রোটারিয়ান মো. জাহাঙ্গীর আলম হৃদয়:
যখন পড়বেনা মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে
আমি বাইবোনা,আমি বাইবোনা মোর
খেয়া তরি ঘাটে
চুকিয়ে দিবো বেচা কেনা
মিটিয়ে দিবো গো
মিটিয়ে দিবো লেনা দেনা
বন্ধ হবে আনা গোনা এই হাঁটে
তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে
তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাইবা আমায় ডাকলে
যখন পড়বেনা মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে
যখন জমবে ধুলা তানপুরাটার তারগুলায়
কাঁটালতা – কাঁটালতায় উঠবে ঘরের দারগুলায়
আহ আহ জমবে ধুলা তানপুরাটার তারগুলায়
ফুলের বাগান – ঘন ঘাসে পড়বে শয্যা বন বাসে
শেওলা এসে ঘিরবে দিঘীর ধারগুলায়
তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে
তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাইবা আমায় ডাকলে
তখন এমনি করে বাজবে বাঁশি এই নাটে
কাটবে – দিন কাটবে – কাটবে গো দিন
আজও যেমন দিন কাটে আহ আহ
এমনি করেই বাজবে বাঁশি এই নাটে
ঘাটে ঘাটে খেয়া তরি এমনি
এমনি সেইদিন ফুটবে ভরি
চড়বে গরু খেলবে রাখাল ঐ মাঠে
সেই দিন আমায় নাইবা মনে রাখলে
তখন কে বলেগো সেই প্রভাতে নেই আমি
সকল খেলায় – সকল খেলায় করবে খেলা এই আমি – আহ আহ কে বলেগো সেই প্রভাতে নেই আমি
নতুন নামে ডাকবে মোরে বাঁধবে –
বাধবে নতুন বাহু ডোরে
আসবো যাবো চিরদিনই সেই আমি
তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে
যখন পড়বেনা মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে।
গীতিকারের লেখা, শিল্পীর কন্ঠে গাওয়া এই গানটির বাস্তবতায় আমাদের সকলের জীবন – আল্লাহর বিধান অনুযায়ী জন্মগ্রহণ করি এবং তাহার হুকুমেই আমাদের সবাইকে দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতে হবে।
আর তারই ধারাবাহিকতায় চলছে সব কিছুই।
তবুও হঠাৎ করে কিছু প্রিয় মানুষদের চলে যাওয়াটা অনেক বেদনার।
প্রিয় পাঠক আজ আপনাদের সামনে আমার ক্ষুদ্র লিখনির মাধ্যমে তুলে ধরছি সেই প্রয়াত প্রিয় মানুষ ও শাহরাস্তি মেহের ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক কবিরুল ইসলাম মজুমদার স্যারের সাথে আমার স্মৃতিময় মুহূর্তগুলোর কিছু স্মৃতি কথা। যিনি গত ৩১ জুলাই ২০২০ রাত ১১ টার দিকে আমাদের ছেড়ে চিরকালের জন্য দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে চলে গেছেন না ফেরার দেশে।
প্রয়াত কবিরুল ইসলাম মজুমদার স্যারের সাথে আমার পরিচয় হয় ১৯৯৬ সালে মেহের ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ বীর মুক্তিযোদ্ধা এম এ আউয়াল মজুমদার স্যারের মাধ্যমে। আমি তখন কবিতা, গল্প লিখতাম । অপর দিকে আমার প্রতিষ্ঠিত শাহরাস্তি অপরূপা নাট্যগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক সংগঠন এর মাধ্যমে সামাজিক কাজগুলি করতাম উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নের গ্রামে -গঞ্জে। উপলতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে দেখা হয় অধ্যক্ষ এম এ আউয়াল মজুমদার স্যারের সাথে, সেখানে তিনি শাহরাস্তি অপরূপা নাট্যগোষ্ঠীর কাজ দেখে আমায় ডেকে নেন এবং অনেক আদর করেন, তখন আমি স্যারকে বলেছি স্যার শাহরাস্তি অপরূপা নাট্যগোষ্ঠীতে আপনাকে প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে দেখতে চাই। তিনি অনায়াসে রাজি হয়ে গেলেন, এরপর শাহরাস্তি মালরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে প্রিন্সিপাল এম এ আউয়াল মজুমদার – প্রয়াত কবিরুল ইসলাম মজুমদার স্যারের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। স্যারের সাথে অনেক কথা হয়।
পরে কবির স্যারকে শাহরাস্তি অপরূপা নাট্যগোষ্ঠীর উপদেষ্টা করা হয়। তখন থেকেই তিনি আমায় আসার যাওয়ার পথে ভালো কাজ গুলি বেশি বেশি করে করার পরামর্শ দিতেন।
নিজের আপন বড় ভাই ও অভিবাবকের মতই আদর স্নেহ করতেন। মেহের ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী হিসেবে তিনি সকল কাজে সহযোগিতা করতেন। আমার পড়া লেখা, বই, কাগজ কলম কিছু লাগবে কিনা জানতে চাইতেন। পরীক্ষার ফি সহ সকল কাজেই অধ্যক্ষ আউয়াল মজুমদার স্যারকে বলে মাফ করিয়ে দিতেন। তিনি আমার ভাই, বোনদেরও কলেজ জীবনের শিক্ষক ছিলেন।

আমায় বলতেন তুমি ভালো লিখতে জানো, উপস্থাপক হিসাবে কাজ করলে জীবনে ভালো করবে। অভিনয় করতে পারো, জীবনে একদিন তুমি অনেক বড় হবে, পৃথিবীর যেখানেই যাবে তুমি ভালো করবে। তোমার জন্য দোয়া থাকবে সবসময়। স্যারের সাথে অনেক স্মৃতি – স্যারের কারণেই দৈনিক চাঁদপুর কন্ঠে কাজ শুরু করি। দৈনিক চাঁদপুর কন্ঠের প্রধান সম্পাদক কাজী শাহদাত ভাইয়ের ছোট ভগ্নিপতি ছিলেন কবির স্যার। এর আগে আমি জেলার অন্যন্য পত্রিকায় লেখালেখি করতাম। স্যারের কারণেই দৈনিক চাঁদপুর কন্ঠে যাওয়া হয়,পরিচয় হয় প্রিয় শাহদাত ভাইয়ের সাথে।
ব্যাক্তি জীবনে স্যারের পরামর্শ নিতাম এটিএন বাংলায় তারকা প্রতিযোগিতায় আমি অংশ নিয়ে অভিনয় শিল্পী হিসাবে কাজ করার সুযোগ পাই, এই কাজে সহযোগিতা করেছেন চাঁদপুর এটিএন বাংলা চ্যানেল এর জেলা প্রতিনিধি পার্থ নাথ চক্রবর্তী দাদা। যাই হোক সে অনেক কথা পরিবারের সহযোগিতা না থাকায় ঢাকায় যেতে পারিনি।
শাহরাস্তি অপরূপা নাট্যগোষ্ঠীর সকল ভালো কাজ গুলিতে স্যার সহযোগিতা করতেন যেমন – কারো বই নেই, স্কুল ড্রেস নেই, কারো খাবার নেই শুনলেই কবির স্যার এগিয়ে আসতেন। দৈনিক চাঁদপুর কন্ঠে আমার কোন লেখা বা নিউজ প্রকাশিত হলেই কল দিয়ে ডেকে বলতেন অনেক ভালো হয়েছে, লিখে যাও। আর বাসায় আসবে আমি এখন কালিবাড়ির রাজমহলে থাকি, তুমি যখনি সময় পাও আসবে। স্যারের কথা লিখে শেষ করা যাবেনা। ২০০৮ সালে আমি প্রবাসে চলে আসি জীবন জীবীকার টানে এরপর প্রায় স্যারকে কল করলে বলতেন তোমার বিকল্প সেই মনের কাউকে পাইনি, তুমি কবে আসবে, চলে আসো।
২০১৮ সালের বাংলা একাডেমি আয়োজিত ২১শে বই মেলায় আমার লেখা প্রথম কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে শুনে স্যার আমাকে শুভেচ্ছা মেসেজ পাঠালেন। বল্লেন দেশে এলে তোমার হাত থেকেই বই নিবো। আমি বল্লাম ঠিক আছে, ২০১৮ সালে বাড়ি এসেই সরাসরি স্যারের বাসায় গিয়ে বই উপহার দিলাম, স্যার বই হাতে পেয়ে দারুণ খুশি। আমার বাড়িতে স্যার, রাজিয়া আপা সহ পুরো পরিবারকে দাওয়াত দিলাম, স্যার যথাসময়ে এলেন।
এরপর আমি আবার প্রবাসে চলে গেলাম। ২০১৯ সালে আবার দেশে গেলাম স্যার বল্লেন তুমি দেশে এসেছো অনেক ভালো হয়েছে – মেহের ডিগ্রি কলেজের নতুন ভবনের উদ্বোধন করবেন মাননীয় এমপি মহোদয় তুমি সেই অনুষ্ঠান বাস্তবায়ন সহ টেলিভিশনে নিউজ করে দিবে। তিনি কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা সাহাব উদ্দিন পাটোয়ারী চাচা, কলেজের অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান স্যার ও উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান মিন্টু ভাইকে বলে দিলেন। সবাই আমার কথা শুনে এবং ডেকে বল্লেন কবির সাহেব তোমায় অনেক ভালোবাসেন। কাজটি তুমিই করবে যেহেতু তুমি এই কলেজের শিক্ষার্থী এবং সাংবাদিকতায় আছো। যথারীতি আমি প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন সহ মোহনা টেলিভিশনে নিউজ করে দিলাম।

২০১৯ সালে শাহরাস্তি অপরূপা নাট্যগোষ্ঠী আয়োজিত উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে জাতীয় শিশু দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন শিক্ষার্থীদের মাঝে পুরুস্কার দেয়া হয়, অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার শিরীন আক্তার, সহকারি কমিশনার (ভূমি) উম্মে হাবিবা মিরা, কবির স্যার উপস্থিত ছিলেন। শাহরাস্তি অপরূপা নাট্যগোষ্ঠীর প্রচার সম্পাদক শিশু শিল্পী দামড়া স্কুলের শিক্ষার্থী আরমান হোসেন এর পড়ার বই নেই শুনে পাঞ্জেরি পাবলিকেশন এর মাধ্যমে বই নিয়ে দিলেন, এই কাজে আরেকজন সহযোগিতা করেন- শাহরাস্তি অপরূপা নাট্যগোষ্ঠীর উপদেষ্টা, সূচিপাড়া ডিগ্রি কলেজের সহকারি অধ্যাপক আবুল কালাম।
প্রয়াত কবিরুল ইসলাম মজুমদার স্যার ছিলেন শাহরাস্তি উপজেলার সকলের প্রিয় কবির ভাই, তিনি যখনি সুযোগ পেয়েছেন তখনি মানুষের উপকার করেছেন, মেহের ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থীদের পাঠাগারে এসে বই পড়ার জন্য উৎসাহ দিতেন। শাহরাস্তি অপরূপা নাট্যগোষ্ঠীর আরেক প্রয়াত উপদেষ্টা ছিলেন শাহরাস্তি বহুমুখী (সরকারি) উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সিদ্দিকুর রহমান।
স্থানীয় শিক্ষক, সংবাদ কর্মী সহ সকলের প্রিয় ছিলেন তিনি, আজ উনি নেই এই কথা দুরপ্রবাসে বসে ভাবতেই দু’চোখে পানি এসে যায়। প্রবাস থেকে কল দিলে হাসি মুখে করুণ সুরে হৃদয় বলে আর কেও ডাকবেনা। কবির স্যারের শুন্যতা পূরণ হবেনা – স্মৃতিতেই থাকবেন প্রিয় কবির স্যার। দোয়া করি মহান আল্লাহ উনাকে জান্নাতবাসী করুন – আমিন।
লেখক: সাংবাদিক, নাট্যকার, লেখক ও কবি