ক্রিস প্যাটেন, লন্ডন, যুক্তরাজ্য:
রাশিয়া এবং চীনের মতো কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রগুলো তাদের অলীক চিন্তা এবং ক্ষমতা কাঠামোকে টিকিয়ে রাখার জন্য তাদের অতীতের কাল্পনিক বিবরণ তুলে ধরতে চায়। কিন্তু মুক্তচিন্তার ও গণতান্ত্রিক চেতনার দেশগুলো- যারা স্বাধীনতাকে মূল্য দেয়, তাদের ইতিহাস সম্পর্কে সাহসী এবং সৎ হওয়া উচিত।
আমার প্রিয় কার্টুনগুলির মধ্যে একটিতে দেখা যাচ্ছে একজন বয়স্ক প্রফেসরীয় চেহারার লোক ছাত্র গোছের একজন অনেক কম বয়সী সহকর্মীর সাথে কথা বলছেন। প্রফেসর লোকটি তাকে বলছেন, ‘যারা ইতিহাস অধ্যয়ন করে না, তারা এটির পুনরাবৃত্তি করতে পারে’। তারপরে তিনি বললেন, ‘আর যারা ইতিহাস অধ্যয়ন করেন তারা অন্য যারা এর পুনরাবৃত্তি করছে তাদেরকে বোকার মতো সমর্থন দিয়ে ইতিহাসের সর্বনাশ করেন’।
অনেক কৌতুকের মতো এটি একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ, কারণ এতে অমোঘ সত্য লুকিয়ে আছে। তবে আমি এখনও বিশ্বাস করি যে, অতীতে আসলে কী ঘটেছিল তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করা ভাল, এমনকি যখন এটি করা অস্বস্তিকর। গতকাল কীভাবে একটি যথোপযুক্ত আজ’কে তৈরি করতে সাহায্য করেছিল, তা আবিষ্কার করার চেষ্টা থেকে শালীন ও মুক্ত সমাজের কখনই পিছপা হওয়া উচিত নয়। আমরা কীভাবে একটি ভালো আগামী তৈরি করতে আমাদের অভিজ্ঞতা ব্যবহার করতে পারি তাও ভাবতে হবে।
যদি কখনও দ্রোহ-বিদ্রোহের বিষয়ও হয় তখনো সমস্যা সমাধানে ইতিহাসের আশ্রয় নেয়া উচিত। এটা ইতিহাসকে শোধন করে। কারণ কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রগুলো তাদের নিজস্ব কাল্পনিক কিন্তু রাজনৈতিকভাবে সমীচীন আখ্যান চাপিয়ে দিতে চায়। কিন্তু মুক্ত গণতান্ত্রিক দেশগুলো- যারা স্বাধীনতাকে মূল্য দেয় তাদের নিজেদের ইতিহাস সম্পর্কে সাহসী এবং সৎ হওয়া উচিত।
উদাহরণস্বরূপ, আয়ারল্যান্ডের সাথে ব্রিটেনের সংশ্লিষ্টতার ইতিহাস এর খাদ্য জোগানের লজ্জাজনক পর্বের চেয়েও বেশি কিছু ধারণ করে করে রচিত হয়েছে। আমি ঊনবিংশ শতাব্দীর ব্রিটিশ-স্বাশিত আয়ারল্যান্ডের আলু-দুর্ভিক্ষ কবলিত অভিবাসীদের একটি পরিবার থেকে এসেছি। ওই দুর্ভিক্ষে কমপক্ষে এক মিলিয়ন মানুষ মারা গিয়েছিলো। তখন প্রায় দুই মিলিয়ন মানুষ তাদের এবং তাদের পরিবারের জীবন বাঁচাতে আয়ারল্যান্ড ছেড়ে চলে গিয়েছিলো।
১৯২১ সালে উত্তর আয়ারল্যান্ড সৃষ্টির ইতিহাসের কথাই ধরা যাক। তখন কট্টরপন্থী প্রোটেস্ট্যান্ট জঙ্গিদের মুক্ত করার জন্য একটি জাল নকশা তৈরি করে এই ক্ষুদ্র দেশটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিলো। যে কারণে ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ক্যাথলিক সংখ্যালঘুরা নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছিলো। তখন ওয়েস্টমিনস্টারের রক্ষণশীল পার্লামেন্টের সদস্যরা প্রায়শই অন্যান্য দেশে নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন এবং নিপীড়নের নিন্দা করে। তারা দক্ষিণ আমেরিকার জাতিগত বিচ্ছিন্নতা এবং নাগরিকদের ভোটাধিকার হরণেরও নিন্দা করেছেন। কিন্তু উত্তর আয়ারল্যান্ডে যা ঘটছে তারা এর প্রতি অন্ধভাবে দৃষ্টিপাত করেছিলেন। তখন উত্তর আয়ারল্যান্ড প্রসঙ্গে সানডে টাইমস- এ বিখ্যাত উদ্ধৃতি প্রকাশিত হয়েছিলো। সানডে টাইমস একে ‘জন বুলের রাজনৈতিক বস্তি’ বলে অভিহিত করেছিলো।

এ বিষয়টি ব্যাখ্যা করে যে, ১৯৯৮ সালের গুড ফ্রাইডে চুক্তি হওয়ার ফলে শেষ পর্যন্ত ওই প্রদেশে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। এটা ছিল ব্রিটেন ও আয়ারল্যান্ডের রাজনৈতিক সম্পর্কে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। প্রায় আকস্মিকভাবে এটি প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন এবং তার ডানপন্থী রক্ষণশীলদের দ্বারা সৃষ্ট সাম্প্রতিক হুমকির বিরুদ্ধে চুক্তিটিকে রক্ষা করার গুরুত্বকেও তুলে ধরে। কারণ তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নকে এই বলে চাপ দেওয়ার চেষ্টা করছে যে, তারা যুক্তরাজ্যের আলোচিত ব্রেক্সিট চুক্তিতে বাণিজ্য ও সীমান্ত ব্যবস্থার বিষয়ে আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্র এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতি থেকে সরে যাবে।
আমাদের ইতিহাসের অন্যান্য দিকগুলোকেও সততার সাথে দেখতে হবে। আমি ব্রিটেনে একটি নৈরাজ্যিক সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে উৎসাহিত করতে চাইছি না, যা দেশটির ইতিহাসের ন্যূনতম প্রতিরক্ষাযোগ্য অংশগুলির সাথে অনুমানযোগ্যভাবে জড়িত যে কোনও কিছুর প্রতিটি চিহ্নকে ভেঙ্গে দেয়। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি যে, শ্রম বাণিজ্যের সাথে চিনি ও তুলা শিল্পের সম্পর্ক এবং আটলান্টিক অর্থনীতি ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশ সম্পর্কে জনসাধারণের বোঝাপড়াকে আরও গভীর করার প্রচেষ্টাকে আমাদের স্বাগত জানানো উচিত।
সর্বোপরি, নিউইয়র্ক টাইমসের প্রাক্তন সংবাদদাতা হাওয়ার্ড ডব্লিউ. ফ্রেঞ্চ তার সাম্প্রতিক বই বর্ন ইন ব্ল্যাকনেস (Born in Blackness)- এ বিশ্বাসযোগ্য এবং যথেষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তার সাথে যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছেন যে, আফ্রিকানদের জন্য লড়াইয়ের মাঠে, ব্রিটেন ছিল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য খেলোয়াড়দের একজন এবং তা তারা করেছিলো কেবল আফ্রিকার জন্য নয়। ফরাসি এই বইটি এমন যুক্তি উপস্থাপন করেছে যা বর্তমানে ব্রিটেনে খুব কমই শোনা গেছে।
এটি এবং অন্যান্য বিষয়ে স্লোগান চিৎকারের পরিবর্তে আমাদের ঐকান্তিক, পরিপক্ক এবং সচেতন বিতর্কে অংশ নেয়া প্রয়োজন। পৃথিবীতে এমন কোনো দেশ নেই যার ইতিহাস কেবল গুণী বীরদের জন্য স্তুতি এবং নৈতিক বিজয়ের কুচকাওয়াজ প্রদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
সুতরাং এটি সাক্ষ্য দেয় যে, একদিকে বাকস্বাধীনতা ও প্রচারণামুক্ত শিক্ষার মধ্যে এবং অন্যদিকে ইতিহাসের প্রতি সততার একটি দৃঢ় সম্পর্ক রয়েছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সরকার যখন মানবাধিকার সংগঠন মেমোরিয়াল ইন্টারন্যাশনালকে বন্ধ করে দিয়েছে তখন ধরে নেয়া হচ্ছে যে, তিনি সমালোচনা এবং ভিন্নমত প্রকাশের সম্ভাবনাকে আরও দমানোর চেষ্টা করছেন। আন্তর্জাতিক এই সংগঠনটি ১৯৮৯ সাল থেকে স্ট্যালিন-যুগের অনেক মৃত্যু এবং অন্তর্ধানের রহস্য উন্মোচন করেছিলো। কৃষ্ণ সাগরের তীরে পুতিনের বিশাল ব্যক্তিগত প্রাসাদ দেখানোর অভিযোগে একটি অনলাইন ভিডিও ইন্টারনেট থেকে মুছে ফেলতে হয়েছে। কারণ এর ফলে অনেক রাশিয়ান তার (পুতিন) জীবনযাত্রার মানকে তাদের (রাশিয়ান নাগরিক) নিজের সাথে তুলনা করে ক্ষুদ্ধ হতে পারে।
একইভাবে, চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর সরকার তথাকথিত ঐতিহাসিক নিহিলিজমকে (নাস্তিবাদ) প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এর অর্থ তার সরকার এমন কিছুকে আক্রমণ করছে যা চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ঐতিহাসিক সরকারি দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সাংঘর্ষিক। এর উদ্দেশ্য হল সিপিসি (CPC)-এর অতীতের নিষ্ঠুরতা নিয়ে সৃষ্ট বিতর্ককে কবর দেওয়া।
মাও সেতুং-এর উন্মত্ত গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড (Great Leap Forward) দ্বারা উদ্ভূত দুর্ভিক্ষে কতজন লোক মারা গিয়েছিল? (গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড হল ১৯৫৮ থেকে ১৯৬২ পর্যন্ত গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের (পিআরসি) দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা)। ১৯৮৯ সালে তিয়ানানমেন স্কোয়ার এবং এর আশেপাশে কতজন লোক নিহত হয়েছিল? জিনজিয়াং প্রদেশে কতজন লোককে গৃহবন্দি করা হয়েছে? কতজন মুসলিম নারী ধর্ষিত হয়েছে এবং জোরপূর্বক গর্ভপাত ও বন্ধ্যাকরণের শিকার হয়েছে? সিপিসি নেতৃবৃন্দের মতে, এই প্রশ্নগুলো করা মানে চীনের প্রতি অপর্যাপ্ত ভালোবাসা প্রদর্শন করা। কিন্তু এত দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ইতিহাসের দর্শনীয় সাফল্যের দেশটির প্রতি ভালোবাসা দেখানোর জন্য শি’র একনায়কত্বকে কেন ভালোবাসতে হবে?
এই কারণেই হংকংয়ে যারা বাস করেন তাদের অনেকেই কমিউনিস্ট বর্বরতা থেকে পালিয়ে আসা পরিবার থেকে এসেছেন। তারা এটা মেনে নিতে পারেন না যে, তাদের দেশপ্রেম প্রদর্শন করতে হবে কিংবা সিপিসিকে ভালোবাসতে হবে। তিয়ানানমেন স্কোয়ারে কী ঘটেছিল তা তারা খুব স্পষ্টভাবে মনে করতে পারেন। সিপিসি হংকংয়ে নিহতদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নির্মিত স্মৃতিসৌধ ‘লজ্জার স্তম্ভ’ ভাস্কর্য (Pillar of Shame sculpture) গুড়িয়ে দিয়ে বা প্রতি বছর ৪ জুন মৃতদের স্মরণে মোমবাতি প্রজ্বলনে অংশ নেওয়া লোকদের বিচার করে ইতিহাস থেকে সেই ঘটনাগুলো মুছে ফেলতে পারবে না।
চীনের কমিউনিস্ট নেতারা তাদের অতীত ইতিহাসের বানোয়াট সংস্করণ লিখে বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে ধরে রাখতে পারে না। হংকংয়ের বাসিন্দাদের স্মৃতি রক্ষার্থে নির্মিত স্থাপনা, শালীনতা প্রদর্শন এবং স্বাধীনতার জন্য মৌলিক অঙ্গীকার এক সময় তাদের একটি ভাল ভবিষ্যত নিশ্চিত করবে। তারা তখন কমিউনিজমের অধীনে আসলে কী ঘটেছিল তা সকল চীনাদেরকে মনে করিয়ে দেওয়ার মহান সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সেবা করতে সক্ষম হবে।
সেই প্রত্যাশাকে উদার গণতন্ত্র এবং মুক্ত সমাজের সমর্থকদের অবশ্যই উৎসাহিত করা উচিত। অতীত পরীক্ষা করার সময় সত্য কখনও কখনও বেদনাদায়ক হতে পারে, তবে তা সততার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। কারণ সততাই সর্বোত্তম নীতি।
ক্রিস প্যাটেন: অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর, হংকংয়ে নিযুক্ত শেষ ব্রিটিশ গভর্নর এবং ইইউ’র বহির্বিভাগ বিষয়ের প্রাক্তন কমিশনার
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
অনুবাদ: শহীদ রাজু।