রাজীব মজুমদার, লস এঞ্জেল্স, যুক্তরাষ্ট্র
প্রেম; দুটি বর্ণের মোহনীয় একটি শব্দ। আদি পিতা আদম যেদিন গোধূলী বেলার ছায়া ঢাকা বনভূমিতে প্রেয়সী ঈভের ঠোঁটে এঁকে দিয়েছিলেন প্রণয়ের প্রথম চুম্বন সেদিন থেকেই জন্ম ভালোবাসা নামক অনিন্দ্য সুন্দর এক অনুভূতির। সেদিন তাঁদের হৃদয়তন্ত্রীতে জেগেছিল প্রেমের শিহরণ! আর সেই শিহরণে আন্দোলিত হয়েছিল সারা বনভূমি। খুশির প্লাবনে গেয়ে উঠেছিল পাখিরা। তারপরে সভ্যতার হাত ধরে মানুষ একদিন অরণ্য ছেড়ে আসে জনপদে। বাকল ছেড়ে পরিধান করে সুন্দর পোষাক। কিন্তু বুকের গভীরে সেই আরণ্যক শিহরণ এখনও বয়ে চলেছে ফল্গুধারার মতই। প্রেমের মোহনশর শুধু মানব-মানবীকে বিদ্ধ করে না, দেবদেবীরাও ঘায়েল হন প্রেমের অমোঘ শরে। পুরান খটুজলেই আমাদের চোখে পড়ে দেবদেবীদের বিচিত্র প্রেমের কাহিনী। দেবতারা শুধু দেবীদের সংগেই প্রেমে সীমাবদ্ধ থাকেননি। অনেক অপরূপা মর্ত্যমানবীদের সৌন্দর্য্য দেখেও বিভ্রান্ত হয়েছেন স্বর্গের দেবতারা। মর্ত্য মানবীর প্রেমের যাদুতে ভূলুন্ঠিত হয়েছে দেবতাদের অভ্রভেদী অহংকার। দেবদেবীদের প্রেমালেখ্যের মধ্যে গ্রীক দেব দেবীদের প্রেমলীলাই নানান বৈচিত্রে ভরপুর। আর রোমাঞ্চকর সেসব কাহিনী নিয়ে এবারের এই আয়োজন-
প্রেমের দেবী ভেনাস– আফ্রোদিতি বা ভেনাস ছিলেন প্রেমের দেবী। তিনি দেবরাজ জিয়াসের কন্যা। দেবীদের মধ্যে তিনি ছিলেন স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের অধিকারিণী এবং অন্যন্য সৌন্দর্য্যরে মূর্ত প্রতীক। কপোত বা বনহংসী বাহিত সুশোভিত রথে চড়ে তিনি বিহার করতেন। তাকে দেখামাত্র মানুষ বা দেবতাদের মধ্যে প্রেমভাব জেগে উঠত। ভেনাস একদিন মর্ত্য মানব এডোনিসকে দেখে প্রেমাতিশষ্যে উন্মাদিনী হয়ে উঠেন। প্রেমাস্পদকে নিয়ে তিনি সর্বদা বনে বনে ঘুরে বেড়াতেন। একদিন আফ্রোদিতি এডোনিসকে আলিঙ্গণ করে গভীর বনে বসেছিলেন। এমন সময় একটি বন্য শুকর গোলমাল শুরু করল। এডোনিস শুকরটিকে হত্যা করতে গিয়ে ভাগ্যদোষে নিজেই নিহত হলেন। বুকভাঙা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন ভেনাস। এডোনিসের প্রতি ভেনাসের ভালোবাসার তীব্রতা দেখে বিচলিত হয়ে পড়লেন মৃত্যুপুরীর দেবতারা। এদিকে এডোনিসকে ততক্ষণে ভালোবেসে ফেলেন মৃত্যুপুরীর রাণী পার্সিফোন। এডোনিসকে ঘিরে তাঁর মনেও জেগে উঠল ব্যাকুল তৃষ্ণা। তিনি কিছুতেই এডোনিসকে ভেনাসের কাছে ফিরিয়ে দিতে রাজী হলেন না। পরে দেবরাজ জিয়াসের মধ্যস্থতায় স্থির হলো এডোনিস বছরের চারমাস থাকবেন মৃত্যুপরীতে রাণী পার্সিফোনের কাছে, চার মাস প্রেমের দেবী ভেনাসের সাথে এবং বাকী চার মাস তিনি নিজ ইচ্ছামত ঘুরে বেড়াবেন।

কিউপিড-সাইকি প্রেমোপখ্যান– কিউপিড ছিলেন প্রেমের দেবী ভেনাসের পুত্র। ভেনাস তাকে দিয়েছিলেন শান্ত, ভদ্র এবং নিষ্কলুষ মায়াবী চেহারা ধরে রাখার কৌশল। কিউপিড একদিন মুগ্ধ হলেন সাইকি নামের এক মর্ত্য মানবীর রূপে। সাইকিরা ছিল তিন বোন। সবাই ছিল অপরূপা সুন্দরী। তবে এর মধ্যে সাইকির রূপের জৌলুস ছিল সবচেয়ে বেশী। তিনি ছিলেন ভেনাসের তুল্য সুন্দরী। কিউপিড মাকে না জানিয়ে বিয়ে করল সাইকিকে। এতে ভীষণ ক্ষুব্ধ হলেন দেবী আফ্রোদিতি। তিনি নানাভাবে সাইকিকে শাস্তি দিতে লাগলেন, স্ত্রীর দুর্দশায় মর্মাহত কিউপিড অবশেষে দেবরাজ জিয়াসের শরণাপন্ন হলেন। পরে জিয়াসের মধ্যস্থতায় অক্ষয় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন কিউপিড ও সাইকি।
অর্ফিয়াস ও ইউরিডাইস– অর্ফিয়াস ও ইউরিডাইসের কাহিনী যেমনি মর্মস্পর্শ তেমনি সর্বজন বিদিত। ইউরিডাইস নামে সুন্দরী এক নৃত্যশিল্পীকে ভালোবাসতেন অর্ফিয়াস। একদিন এক বিষধর সাপের ছোবলে মারা গেলেন ইউরিডাইস। ইউরিডাইসের মৃত্যুতে সকরুণ শোকে মুহ্যমান হয়ে গেলেন অর্ফিয়াস। তার শোকের বিলাপ একসময় সংগীতের বাণী হয়ে মিশে গেল সুরের মুর্চ্ছনায়। সেই সুর জড় পদার্থেরও প্রাণ সঞ্চার করত। সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনত তার গান। সহানুভূতি দেখাত তার সুখে দুঃখে। অর্ফিয়াসের সেই বাঁশরী করুণ সুরে নরকের রাজা হেডস এবং রাণী পার্সিফোনের অন্তর বিগলিত হলো। অর্ফিয়াসকে তাঁরা প্রতিশ্রুতি দিলেন ইউরিডাইসকে তাঁরা মর্ত্যে ফেরত পাঠাবেন, কিন্তু শর্ত হলো নরকের দ্বার পার না হওয়া পর্যন্ত অর্ফিয়াস পেছনে তাকাতে পারবে না। কিন্তু নরকের দ্বারে এসে অর্ফিয়াস আর ধৈর্য্য ধরতে পারলেন না, ইউরিডাইসকে দেখার জন্য তাকালেন পেছনের দিকে। সাথে সাথে ছায়ার মত হয়ে মিলিয়ে গেল ইউরিডাইস। কেবল একটি দীর্ঘশ্বাস শুনতে পেলেন তিনি। বেদনায় ভেঙে পড়লেন অর্ফিয়াস। নিজের ভুল এবং বিশ্বাসহীনতার জন্য প্রিয় দয়িতাকে হারিয়ে জলের প্লাবন নামল তার চোখে।

স্বর্গদেবী ইয়স– স্বর্গদেবী ইয়স ছিলেন অপূর্ব সুন্দরী। গোলাপ কলির মত ছিল তার হাতের আঙুল। সর্বদা লাল পোষাক পরে এবং লাম্পাস ও পে¬থন নামক দুই অশ্ববাহিত রথে চড়ে তিনি পূর্ব ও পশ্চিম আকাশে পরিক্রম করে বেড়াতেন। দেবতা এরেসের সংগে তার অবৈধ সম্পর্ক ছিল। দেবী আফ্রোদিতি একদিন ইয়সকে স্বামী এরেসের শয্যায় দেখে ভ্রষ্টা বলে অপবাদ দেন। অভিশাপ দেন- চিরকাল মর্ত্য মানবদের প্রতি ইয়সের অবৈধ, অতৃপ্ত সম্পর্ক থাকবে। এরপর থেকেই কোন মানবকে দেখলে অন্ধ আসক্তিতে উন্মত্ত হয়ে উঠতেন ইয়স। বহু মর্ত্য মানবের শয্যা সংগী হয়েছেন এই দেবী।
দেবরাজ জিয়াস– স্বর্গের রাজা বা প্রধান দেবতা হলেন জিয়াস। তাঁর ছিল ৭ রাণী। হেরা ছিলেন তাঁর প্রধান মহিয়সী। বাকী ছ’জন রাণী হলেন- মেথিস, থেমিস, ইউরিলোস, দিমেতার, মিনোসাইন ও লিটো। সুযোগ পেলেই এ সাত রাণীকে ফাঁকি দিয়ে গোপন প্রণয় লীলায় মেতে উঠতেন দেবরাজ জিয়াস। প্রেমের দুর্নিবার আকর্ষণে তিনি নানা রূপ ধারণ করতেন। কখনও হাঁস, কখনো বুনো ষাঁড় কখনও বা স্বর্ণবৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়তেন মর্ত্য মানবীদের উপর।

দেনা-জিয়াসের প্রেম কাহিনী– রাজা এক্রিসিয়াসের অনূঢ়া কন্যা দেনার রূপ সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ হয়ে তার সাথে মিলিত হবার বাসনা জাগে দেবরাজ জিয়াসের। দেনা ছিলেন কারাগারে বন্দিনী। কারণ রাজা এক্রিসিয়াস জানতেন যে, দেনার গর্ভজাত সন্তানের হাতেই তিনি নিহত হবেন। তাই তিনি স্বীয় কন্যা দেনাকে অন্ধকার কারাগারে বন্দী করে রাখেন। কারাগারে দেনাকে দেখে দেবরাজ জিয়াস তার উপর স্বর্ণবৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়েন। এর ফলে দেনার গর্ভে জন্ম নেয় এক পুত্র সন্তান। তার নাম পার্সিয়াস। দেনাকে খুবই ভালোবাসতেন জিয়াস। তাই নানা দুর্ঘটনার হাত থেকে দেনার গর্ভজাত সন্তান পার্সিয়াসকে বাঁচিয়ে রাখেন তিনি।

জিয়াস-এ্যালসিমিনের প্রেম ও হারকিউলিসের জন্ম– টাইরিনসের রাণী এ্যালসিমিনের রূপে মুগ্ধ হলেন জিয়াস, কৌশলে জিয়াস অ্যালসিমিনের স্বামীর রূপ ধরে অন্দরমহলে গিয়ে এ্যালসিমিনের সাথে মিলিত হন। এর ফলে রাণী গর্ভবতী হয়ে পড়েন। রাণীর গর্ভে জন্ম নিল এক সস্তান- তার নাম হারকিউলিস। শৌর্য-বীর্যে হারকিউলিস ছিলেন মর্ত্যমানবদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। এদিকে প্রধান রাণী হেরা এই ঘটনা জানতে পেরে নানা কৌশলে হারকিউলিসকে মেরে ফেলার চক্রান্ত করে; কিন্তু জিয়াস অসীম ক্ষমতা বলে প্রতিবারই এসব চক্রান্ত থেকে মুক্ত করেন প্রিয় পুত্র হারকিউলিসকে।
বনদেবী আর্তেমিস– বনদেবী আর্তেমিস ভালোবাসতেন মর্ত্য মানব, শিকারী ওরিয়নকে। কিন্তু সামান্য একজন মর্ত্য মানবের সাথে প্রেম করবে আর্তেমিস, এটা সহ্য হলো না দেবতা এ্যাপোলোর। তাই তিনি চক্রান্ত করতে লাগলেন কিভাবে ওরিয়নকে হত্যা করা যায়। একদিন ওরিয়ন সমুদ্রে সাঁতার কাটছিলেন। তখন দেবতা এ্যাপোলো আর্তেমিসকে ডেকে বললেন, ঐ যে লোকটা সমুদ্রে সাঁতার কাটছে সে মন্দিরের পুজারিনীকে ধর্ষণ করেছে, তুমি ওকে তীর বিদ্ধ করো। আর্তেমিস অব্যর্থ হাতে তীর ছুড়লেন। নিহত হলেন ওরিয়ন। পরে, নিজের ভুল বুঝতে পারেন তিনি। শোকে বিহবল হলেন বনদেবী আর্তেমিস।