক্রী করা হয়। সেখান থেকেই সম্ভবত এই ভাইরাস মানুষের শরীরে চলে এসেছে। সাপের রক্ত শীতল, আর বাদুড়ের রক্ত উষ্ণ। করোনা ভাইরাস একই সময়ে শীতল এবং উষ্ণ রক্তবিশিষ্ট প্রাণির শরীরে কিভাবে টিকে থাকল সেটাই এখন রহস্য। এ রহস্যভেদ করার জন্য উহান বাজারের আরও সাপ এবং অন্যান্য প্রাণির নমুনা পরীক্ষা করার দরকার ছিল। কিন্তু রোগের প্রাদুর্ভাব হওয়ার পর উক্ত বাজার বন্ধ করে দিয়ে ব্যাপক পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালিত হয়েছে।

কি কি লক্ষণ দেখা যায়?
বেশিরভাগ করোনা ভাইরাসই বিপজ্জনক নয়। কিন্তু এবারের অপরিচিত এই নতুন ভাইরাসটি দিয়ে সৃষ্ট নিউমোনিয়া দুনিয়াজুড়ে মহামারীর সৃষ্টি করেছে। করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রধান লক্ষণ হলো জ্বর, কাশি এবং শ্বাস-কষ্ট। কিন্তু এর পরিণামে নিউমোনিয়া, অরগ্যান ফেইলিওর (organ failure) বা দেহের বিভিন্ন প্রত্যঙ্গ বিকল হয়ে যাওয়া এবং মৃত্যুও হতে পারে। ভাইরাসটি শরীরে ঢোকার পর সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিতে প্রায় পাঁচ দিন লাগে। প্রথম লক্ষণ হচ্ছে জ্বর। তার পর দেখা দেয় শুকনো কাশি। এক সপ্তাহের মধ্যে দেখা দেয় শ্বাসকষ্ট এবং তখন কোন কোন রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়।

আমাদের কি উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত?
নতুন করে সংক্রমণের বিস্তারিত খবর না পাওয়া পর্যন্ত বলা কঠিন যে এ মূহুর্তে আমাদের কতটা উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত। সার্সের বিষয়টা আমাদের মনে আছে। কিন্তু এখন যে কোন দেশের এ ধরণের রোগের সাথে লড়াই করার জন্য অনেক বেশি প্রস্তুতি রয়েছে। যেকোনো ভাইরাসই মানুষকে আক্রমণ করতে পারে। আর একবার মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারলে তা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। ভাইরাসকে সে সুযোগ দেয়া উচিত নয়।
এর কি কোন চিকিৎসা আছে?
যেহেতু এই ভাইরাসটি নতুন, তাই এর কোন টিকা বা ভ্যাকসিন দিতে হয় অন্য কোন চিকিৎসা নেই যা এ রোগ ঠেকাতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে অন্যান্য ভাইরাসজনিত রোগের মতই পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পানীয় এবং পুষ্টির ব্যবস্থা করতে হবে। রোগের তীব্রতা অধিক মনে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। প্রয়োজনে হাসপাতালের শরণাপন্ন হতে হবে।
এর হাত থেকে রক্ষা পাবার উপায় কী?
একমাত্র উপায় হলো, যারা ইতোমধ্যেই আক্রান্ত হয়েছে বা এ ভাইরাস বহন করছে- তাদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা। হাত সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। হাত দিয়ে নাক বা মুখ ঘষবেন না, ঘরের বাইরে গেলে প্রয়োজনে উপযুক্ত মাস্ক বা মুখোশ পরতে হবে। অন্যকে সংক্রমিত করার ঝুঁকি পার হওয়া পর্যন্ত সংক্রমিত ব্যক্তিকে আলাদা করে রেখে চিকিৎসা দিতে হবে। মানুষজনকে অরক্ষিত প্রাণি থেকে সাবধানতার পাশাপাশি ডিম ও মাংস রান্না এবং ঠান্ডা বা ফ্লুতে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে থাকার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস ও আমরা কি করেছি, কি করা উচিত ছিল:
বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস রোগের মহামারী বলতে বাংলাদেশে এটির প্রাদুর্ভাব ও দ্রুত বিস্তারের চলমান ঘটনাটিকে নির্দেশ করে, যা বর্তমানে বিশ্বজুড়ে চলমান মহামারীর একটি অংশ। করোনা ভাইরাস রোগ ২০১৯ (কোভিড-১৯) নামক একটি রোগ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার কারণে এই বৈশ্বিক মহামারিটির সৃষ্টি হয়েছে। গুরুতর তীব্র শ্বাসযন্ত্রীয় রোগ, লক্ষণ, সমষ্টি সৃষ্টিকারী করোনা ভাইরাস ২ (সার্স-কোভ-২) নামক সংক্রামক ধরনের একটি জীবাণুই প্রকৃতপক্ষে মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হয়ে মানবদেহে এই রোগটি সৃষ্টি করে।
চীন থেকে প্রথম উৎপত্তি হওয়ার পর বাংলাদেশে কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির কথা প্রথম জানা যায় ৮ই মার্চ, ২০২০ সালে এবং প্রথম মৃত্যুটি ঘটে ১৮ই মার্চ, ২০২০ সালে।

১৬ কোটি জনসংখ্যার দেশ হিসেবে যথেষ্ট পরিমাণ পরীক্ষা বাংলাদেশে করা হয়নি। সংবাদপত্র ও সামাজিক মাধ্যমে কোভিড-১৯ এর লক্ষণসহ অনেক সংখ্যক রোগীর মৃত্যুসংবাদ এসেছে যার মধ্যে কিছুসংখ্যক ভুয়া এবং ষড়যন্ত্রতত্ত্ব বলে প্রমাণিত হয়েছে। মৃতদের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে স্থানীয় জেলা হাসপাতালে আইসোলেশনে রেখে কোভিড-১৯ এর চিকিৎসা দেয়া হয়েছিল তবে কয়েকজনকে চিকিৎসা দিতেও অস্বীকৃতি জানানো হয়। যদিও যাচাই নিশ্চিত করতে কোনই পরীক্ষা করা হয়নি। দীর্ঘ সময় যাবত পরীক্ষা প্রক্রিয়াকে শুধুমাত্র রাজধানীর ‘আইইডিসিআর’ এ কেন্দ্রীভূত করা হয়েছিল, যদিও কোভিড-১৯ এর লক্ষণসহ রোগীর খোঁজ সারাদেশেই পাওয়া গিয়েছিল।
‘আইইডিসিআর’ কর্তৃক একগুচ্ছ হটলাইন নাম্বার, ই-মেইল অ্যাড্রেস এবং তাদের ফেসবুক পাতা জনগণের জন্য সরবরাহ ও নিশ্চিত করা হয়েছিল যাতে তারা দরকারি তথ্য বা কোভিড-১৯ সন্দেহে যোগাযোগ করতে পারেন।
২২ মার্চ ২০২০ বাংলাদেশ সরকার ১০ দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছিল যা পরবর্তীতে কয়েক বার বর্ধিত করে ৩০ জানুয়ারি ২০২১ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। বাংলাদেশে ‘লকডাউন’ প্রয়োগের সময়টিকে সরকারিভাবে ‘সাধারণ ছুটি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। ‘সাধারণ ছুটি’র মধ্যে সারা দেশেই জরুরি সেবা, পণ্য পরিবহন, চিকিৎসা ইত্যাদি অতি প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলো ছাড়া গণপরিবহনও অবরুদ্ধ করা হয়েছিল। দেশজুড়ে অবরুদ্ধকরণ (লকডাউন) আরোপ করার আগ পর্যন্ত আক্রান্ত বাড়ি, প্রয়োজনে জেলা, উপজেলা ইত্যাদি অবরুদ্ধকরণ করা হয়েছিল। ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত দেশের ২৯টি জেলা সম্পূর্ণ এবং ১৯টি জেলা আংশিকভাবে অবরুদ্ধ করা হয়েছিল। বিভিন্ন দেশের মত দেশজুড়ে অবরুদ্ধকরণ না হলেও সারা দেশেই অতি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মুক্তভাবে চলাচলের উপর বাধা আরোপ করা হয়েছিল। সারা দেশে সন্ধ্যা ৬টার পর থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত বাইরে বের হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। একইসাথে এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় চলাচল বন্ধের জন্যও প্রশাসন কড়াকড়ি আরোপ করেছিল। এছাড়া বাংলাদেশ সরকার জনগণের জন্য প্রাণোদনা বাবস্থা করেছিলেন যাতে করে কেউ সমস্যায় না পড়ে।

বাংলাদেশে অন্যান্য দেশের মত কঠোর অবরুদ্ধকরণ (লকডাউন) করা উচিত ছিল এবং এর পাশাপাশি সারা দেশে অনেক টেস্ট করে আক্রান্ত রোগীদের আলাদা করে চিকিৎসা করলে আমাদের দেশে আক্রান্তের সংখ্যা অনেক কম হতো।
সর্বোপরি আমাদের উচিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা তবেই আমরা এ রোগ থেকে রক্ষা পেতে পারি। বর্তমানে করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিস্কার হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারও ভ্যাকসিন আমদানি করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। যতদিন পর্যন্ত পুরো বাংলাদেশকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনা না যাবে ততদিন পর্যন্ত সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।