জন্ম, বেড়ে ওঠা ও পড়ালেখা এদেশে। তবে বৈবাহিক সূত্রে একসময় বিশ্বের উন্নত দেশে পাড়ি জমান। সেখানেই পরিবার নিয়ে আবাস গড়ে তোলেন। ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখা দেখাশোনার পাশাপাশি বাংলার কৃষ্টি-কালচার চর্চা এবং বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে লেখালেখি কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। বলছি সংস্কৃতিমনা ব্যক্তিত্ব সেলিনা আক্তার জোসনার কথা। দীর্ঘদিন ইতালির মিলানোতে থাকার পর বছর কয়েক আগে পরিবারসহ যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান তিনি। প্রবাসে দেশের কৃষ্টি কালচার তুলে ধরার জন্য অবিরাম কাজ করে যাচ্ছেন সেলিনা আক্তার। সম্প্রতি তিনি প্রবাসীদের প্রিয় পত্রিকা পাক্ষিক প্রবাস মেলা অফিস পরিদর্শনে এসেছিলেন। বলেছেন দেশ ও প্রবাস জীবন নিয়ে নানা স্মৃতির কথা। সেসবের চুম্বক অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো। আলাপচারিতায় লেখা তৈরি করেছেন মো: মোস্তফা কামাল মিন্টু।
প্রায় দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে প্রবাসে আছেন সেলিনা আক্তার জোসনা। দেশপ্রেমকে সঙ্গী করে প্রবাসে নতুন প্রজন্ম ও বিদেশিদের কাছে বাংলার কৃষ্টি-কালচার তুলে ধরা এবং বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। স্বামীর সাথে নিজেদের ব্যবসা বাণিজ্য দেখার পাশাপাশি লেখালেখি এবং প্রবাসের সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।

চট্টগ্রামের রাউজানের মেয়ে সেলিনা আক্তারের প্রাথমিক পড়াশোনা বাগওয়ান প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। দেওয়ানপুর এস.কে. সেন উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি শেষ করেন। পরে নাসিরাবাদ সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি ও গ্র্যাজুয়েশন করেন তিনি। বিবাহসূত্রে ১৯৯৯ সালে ইতালির মিলানোতে পাড়ি জমান সেলিনা।
প্রবাসে নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা ভাষাচর্চাকে উৎসাহিত করার জন্য সেলিনা আক্তার ২০১৪ সালে মিলানোতে বাংলা স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। স্কুলটি প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘একটা বাংলা স্কুল প্রতিষ্ঠা করা ছিল আমার স্বপ্ন। প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা যাতে ইতালিয়ান ভাষার সাথে সাথে বাংলা ভাষাও শিখতে পারে সেই জন্য মূলত এই স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করা।’ স্কুলটি ইতালিয়ান সরকার অনুমোদিত বলে তিনি জানান।
সামাজিক কাজের পাশাপাশি সেলিনা আক্তার একজন পেশাদার সাংবাদিক। ২০০৬ সাল থেকে রোমের ‘স্বদেশ বিদেশ’ পত্রিকার মিলানোর ব্যুরো প্রধান হিসেবে কর্মরত আছেন। পত্রিকাটি প্রথমে সাপ্তাহিক থাকলেও সময়ের পরিক্রমায় এটি এখন মাসিক হিসেবে চালু রয়েছে। অনলাইন ভিত্তিক ইউরো বিডি নিউজ এর সম্পাদক সেলিনা আক্তার জোসনা।

২০১৬ সালে এশিয়ান টিভি’র ইতালি ব্যুরো প্রধান হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরে লন্ডন পাড়ি জমালে এটিএন বাংলার ইউকে ইউরোপ নিউজ করসপন্ডেন্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন। এছাড়া তিনি রাজনীতি, সামাজিক, বিভিন্ন দিবসকেন্দ্রিক, বঙ্গবন্ধু প্রভৃতি বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেন। মিলান ভিত্তিক সাংস্কৃতিক সংগঠন শিকড় এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সেলিনা আক্তার। এটি ২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন দিবসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো এই সংগঠনের মাধ্যমে অয়োজন হয়ে থাকে।

লন্ডনে পাড়ি: ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার কথা চিন্তা করে ২০১৭ সালের দিকে পরিবার নিয়ে লন্ডনে চলে যান সেলিনা আক্তার। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘লন্ডন ইতালির চেয়ে বেশি ‘মাল্টি কালচারাল’। ইতালিতে আমরা প্রথম প্রজন্ম বাংলাদেশি হিসেবে ছিলাম। আর লন্ডনে এখন বাংলাদেশিদের চতুর্থ প্রজন্ম চলছে।’ বর্তমানে পরিবার নিয়ে ইস্ট লন্ডনের ক্যানিং টাউনে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন। যদিও ইতালিতে এখনো ব্যবসা-বাণিজ্য রয়েছে। তার স্বামী আব্দুল খালেক রিন্টু সেগুলো দেখভাল করেন।

প্রবাস জীবন: বিবাহ সূত্রে প্রবাসী হলেও প্রবাস জীবন এখনো আপন হতে পারেনি বলে সেলিনা আক্তার জানান। তিনি বলেন, ‘সত্যি বলতে আমি কখনো প্রবাসে যেতে চাইনি। বাংলাদেশই আমার ভালো লাগে। এতো বছর প্রবাসে আছি কিন্তু প্রবাসকে এখনো আমি ভালোবাসতে পারিনি। মাতৃভূমি বাংলাদেশকেই ভালো লাগে। প্রবাসের উন্নত জীবন-যাপনের মাঝেও দেশকে খুব মিস করি।’

দাবি: প্রবাসী হলেও নিজের মাতৃভূমিতে ভোটাধিকার চান সেলিনা। বিমানবন্দরে প্রবাসীদের সেবা দেয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করাসহ সবধরনের হয়রানি বন্ধের দাবি জানান তিনি।
পরিবার: সেলিনা আক্তার জোসনার স্বামী আব্দুল খালেক রিন্টু একজন ব্যবসায়ী। তিনি ১৯৮৮ সাল থেকে প্রবাসে আছেন। রোমের ল্যাম্বারদিয়া বৃহত্তর কুমিল্লা সমিতির সভাপতি ছিলেন তিনি। আব্দুল খালেক তার স্ত্রীর কাজে বেশ উৎসাহ যোগান।
তাদের সংসারে রয়েছে এক ছেলে, এক মেয়ে। মেয়ে রুবাইয়া আক্তার মীম ওয়েস্ট মিনিস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বায়োমেডিকেলে গ্র্যাজুয়েশন এবং কুইন মেরি থেকে একই বিষয়ে মাস্টার্স করেছেন। ছেলে খালেক মাহমুদ ইফতী দি সিটি লন্ডন ইউনিভারার্সটি থেকে এরোনেটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পড়াশোনা করছে।
প্রবাস মেলা: প্রবাস মেলা প্রবাসীদের পত্রিকা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসবাসরত লাখ লাখ প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সই বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি সচল রাখছে। আর সেই রেমিটেন্স যোদ্ধাদের কণ্ঠস্বর হলো প্রবাস মেলা। আমি পত্রিকাটির নিয়মিত পাঠক। এটি একটি ভালো উদ্যোগ। আমি পত্রিকার সকল কলাকুশলীদের অন্তর থেকে স্যালুট জানাই এবং এর উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করছি।