জেভিয়ের সোলানা, মাদ্রিদ, স্পেন:
অন্যান্য দেশের সাথে তাদের মতাদর্শগত পার্থক্যের উপর জোর দেওয়ার পরিবর্তে গণতান্ত্রিক দেশগুলোর উচিত নিজেদের এবং বিশ্বের প্রতি তাদের দায়িত্ব স্বীকার করা। বিশেষ করে মুক্ত দেশগুলোকে এখন তাদের দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক বৈধতা পুনরুজ্জীবিত করার জন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদন করতে হবে।
উদার গণতন্ত্র এখনও জীবিত, কিন্তু এর দুর্বলতার স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ফ্রিডম হাউসের মতে, বিশ্ব টানা ১৫ বছর ধরে বৈশ্বিক গণতন্ত্রের দুর্বলতার লক্ষণগুলো স্পষ্ট হচ্ছে।
কর্তৃত্ববাদের ক্রমবর্ধমান জোয়ার মোকাবেলার প্রয়াসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সম্প্রতি বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে একটি ভার্চুয়াল শীর্ষ সম্মেলনে ১০০ টিরও বেশি দেশের বিশ্ব নেতাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আমার প্রজন্মের একজন স্পেনের নাগরিক হিসেবে আমাকে গণতন্ত্রের মূল্য তুলে ধরার শক্তিশালী কারণ রয়েছে। কারণ আমি ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কোর মতো একনায়কত্বের অধীনে আমার জীবনের একটি অংশ কাটিয়েছি। সেকারণে আমি জানি একটি দেশের জন্য খোলামেলা ভাবে মতপ্রকাশ এবং সমৃদ্ধি বেছে নেওয়ার অর্থ কী। লা ট্রান্সিসিয়ন (La Transición)- স্পেনের স্বৈরতন্ত্র থেকে সাংবিধানিক গণতন্ত্রে শাসনের পরিবর্তনের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ছিল একটি ঐতিহাসিক কীর্তি। যা নতুন প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠা, একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের বিকাশ এবং ইউরোপে একীভূতকরণকে অন্তর্ভুক্ত করে।
কিন্তু গণতন্ত্রকে একটি নৈতিক, ন্যায্য এবং ব্যবহারিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসাবে রক্ষা করার অর্থ হল আমাদের আন্তর্জাতিক পরিবেশকে গণতন্ত্র এবং স্বৈরাচারের মধ্যে সংঘর্ষ হিসাবে সংজ্ঞায়িত না করা। সর্বোপরি, বাস্তবে উদ্ভূত বৈশ্বিক সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য দেশগুলোর বৈঠকে কোনও ভুল নেই। এই বৈঠক তাদের সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

যদিও সামিট ফর ডেমোক্রেসির অংশগ্রহণকারীরা মানবাধিকার রক্ষার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু এটি এর ফলাফলের চেয়ে প্রতীকী মূল্যের জন্য বেশি স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এর প্রমাণ হল তাইওয়ানকে আমন্ত্রণ জানানোর ক্ষেত্রে বাইডেনের সিদ্ধান্ত। কিন্তু বাইডেনের এই সিদ্ধান্ত চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা কমাতে খুব কম ভূমিকা রাখবে।

অন্যদিকে, আজকের অপ্রত্যাশিত এবং বিপজ্জনক বিশ্বে কার্যকর বৈশ্বিক শাসনের প্রয়োজনীয়তা আগের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি। গত শতাব্দীতে আবির্ভূত পারমাণবিক হুমকির পাশাপাশি, আমাদের এখন সাইবার আক্রমণ, অভিবাসনের সমস্যা, সামরিক প্রযুক্তিতে ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষতিকারক সম্ভাবনার মতো চ্যালেঞ্জগুলোর সাথে লড়াই করতে হবে। বাইডেনের সাম্প্রতিক শীর্ষ বৈঠক মতাদর্শগতভাবে বিশ্বকে দুটি বিরোধী শিবিরে বিভক্ত করেছে। এইভাবে একটি বড় ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। যার ফলে স্বাধীন দেশ এবং স্বৈরাচারের মধ্যে বিভাজনের সমস্যা মূল আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা বিশ্বব্যাপী সমস্যাগুলো সমাধান বা পরিচালনার জন্য মৌলিক এবং কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
উদাহরণস্বরূপ, বিভিন্ন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবিধি তৈরি করতে অক্ষমতার কারণে অনেক আগেই বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কার্যক্ষমতা হারিয়েছে। ডব্লিউটিও-র মধ্যে বিদ্যমান বিভাজনের ফলে গণতান্ত্রিক এবং অগণতান্ত্রিক দেশগুলোর মধ্যে আদর্শগত বিচ্ছিন্নতার একটি উপাদান যুক্ত করলে সমস্যা সমাধান করা আরও কঠিন হবে।

আমরা যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার ভয়াবহ পরিণতি এড়াতে চাই তবে এই বিরোধগুলো নিষ্পত্তি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে বহুপাক্ষিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা ছিল একটি ঐতিহাসিক অর্জন। কিন্তু একটি ক্রমবর্ধমান পরস্পর নির্ভরশীল, জটিল এবং গতিশীল বিশ্বের সঙ্গে মানিয়ে চলতে এর প্রতিষ্ঠানগুলোতে কার্যসম্পাদনে পদ্ধতিগত সক্ষমতার অভাব রয়েছে।
কোভিড-১৯ সংকট এটিকে আরও স্পষ্ট করেছে। বিশ্ব মানবসম্প্রদায় মহামারী মোকাবেলায় অপ্রস্তুত ছিল এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্পষ্টতই কম অর্থায়ন করেছিল। যখন প্রাক্তন মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প বেপরোয়াভাবে ঘোষণা করেছিলেন যে তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করছেন, তখন বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একক বৃহত্তম অবদানকারী হয়ে উঠতে প্রস্তুত ছিল।

অন্যান্য দেশের সাথে তাদের মতাদর্শগত পার্থক্যের উপর জোর দেওয়ার পরিবর্তে গণতান্ত্রিক দেশগুলোর উচিত নিজেদের এবং বিশ্বের প্রতি তাদের দায়িত্ব স্বীকার করা। বিশেষ করে মুক্ত দেশগুলোকে এখন তাদের দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক বৈধতা পুনরুজ্জীবিত করার জন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিলম্বিত কাজ সম্পাদন করতে হবে।
প্রথম কাজ হলো দেশীয় অর্থনৈতিক বৈষম্য কমিয়ে আনা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে গণতন্ত্র কল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে এটা প্রমাণ করেছিল যা দেশে দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সামাজিক সংহতি নিশ্চিত করতে সহায়তা করেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক দশকগুলোতে এই সংহতি বড় ধাক্কা খেয়েছে। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট এবং কোভিড-১৯ মহামারী দ্বারা এটি আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে।
আমাদের সমাজে প্রোথিত আর্থ-সামাজিক বৈষম্যগুলো গণতন্ত্রের জন্য হুমকিস্বরূপ। কারণ পৃথক জীবনযাপনের ক্রমবর্ধমানতা যৌথ রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে আরও কঠিন করে তোলে। শেষ পর্যন্ত, অসমতা আমাদের নাগরিক হিসেবে কাজ করার ক্ষমতাকে নষ্ট করে দেয়। গণতান্ত্রিকভাবে অনেক দেশ পিছিয়ে পড়ার কারণ হিসেবে আংশিকভাবে নাগরিকদের অসন্তোষকে দায়ী করা হয়। কারণ তারা আস্থা হারিয়েছে যে বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা তাদের জীবনে ঘটে যাওয়া অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং জীবনযাত্রার মানের দীর্ঘ পতনকে ফিরিয়ে দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলশ্রুতিতে উদ্ভূত রাজনৈতিক হতাশা পপুলিস্ট জাতীয়তাবাদের উত্থানের প্রধান উৎস হয়ে ওঠে।
গ্লোবাল সাউথের (Global South) আরও উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থ-সামাজিক উন্নতিকল্পে সুস্পষ্ট নেতৃত্ব দেওয়া গণতন্ত্রের দ্বিতীয় কাজ। এটি উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের আনুগত্যকে সহজতর করতে পারে।
নতুন অমিক্রন ভেরিয়েন্টের দ্রুত বিস্তার দেখিয়েছে যে, বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনের ন্যায়সঙ্গত বণ্টন নিশ্চিত করার জন্য আমাদের একটি নৈতিক এবং বাস্তব আবশ্যিকতা রয়েছে। আফ্রিকায় টিকা দেওয়ার হার হতাশাজনকভাবে কম। যদিও ধনী গণতন্ত্রের অনেক নাগরিক এখন তৃতীয় কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনের ডোজ নিতে পারছে কিন্তু মাত্র ৮ শতাংশ আফ্রিকানদের সম্পূর্ণ টিকা দেওয়া হয়েছে।
তদুপরি, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে জনগণের জন্য দ্রুত টিকাদান নিশ্চিত করার চেয়ে গণতন্ত্রের জন্য কার্যকরী বৈশ্বিক প্রচার আর কিছু হতে পারে না। বিশ্বের জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ মানুষকে টিকা দেওয়ার জন্য জি-৭-এর জিডিপি-এর মাত্র ০. ১৩ শতাংশ অর্থ খরচ হবে। এটি ধনী গণতান্ত্রিক দেশগুলোকে তাদের আন্তর্জাতিক বৈধতা বাড়ানোর জন্য সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
গণতান্ত্রিকভাবে উন্নত দেশগুলো তাদের রাজনৈতিক সদিচ্ছাগুলোর সমাবেশ ঘটিয়ে তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে আরও তৎপর হতে পারে। তারা যথাযথভাবে অর্থায়ন করে গ্লোবাল সাউথকে তাদের সবুজ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উত্তরণের অঙ্গীকার পূরণে সাহায্য করতে পারে। কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত ২০০৯ সালের জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনে ধনী দেশগুলো প্রতিশ্রুতি দেয় যে তারা প্রতি বছর ১০০ বিলিয়ন ডলার উন্নয়নশীল দেশগুলিকে প্রদান করবে যাতে ঐ দেশগুলো তাদের দুর্ভোগ নিরসন এবং অভিযোজন ব্যয় মেটাতে পারে। কিন্তু উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো তাদের কথা রাখে নি।
বাইডেন তার ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারের প্রতিশ্রুতি পূরণ করে গণতন্ত্রের জন্য একটি শীর্ষ সম্মেলন আহ্বান করে দেখিয়েছেন যে তিনি ট্রাম্প নন। কিন্তু তা হয়তো অপর্যাপ্ত প্রমাণিত হতে পারে। আদর্শগতভাবে সমমনা কারো সাথে সহযোগিতার পথ তৈরি করা বেশ জটিল। ভিন্ন বিশ্বদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তির সাথে এটি করা, এমনকি নিজের সাথে নিজের বিরোধিতা করাও অনেক বেশি কঠিন।
যেহেতু এটা সুস্পষ্ট যে গণতন্ত্রকে আমাদের শক্তিশালী করতে হবে। এতে সবচেয়ে জরুরী বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলো সমাধানের জন্য অন্যান্য দেশের সাথে কাজ করার ক্ষেত্রে আমাদের মৌলিক মূল্যবোধগুলো বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। আমি আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করি যে গণতন্ত্রের এটাই প্রয়োজন।
জেভিয়ের সোলানা: ন্যাটোর সেক্রেটারি জেনারেল এবং স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, বৈদেশিক এবং নিরাপত্তা নীতি বিষয়ক প্রাক্তন ইইউ’র উচ্চ প্রতিনিধি, EsadeGeo – সেন্টার ফর গ্লোবাল ইকোনমি অ্যান্ড জিওপলিটিক্সের প্রেসিডেন্ট এবং ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের বিশিষ্ট ফেলো।
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
অনুবাদ: শহীদ রাজু।