জুলি রহমান, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র
বর্তমানে ফেইসবুকের দুনিয়া। যার যখন যা মনে পড়ে; তাই লিখে ফেইসবুকের পাতা সহ পত্রিকার পাতাও দখল করে রাতারাতি লেখক কবি জুঁ-হুকুম জাহাপনা হয়ে ওঠে দেখছি।
রিয়াদের কবি শাহজান চঞ্চল এক মাল্লার ছৈয়া নৌকার ছবি ফেইসবুকে আপলোড দিয়া দিলো তো আমার রুদ্ধ দ্বারের স্মৃতির সিন্দুক খুলে। যা ছিলো এতোকাল পৌরাণিক চাবির গোছার দখলে। চঞ্চল কি-না এতো যুগ পর সেই চাবি তুলে দিলো আমার চোখের দরোজায়!
তাহলে লিখতেই হয় দু’কলম। স্মৃতির পাতা যেহেতু খুলেই গেলো।
আমি তখন অষ্টম শ্রেণীর বালিকা। ঢাকা পলিটেকনিকের ছাত্রী। অধ্যবসায়ের চেয়ে গ্রামে মাকে কাছে পাবার প্রবণতাই ছিলো বেশি। যে কারণে আমাকে প্রতিনিয়তই নরম কঠিন বকা হজমী বড়ির মতোই হজম করতে হয়েছে। রমজান মাস। স্কুল ছুটি। বাড়ি যাবো মার কাছে। বড় ভাই ঢাকা ইউনিভার্সিটির লেকচারার। ভাইয়েরও ছুটি। বড় ভাই রেগে বলেলন; এই ছুটি হলেই গ্রামে যেতে হবে? পড়ালেখা নাই? তা-ছাড়া আমার প্রচুর কাজ। ঈদের একদিন আগে বাড়ি যাবো। বড় আপা বললেন, না ঈদের আগের রাতে বাড়ি যাবো এ ভারী মজার বিষয়। ঈদের দিন সকালে সবাই দেখবে আমরা হাজির। সবাই আমাদের ঘিরে থাকবে সে কত্তো মজা! বোকা তুই একটা; মন খারাপ করতে নেই।
বড় আপার লম্বা লেকচারের পর দুলাভাই-এই জুলি, তুমি এতো গ্রামে যেতে চাও কেনো? গ্রামে কী আছে ধূলোবালি ছাড়া।
বড় ভাই বললেন, আগামীকাল তোর গিটারের ক্লাস। এক ঘন্টার। দুলাভাই আগুন! দলিল তুমি জুলিকে ক্লাবে নিয়ে যাও। এখন গিটারে মানে কী? এবার তুমি ওকে নষ্ট করে ছাড়বে। একটা স্কলার মেয়ের ভবিষ্যতের বারোটা না বাজালে দেখছি তোমার শান্তি নাই।
এবার বড় ভাই বলছেন, সামাদ! বোনটা আমার তোমার নয়। আমি নিরব শ্রোতা। আমার চিন্তা একটাই মার কাছে যাওয়া। আমি চোখ বন্ধ করলেই দেখি মা আমার মুঠো খোঁপা করে বিরাট আঙিনা দিয়ে হাঁটছেন। মাথার ঘোমটা পড়ে গেলেই আবার ঘোমটা টানছেন। আমার অবস্থা হয়ে দাঁড়ালো বলাইর চরিত্রের- এ বাও মেলে না। ও বাও মেলেনা। মেলে অন্য বাও। সত্যিই আমি জ্বরে ভোগতে থাকি। সেদিকে কারো খেয়াল নেই।

হাঁতির দাঁতে তৈরী ডাইনিং টেবিল। লম্বা। দশটি চেয়ার দুপাশে। দুলাভাই ঘরে ঢুকেই গুণতেন কী বাকী আছে বা কোন খাদ্য মেনুটা জরুরী ছিলো। আবার লাগতো দুজনে মিষ্টি ঝগড়া। এর মধ্যে যোগ দিতেন ইঞ্জিনিয়ার আজিজ ভাই যিনি আমার বড় ভাই ও দুলাভাইয়ের জানের দোস্ত। আমরা সবাই আজানের অপেক্ষায় সেখানে আজিজ ভাই একটা চেয়ার টেনেই সব থালা থেকে এক এক আইটেম তুলেই খাওয়া শুরু। খেতে খেতে বলতেন সবাই যদি অনাহারী থাকবে তবে রন্ধন প্রক্রিয়ার বদনাম হয়ে যাবে। এখনো আপনাদের আজান পড়তে মিনিট পাঁচেক দেরি আছে। সুতরাং যাতে যাতে লবণ ঝাল কম পড়েছে যোগ করতে পারেন। জাহান ভাবী থালাটা কেড়ে নিয়ে বলতেন, এসব চলবে না। যাও প্রফেসরের সংগে বসো গিয়ে সোফায়। আজান পড়বে দ্বীন বেদ্বীন সব এক সংগে খাবো। তা-ও যদি একটু সোওয়াব তোমার কপালে জুটে। স্ত্রীর কথায় আজিজ সাহেব এতিমের মতো খাবার থালাটি রেখে হাত গুটিয়ে বসতেন। নিরস বদনে বড় ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলতেন; হলো কী প্রফেসার সাহেব! বড় আরামে আছেন ভাই। পূর্ণভোগী স্বাধীনতা যাকে বলে। এসব বেল তলায় ভুলেও পা রাখার চিন্তাটিও করবেন না। বড় ভাই ও রস মিশিয়ে বলতেন তা-তো বলবেই বৌ এর ধমকও যে কতো মধুর তা কী আর বোধের কিছু বাকী আছে?
অপেক্ষার পাথর সময় গলিয়ে এলো অবশেষে ঈদের আগের দিন! বাড়ি অর্থাৎ আমার মায়ের কাছে যাবার পালা। কতোদিন আমি আমার মায়ের ভেজা চুলের গন্ধ পাই না। কতোদিন মায়ের আঁচলের গন্ধ পাই না। কতোদিন মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে ঘুমাই না। এ সব ওরা কেউ বুঝে না। আড়ালে শুধুই আমার চোখ গলে। বালিশ ভিজে। মাত্র বারো বছরের একটা বালিকা শিশু মাকে ছাড়া কিভাবে থাকতে পারে? ওরা কখনো এইটার উপলব্ধি দূরে থাক; আমার বুকের তলের শূণ্যতার জায়গাটা একটুও ছুঁয়ে দেখতো না।
তখন আমাদের বাসে উঠতে হতো গুলিস্তান থেকে। গাবতলী থেকে দ্বিতীয় বাস নয়ারহাটে। নেমেই নৌকা অথবা লঞ্চে যাওয়া। বাস থেকে নামার পর লাগতো আবার ঝগড়া। বড় ভাই লঞ্চে যাবেন। দুলাভাই নৌকায়। আমাদের হাত ভর্তি ব্যাগ ব্যাগেজ তল্পী তল্পা। সব নয়ারহাটের লাল মাটির উপর ফেলে রেখে লঞ্চ অথবা নৌকার জন্য প্রহর গুণা। এক মাল্লার নৌকা অবশ্য ব্রীজের নিচেই যাত্রী অপেক্ষায় প্রস্তুত। লঞ্চের জন্য তো অপেক্ষা করতেই হবে। আমি আর আমার বোনের মেয়ে লতা টস ধরতাম লঞ্চের। কারণ তাড়াতাড়ি পৌঁছুতে পারবো। আর নৌকা নিলে তো রাতও হতে পারে। কিন্তু আমার দুলাভাই মার্চেন্ট সামাদ সাহেব শ্বশুড় বাড়ি যাচ্ছেন ঈদ করতে। তাঁর সংগে আছে টেপ রেকর্ডার। আছে চেঞ্জার যার গান ফুল ভলিয়মে দিয়ে নৌকায় চড়ে শ্বশুড় বাড়ি যাবেন; সেখানে বাঁধ সাধেন কি-না ক্যামেস্ট্রির প্রফেসর?
এক পর্যায়ে সামাদ সাহেব বলে বসেন; দলিল তুমি তোমার সাবজেক্টের অবমানা করছো। তোমার মোটেও ক্যামিস্ট্রি পড়া উচিত হয়নি। তোমার ম্যাথ পড়াটা জরুরী ছিলো। তোমাকে না খটখইট্টা অংকেই মানায়। র-সা-য়-নে না ! না মানে না। বলেই দুলাভাই এক মাল্লাইয়্যা ছইয়া নৌকার ভেতর মাল সামাল তুলতে থাকে।
আমি আর লতা তখন দারুণ বিপাকে। আমি যেমন আমার মায়ের জন্য পাগল। তেমনি লতা তাঁর নানু অর্থাৎ আমার মায়ের জন্য পাগল।
ছুটলো নৌকা। উঠলো বাদাম। বইলো হাওয়া। টানলো গুন। বেজে উঠে আমার দুলাভাইয়ের চেঞ্জার।
আমরা যখন গ্রামের দিকে যাই তখন উজানের স্রোতে ঠেলে ঠেলে। আর যখন ঢাকা আসি তখন ভাটার টান। আমাদের নৌকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে লঞ্চ
শাহজালাল। তাঁর ঢেউ এসে লাগলো ছোট্ট এক মাল্লার নৌকার শরীরে। দূরে গুন টানছে আরেক মাঝি। তাঁর কাঁধে গুন। বাঁকা হয়ে সে কখনো নদীর কিনার কখনো পানির ভেতর হাঁটছে। নলখাগড়ার ঝুঁপের ভেতর কখনো সে লুকিয়ে যেতো। আমি বা আমার চোখ অপেক্ষায় থাকে কতক্ষণে লোকটি বের হবে। কাশের ফুলের সাথে কখনো মাখামাখি করে পাখির ছিন্ন পালক গুনে পেঁচিয়ে বের হতো। আবার ধাউসের ভেতর লুকিয়ে যেতো তাঁর দিগম্বর খয়েরী পিঠ। লুঙ্গির কোচা হাঁটু অবধি। মাঝে মাঝে আমার ভেতর চিৎকার দিয়ে উঠতো। আহা কী কষ্ট লোকটির। আর আমরা দিব্বি আরামে বসে আছি।
চেঞ্জারে তখন গান বাজছে-আমি মিস
ক্যালকাটা নাইনটিন সেভেনটি সিক্স।
আর আমার বুকের তলে ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে সুর-
নায়ের মাস্তুলে কান্দিয়া কয় হায়রে
কী করো মাঝিয়া ভাই রে?
এই যে হালের টান মোর না সহে পরাণে রে
তুমি বাইয়া যাইয়া কোন ঘাটে লাগাইবা রে সোনার নাও?
মনে যখন এই সুর চোখে তখন ঢেউয়ের নাচন। একটা মিষ্টি দুলুনি। দুই পাড় থেকে ফণা তোলা ঢেউ এসে নৌকার পাড়ে লেগে সরে যাচ্ছে। জলের তরঙ্গে সে কি আদর সোহগ। জলের সাথে জলের সঙ্গম সূধা কী সঞ্জিবীনি সূধা রস। প্রাণে আমার আকুলি বিকুলি করে বেড়াতো। কী নাই? কিসের তাড়না? কেনো এমন অনুভব? কাউকে এর অংশীদার তো করতে পারি না। কার কাছে বলবো আমার এই ভালো লাগার কথা। আমার অনুভূতির সাত রঙে রাঙানো হৃদয়ের আকুতি?
বড় আপার ডাকে সম্বিত ফিরে পাই। সবাই এফতাঁর করো। সময় হয়ে গ্যাছে। দুলাভাইকে একটা ধমক আজান পড়ছে তুমি গান বন্ধ করবে? দেরী হবে জেনেই আপা প্রতিবারই বিরিয়ানী নয় পরোটা মাংস নিয়ে আসতেন সংগে করে। আমার কোনো ক্ষিধে নেই। বুভুক্ষ আমি প্রকৃতির প্রেমে। যা এ যাবৎ ইটের কঠিন দেয়ালে গুমরে মরেছে। আজ এ জল আমার। নদী আমার।মাটি আমার। বৃক্ষ তরুলতা সব সব সব আমার। স্কুলেও আমার ভালো লাগে না সহপাঠীদের। প্রাণ খোলে কথা বলা যায় না। কেমন মেকী মেকী ভাব সবার মধ্যে।
বাড়ির কাছাকাছি আসতেই লতা কান্না জুড়ে দিতো। নৌকা থামানোর জন্য। আট ঘন্টা নৌকায় বসে থাকার মতো মেয়ে যেমন লতা নয় তেমনি আমিও। নৌকা ভিড়তেই দুজনে ভোঁ-দৌড়। বাড়ির ওঠোনে দাঁড়াতেই কী মধুর গন্ধ। কাজের বোয়ারা ছুটে আসতো লতাকে কোলে নিতে। লতা ঝাঁপিয়ে পড়তো আমার মায়ের কোলে। আমার নাসারন্ধ্র ততক্ষণে দখল করে নিয়েছে খই নাড়ু মোয়া মুড়ির গুরের মিষ্টি গন্ধ। মিঠুরীর খেজুরের গুড়ের মৌ মৌ সুগন্ধ বাড়ির আঙিনা দখল করে করে বাহির বাটিতে হামাগুরি খেতে লাগলো। পাড়ার বাচ্চারা যাদের ছেড়ে আমি শহুরে হয়েছি তাঁরা এসে আমাকে জড়িয়ে ধরছে। আমার মা আঁচলে চোখ মুছছেন। আর কেঁদে কেঁদে বলছেন-গ্রামে যদি একটা হাই স্কুল থাকতো আমি কী ওকে ছাড়তাম। যে ভালো সে গ্রামেও ভালো করে। দুলু তো গ্রামে থেকেই ভালো করেছে। জুলিও করতো। আমার মায়ের কান্না আমাকে চরমভাবে গলাতে থাকে। আমি মা একচোট কেঁদে নিলাম। আমাদের কান্না দেখে লতা মাটিতে গড়িয়ে কান্না।
আজই শেষ ইফতার। রাত পেরোলেই ঈদ। বড় ভাই দুলাভাইয়ের আবার খুনসুটি। সামাদ তুমি না একটা কুফা। দুলাভাই খুব চটে যেতেন কুফা মানে?
বড়ো ভাই হ্যা কুফা। তোমার জন্য ঈদের চাঁদটাও দেখা হলো না।
উঠোনে মাদুর পাতা হলো। হ্যাজাক বাতি ঘিরে বিভিন্ন রঙের পোকা ভোঁ-ভোঁ করতে লাগলো। আর মা একটা একটা করে খাদ্য মেনু সাজাতে লাগলেন। লাউয়ের মিঠুরী, খই, মোয়া, মুড়ি, ঢ্যাপের নাড়ু, নারকেলের নাড়ু’ পায়েস, ছোলা ভাজি, পিয়াজু, পিয়াজ রসুনের দোলমা, সজনে ডাটার বেলের চর্রচরি, খেতে খেতে, গল্পে গল্পে, গানে গানে। আমাদের কথার শেষেই উঠোন ভরে যেতো মানুষে।
কারণ দুলাভাইয়ের চেইঞ্জার আর টেপ রেকর্ডারে গান শুনবে লোকজন। আমাদের বাংলো ঘরে লোকের তখন গমগম।