এবিএম সালেহ উদ্দীন, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র: নারী ও পুরুষ একে অপরের সম্পূরক। মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। মুদ্রার এক পিঠ ব্যতীত যেমন অন্য পিঠের গুরুত্ব নেই, তেমনি নারী এবং পুরুষও একই রকম। একজন ছাড়া অন্যজন অপূর্ণাঙ্গ। দুইয়ের সমন্বয়েই নারী ও পুরুষের সম্পূর্ণতা। উভয়ের দাম্পত্যজীবনের মধ্য দিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে গভীর ভালোবাসা ও দৃঢ় বন্ধন সংস্থাপিত হয়। ক্ষেত্রবিশেষে নারী ছাড়া পুরুষ কিংবা পুরুষ ব্যতীত নারীর জীবন চলতে পারে। কিন্তু স্বামী-স্ত্রীর যৌথ জীবন ব্যবস্থাপনার উপর কোনো কিছু নেই।
পৃথিবীর আদিকাল থেকে স্রষ্টার নির্দেশনার পরম সৌন্দর্যটি মানববিশ্বকে সুষমামণ্ডিত ও আলোকিত করে রাখছে। এর ব্যতিক্রমটি খুব গৌণ এবং তার সংখ্যা নগণ্য। বৈবাহিক সম্পর্কের বাইরে অর্থাৎ গার্লফ্রেন্ড কিংবা অন্য যেকোনোভাবে সংস্থাপিত হওয়া নারীর অধিকারের বিষয়টিও বর্তমান বিশ্বে আলোচিত।

নারী-পুরুষের যৌথ সংসারধর্মই পৃথিবীকে আলোকিত করেছে। নারী-পুরুষের বন্ধনটি একটি চিরস্থায়ী বিধান। এর বিপরীত হলে ঝামেলায় পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। নারী ও পুরুষ উভয়কেই এই বিষয়টির উপর গুরুত্বশীল হতে হয়। পুরুষকে যেমন তার লক্ষ্যস্থলে পৌঁছার জন্য নারীকে সঙ্গে রাখতে হয়, তেমনি পুরুষকে বাদ দিয়ে নারীর লক্ষ্যস্থলে পৌঁছানোটা সহজ ব্যাপার নয়। নারী-পুরুষের সুগভীর আন্তরিকতা যৌথ নিয়মের উপর পৃথিবীর সামান্য সাফল্য অর্জিত হলেও সেটি অনেক গুরুত্ববহ। কোনো কাজ একা সম্পন্ন করা কঠিন এবং ঝুঁকিপূর্ণ। ইচ্ছে করে কেউ এমন ঝুঁকিতে যেতে পারে না। বিশ্বে নারী যেসব মহৎ কাজ করে আসছে, তার তুলনা বিরল। তেমনি নারীর সহযোগিতার মাধ্যমে পুরুষের বহুমাত্রিক সাফল্যের কথাও সর্বজনবিদিত। তবে এটা সত্য যে, পুরুষের পাশাপাশি নারীর এত বড় ভূমিকা থাকার পরও বিশ্বে নারীরাই বেশি প্রবঞ্চিত ও অধিকারবঞ্চিত হন। পৃথিবীতে নারীরাই সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত হন।
আমাদের বুঝতে হবে, নারী ও পুরুষ উভয় শ্রেণিই মানুষ। নারীকে শুধু নারী না বলে কিংবা পুরুষকে শুধু পুরুষ হিসেবে চিহ্নিত করার আগে অত্যাবশ্যকীয়ভাবে মানতে হবে যে উভয়েই মানুষ। মানুষের মর্যাদাবোধকে সংরক্ষণ করতে হলে প্রথমে তার মানবসত্ত্বার উপর গুরুত্ব দিতে হবে। নারীকে অন্য কোনো সত্ত্বারূপে সজ্ঞায়িত না করে মানুষ হিসেবে গণ্য করতে হবে। মর্যাদাবোধ থেকে কাউকে আলাদা করা যাবে না। প্রথমে সে মানুষ, তারপর সে নারী- কথাটি মনে রাখতে হবে। একইভাবে পুরুষের মানবিক সত্ত্বার বিষয়টিও নারীকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার ভুল-বোঝাবুঝি দীর্ঘস্থায়ী রাখা যাবে না। পারস্পরিক ভালোবাসা ও বিশ্বাসকে সুদৃঢ়করণের মধ্য দিয়ে সকল ভুল নিরসন করতে পারলে অবশ্যই তার সুফল পাওয়া যাবে।
পুরুষ ও নারীর মর্যাদা প্রথমে নিজের ঘরেই তৈরি করে নিতে পারলে সমাজে এর একটা সুপ্রভাব পড়ে। প্রতিটি পরিবারের আন্তরিক সচেতনতাই সেই কাজকে স্বার্থক করতে পারে। আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক মানদ- নির্ণয়ে সেটি মুখ্য ভূমিকা রাখতে পারে। তেমনি মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে হলে নারী ও পুরুষকে মনেপ্রাণে এই স্বীকারোক্তির উপর সুদৃঢ় থাকতে হবে। মানবিক নীতির উপর দৃঢ় থাকতে পারলেই মানুষ হিসেবে পূর্ণতা লাভ করা সম্ভব। অন্যথায় পরিপূর্ণ মানুষ হওয়া সম্ভব নয়। নারী-পুরুষের বৈবাহিক বন্ধনের চিরকালীন নিয়মের মধ্যে শান্তিপূর্ণ জীবন পরিচালনার জন্য স্বামী-স্ত্রী উভয়ের মধ্যকার বিশ্বাসের ভিত্তিকে সুদৃঢ় করে নিতে হয়। একে অপরের প্রতি বিশ্বাসের দীপ্তি, ভালোবাসা ও আন্তরিকতা যত বেশি বৃদ্ধি পাবে এবং সুদৃঢ় হবে, ততই উভয়ের দাম্পত্যজীবন মধুরতম সুন্দর ও স্বার্থক হবে। স্বামী-স্ত্রীর সুসম্পর্ক স্থায়ীকরণের অন্যতম শর্ত হলো, পরস্পরের মধ্যে বিশ্বাস স্থাপন এবং সন্দেহমুক্ত জীবনযাপন করা। পারিবারিক জীবনের গভীর ভালোবাসার বন্ধন যত বেশি পরিশীলিত ও পরিমার্জিত হবে; ততই শান্তিময় জীবনের সুখ ও মজা উপলব্ধি করা যাবে।
রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং শিক্ষাক্ষেত্রে নারীর অবদানের অনেক উৎকৃষ্ট ধারাবাহিকতা থাকার পরও বর্তমান বিশ্বে নারীরাই বেশি অধিকারহারা। তারাই সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত ও লাঞ্ছনার শিকার হন। আমাদের অবশ্যই অনুভব ও উপলব্ধিতে থাকতে হবে যে নারী হলো মায়ের জাত। তারা যদি লাঞ্ছিত, নির্যাতিত ও অধিকারবঞ্চিত হয়, তখন পুরুষ ও নারীর কারোরই অধিকারের মূল্য থাকে না।
বর্তমান পৃথিবীতে একটা ভয়ংকর সামাজিক ব্যাধি হলো নারীর অধিকার খর্ব করা। সভ্য জগতেও নারী নির্যাতনের ভয়ংকর ঘটনা অহরহ ঘটেই যাচ্ছে।
কিন্তু প্রতিকারের উপায় কী? কীভাবে নারী ও পুরুষের মধ্যকার বৈষম্যহীন সমাজ হবে। কোন পন্থায় এর সঠিক সমাধান রয়েছে। যুগ যুগ ধরে মানবসমাজে যে কুসংস্কারের প্রচলন আছে; সেসব কুসংস্কার থেকে উভয় গ্রুপকে মুক্ত থাকতে হবে। সমাজ, ধর্ম ও রাষ্ট্রীয় যেসব মানবিক নীতিবোধ ও আইন রয়েছে, সেগুলোর প্রতি সম্মান এবং তা পালন করার মনোবৃত্তি পোষণ করতে হবে। পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের ভিত্তিতে সবার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে হবে।
নারীর মর্যাদা ও অধিকারের ব্যাপারে ইসলাম ধর্মের নির্দেশনা স্পষ্ট। ইসলামের বাণী হচ্ছে: ‘একজন পুরুষ তথা স্বামী ও স্ত্রীর অধিকার সমান।’ এ ব্যাপারে কোনো গোঁজামিল কিংবা অপব্যাখ্যার সুযোগ নেই। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, নারীর অধিকার প্রশ্নে মুসলমানদের মাঝে অল্পশিক্ষিত কোনো বিশারদ (!) কিংবা অন্য ধর্মের পুরোহিত দ্বারা নারীর অধিকার নিয়ে বৈষম্যমূলক ফতোয়াবাজির অবতারণা ঘটিয়ে সংকট তৈরি করার ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে।
ভারতবর্ষের কট্টর হিন্দু, ব্রাহ্মণ এবং নিম্নবর্ণের হিন্দুদের অনেকের মাঝে এখনো এমন কুসংস্কার রয়েছে; যাতে নারীর প্রতি অবিচার, জুলুম, নির্যাতন এবং অমানবিক আচরণের ব্যবস্থা বিদ্যমান। এখনো মানববিধ্বংসী সতীদাহ, অন্য ধর্মের লোকদের সঙ্গে সংশ্রবসহ অনেক স্পর্শকাতর বিষয়ের অবতারণা ঘটিয়ে নির্যাতন ও নারীর অধিকার বিনষ্ট করা হয়ে থাকে। হিন্দুধর্মে বিধবা নারীকে জীবন্ত পুড়িয়ে সতীদাহ প্রথার মতো নৃশংস হত্যাকা- ঘটানো হতো অবলীলায়। অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে অবশেষে রাজা রামমোহন রায় (২০০ বছর আগে) শেষ পর্যন্ত সতীদাহ প্রথা তুলে দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিধবাদের জন্য বিবাহ প্রথা চালু করেন।

নারী অধিকার বাস্তবায়নে সবচেয়ে জরুরী হলো নারীর ক্ষমতায়ন। এর জন্য চাই শিক্ষা। তাই পৃথিবীর প্রত্যেকটি নারীকে সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। পরিশেষে বলতে চাই নারীর অধিকার ও গৌরবজনক মর্যাদাবোধ সমাজে পরিপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত হোক-এটাই আজকের প্রত্যাশা।