কামরুল হাসান সিদ্দিকী:
থেমে যাওয়া মৃদু বৃষ্টির সেই সন্ধ্যায় অনুজপ্রতীম সমুদ্র বললো
: ভাই চলেন এক জায়গায় যাই।
: কোথায়?
: এই কাছেই, কবিতা সন্ধ্যায়।
: যাবো?
: চলেন যাই।
: বেশ, ‘তবে তাই হোক’।
ওখানে শ্রবণ যন্ত্রের অবিশ্বাস্য সহ্য ক্ষমতার রতনদাকে পেলাম। ম্যাজিক লণ্ঠনের প্রধান পুরুষ। অগোচরে আমার শ্রদ্ধার মানুষ। একে অন্যকে অন্তত দু’ যুগ ধরে চিনি, তবে সংক্ষিপ্ত পরিসরে। তাঁর এই দূরূহ ধ্বনি-প্রতিষ্ঠানে আগেও দু’কি তিনবার আশ্রয় নিয়েছি। যাহোক ওখানে সেদিন পার্শ্ব বঙ্গের একজন কবি ছিলেন। এখানকার ছিলেন, বিবাহ সূত্রে ভদ্রমহিলা এখন ওখানকার। যিনি কেন্দ্র ছিলেন সেই কাব্য সন্ধ্যার। যার প্রকাশিত পুস্তক সংখ্যা চার। সবই কবিতার। তার মতে। কবিতার কাটা-ছেঁড়ায় অগভীর প্রকাশের চার-পাঁচজন ভদ্র মহিলাসহ ওই ভূগর্ভস্থে সেদিন সমবেত হয়ে ছিলেন আনুমানিক জনা চল্লিশ-কি-পঞ্চাশেক। সকলেই কবিতা ঘেঁষা। প্রায় সকলেই কবিতা পাঠ করেছেন। অতিথির প্রকাশিত পুস্তক নিয়ে সর্বোচ্চ বিনয়সহ আলোচনাও করেছেন। কেউ-কেউ লঘু স্তরে আপত্তিকর উচ্চারণে। যারা স্বকণ্ঠে স্বরচনা উপস্থাপন করেছেন, তাৎক্ষণিক বিবেচনায় কয়েকটি ছাড়া বাকিগুলো অশ্রাব্য এবং অন্যায়। নিজ মর্যাদার প্রশ্নে সবারই সদয় হওয়া উচিৎ। বিশেষত বয়োজ্যেষ্ঠদের।
আমি কবি নই। কবিতা বুঝি না। গদ্যও যে বুঝি তাও নয়। তবে এটুকু বুঝি, এসব ইয়ার্কি মারার জিনিস নয়। তাই মধ্যরাতে এখনো প্রায়শঃই, বিশ্বাসের মেঘ থেকে উঠে এসে দাঁড়াই আমার আকাশ-বারান্দায়। শীর্ষ সম্পাদক সমীপে, ভিক্ষুকের মতো প্রার্থনা করতে-করতে ভিজিয়ে দি’ মধ্য রাতের তাঁরাদের।
কবিতা কঠিণতম কলা। আর সুকুমার বৃত্ত মানেতো মগ্নদেরই সমাগম। আমার অনুভূতিতে এটা চুড়ান্ত নির্মাতার পক্ষপাত প্রাপ্ত ধ্যনীদের নিরবিচ্ছিন্ন মগ্নতা। যা হোক, সেই সন্ধ্যায় যারা কবিতাকে প্রাপ্য সম্মান দেন নি, তারা ন্যায় করতে ব্যর্থ হয়েছেন, নিজেদের সাথেই। এ পর্যন্ত যা প্রকাশ করলাম, এর জন্য সে দিন কবিতাকাঙ্খীদের কেউ যদি মনে কষ্ট পেয়ে থাকেন, তাহলে খুশি হবো। কবিতার সঙ্গে সংসার করার জন্যে এটাকে ন্যূনতম বলে মনে করি। শ্রদ্ধাষ্পদেষু রতনদা ক্ষমা করবেন। জানি অনেক সীমাবদ্ধতা আছে, তবু ম্যাজিক লণ্ঠন যে কারও জন্যই উন্মুক্ত; কথাটা হয়তো যুক্তিগ্রাহ্য, কিন্তু কেনো যেন কাব্য এবং হৃদয় গ্রাহ্য হয়ে উঠতে চায় না। মান্যবর কবি রেজাউদ্দিন স্ট্যালিন আপনাকে ধন্যবাদ। আমার রচনা নিয়ে আপনার ধনাত্বক মন্তব্য আমাকে প্রাণিত করেছে। তবে কাব্য সমালোচনায় অনুচিত উদারতা কাম্য নয়। এটা মুদ্রাহীন হলেও পথ পরিক্রমার প্রশ্নে পেশারও অধিক ও অমূল্য। নিঃশব্দ নির্মাণে স্বাচ্ছন্দ বোধ করলেও, সেদিন প্রথমবারের মতো এমত হাল দেখে বাধ্য হয়েছি নিজ রচনা পাঠ করতে। সেই কবিতা সন্ধ্যা নিয়ে আমার ধ্বনি প্রতিক্রিয়াটি নিচে উক্ত হলো:
ধ্বণি প্রতিষ্ঠান
যাদু-লণ্ঠন বাজে ঠন্-ঠন্
বহুদিন পর আজ বর্ষণ
কবিতা আমারই মেয়ে
ওকে একদম একা পেয়ে
বত্রিশ জনে করে বিবসন
কারু কারাবাসে শব্দ বপন!
পুরানো স্বজন মেধাবী রতন
এটা কী ধরন ধ্বণির নিধন?
শব্দ সারথী দ্বীপ-মায়াবতী
ঢেকে রাখে মুখ দূরতর নির্জন।
শুকিয়েছে কেনো কলমের কালি
কবিতার বইয়ে ধুলো আর বালি
ছন্দেরা সব হচ্ছে হনন, পাতা
জুড়ে কেনো অক্ষর-অনশন?
তোমারই সামনে ধ্বনি-মহাজন
পুত্রী আমার গেছে বনবাসে
সুরের শাসনে অসুরেরা আসে
মগ্নতা নেই খ্যাতিরই প্রলোভন!
এটা যে আকাল এটা যে অকাল
দিয়েছে সাক্ষ্য আত্মজা অভাজন।
আসি ঘরে ফিরে, আমি নির্ধন
এ কেমন দিন এ কেমন ক্ষণ?
কারে আর দিবো কিবা বিবরণ
ছিলো পাহারায় ওখানে তখন
শব্দ বিনাশী বিদেশী ও দেশী
মিমাংসিত মাসী, চার থেকে
পাঁচজন। হাহ্, বাজে ঠন্ ..ঠন্ ..
যাদুরও উঠোনে নির্জলা বরিষণ!
ঠন্ .. ঠর্ন-ঠর্ন .. ঠন-ঠন্?
এবারে স্বভাব বিরুদ্ধ হলেও একটি বিশেষ বার্তা দেয়ার উদ্দেশ্যে, বাধ্য হয়েই সেদিন আমার যে রচনা দুটো পাঠ করেছিলাম, নিচে একটির আনন্দ বেদনার জন্মক্ষণসহ পাঠকের কাছে নিবেদন করলাম:
হা-ডু-ডু
হাডুডু দারুণ খেলা, হয়
যদি খেলা তোমার আমার হেলা খেলা সারা বেলা।
জাপ্টে ধরবো তোমাকে পালাতে গেলেই আমি, তুমি
আমার গায়ের জামাকে।
খুব সুখী হলে সব্বাই খেলে, মর্ত্যে
মাটিতে এটাই জাতীয় খেলা
খুঁজি অরণ্য চলো লাবণ্য, থাক
দূরে-দূরে যত পুণ্যের মেলা
সেটাই সঠিক ঘড়ি টিক্ .. টিক্ ..
ভুলে, খেলবো নব্য নিয়মে
দেখবে কেবল দেবদূতগণ,
খেলছি কেমন স্বচ্ছ কাঁচের বোয়মে!
তুমি নেবে দম আমিও বেদম …
হাডুডু মানেই ধস্তাধস্তি
যা বলে বলুক কুজনে
তবুও স্বস্তি এমন খেলায় পায়রার জোড়া মধ্যরেখায়
আমরা জিতেছি দুজনে।
এরপর, এক নির্ঘুম মধ্যরাতে দূর দেশে থাকা আমার পুত্রকে (প্রমিথিউস সিদ্দিকী) নিয়ে এই রচনা। ও এখন পরিণত। তবে আমার দ্ব্যর্থহীন স্বপ্নে ও সব সময়ই ওর শৈশবের চেহারায় দশ্যমান। সেই নগ্ন গাত্র, খোলা পা, ঢিলে ইলাস্টিকে নেমে যাওয়া হাফ প্যান্ট। ঘরে ফিরে এলে কাছে আসা, কোলে বসে কথা শোনা, বলা …। সে’ রাতে রারবারই মনে হচ্ছিলো, আমি আর কোনো দিন আমার ওই ছোট্ট প্রমিথিউসকে দেখবো না। তবে বিশ্বাস, জগৎ রহস্যময়। একদিন ঠিকই দেখা হবে, ফের হবে …; ঠিক সেই চেহারায়।
প্রতীক্ষা ও পুত্র প্রমিথিউস
আমার আকাশ জুড়ে বৃষ্টি নেমেছে জোর
ছোট্ট ছেলেটা গেলো কই? খুঁজি
খুঁজে বেড়াই দশ দিক, সন্ধ্যে থেকে ভোর।
নগ্ন গাত্র পুত্র আমার করে খেলা
বুকে, সারা বেলা সাঁতরায়।
ফাঁকি দিয়ে ইস্কুল ঘুম চোখে
টুং-টাং রিক্সায় সেই ভোর সাতটায়
পাঁজরের খোলে শ্রাবণের মেঘ ভাসে
আহা! মমতার জলরাশি
হবে নাকি দেখা আর কোনো দিন
শিশুটি কি শুধু স্বপ্নেরই অধিবাসী?
নিজের চিহ্ন হলে ভূগোল ভিন্ন
বলো কার ভালো লাগে
একদিন হবে দেখা, ঠিক হবে ভেবে
বারান্দায় বাবা এক সারা রাত জাগে।
অনুষ্ঠান শেষে রতনদা বললেন, চা খেয়ে যাবেন। আমরা চা খেয়ে যে যার মতো ফিরে গেলাম। ঘরে ফিরে দেখি, আমার মুমুর্ষ মেয়ে ‘কবিতা’ উঠে বসেছে শয্যায়। বহুদিন পর সে রাতে, জীবনের ঝিলিক দেখেছি ওর চোখে।