প্রবাস মেলা ডেস্ক: নিউইয়র্কের আপস্টেট রকল্যান্ড কাউন্টির চেস্টনাট রিজে বেঙ্গলি ইন্টারন্যাশনাল লিটারারী সোসাইটির উদ্যোগে প্রথমবারের মত রকল্যান্ড রিট্রিট অ্যান্ড বুক ফেয়ার ২০২৩ অনুষ্ঠিত হয়েছে। দুই দিন ব্যাপী এ মেলার উদ্বোধন করা হয়েছে ২৯ জুলাই ২০২৩, শনিবার বেলা ৩টায়। এ মেলাকে ঘিরে লেখক-প্রকাশক-কবি-সাহিত্যিকদের পদভারে মুখরিত ছিল সবুজে ঘেরা মনোরম পরিবেশের চেস্টনাট রিজ। এবারের মেলার স্লোগান ছিলো ‘বনের মাঝে লেখার খোঁজে’।
২৯ জুলাই ২০২৩ ফিতা কেটে মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আগে সকালে আয়োজন ছিল বনের মাঝে হাঁটা, ইয়োগা এবং সাঁতারকাঁটা। আবার ক্যাম্পিংয়ের ব্যবস্থাও ছিলো। সুবিশাল তাবুর নিচে সুসজ্জিত মিলনায়তনে বিপুল সংখ্যক লোকের উপস্থিতিতে উদ্বোধনী অনুষঠানে বাংলা ভাষা ভাষিদের সাথে তাল মিলিয়ে আমেরিকান ইংরেজী ভাষার সঙ্গীত শিল্পীরা বাংলাদেশ ও আমেরিকার জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে দর্শকদের দারুণভাবে মুগ্ধ করেন। অনুষ্ঠানের আয়োজক বেঙ্গলি ইন্টারন্যাশনাল লিটারেরি সোসাইটি’র প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বিজ্ঞানী ও ছড়াকার ড. ধনঞ্জয় সাহা এবং ইভেন্ট কমিটির আহবায়ক বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব কানাডা’র সভাপতি কবি, আবৃত্তিশিল্পী ও সংগঠক মৌ মধুবন্তীর স্বাগত বক্তব্যের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা করা হয়। অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব কানাডা’র সদস্য সচিব, শিক্ষক ও লেখক মানসী সাহা। পরে ফিতা কেটে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন স্থানীয় প্রতিবন্ধী স্কুল অট্রো স্পীচট স্কুল এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক জ্যানেট রড্রিগেজ। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বাংলাদেশের জাতিসত্বার কবি, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মুহম্মদ নূরুল হুদা এবং বিশেষ অতিথি ভারত থেকে সমাজ সচেতন নারীবাদী কবি সুবোধ সরকার ভার্চুয়ালী যুক্ত হয়েছিলেন। বাংলাদেশ থেকে বিশিষ্ট কবি নজমুল হেলাল সাফল্য কামনা করে লিখিত বার্তা পাঠিয়েছেন। জুমে রাইটিং ফ্রম দি রিডার্স পার্সপ্যাক্টিভের উপর বক্তব্য রেখেছিলেন নর্থ ক্যারোলাইনা থেকে প্রফেসর ড. জর্জ গোপেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন সাউথ ক্যারোলাইনা থেকে আগত নিউরোসাইকোলজিস্ট, লেখক ও পাবলিশার ড. হাওয়ার্ড রাংকিন। তার আলোচনার বিষয় ছিল How not to think and write effectively। এর পর মেলায় আগত সাহিত্যিক ও কবিদের উত্তরীয় পরিয়ে স্বাগত জানানো হয়।

দ্বিতীয় দিনের অনুষ্ঠানটি ভরপুর ছিল অনবদ্য চিন্তাধারার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। সকালে আবারো অর্গানিক ব্র্যাকফাস্ট দিয়ে দিন শুরু হয় দিনব্যাপি কর্মসূচী। থ্রী ফোল্ড ফাউন্ডেশনের এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর এরিক সিলবার এবং অনুষ্ঠানের আয়োজক ড. ধনঞ্জয় সাহা ও আহবায়ক মৌ মধুবন্তী তাদের স্বাগত বক্তব্যের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। বহ্নিশিখা গ্রুপের ক্ষুদে শিল্পীরাজেরা বাংলাদেশ ও আমেরিকার জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে শোনায়। ড. অনিমিতা সাহা বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত ও অন্যান্য কিছু বাংলা গানের অনুবাদ করেছেন ইংরেজী ভাষার দর্শকদের জন্য। অতিথিদের থাকার সুব্যবস্থা ছিল সভাস্থল সংলগ্ন হোল্ডিং হাউজে। থাকা খাওয়া ছিল রেজিস্ট্রেশন ফিয়ের মধ্যেই। প্রোগ্রামের সুবিধার্থে ইভেন্ট ব্রাইটে রেজিষ্ট্রেশনের ব্যবস্থা ছিল। তার থেকে ৫০ ডলারের কুপন দেয়া হয় রেজিষ্টার্ড অংশগ্রহণকারীদেরকে বই ও অটিস্টিক নারী-পুরুষের তৈরি ক্রেফট কেনার জন্য। নিউইয়র্কে এই প্রথম রেজিস্ট্রেশন ফি দিয়ে সাহিত্যানুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়ে একটা দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে বেঙ্গলি ইন্টারন্যাশনাল লিটারারী সোসাইটি।
একুশ বছরের উর্ধ্বে অটিস্টিক যুবক-যুবতীর জন্য শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠান এন্ডেভার ২১+ এর অটিস্টিক শিক্ষার্থীদের লেখা কবিতা পাঠের আসর ছিলো সংবেদনশীল। এতে অংশ নেন আসাফ সুকফ, আনান সাহা, দিয়ান লাফরজিয়া এবং ভিভেক মুখার্জি। যার নেতৃত্ব দেন গ্যালিলি ডেমাও। মালবেরি স্থানীয় ব্যান্ডের সদস্য গ্যালিলি, নাটালি, জেনি, লেলিয়ানা ও জন এর পরিবেশনায় ইংরেজী গান ছিলো বেশ মনোমুগ্ধকর। স্প্যানিশ কবি ড্যানিয়েলার ইংরেজী ও স্প্যানিশ ভাষায় কবিতা পাঠ শুনে সবাই মুগ্ধ হন। গৌতম সাহার রচিত এবং তার কণ্ঠে বাংলা গানের সাথে ইংরেজী ও স্প্যানিশ গানের মেলডি ছিলো অনবদ্য। ইউরিথিমি স্কুলের শিক্ষক এলসা মেককউলি নিপুণভাবে দেখিয়েছেন বাংলা এবং ইংরেজি শব্দ এবং বাক্যের দেহ সঞ্চালনা। মোহাম্মাদ নাসির শিকদার আলোকপাত করেন কি করে ওবেসিটিমুক্ত হয়ে সুস্থভাবে মনোযোগ দিয়ে সাহিত্য চর্চা করা যায়। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন রিনা সাহা এবং অধ্যাপিকা হুসনে আরা। মৌ মধুবন্তীর সঞ্চালনায় নির্দিষ্ট শব্দের ব্যবহারে মোট ৭ জন কবি বনের মধ্যে বসে কবিতা লিখেছেন। এতে একমাত্র বিজয়ী হিসেবে পুরস্কার জিতে নেন বাংলাদেশ থেকে আগত সাংবাদিক, কবি শহিদ রাজু। জলবায়ু সচেতন সংগঠক, লেখক ও পারফর্মারদের হাতে এওয়ার্ড, সার্টিফিকেট এর সাথে তুলে দিয়েছিলেন ড. ধনঞ্জয় সাহার নিজ হাতে লাগানো চোখ জুড়ানো গাছের চারা।

দ্বিতীয় দিনেও টি ব্রেকে ও লাঞ্চে থ্রি ফোল্ড ক্যাফের কুক জেসির হাতের আমেরিকান খাবার ছিল অত্যন্ত সুস্বাদু। এর সাথে উত্তম সাহা যোগ করেন বাংলাদেশী চিকেন বিরিয়ানী ও সেদ্ধ ডিম। অভাবনীয় এক ফিউশান লাঞ্চে সবাই পরিতৃপ্তি নিয়ে আপ্যায়িত হন। এই খাবারের দর্শন ছিল স্বামী বিবেকানন্দের দর্শনের সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ। যার উপরে বক্তব্য রেখেছিলেন স্বামী সুমনাসানন্দা মহারাজ। এই পর্ব পরিচালনা করেন বিবেকানন্দ স্টাডি এন্ড ফিলান্থ্রোপিক সোসাইটির কর্ণধার প্রকাশ চক্রবর্তী। দর্শনটি ছিল বডি, মাইন্ড এন্ড স্পিরিট – বিষয়টি সম্পৃক্ত ছিল দার্শনিক ও কবি রুডলফস্টেইনারের দর্শনের সাথে। অনুষ্ঠানে দুইদিনই সঙ্গীত পরিবেশন করেছেন বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী সামিনা খন্দকার ও মানসি সাহা। স্বরচিত কবিতা ও গল্প পাঠে অংশ নেন কবি মৌ মধুবন্তী, সবিতা দাস সুতার, মোহাম্মাদ মিজানুর রহমান, বেনজির শিকদার, বিমল সরকার, শহীদ রাজু, বিদিয়া মুরলীধর, কুলসুম আক্তার সুমী, বনানী সিনহা, গ্যালিলি ডেমাইও, মুনমুন সাহা, নবনীতা দিমিত্রা, হাওয়ার্ড রাংকিন, উইলিয়াম টেইলার প্রমুখ।
সমাপনী অনুষ্ঠানে বাংলা গানের স্কুল বহ্নিশিখা থেকে নতুন প্রজন্মের শিশু, কিশোররা শিল্পী সবিতা দাস সুতারের তত্ত্বাবধানে তাদের সুললিত কণ্ঠে গান, আবৃত্তি পরিবেশন করে। দুইদিনই বইয়ের স্টল বিশেষভাবে এক ঘন্টা করে ওপেন রাখা হয়েছিল ক্রেতাদের জন্য। মোট ১৭ জন কবি-লেখকের বই ছিল স্টলগুলোতে। কালের চিঠি প্রকাশনার স্টলও ছিল। এই বইমেলায় দু’শর অধিক বই বিক্রি হয়েছে বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা। কালের চিঠির প্রকাশক বিমল সরকার পরিচয় করিয়ে দেন তার গ্লোবাল ভিলেজ অয়েলফেয়ার গ্রুপকে। রবিবার অনুষ্ঠান শেষে আরো একধাপ অনুষ্ঠান হয় ড. ধনঞ্জয় সাহার বাড়িতে বারবিকিউর মাধ্যমে। এই পর্বে কবি-সাহিত্যিক ছাড়াও সপরিবারে উপস্থিত ছিলেন নিউইয়র্ক স্টেট আওয়ামীলীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মুজিবর রহমান মিয়া। এই বারবিকিউর সমস্ত আয়োজন করেছিলেন উত্তম সাহা ও মুনমুন সাহা। নবীন এবং প্রবীণ লেখকদের লেখায় উৎসাহ যোগানো, তাদের লেখা প্রকাশ করার মাধ্যমে সারা বিশ্বে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে ছড়িয়ে দেয়া এই প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা। বাঙালি সংস্কৃতির সাথে নতুন প্রজন্মকে জড়িয়ে রাখার ক্ষেত্রে এই মেলার গুরুত্ব অপরিসীম বলেও অনেকে মন্তব্য করেন। ২৩০ একর জমির উপর গড়ে ওঠা চেস্টনাট রিজের এই কমিউনিটির লোকেদের আন্তরিক সহযোগিতাও ছিল ব্যতিক্রমী। নানা ভাষাভাষীর বিপুল সংখ্যক মানুষ অংশ নেন দু’দিনের এ অনুষ্ঠানমালায়।
প্রবাস নতুন প্রজন্মের মাঝে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ফল্গুধারা প্রবাহিত করতে সকলে একযোগে কাজের সংকল্প রেখে এবং প্রতি বছর এধরনের বই মেলা আয়োজনে প্রত্যাশা ব্যক্ত করে দু’দিনব্যাপী সফল সাহিত্যানুষ্ঠান ও বইমেলা শেষ হয় ৩০ জুলাই ২০২৩।