প্রবাস মেলা ডেস্ক: মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়েছে ১৯৭১ এ। আমরা পেয়েছি বিজয় ষোলই ডিসেম্বরে। কিন্তু ১৪ ডিসেম্বরে বুদ্ধিজীবী হত্যার করুণ কাহিনী কি ভুলবার মত? সারা বিশ্বের স্বাধীনতার স্বপক্ষের মানুষের বুকে এখনো গেঁথে আছে স্বাধীনতার তীব্র বেদনা। তাই টরন্টোবাসী দায়িত্বের সাথে হাতে নিয়েছে একটি অনুষ্ঠানের, যার মাধ্যমে আমাদের শহীদ বুদ্ধিজীবিদের আত্মাকে সন্মান ও শ্রদ্ধা জানানো হয়।
এই পুর্বপরিকল্পিত হত্যাকান্ডের ব্যাপারে আমাদের নতুন প্রজন্মসহ যারা এই ইতিহাস জানে না তাদের সাথে ইতিহাসের সত্যতা ভাগ করে নিতে, সচেতন করতে। টরন্টোর ফ্রিজিং রেইন ও চরম দুর্যোগময় আবহাওয়াকে উপেক্ষা করে ১৪ই ডিসেম্বর, শনিবার ২০১৯, ১৬ ডোম এভিনিউতে অবস্থিত HCM অডিটোরিয়ামে মঞ্চস্থ হয় “স্বাধীনতার বেদনা” নাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

এই নাটকটি রচনায় ও নির্দেশনায় ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রী, সকলের অতি পরিচিত ব্যক্তিত্ব অর্চনা সাহা। তিনি যুদ্ধের সময় অনেক অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গিয়েছিলেন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন স্বক্রীয় রাজনীতিক কর্মী ও প্রতিবাদী কন্ঠ ছিলেন। তিন মাসের অবিরাম রিহার্সেল আর টরন্টোর ব্যস্ত জীবনের সময়কে ম্যানেজ করে নয়জন অভিনেতা অভিনেত্রী নিবেদিত প্রাণ ছিল এই নাটককে মঞ্চায়নের জন্য। যান্ত্রিক ত্রুটি বাদ দিলে নাটকটির সফল মঞ্চায়ন হয়েছে।
সার্বিকভাবে বলতে গেলে নাটকটি দর্শকের মনকে নাড়া দিতে সক্ষম হয়েছে। তারা জেনেছে যুদ্ধোত্তর স্বাধীন বাংলাদেশে এইসব রাজাকারেরা প্রিয় বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমার সুযোগ নিয়ে কিভাবে ঝাঁকিয়ে বসে আছে দেশের সর্বত্র। নাটকের আবহ সংগীতে ছিলেন বাসুদেব দত্ত।
নাটকই শুধু ছিল না এই অনুষ্ঠানে, বিভিন্ন রকমের পরিবেশনায় ভরপুর ছিল সন্ধ্যা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত।
অনুষ্ঠানের প্রথমে শ্রদ্ধা ও সম্মাননা প্রদান করা হয় দেশের বরেণ্য বীর মুক্তিযোদ্ধাদের যাদের কাছে আমাদের ঋনের অন্ত নেই, গোটা জাতি যাদের কাছে কৃতজ্ঞ। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে কনসাল জেনারেল নাইম উদ্দীন আহাম্মেদ ও কমিউনিটির অভিভাবক কবি আসাদ চৌধুরী তাদেরকে পুষ্পস্তবক, উত্তরীয় প্রদান করেন। তারপর একদল শহীদ আত্মার অতৃপ্ত আত্মার মোমবাতি হাতে আগমন ও তাদের স্বজন হারানোর আর্তি জানিয়ে বিদায় নেবার পরে মঞ্চে শিল্পী মুক্তিপ্রসাদ ও শিশুদের কন্ঠে জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয় যথাযোগ্য ভাবগম্ভীর পরিবেশে।

বিভিন্ন সংগীত কলা ও নাচের স্কুলের প্রায় ৯৬ শিশু-কিশোর এতে অংশগ্রহণ করে। নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা পরিবেশন করে দেশাত্ববোধক গানের পর্ব, বাংলা প্রাণের সুর, পরিচালনায় ছিলেন সোমা চৌধুরী এবং ড: অরুনাভ। উদীচীর গণসংগীতের পর্বটিও দর্শক নন্দিত হয়।তা পস দেব ও চিত্রা দাসের পরিচালনায় নৃত্যানুষ্ঠানটি ছিল অনব্দ্য ও উপভোগ্য।
অনুষ্ঠানের সাবলীল উপস্থাপনায় ছিলেন চয়ন দাস ও রুমা মোদক। পৃষ্ঠপোষতায় ছিলেন HCM এর কর্মীবৃন্দ, ব্যারিষ্টার চয়নিকা দত্ত, চিত্ত দাস, মিঠু সোম, আলী রেজা প্রিন্টিং , কানিজ বুটিক সহ আরো অনেকে। মিহির দাস এর পরিচালনায় অনুষ্ঠিত হয় শিশুদের জন্য চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা। বিচারক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চিত্রশিল্পী সৈয়দ ইকবাল ও আরো কয়েকজন। অনুষ্ঠিত হয় নতুন প্রজন্মের জন্য নির্ধারিত বক্তৃতা। বীর মুক্তিযাদ্ধা আর যারা আমাদের মাতৃভুমির জন্য প্রাণ দিয়েছেন তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয়- মুক্তিযুদ্ধ আমাদের গৌরব, আমাদের অহংকার এটা আমরা সবাই লালন করি অন্তরে।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে অর্চনা সাহা ও শুভ্রা সাহা আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও সাধুবাদ জানান সবাই কে যারা এই কঠোর পরিশ্রমের নিবেদন- “ স্বাধীনতার বেদনায় “ অংশগ্রহন করেছেন, পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগীতা করেছেন। যে সকল দর্শকেরা প্রতিকুল আবহাওয়াকে উপেক্ষা করে এসেছেন তারা সীমাহীন প্রশংসার দাবীদার। দেশের স্বাধীনতার প্রতি গভীর মমত্ববোধ থেকে সুদূর ওয়াটারলু (১৫০ কিমি দূরত্ব) থেকে এবং নিউমার্কেট থেকেও দর্শক এসেছেন ধীর লয়ে গাড়ি চালিয়ে। যারা অনুষ্ঠানের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত উপস্থিত থেকে ছবি তুলেছে, ভিডিও করেছে , ফেসবুকে লাইভ দিয়ে সারা বিশ্বে অনুষ্ঠানকে শেয়ার করেছে তাদের মধ্যে অন্যতম হলো নাশিদা চৌধুরী, মোহাম্মেদ তোহা মাহিম, ও রোজী তালুকদার।
বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানাই প্রিয় আখলাক ভাইকে এবং ভাগিনা অর্ণবকে ট্রান্সপোর্টেশানে সাহায্য করার জন্য। আরো কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাই যারা ডিনার রান্না ও পরিবেশনা করেছে। রসগোল্লার সুখ্যাতি এখনো শুনতে পাচ্ছি। সার্বিকভাবে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে এই প্রথম টরন্টোতে এমন সাড়ম্বর আয়োজন হয়। বিজয় দিবসের আগে এমন মর্মান্তিক শোকের দিন আমাদের স্মৃতিতে হাজার বছর ধরে জ্বলজ্বল করবে।