আখি সীমা কাওসার, রোম, ইতালি প্রতিনিধিঃ ইতালিতে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎসব পবিত্র ঈদুল-আজহা, অনেকটা সাদামাটাভাবে উদযাপিত হয়েছে। কিন্তু ছিলোনা আনন্দের ছোঁয়া। কারণ “চীনের উহান” শহর থেকে শুরু হওয়া ২০১৯ এর ডিসেম্বর থেকে করোনা ভয়াবহতা একটুও কমেনি, বরং দিন দিন চরিত্র বদলিয়ে আক্রমণ করছে বয়োবৃদ্ধ সহ যুবক যুবতীদের । কোথাও কোথাও এমনও শোনা যাচ্ছে করোনার ভ্যাকসিন নেওয়ার পরেও অনেকেই করোনায় আক্রান্ত হয়েছে এবং কেউ কেউ পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে । করোনার তান্ডব আজও থামেনি, দেশ থেকে দেশান্তরে উড়ে বেড়াচ্ছে বাতাসের মত । ইউরোপের কোন কোন দেশ কিছুটা করোনার প্রকোপ থেকে নিস্তার পেলেও, আবারও করোনা বাড়ছে ইতালিসহ ইউরোপের অনেক দেশেই এবং লন্ডনে।
ইউরোপের দেশ সহ লন্ডনেও লকডাউন কিছুটা শিথিল করলেও, আবারও পুরোদমে লকডাউন দিবে কোন দেশ। করোনার কারনে অনেক দেশেই, ব্যবসা-বাণিজ্যেসহ সকল কিছুতেই অর্থনীতির ধ্বস নেমেছে, দেশগুলোতে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে, ইউরোপের দেশে দেশে বেকারত্বের হার বাড়ছে অনেক গুন। মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ কি হবে আগামীতে? বিশ্ব অর্থনীতিবিদদের ভবিষ্যৎ বাণী কঠিন পৃথিবী অপেক্ষা করছে আমাদের প্রজন্মের জন্য । কারও কারও মনে প্রশ্ন, আমরা কি আগের মত উন্মুক্ত পৃথিবী ফিরে পাবো? মাক্স ছাড়া মানুষ উন্মুক্ত বিচরণ করতে পারবো কি?
এখন আবার ইউরোপের দেশগুলোতে প্রচন্ড তাপদাহ পড়ছে। আবহাওয়াবিদরা বলছে ২৪/২৫ জুলাই ভয়াবহ গরম অপেক্ষা করছে ইউরোপ বাসীদের জন্য । এই দুইদিন জনগণকে বাইরে শুধু শুধু ঘুরাফেরা করতে নিষেধ করা হয়েছে এবং বেশি বেশি পানি খেতে বলা হয়েছে। এরই মধ্যে মানুষের চলাফেরা করতে হয়, কাজে যেতে হয়, এই প্রচণ্ড গরমে মাক্স দিয়ে চলাফেরা করা মানুষের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে । তারপরেও উপায় নেই মাক্স দিয়ে কিছুটা হলেও করোনার হাত থেকে রেহাই পাবার চেষ্টা । মাক্স ছাড়া একজন মানুষ একেবারেই নিরাপদ নয়। এটা বারবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলে দিচ্ছে ।

করোনা পৃথিবী থেকে কবে নাগাদ বিদায় নেবে,বা নেবে কিনা? তাও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একরকম এখনো সঠিকভাবে বলতে পারছেনা । তদ্রুপ বড় বড় বিজ্ঞানীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ বাড়ছে। ১০০% কার্যকরী ভ্যাকসিন এখনো আবিষ্কার হয়নি। যারা দ্বিতীয় ডোজ এরই মধ্যে নিয়েছে, তাদের অপেক্ষা করতে হবে, যখন থেকে প্রথম ডোজ দিয়েছে ঠিক, তার ১১ মাস পরে আবারও নতুন করে ভ্যাকসিন নিতে হবে, ধারাবাহিক ভাবে । একজন মানুষ প্রতিবছরই এই ভ্যাকসিন নিতে হবে।
এত কিছুর মাঝেও মুসলমানদের ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে ঈদ উদযাপন এবং কিছুটা হলেও আনন্দ করা। যেহেতু এটা ধর্মীয় ঈদ, তাই ঈদের জামাত পড়তে হবে, আল্লাহ পাকের নামে কুরবানী করতে হবে, কোরবানি করার তৌফিক যার আছে, সেই কেবলমাত্র দেশে এবং বিদেশে কোরবানি করেছে। এখানে অনেকেই আছে মধ্যরাত পর্যন্ত কোরবানির মাংস নিজ হাতে প্রতিবেশী পরিচিত বন্ধুদের মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছে । ২০ জুলাই মঙ্গলবার ইতালিতে ঈদুল আযহা উদযাপন করা হয়েছে। প্রতি বারের মত এবারও দেশটির জনবহুল এলাকা লারগো প্রেনেসতিনা (Largo Prenestina), পিয়াচ্ছা ভিত্তোরিও (piazza Vittorio ) এবং রোমের বড় মসজিদ, খোলা মাঠসহ আরো অনেক স্থানেই ঈদ উদযাপন করেছে বাংলাদেশিসহ অন্যান্যা দেশের অভিবাসীরা। প্রথম জামাত অনুষ্ঠিত হয় সকাল সাড়ে সাতটায়।
দ্বিতীয় জামাত সাড়ে আটটায় অনুষ্ঠিত হয়। পর্যায়ক্রমে মুসল্লীদের উপস্থিতির উপর নির্ভর করেই জামাতের সংখ্যা বাড়ানো হয়। তবে কোভিড-১৯ এর কারণে তেমন কোন আনন্দমুখর পরিবেশ দেখা যায়নি। এমনকি জামাত শেষে কেউ কারো সাথে আলিঙ্গন করতে পারেনি, বিধিনিষেধ, স্বাস্থ্যসম্মত দিক মানার কারণে। তাছাড়া মঙ্গলবার কর্মদিবস থাকায় অনেকেই ঈদের জামাত আদায় করতে পারেনি। যেহেতু বাংলাদেশিদের ঈদ ছাড়া আরও বিশেষ দিনগুলোতে এদেশে কোন স্পেশাল বন্ধ নেই, কাজের তাড়নায় অনেকেই ঈদ আনন্দ এবং ঈদ জামাত থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

উল্লেখ্য প্রশাসনের কড়া নিরাপত্তার মধ্যে শান্তিপূর্ণ ভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে জামাতগুলো শেষ করা হয়। উক্ত ঈদের নামাজে বাংলাদেশের মুসলিমদের সাথে নামাজ আদায় করেন রোম বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সিলর (শ্রমকল্যাণ) মোঃ এরফানুল হক। একিই দিনে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে ইতালির ভেনিস, আনকোনা, মোদেনাসহ আরও অনেক স্থানে। ঈদের জামাতে ইতালি প্রবাসী বাংলাদেশিরা,ছাড়াও অন্য দেশের মুসলমানরাও অংশগ্রহণ করে। জামাত শেষে প্রবাসি বাংলাদেশিরা জানায়, আমরা ইতালিতে সেই আগের মত ঈদের আনন্দ অনুভব করতে পারিনি। করোনা আমাদের জীবনযাত্রাকে সীমিত করে দিয়েছে। সংকীর্ণ করে দিয়েছে সামাজিক যোগাযোগ, আমাদের অনেক আনন্দকে বিলীন করে দিয়েছে এই মরণব্যাধি করোনা । ঈদ জামাত শেষে আলিঙ্গণ করা যে আনন্দ, সেটি আর হয়ে উঠেনি করোনার কারণে। করোনা মুক্ত পৃথিবী ফিরে না এলে আমরা হারানো ঈদের আনন্দ আর ফিরে পাবো কিনা জানিনা। উল্লেখ্য, ঈদুল আজহায় বেশির ভাগ স্থানে দুটি করে জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। আবার কোন কোন স্থানে তৃতীয় ও চতুর্থ জামাত হতে দেখা গিয়েছে ।