শরীফ মুহাম্মদ রাশেদ:
যুদ্ধ, এটা কি জন্য ভাল? বেশির ভাগ মানুষ মনে করেন যুদ্ধ কোন ভালো ফল বয়ে আনে না। এটি চালানোর জন্য প্রচুর হাস্যকর কারণও রয়েছে। আমরা যুদ্ধে যাওয়ার জন্য সবচেয়ে অবিশ্বাস্য হাস্যকর কিছু অজুহাতের কিছু বিবরণ তুলে ধরবো। আপনি বিশ্বাস করুন বা না করুন বিপথগামী কুকুর, ইমু পাখি, মানুষের কান, বালতি এবং এমনকি ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে দেশে দেশে অনেক যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। আসুন জেনে নিই ওই সব যুদ্ধের কিছু কাহিনী।

১) জেনকিন্সের কানের যুদ্ধ (১৭৩৯–১৭৪৮): ব্রিটেন এবং স্পেনের মধ্যে ১৭৩৯ সালে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ নয় বছর ধরে চলেছিল। আসলে একটি কান কাটা-কে কেন্দ্র করে এই যুদ্ধের শুরু। ১৭৩১ সালে স্প্যানিশ সৈন্যরা ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন রবার্ট জেনকিন্সের কান কেটে ফেলেছিল। এর কারণ হিসেবে জানা যায় ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন রবার্ট জেনকিন্সের তখন ওয়েস্ট ইন্ডিজে তার জাহাজে অবকাশ যাপন করছিলেন। তখন স্প্যানিশ সৈন্যরা তার জাহাজে উঠতে চাইলে তিনি তাদের বাধা দেন। ব্যাস মাথা গরম স্প্যানিশ সৈন্যরা ক্যাপ্টেন জেনকিন্সের কান কেটে দেয়। উল্লেখ্য, ব্রিটিশরা সত্যিই ক্যারিবীয় অঞ্চলে স্প্যানিশদের খরচে শক্তিশালী ব্যবসায়িক অবস্থান তৈরি করতে চেয়েছিল। কিন্তু তারা কিছুতেই স্প্যানিশদের সাথে পেরে উঠছিল না। তারা যে কোন ছুতোয় যুদ্ধ বাঁধাতে চাইছিল। এদিকে স্প্যানিশ সৈন্যরাও যুদ্ধের জন্য তক্কে তক্কে ছিল। এক পর্যায়ে দুপক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। এদিকে স্প্যানিশ কমান্ডার, ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন রবার্ট জেনকিন্সকে ১৭৩১ সালে তার কান কাটার সেই সময়ের কথা মনে করিয়ে দিলে জেনকিন্স তার সৈন্যদের উদ্দেশ্যে হুংকার দিয়ে বলে- আক্রমণ করো। এভাবে কান-কে কেন্দ্র করে একটি যুদ্ধের জন্ম হয়েছিল। এ যুদ্ধে প্রায় ৪০ হাজার সৈন্য মারা যায়।

২) বিপথগামী একটি কুকুরের কারণে যুদ্ধ (১৯২৫): ১৯২৫ সালের দিকে গ্রীস এবং বুলগেরিয়া একে অপরকে আদৌ পছন্দ করত না। সেসময় তারা WWI এর খেলায় পরস্পর লড়াই করেছিল এবং তাদের উভয়ই জিতার ব্যাপারে আশাবাদী। খেলা শুরুর একটু পরেই যখন একটি কুকুর তার মালিক একজন গ্রীক সৈন্যের কাছ থেকে দূরে চলে যায় এবং বুলগেরিয়ান সীমান্তের দিকে দৌড়াতে থাকে। তখন একজন বুলগেরিয়ান সৈনিক কুকুরটিকে তাড়া করে এবং গুলি করে হত্যা করে। খেলা বন্ধ হয়ে যায়। শুরু হয় দুপক্ষের সাথে মারামারি, কাটাকাটি। সবশেষে দুইদেশ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে যায়। গ্রীকরা বুলগেরিয়ার পেট্রিচ শহরে আক্রমণ ও দখল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তারপরে যা ঘটেছিল তা হল একটি চরম সংঘাত যা ৩০ হাজার লোকের মৃত্যু ঘটায়।

৩) ফুটবল যুদ্ধ (১৯৬৯): ১৯৬৯ সালে অবশ্যই হন্ডুরাস এবং এল সালভাদরের মধ্যে সংক্ষিপ্ত যুদ্ধটি আসলে একটি ফুটবল ম্যাচ নিয়ে ছিল না। দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক ইতিমধ্যেই গভীর টানাপোড়নে ছিল। তবে ফুটবল যুদ্ধের জন্য একটি অনুঘটক ছিল মাত্র। ১৯৬৯ সালে দু’দেশের ফুটবল দলগুলি ১৯৭০ বিশ্বকাপে একক যোগ্যতা অর্জনের জন্য মুখোমুখি হয়েছিল। উভয় দেশ তাদের প্রতিটি খেলায় জিতেছে, তাই একটি জয়নির্ধারক তৃতীয় ম্যাচ খেলা হয়েছিল, যেটিতে এল সালভাদর জিতেছিল। কিন্তু হন্ডুরাস সমর্থকরা তা মেনে নিতে পারেন নি। ফলে দু’দেশের মধ্যে বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও উত্তেজনা ছড়ায়। হন্ডুরাস ভিত্তিক সালভাডোরিয়ান বিভিন্ন দোকান, স্টোর এবং কোম্পানিগুলি ব্যাপক লুটপাটের শিকার হয়। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করা হয়। তারপর ১৪ জুলাই ১৯৬৯ এল সালভাদর তাদের নাগরিকদের রক্ষা করার জন্য হন্ডুরাস আক্রমণ করে। শুরু হয়ে যায় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। ওই যুদ্ধটি সব মিলিয়ে ২ হাজার জনেরও বেশি লোকের মৃত্যু ঘটায়। বিশ্বকাপে, এল সালভাদর তার তিনটি খেলার একটিতেও গোল করতে না পেরে চরমভাবে হেরেছিল।

৪) ইমু পাখি যুদ্ধ (১৯৩২): ১৯৩২ সালে, অস্ট্রেলিয়ান নেতারা লক্ষ্য করলো যে তাদের দেশের চারপাশে খুব বেশি ইমু দৌড়াচ্ছে এবং তারা কৃষকদের ফসল ধ্বংস করছে। সুতারাং কিছু একটা করা দরকার। তাই তারা ইমু পাখি মারার জন্য মেশিনগান সহ সৈন্য পাঠায়। যদিও এটা এতটা সহজ কাজ ছিল না। উড়ন্ত পাখিগুলি উল্লেখযোগ্যভাবে স্থিতিস্থাপক প্রমাণিত হয়েছিল কারণ তাদের গতি খুব দ্রুত ছিল এবং প্রথম গুলিতে তাদের একটিও মারা যায়নি। তাই কর্তৃপক্ষ দ্রুত তাদের মারার জন্য রসদ এবং গোলাবারুদ দিয়ে সেনাবাহিনী নিয়োগ করে। এক সপ্তাহ লড়াই করার পর অস্ট্রেলিয়ান সেনাবাহিনী হাল ছেড়ে দেয়। কারণ তারা মোট ২০ হাজার ইমুর মধ্যে মাত্র ২ হাজার ৫০০ টি ইমুকে হত্যা করতে পেরেছিল। শেষ পর্যন্ত ওই যুদ্ধে ইমু পাখিরাই জিতেছিল…

৫) শূকর নিয়ে যুদ্ধ (১৮৫৯): বর্তমানে বিশ্বের ইতিহাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যকে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে গণ্য করা হয় এবং দুদেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। তবে এ সম্পর্ক সবসময় এমন মধুর ছিল না। একটি শূকর কে কেন্দ্র করে ১৮৫৯ সালে দেশ দুটির মধ্যে সম্পর্কে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল। সে বছর ১৫ জুন, একটি বিপথগামী শূকর দুই দেশকে প্রায় যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল। শূকরটি ওয়াশিংটন রাজ্যে আমেরিকান বসতি স্থাপনকারীদের কাছ থেকে দৌড়ে ব্রিটিশ মালিকানাধীন কানাডায় চলে যায় যেখানে ব্রিটিশরা ভেড়া পালছিল এবং তারা বিপথগামী শূকরটিকে গুলি করেছিল। এটি আমেরিকানরা ভালভাবে নেয়নি। ফলে দুদেশের মধ্যে যুদ্ধাবস্থার সৃষ্টি হয় এবং ব্রিটিশ এবং আমেরিকান উভয় সীমান্তে সৈন্য স্থাপন করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোন গুলি চালানো হয়নি তবে এ স্ট্যান্ডঅফ চার মাস স্থায়ী হয়েছিল। এ যুদ্ধে হতাহতদের মোট সংখ্যা একটি শূকরের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।

৬) দ্য ওয়ার অফ দ্য (ওকেন) বাকেট– বালতি নিয়ে যুদ্ধ (১৩২৫): ইতিহাস থেকে জানা যায়, ওকেন বাকেটের যুদ্ধ হল মধ্যযুগীয় ইতালীর দুটি রাজ্যের মধ্যে সংঘটিত একটি সংঘাত যা ১৩২৫ সালে রক্ত ক্ষয়ী যুদ্ধে রূপ নিয়েছিল। একটি বালতি চুরির ঘটনা থেকে এই যুদ্ধের সূচনা। জানা যায় ইতালীয় রাজ্য মোডেনার সৈন্যরা আরেক রাজ্য বোলোগনা শহরের কূপ থেকে একটি বালতি চুরি করেছিল। বালতিটি আজও মোডেনা শহরে পাওয়া যায়। যুদ্ধরত উভয় পক্ষের অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিলো এবং যার ফলে ২ হাজার জন লোক মারা গিয়েছিল।

৭) সিসিলিয়ান ভেসপারদের যুদ্ধ (১২৮২–১৩০২): সিসিলিয়ান ভেসপারদের যুদ্ধটি ১২৮২ সালে ফরাসি অধিকৃত সিসিলিতে শুরু হয়েছিল এবং অবিশ্বাস্যভাবে এ যুদ্ধটি ২০ বছর স্থায়ী হয়। ইতিহাস বলছে একটি গুজব রটানো হয়েছিলো যে ইস্টার সোমবার সন্ধ্যার প্রার্থনার সময় একজন সিসিলিয়ান মহিলাকে একজন ফরাসি মাতাল হেনস্থা করে গির্জা থেকে বের করে দিয়েছিলো। এই ঘটনা সিসিলিয়ানদের এতটাই ক্ষুব্ধ করেছিল যে পরবর্তী ছয় সপ্তাহের মধ্যে তারা প্রায় ৪ হাজার ফরাসীকে হত্যা করেছে বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। তারপর বিভিন্ন কূটনৈতিক ভুল আরও দুই দশক ধরে দুদেশের মধ্যে শত্রুতা দীর্ঘায়িত করে রেখেছিল।
৮) কারানসেবেসের যুদ্ধ (১৭৮৮): ১৭৮৮ সালে অস্ট্রিয়া তুরস্কের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। ঐ বছর অস্ট্রিয় একদল সৈন্য তুরস্কে স্কাউটে পাঠানোর পর সেখানে কিছু যাত্রীদের সাথে তাদের বচসা হয়। পরে তুরস্কের লোকেরা তাদের মদ খাইয়ে বিষয়টি দফারফা করে। অস্ট্রীয় সৈন্যরাও বিষয়টি ভালোভাবে মেনে নেয়। এর কিছুদিন পরে তারা অস্ট্রিয়ান সৈন্যদের আরেকটি রেজিমেন্টের সাথে দেখা করে যাদের সাথে তারা তাদের অ্যালকোহল ভাগাভাগী করতে রাজি হয়নি। ফলে দুপক্ষের মধ্যে তুমুল উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে অস্ট্রিয়ান সৈন্যদের গুলি চালানোর অভিযোগের প্রেক্ষিতে ঘটনা সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খলার দিকে মোড় নেয়। এভাবে দুদেশর মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে যায়। বিশ্বাসযোগ্য ঐতিহাসিক সূত্রে বলা হয়েছে এ যুদ্ধে অন্তত ১ হাজার অস্ট্রিয়ান সৈন্য নিহত হয়েছিল।

৯) চিনচা দ্বীপপুঞ্জ যুদ্ধ (১৮৬৪–১৮৬৬): এটিকে স্প্যানিশ-দক্ষিণ আমেরিকান যুদ্ধও বলা হয় । এ যুদ্ধে পেরু, চিলি, ইকুয়েডর এবং বলিভিয়াকেও সংঘাতের মধ্যে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এই যুদ্ধটিকে সম্পূর্ণরূপে আঞ্চলিক যুদ্ধ বলে মনে হয়। ১৮৬৪ সালে স্পেন পেরুর চিনচা দ্বীপপুঞ্জ দখল করে নেয়। কিন্তু চিনচা দ্বীপপুঞ্জের একটা বিশেষত্ব ছিল তা হল পাখির বিষ্ঠা। চিনচা দ্বীপপুঞ্জটি একটি দেশিয় প্রজাতির পাখি গুয়ানাই করমোরেন্টের জন্য বিখ্যাত। দ্বীপগুলি গুয়ানাতে খুব সমৃদ্ধ, এ পাখির মল খুব দুর্গন্ধ হলেও এটি উত্তম সারের উৎস। এটি দ্বীপগুলিকে একটি সম্ভাব্য মূল্যবান সম্পদ করে তুলেছে যা পেরুর অর্থনীতিতে বিশাল অবদান রেখে চলেছে। এ দ্বীপপুঞ্জর বদলে পেরু স্পেন থেকে স্বাধীনতার স্বীকৃতি লাভ করে। অবসান হয় দীর্ঘদিনের স্পেন-পেরু যুদ্ধ।