ন্যান্সি কিয়ান, শিকাগো, যুক্তরাষ্ট্র: আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রর সৈন্য প্রত্যাহার সারা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। চরম বিশৃঙ্খলা, দুর্দশা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের দ্বারা যে সমস্ত সাধারণ নাগরিকদের জীবন গেছে তাদের দুঃখ-দুর্দশা সামনে এনে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। এটা অকল্পনীয় মনে হয় যে, ২০ বছরের যুদ্ধ, হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু এবং ২ ট্রিলিয়ন ডলার খরচের বিনিময়ে একটি নতুন আফগানিস্তান নির্মাণ করা যথেষ্ঠ ছিলো না।
আফগানিস্তানে পশ্চিমাদের ব্যর্থতার পিছনে অনেকের আঙুলি হেলন এবং অনেক অপরাধীর চক্রান্ত কাজ করেছে বলে মনে করা হয়। কিন্তু সেখানকার সবচেয়ে মৌলিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পশ্চিমাদের কথা বলতে প্রকট অনীহা লক্ষণীয়। আর তা হলো একটি সাধারণ আফগান জাতীয় পরিচয় বিকাশে পদক্ষেপ গ্রহণের অনুপস্থিতি এবং একটিমাত্র দল বা গোষ্ঠীকে সমর্থনে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের মতভেদ।

প্রত্যেকটি স্বাধীন দেশের মাত্রাগতভাবে কিছু সাধারণ জাতীয় পরিচয় থাকে। এগুলো প্রায়শ ধর্মীয়, ভাষাগত বা জাতীগত ভিত্তিতে চিহ্নিত করা হয় যা জাতিগঠনের উদ্দেশ্য বিশদভাবে স্পষ্ট করে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ঊনবিংশ শতাব্দীতে প্রুশিয়ানরা জার্মান জাতিগত পরিচয় সৃষ্টি করেছিলো এবং তা তাদের বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। অষ্টাদশ এবং উনবিংশ শতাব্দীতে যথাক্রমে ফ্রান্স এবং ইতালিতে জাতি নির্মাণ একইভাবে এগিয়ে গিয়েছিলো।
জাতীয় পরিচয়গুলি মূলত জৈবিকভাবে বিকশিত হয়। কিন্তু সেগুলো প্রধানত সক্রিয় সরকারি ব্যবস্থা দ্বারা প্রতিপালিত হয়ে থাকে। এর কারণ হলো, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এরূপ এবং সংবেদনশীল নাগরিকদের একটি কমন ভাষায় শিখিয়ে একটি কমন (Common) সংস্কৃতি লালনে উৎসাহিত করতে প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতাব্দীতে মার্কিন নেতারা মনে করতেন সারাবিশ্ব থেকে অভিবাসীদের আমেরিকায় অন্তর্ভূক্ত করার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পাবলিক স্কুলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এতে অভিবাসীরা নিজেদের আমেরিকান হিসেবে গণ্য করবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন এবং তার শিক্ষা বিষয়ক সংস্কারক হোরাস মান যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে, একটি কমন নাগরিক মূল্যবোধ এবং ঐক্য গড়ে তুলতে পাবলিক স্কুলগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম।
কিন্তু জাতীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠা করার প্রক্রিয়া অনেক দীর্ঘ। পাবলিক স্কুলগুলো প্রতিষ্ঠা করতে যথেষ্ট সময় লাগে। তেমনিভাবে শিক্ষার পাঠ্যক্রম প্রণয়নে এবং শিক্ষকদের পাঠাদান প্রক্রিয়াও সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। এতে শিশুদের শিক্ষিত করতে এবং সমাজ পরিচালনায় নেতৃত্ব গ্রহণ করতেও অনেক সময় চলে যায়। ফলে সশস্ত্র দ্বন্দ্ব-সংঘাত ছাড়াই জাতীয় রাজনৈতিক মতবিরোধ সমাধানে যথেষ্ঠ ঐক্য অর্জনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম অপেক্ষা করতে হয়েছে। তারপরেও ১৯৩০ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে শুধুমাত্র ইংরেজি ভাষায় পাঠদানকে যথেষ্ঠ হিসেবে গণ্য করা হতো না।

বর্তমান বিশ্বে আফগানিস্তান ছাড়া এমন কোন দেশ নেই যার একটি কমন (Common) পরিচয়ের প্রয়োজন আছে। কারণ এদেশটির সরকারিভাবে স্বীকৃত ১৪টি এথনিক গ্রুপ আছে যাদের জীবনযাপন বা কথা বিনিময় হয় ৪টি আলাদা অঞ্চল নিয়ে গঠিত জনগণকে নিয়ে। তারা প্রায় ৪০ থেকে ৫৯টি মাতৃভাষায় কথা বলে। দেশটি দশকের পর দশক ধরে গৃহযুদ্ধে বিভক্ত হয়ে পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলো। তাদের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও আস্থা প্রতিষ্ঠা করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে যখন ২০০১ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা জোট দেশটিতে আক্রমণ চালায়।
ফলে পশ্চিমাদের এমন প্রত্যাহারের সময়কালে দেশটির বিভাজিত জাতীয় পরিচয়ের প্রভাবটিকে দূর করতে পারেনি। দেশটিতে চলমান অবিরাম গৃহযুদ্ধ এবং সাম্প্রতিককালে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো এটা আরও স্পষ্ট করেছে যে, এর জাতিগত ও ভাষাগতভাবে পরিচালিত রাজনৈতিক বিভাজনগুলো আজ যতটা গভীর হয়েছে, তেমনিভাবে ২০ বছর আগে পশ্চিমাজোট যখন দেশটি দখল শুরু করেছিলো সেগুলো তখনও বিদ্যমান ছিলো।
যদিও আফগানিস্তানে সামগ্রিক শিক্ষার মান বাড়ানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রচুর অর্থ ব্যয় এবং প্রচেষ্টা চালিয়েছিলো কিন্তু শেষ অবদি একটি সাধারণ পাঠ্যক্রম প্রণয়ন ছাড়াই তারা দেশটি ত্যাগ করলো। দেশটিতে বর্তমানে দুটি সরকারি ভাষা আছে, দারি ও পশতু এবং এ দুই ভাষাতেই সংবাদ প্রকাশ ও সম্প্রচার করা হয়। কিন্তু বহু আফগান নাগরিক এ দুটো ভাষার একটি বা কোনটিতেই কথা বলে না।
আফগানিস্তানে একটি সাধারণ জাতীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররা এমন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন থেকে দূরে সরে গেছে যা তাদেরকে সাংস্কৃতিক অসংবেদশীলতার অভিযোগ থেকে মুক্ত রাখতে পারে। ভয়াবহ সাংস্কৃতিক সংযোজন বা নির্মূলনীতির পরিপেক্ষিতে তাদের ভয় অযৌক্তিক ছিল না। কেননা এটা ঐতিহাসিকভাবে সত্য যে, তারা দেশিয় বা বৈদেশীয়ভাবে ভাষা সংস্কৃতির বিজাতীয়করণ করেছে।
কিন্তু জাতীয় পরিচয় বৈষম্যমূলক বা জোরপূর্বকভাবে প্রতিষ্ঠা করা ঠিক নয়। সুইজারল্যান্ডের মতো ইউরোপীয় দেশগুলো দেখিয়েছে যে, শান্তিপূর্ণভাবে একাধিক ভাষার সমন্বয়ে একটি জাতীয় পরিচয় নির্মাণ করা সম্ভব। এর মূল নির্দেশনা হলো, একটি শিশুকে কয়েকটি ভাষা শিখতে উদ্বুদ্ধ করা যাতে করে ভাষা বিভাজনের কারণ হয়ে না দাঁড়ায়। একইভাবে একটি দেশের সাধারণ ইতিহাসে সেখানকার সকল জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্তি নিশ্চিত করাও জরুরী।

তাছাড়া শিক্ষাগত অনুপ্রেরণাও শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হতে পারে। জাতিগত সংখ্যালঘু শিশুদের বোর্ডিং স্কুলে যেতে বাধ্য করে অতীতের ভয়াবহ ভুলের পূনরাবৃত্তি করার প্রয়োজন নেই, যেটা উনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া করেছিলো। এটা বহুলভাবে প্রমাণিত যে, আর্থিকসহ এ ধরণের অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতা প্রদানের ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্কুলে ছাত্র-ছাত্রী উপস্থিতির হার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এ ধরণের নীতিগুলোর আংশিক সীমাবদ্ধতা হলো এগুলো বাস্তবায়ণে নির্ধারিত সময়ের আবশ্যিকতা। প্রথমত, দেশগুলোর পর্যাপ্ত শিক্ষকের প্রয়োজন যারা একাধিক সাধারণ ভাষায় একটি সাধারণ পাঠ্যক্রম শিক্ষা দিতে পারে। এমনকি ১৯২০ এর দশকেও যুক্তরাষ্ট্রের স্কুলগুলোতে অভিবাসী শিশুদের তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষা দেয়া হয়েছিলো এবং শিক্ষক নিজেই সেই ভাষাগুলো জানতেন।
তাছাড়া প্রথম প্রজন্ম যদি দ্বিতীয় প্রজন্মকে শিক্ষা দেয় তবে জাতীয়ভাবে সম্মিলিত প্রজন্ম তৈরি হয়। পরবর্তীতে তারা প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে স্বতস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে। কেউই কমপক্ষে ৪০ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে জাতীয় পরিচয়ের প্রভাব ধরে রাখতে চায় না বা পারে না। উল্লেখ্য যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্রদের কেউই এত লম্বা সময় ধরে আফগানিস্তানে থাকতে চায়নি।
একটি যুদ্ধের জন্য ২০ বছর অনেক দীর্ঘ সময়। কিন্তু তা একটি স্থিতিশীল কমন জাতীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠার জন্য কখনোই যথেষ্ঠ নয়। একইভাবে এতে অবাক হবার কিছু নেই যে, পশ্চিমারা আফগানিস্তানে নিজেরাও ব্যর্থ হয়েছে এবং আফগান জনগণকে ব্যর্থ করেছে। কারণ আফগানরা কখনোই অর্থপূর্ণ উপায়ে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে চায়নি। যখনই পশ্চিমাদের প্রত্যাহার ঘটেছে তখনও আফগান দেশটি জাতীয় পরিচয়ের বিবেচনায় আগের মতোই খন্ডিত থাকছে। একটি দমনমূলক সরকার আর গৃহযুদ্ধের মধ্যে পূর্বের ন্যায় একই রকম অসন্তুষ্টির পছন্দ নিয়েই চলতে হচ্ছে আফগানদের।
ন্যান্সি কিয়ান: নর্থ ওয়েস্ট্রার্ণ ইউনিভার্সিটির কেলগ স্কুল অব ম্যানেজমেন্টের ম্যানেজারিয়াল অর্থনীতি এ্যান্ড ডিসিশন সায়েন্স এর অধ্যাপক। চায়না ইকন ল্যাব এ্যান্ড নর্থ ওয়েস্টার্ণ চায়না ল্যাব এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক।
স্বত্ত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
অনুবাদ: শহীদ রাজু