জোশকা ফিশার, বার্লিন, জার্মানি:
ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন ইউরোপকে আগের চেয়ে অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ করেছে। এখন চ্যালেঞ্জ হল কমন স্বার্থের এই চেতনাকে সমুন্নত রাখা। এর সাথে সাথে একটি শক্তিশালী, আরও প্রাণবন্ত এবং আরও স্বয়ংসম্পূর্ণ ইইউ তৈরি করা জরুরি যাতে ইইউ নতুন করে উদ্ভূত পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতাময় বিশ্বে তার ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থকে এগিয়ে নিতে সক্ষম হয়।
ইউরোপে যুদ্ধ ফিরে এসেছে। সম্প্রতি, একটি ইউরোপীয় পরাশক্তি তার ছোট প্রতিবেশীকে আক্রমণ করেছে। তারা দাবি করছে যে একটি সার্বভৌম জাতি-রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিবেশী দেশটির অস্তিত্বের কোন অধিকার নেই; এমনকি যারা তাদেরকে চ্যালেঞ্জ করবে তাদের বিরুদ্ধে পারমাণবিক হামলার হুমকি দিয়েছে। এ হুমকির সাথে সাথে, পুরোবিশ্ব মৌলিকভাবে পরিবর্তিত হয়ে গেছে। ইউরোপকে অবশ্যই এর সাথে পরিবর্তন করতে হবে।

ইউক্রেনের বিরুদ্ধে কোন প্রকার প্ররোচনা ছাড়া আগ্রাসন চালিয়ে রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইচ্ছাকৃতভাবে ইউরোপীয় শান্তির ভিত্তি এবং ঠান্ডা যুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছেন। এতে রাশিয়ার সাথে পশ্চিমাদের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কই শুধু নষ্ট হয়নি; ন্যাটো এবং রাশিয়ার মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘর্ষের একটি সুস্পষ্ট সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।
এখন পুরোবিশ্বকে অবশ্যই মারাত্মক ঝুঁকি মোকাবেলা করতে হবে। একবার ধারণা করা হয়েছিল যুদ্ধ থেমে যাবে, আবার দেখা গেছে, না এটি থামবে না। এ যুদ্ধটি শুধু ইউরোপে নয়, এটি অতি দ্রুত বিশ্বব্যাপী দাবানলে পরিণত হতে পারে। যদি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়, তবে ইউরোপীয় মানদণ্ড অনুসারে, ব্যাপক ধ্বংসাত্মক অস্ত্র ব্যবহার করার সম্ভাবনার কারণে পৃথিবী ধ্বংসের একটি অভাবনীয় উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে।
নিশ্চিতভাবে বলা যায়, পুতিন হিসাবে কিছু গুরুতর ভুল করেছেন। তিনি মনে করেছেন তার সামরিক বাহিনীর ঝটিকা অভিযান গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত ইউক্রেনীয় সরকারকে উচ্ছেদ করে সেখানে একটি পুতুল সরকার প্রতিষ্ঠা করবেন। কিন্তু তিনি রাশিয়ান সামরিক বাহিনীর দক্ষতাকে অত্যধিক মূল্যায়ন করেছেন বলে মনে হচ্ছে। পক্ষান্তরে, তিনি ইউক্রেনীয়দের তাদের দেশ এবং তাদের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করার ইচ্ছাকে অবমূল্যায়ন করেছেন।
পুতিন ন্যাটো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নকেও অবমূল্যায়ন করেছেন বলে মনে হচ্ছে। যদিও কিছু পুশব্যাক নিঃসন্দেহে প্রত্যাশিত ছিল, কিন্তু তিনি সম্ভবত পশ্চিমের দ্রুত, দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এবং ঐক্যবদ্ধ প্রতিক্রিয়ার প্রত্যাশা করেননি।
আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকে প্রায় ৩.৫ মিলিয়ন ইউক্রেনীয়দের একটি বড় অংশকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি, পশ্চিমা দেশগুলি ইউক্রেনকে বিলিয়ন ডলার মূল্যের অস্ত্র এবং অন্যান্য সামগ্রী পাঠিয়েছে। তারা রাশিয়া, পুতিন এবং তার সমর্থকদের উপর কঠোর, তীব্রতর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
ইউরোপের জন্য এই প্রতিক্রিয়াটি প্রতিফলিত করে যে পুতিনের আগ্রাসনের ফলে যুদ্ধ তাদের নিজ ঘরের খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। দিনের পর দিন ইউক্রেনের ধ্বংস হয়ে যাওয়া শহর, বোমায় ভরে যাওয়া আশ্রয়কেন্দ্র এবং সাধারণ ইউক্রেনীয়রা সাহসের সাথে নতুন বাস্তবতার মোকাবিলা করছে। আর টেলিভিশন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে এসব বাস্তব গল্পের নির্মমতা দেখে ইউরোপীয়রা আবেগ আপ্লুত হয়ে ভাবানার অতলে ডুবে যাচ্ছেন। কার্যত ইউরোপ মহাদেশ জুড়ে প্রতিটি দেশে উদ্বাস্তুদের আগমনের সাথে, এ যুদ্ধকে ইউরোপীয়দের দৈনন্দিন জীবনের একটি নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যে পরিণত করেছে।

কিন্তু ইউরোপীয়দের এ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও গভীরভাবে সঞ্চালিত হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরে বা এর বাইরের ইউরোপীয়রা বুঝতে পারছে যে পুতিনের আগ্রাসন শুধুমাত্র ইউক্রেনের দিকে পরিচালিত নয়। রাশিয়া আমাদের সবচেয়ে গভীরভাবে ধারণকৃত মূল্যবোধ সমুহের উপর আক্রমণ শুরু করেছে। আমাদের গণতন্ত্র, আইনের শাসন, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং সীমান্তের অলঙ্ঘনতা তার লক্ষবস্তু। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে এ যুদ্ধ যদি আমাদের সকলের উপর আক্রমণ হয়, তবে এর বিরুদ্ধে আমদের একমাত্র উপযুক্ত প্রতিক্রিয়া হল আমাদের ঐক্যবদ্ধতা।
তবুও, ইউরোপের ঐক্য এখন পর্যন্ত প্রশংসার দাবিদার। তবে এ ক্ষেত্রে আরও অনেক কিছু করতে হবে। ইউক্রেনের যুদ্ধ কীভাবে বিস্তৃত হবে, বা ইউক্রেন স্বাধীন দেশ হিসেবে টিকে থাকবে কিনা তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে এ বিষয়ে সামান্য সন্দেহ আছে যে, পুতিনের এ যুদ্ধ গভীরভাবে দীর্ঘমেয়াদী পরিণতি ডেকে আনবে। বলা যায় স্নায়ুযুদ্ধের পরিস্থিতি হ্রাস পাওয়ার চরম মুহূর্তের তুলনায় এ যুদ্ধের সম্ভাব্য ফলাফল আরও গভীর হবে।
প্রাথমিকভাবে বলা যায় রাশিয়ার অবিশ্বাস আরও স্থায়ী হবে। রাশিয়ার সাথে পশ্চিমাদের সম্পর্ক দীর্ঘকাল ধরে ইউরোপীয় শান্তির স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু এখন এটি বোঝায় যে ইউরোপকে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে তার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। বিশেষ করে, ন্যাটোর পূর্ব প্রান্ত এবং ইইউ-এর পূর্ব সীমান্ত এখন দুর্বল থাকবে। এক্ষেত্রে উচ্চ স্তরের সামরিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এই কাজটি অবশ্যই ন্যাটো এবং ইইউ সমানভাবে ভাগ করে করা উচিত। অর্থাৎ ইউরোপীয় ইউনিয়নকে একটি ভূ-রাজনৈতিক খেলোয়াড়ে রূপান্তরিত করা উচিত।
এখন পর্যন্ত, ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ার ছিল ইউক্রেনকে ইইউর সদস্যপদ দেয়ার প্রতিশ্রুতি নিষ্পত্তি করা এবং তা অবশই ইইউ’র সাথে তার সংযোজন শান্তি, সমৃদ্ধি এবং আইনের শাসনের প্রতি সম্মান বয়ে আনবে। কিন্তু, এই শতাব্দীর শুরুতে ইইউ-এর পূর্বাঞ্চলীয় পরিবর্ধন যেমনটি দেখিয়েছে তা মোটেই সন্তোষজনক নয়। কারণ একটি দেশ প্রত্যাশিত ভূ-রাজনৈতিক রূপান্তর সম্পূর্ণ করবে এর নিশ্চয়তা দেওয়ার জন্য তার একা যোগদানই যথেষ্ট নয়।

পশ্চিম বলকান দেশগুলির পাশাপাশি তুরস্ক, ইউক্রেন, মাল্দোভা এবং জর্জিয়ার মতো দেশগুলো যে আকাঙ্খার মুখোমুখি হয়েছে, এক্ষেত্রে ইইউকে আরও নমনীয়, সংবেদনশীল এবং নুন্যতম বৈষম্যহীন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে- অথবা ঝুঁকির পতন ঘটাতে হবে। শুধুমাত্র একটি অর্থনৈতিক এবং আর্থিক ইউনিয়নের পরিবর্তে একটি রাজনৈতিক, নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা নিশ্চিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিকাশ একটি আদর্শ সুযোগ প্রদান করে। ইইউ এর সদস্য হওয়ার একটি আদর্শ প্রস্তাব হল এটি একটি আর্থিক ইউনিয়নের পরিবর্তে রাজনৈতিক, নিরাপত্তা, এবং প্রতিরক্ষা ইউনিয়নে বিকশিত হবে।
এই নতুন ইউরোপের আকার নেওয়ার সাথে সাথে, ইইউ সদস্যপদের নতুন যাত্রার ম্যাপ তৈরি করা যেতে পারে। যা প্রতিটি সদস্যের নিজস্ব মানদ-, অধিকার এবং বাধ্যবাধকতার বিভিন্ন পর্যায় নিয়ে গঠিত হবে। পরবর্তী পর্যায়ে যাওয়ার জন্য, একটি দেশকে অবশ্যই অর্থনীতি, আইনের শাসন, নিরাপত্তা এবং অন্যান্য ডোমেনের সাথে সম্পর্কিত পূর্ব-নির্ধারিত মান পূরণ করতে হবে। কিছু দেশের দ্রুত অগ্রগতি হতে পারে, অন্যরা হয়তো কখনই ইইউ’র সদস্যতার সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছাতে পারবে না। কিন্তু এই ব্লকের সাথে তাদের সম্পর্ক বজায় রেখে সবাই উপকৃত হবে।
ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন ইউরোপকে আগের চেয়ে অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ করেছে। এখন চ্যালেঞ্জ হল কমন স্বার্থের এই চেতনাকে সমুন্নত রাখা। এর সাথে সাথে একটি শক্তিশালী, আরও প্রাণবন্ত এবং আরও স্বয়ংসম্পূর্ণ ইইউ তৈরি করা জরুরি যাতে ইইউ নতুন করে উদ্ভূত পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতাময় বিশ্বে তার ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থকে এগিয়ে নিতে সক্ষম হয়। এখন জোটবদ্ধ থাকা অবশ্যই অপরিহার্য, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার সাথে। কিন্তু, ইউরোপীয়রা ইউক্রেনীয়দের সাহসিকতা এবং মেধা দেখে যেমন বিস্মিত হয়, তেমনি আমাদের অবশ্যই তাদের কাছ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। আর তা হল কেউ আপনার জন্য লড়াই করবে না, যত কঠিনই হোক না কেন, আপনাকেই আপনার পরিবার, আপনার দেশ এবং আপনার ভবিষ্যতের জন্য লড়তে হবে।
জোশকা ফিশার
জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত জার্মানির ভাইস চ্যান্সেলর, প্রায়
২০ বছর ধরে জার্মান গ্রিন পার্টির নেতা ছিলেন।
স্বত্ত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
অনুবাদ: শহীদ রাজু।