আবেদা সুলতানা: এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রাণী মানুষ, মানুষের আসলে অহঙ্কার করার মতো কিছুই নেই। তার জন্ম এবং মৃত্যুর ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তার জন্মের সময় এবং জন্মস্থান নিজ কর্তৃক নির্ধারিত নয়। কে কখন মারা যাবে তা জানার কোনো ব্যবস্থা নেই। মানুষ ইচ্ছা করলে নিজের শরীরটাকে ছোট বা বড় করতে পারে না। তার গায়ের রংটাও পরিবর্তন করতে পারে না। ইচ্ছা করলেই মানুষ আকাশে উড়তে পারে না, সাগর তলে বাস করতে পারে না এবং হাজার বছর ধরে বাচঁতেও পারে না। তবু মানুষের এই সব বিষয়ে কোনো ভাবনা নেই। অর্থবিত্ত আভিজাত্যের নেশায় মানুষ মশগুল। ক্ষমতার মোহে অন্ধ। জনগণের অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। মানুষকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। দুর্নীতি করে সম্পদ বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছে। বিলাসিতার শেষ নেই, চাহিদার সীমা নেই। অথচ এই সব অর্থ, সম্পদ, আভিজাত্য এবং ক্ষমতার বাহাদুরী সবই ছেড়ে মানুষকে এই পৃথিবী থেকে চলে যেতে হয়। যেই সম্পদ সে অর্জন করে, সেই সম্পদই সে ভোগ করতে পারে না। এটাই অনিবার্য বাস্তবতা। তবু মানুষের চাওয়া পাওয়ার শেষ নেই, অহমিকার অন্ত নেই।
মানুষেরা এই পৃথিবীতে যা কিছুই বানিয়েছে তার সবকিছুর উপাদান কিন্তু প্রকৃতিতেই বিদ্যমান। মানুষ কেবল চিন্তা, গবেষণা এবং পরিশ্রম করে সেটাকে ব্যবহারের উপযোগী করেছে। আমরা লোহা দিয়ে বাড়ি, বিমান, জাহাজ তৈরি করেছি। কিন্তু সেই লোহা তো প্রকৃতিরই দান। আমরা জ্বালানি তেল দিয়ে গাড়ি, বিমান, জাহাজ, কলকারখানা সবই চালাচ্ছি। কিন্তু সেই জ্বালানি তেলও প্রকৃতিরই দান। মানুষ সেটাকে কেবল ব্যবহার উপযোগী করছে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির চমকপ্রদ উপাদান কম্পিউটারের চিপসের মূল উপাদান সিলিকন তো প্রকৃতিরই অবদান। মানুষ গবেষণার মাধ্যমে সেটাকে কেবল ব্যবহার উপযোগী করেছে। এভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে প্রতিটি জিনিসই প্রকৃতির দান। যে সূর্য পৃথিবীকে আলো দেয়, যে চন্দ্রকে আমরা উপভোগ করি তাও প্রকৃতির দান। আবার সাগর, নদী, পর্বতও মানুষের হাতে সৃষ্ট নয়। যে অক্সিজেন আর পানি নিয়ে আমরা বেঁচে আছি, সেটাও প্রকৃতির দান। যে খাবার আমরা খাই, তাও সব প্রকৃতির অসীম দান। সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে মানুষ প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আসছে। জয়ীও হয়েছে। চূড়ান্তভাবে জয়ী হয়েছে বলা যায় না। প্রকৃতিও সুযোগ পেলে মানুষের ওপর আঘাত হানে। মানুষ তার সামনে অসহায়। পৃথিবীর আবহাওয়া ও পরিবেশ দূষিত হচ্ছে দ্রুত।নিত্যনতুন রোগ-জীবাণু জন্ম নিচ্ছে। উন্নত-অনুন্নত নির্বিশেষে দেশগুলোয় একেকটা ভয়ংকর রোগের মহামারী দেখা দিচ্ছে। এখন সারা বিশ্ব আতঙ্কিত চীন থেকে আগত করোনাভাইরাসের প্রকোপে। মৃত্যুদূতের মতো এই ভাইরাস সর্বত্র ছড়াচ্ছে। এটা কি মানুষের বুদ্ধিভ্রম আর কৃতকর্মের জন্য প্রকৃতির প্রতিশোধ? মনে হয় সেটাই সম্ভব। সেই আদিকাল থেকে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে গাছ কাটা চলছে অবাধে। আমাদের দেশে খাল-বিল-নদী বুজিয়ে ফেলা হচ্ছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা মাটির পাহাড় কেটে ফেলছে।
মানুষের তৈরি পলিথিন, নানা বর্জ্যদ্রব্য পরিবেশ দূষিত করে ফেলছে। তার ওপর বিজ্ঞানীদের সাবধানবাণী উপেক্ষা করে বছরের পর বছর সমুদ্রের জলে পরীক্ষামূলকভাবে আণবিক বোমার বিস্ফোরণ এবং তেজস্ক্রিয় বর্জ্য থেকে বিষাক্ত রাসায়নিকের সংক্রমণে ক্যান্সার, নিউকোমিয়া ইত্যাদি ঘাতক রোগের ক্রমশ ব্যাপক বিস্তার ঘটছে। সারা বিশ্বের পরিবেশ ও আবহাওয়া এমনভাবে দূষিত হচ্ছে যে, এখনি তার প্রতিকার ব্যবস্থা না হলে সারা বিশ্বে বিপর্যয় দেখা দেবে। কিন্তু মানবসভ্যতার এই বিপদাশঙ্কা সম্পর্কে একেবারেই নির্বিকার। প্রকৃতি-দূষণের আরও একটা বিপজ্জনক দিক হল পুরনো রোগ ও নতুন রোগের মহামারী আকারে প্রাদুর্ভাব। বাংলাদেশে এক সময় ছিল ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, কলেরার মহামারীরূপে বিস্তার লাভ। তা রোধ করা গিয়েছিল। সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল পরপর দু’বার ডেঙ্গুর মহামারীরূপে দেখা দেয়া। তা পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা পর্যন্ত ছড়িয়েছিল।এখন আণবিক বোমার চাইতেও যে ভয়ানক শত্রু, বিশ্বের উন্নত উন্নয়নশীল নির্বিশেষে বহু দেশের দুয়ারে এসে দাঁড়িয়েছে তার নাম করোনাভাইরাস।
প্রকৃতিকে মিত্র না বানিয়ে তার সঙ্গে শত্রুতা করে বিশ্বের মানুষ যদি শুধু নিজের স্বার্থ ও সুবিধা দেখে, তাহলে প্রকৃতি যে তার প্রতিশোধ নেবে এবং নিচ্ছে, এটা দৃশ্যমান । জনসংখ্যাবিদ ম্যালথাস বলেছিলেন। মানুষ যখন বিশ্বে তার সংখ্যা এমনভাবে বাড়াতে থাকে যে, প্রকৃতির জন্য তা ভারবাহী হয়ে ওঠে, তখন প্রকৃতিই নিজে ঝড়, বন্যা, ভূমিকম্প, দুর্ভিক্ষ, মহামারী দ্বারা এই জনসংখ্যা কমিয়ে ভারসাম্য আনে। আর, জ্ঞানবিজ্ঞানের উৎকর্ষ সব অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে না। চিকিৎসাবিজ্ঞান একজন মানুষের রোগ নিরাময়ে সক্ষম। কিন্তু তাই বলে মানুষকে অমরত্ব দানে সক্ষম নয়। নারী গর্ভে থাকা সন্তানটি ছেলে নাকি মেয়ে তা প্রসবের আগে জানা সম্ভব। কিন্তু তাই বলে ইচ্ছামত ছেলে অথবা মেয়ে শিশুর জন্ম দেয়া সম্ভব নয়। মানুষ তার ইচ্ছামত দিনরাত্রিকে যেমন বড় ছোট করতে পারে না, ঠিক তেমনি রোদবৃষ্টি আর শীতকে ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। একইভাবে ভূমিকম্প, অতিবৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগকে বন্ধ করার উপায় ও মানুষ আবিষ্কার করতে পারেনি। কারণ, মানুষের জ্ঞান এবং ক্ষমতার একটি সীমারেখা আছে, যা অতিক্রম করা কোনো মানুষের পক্ষে কোনো দিনও সম্ভব নয়। এই বাস্তবতাকে মানতেই হবে।

করোনা ভাইরাসের কাছে পুরো পৃথিবীই আজ বিপর্যস্ত। পৃথিবীর প্রায় দু’শরও বেশি দেশে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। ভয় এবং আতঙ্ক সবাইকে গ্রাস করেছে। উন্নত-অনুন্নত বলে কথা নেই, সব দেশের বড় বড় শহরের রাস্তাঘাট ফাঁকা। শহরে জনগণের কোলাহল নেই, কাজের ব্যস্ততা নেই। কারো সাথে কেউ প্রাণ খুলে কথা বলছে না। রাস্তা-ঘাটে লোক চলাচল নেই বললেই চলে। যারাই চলাচল করছে, তারা সবাই মাস্ক পরে মুখ ঢেকে চলাচল করছে। স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ। ক্যাম্পাসে ছাত্রছাত্রী নেই, শপিং মল বন্ধ, পর্যটন কেন্দ্রসমূহ বন্ধ, সি-বিচে মানুষ নেই। ফাইভ স্টার হোটেলগুলোতে লোক নেই, রেস্টুরেন্টগুলো বন্ধ, বিশ্ব বিখ্যাত ফুটবল লীগের খেলা বন্ধ। ফুটবল মাঠে খেলা নেই, গ্যালারিতে দর্শক নেই। বিমানে যাত্রী কম, তাই ফ্লাইট সংখ্যা কমে গেছে।
বিভিন্ন দেশের বড় বড় পুঁজিবাজারগুলোতে ধ্বস নেমেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আমদানি-রপ্তানির পরিমাণ কমে গেছে। কোথাও আজ উৎসব মুখর পরিবেশ নেই। সর্বত্রই ভয়, আতঙ্ক এবং স্থবিরতা। মনে হচ্ছে পুরো পৃথিবীটাই যেন আজ থমকে গেছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে আজ মন্দার ঢেউ । জ্ঞানবিজ্ঞানের এত আবিষ্কারের যুগে করোনা নামক একটি ভাইরাসের আক্রমণে মানুষ মারা যাবে তা ভাবতেও কষ্ট হয়। কিন্তু বাস্তবে তাই এখন সত্য। জ্ঞানবিজ্ঞানে অতি উন্নত এবং অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে শক্তিশালী দেশসমূহ যখন অতিব ক্ষুদ্র একটি ভাইরাসের কাছে পরাজিত হয়, তখন মানুষের উচিত বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা এবং গবেষণা করা। মানুষের আজ অহমিকার শেষ নেই, দাম্ভিকতার অন্ত নেই। একটু ক্ষমতা পেলেই বাহাদুরি করতে কোনো কমতি থাকে না। মানুষ বেপরোয়া এবং যখন যা খুশি করে বেড়ায়। অপরের অধিকার কেড়ে নেয় এবং মানুষকে নির্যাতন করে।
করোনা নামক একটি ভাইরাসের কাছে মানবজাতির পরাজয়ের মধ্য দিয়ে মানুষের অসহায়ত্বের বিষয়টি আবারো দিবালোকের মতো ফুটে উঠেছে। জ্ঞানবিজ্ঞানে মানুষের অভূতপূর্ব উন্নতির যুগেও তারা একটি ভাইরাসের হাত থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারছে না। আতঙ্কে মানুষের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। একে অপরের সাথে স্বাভাবিকভাবে দেখা করছে না, কথা বলছে না এবং সবাই আতঙ্কিত। সুতরাং মানুষের উচিত তার অসহায়ত্বের বিষয়টি নিয়ে চিন্তা এবং গবেষণা করা। তার উচিত অহমিকা, অহংকার এবং দম্ভ পরিহার করা। তার উচিত অন্যায় কাজকে পরিহার করা এবং সত্য-ন্যায়ের পথে চলা। তার উচিত মানুষের প্রতি ন্যায়বিচার করা এবং মানুষের ওপর দমন-নিপীড়ন বন্ধ করা। তার উচিত স্রষ্টার কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করা এবং অতীত ভুলের জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করা। তা না হলে মানুষের জন্য দুঃখ এবং কষ্টই হবে একমাত্র অর্জন।সুতরাং মানুষের উচিত বাস্তবতায় ফিরে আসা, বাস্তববাদী হওয়া এবং এই মহাবিশ্বের স্রষ্টার কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করা।
সুতরাং আসুন, আমরা সবাই নিজেদেরকে জানি, স্রষ্টাকে জানি এবং তাকে মানি। কীভাবে এই পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাব হলো, এই পৃথিবীতে আমাদের কাজ কী এবং মরণের পরে কী হবে সে সব বিষয় জানা এবং সেই অনুযায়ী পথ চলা আমাদের অপরিহার্য দায়িত্ব। তাহলেই কেবল মানুষের জীবন শান্তির এবং সুখের হবে। তা না হলে মানুষের জন্য দুঃখ আর কষ্ট ছাড়া আর কিছুই নেই যা কারোর কাম্য নয়।
লেখক: কবি ও লেখিকা