মো: মোস্তফা কামাল মিন্টু
বাংলা সঙ্গীতাঙ্গনের প্রতিশ্রুতিশীল প্রবাসী কণ্ঠশিল্পী তাজ আক্তার দিয়া। দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকলেও বাংলা ভাষা, বাংলা সংস্কৃতির প্রতি অকুণ্ঠ ভালোবাসা থেকেই দেশে এবং প্রবাসে দর্শক-শ্রোতাদের ভালোবাসায় এগিয়ে যেতে চান। স¤প্রতি প্রকাশিত তার দুটি মৌলিক গানে ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা পাওয়ায় দেশে-বিদেশে বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছেন এই প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পী। যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া বসবাসকারী দিয়া সম্প্রতি এক বিকেলে এসেছিলেন পাক্ষিক প্রবাস মেলা কার্যালয়ে। আলাপচারিতায় গানসহ তার জীবনের নানা গল্প প্রবাস মেলা’র পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল।
তাজ আক্তার দিয়া ২০০৫ সাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী। সেখানে উচ্চ শিক্ষা শেষে একটি স্বনামধন্য ফাইনান্সিয়াল ইন্ডাস্ট্রিতে আইটি প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত আছেন। শিল্পী হয়ে উঠার গল্প জানতে চাইলে তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি গানের চর্চা করতেন। জন্ম ঢাকায় হলেও বাবার চাকরির সুবাধে তার ছোটবেলার কিছুটা সময় কেটেছে ময়মনসিংহ ও যশোর শহরে। যশোরে দাউদ পাবলিক স্কুলে ক্লাস ওয়ান পর্যন্ত এবং সেক্রেড হার্ট স্কুলে ক্লাস (Sacred Heart School) ফোর পর্যন্ত পড়েছেন। ক্লাস ওয়ান থেকেই তার গানের চর্চা শুরু হয় বলে জানান। দিয়া স্মৃতিচারণা করে বলেন, ক্লাস ওয়ানে একদিন প্রিন্সিপাল স্যার আমার একটি ছড়া গান শুনবার পরে আমাকে স্কুলের বার্ষিক প্রোগ্রামে গান করালেন। আমার ছড়া গান শুনে প্রিন্সিপাল স্যার সহ স্কুলের সকল শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং সহপাঠীরা আমার ব্যাপক প্রশংসা করেছিলেন। বলা যায় সেদিন থেকেই আমি গানের প্রতি আরো আকৃষ্ট হয়ে পড়েছি। যশোরে থাকা অবস্থায় দিয়া কিংশু একাডেমি থেকে গান শিখেছেন বলে জানান।

দিয়া বলেন, ছোটবেলা থেকে আমার মা তাবেন্দা আক্তার আমাকে গানের প্রতি অনেক উৎসাহ যোগাতেন। মা নিজেও গান করতেন। ফলে মায়ের যে কোন গান শুনেই আমি মুখস্থ করে ফেলতাম এবং নিজে নিজে গাওয়ার চেষ্টা করতাম। মা আমাকে তখন গানের প্রতি প্রচন্ড রকমের উৎসাহ দিতেন। আমার বড় ভাই নাজমুল আহসান সুদীপ এবং মামা ডা: গোলাম সামদানী খুব ভালো গান করতেন। আমি এবং আমার বড় ভাই একসাথে গান শিখে বড় হয়েছি। আমার মামা, খালারা আমাদের গানের ব্যাপারে অনেক প্রশংসা করতেন এবং উৎসাহ দিতেন।
যশোর থেকে ঢাকায় এসে অগ্রণী উচ্চবিদ্যালয়ে ক্লাস ফাইভে ভর্তি হন দিয়া। এখানেও স্কুলের সকল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে দিয়া ছিলেন আয়োজকদের ভ‚মিকায়। স্কুলের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তার ছিল সরব উপস্থিতি। এরপর এখান থেকে এসএসসি পাশ করে তিনি ভিকারুননিসা কলেজে ভর্তি হন। সেখানেও কলেজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তিনি ছিলেন সামনের সারিতে। দিয়া ঢাকায় শ্রদ্ধেয় তাপস কুমার দাসের কাছে বেশ কিছু দিন এবং শ্রদ্ধেয় খন্দকার নুরুল আলম এর কাছে প্রায় দেড় বছর ক্লাসিক্যাল মিউজিক এর উপর তালিম নিয়েছেন।

ভিকারুননিসা কলেজের গানের প্রতিযোগিতায় আধুনিক গানে প্রথম পুরস্কার পেয়েছিলেন দিয়া। সেই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে দিয়া বলেন, সেদিন বিচারক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী সুবীর নন্দী, কনক চাঁপা এবং ফাতেমা তুজ জোহরা। বিচারকরা আমার গানের অনেক প্রশংসা করেছিলেন। বিশেষ করে সেদিন প্রয়াত সুবীর নন্দী দাদা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন, ‘তুমি গান গাওয়া চালিয়ে যাও, গান যেনো চিরদিন তোমার সাথে থাকে’। দাদার একথা আমাকে আজও গান করতে ব্যাপক উৎসাহ যোগায়।
তাজ আক্তার দিয়া ২০০৫ সালে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু দিন অধ্যয়ন করার পর যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। সেখানে ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি অব পেনসালভিনিয়া থেকে আইটির উপর গ্র্যাজুয়েশন করেন। এরপর থেকে তিনি সেখানে একটি আইটি সেক্টরে দীর্ঘ ১২ বছর ধরে কর্মরত আছেন।
আইটি ক্যারিয়ারের পাশাপাশি তিনি সংগীত জগতেও দর্শকদের মন জয় করে এগিয়ে যেতে চান। এক প্রশ্নের জবাবে গুণী এই শিল্পী বলেন, আইটি ক্যারিয়ারের পাশাপাশি আমি গান নিয়েও বড় স্বপ্ন দেখি। মার্কিন মুলুকে থাকলেও জন্মভ‚মির মায়া আমাকে খুব টানে। আমি প্রতিবছরই দেশে আসি। প্রতিবছর সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য আসলেও এবার একটু সময় নিয়ে এসেছি। কারণ আমার গানের ভিডিও প্রকাশ নিয়ে বেশ কিছু কাজ ছিল।

আমেরিকা প্রবাসী সেনশেসনাল কণ্ঠশিল্পী দিয়া’র এরই মধ্যে দুটি মিউজিক গানের ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে। ৩১ মে লেজার ভিশন এর ইউটিউব চ্যানেলে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয় ‘কফি হাউস’ গানটি। এতে গীতিকার ও সুরকার ছিলেন সঙ্গীত পরিচালক পার্থ মজুমদার। এছাড়া সম্প্রতি ‘কি অপরাধে’ মেলোডিয়াস টাইপের একটি ভিডিও গান প্রকাশিত হয়েছে। এ গানে গীতিকার ছিলেন রঞ্জু রেজা এবং সুরকার ছিলেন পার্থ মজুমদার। দুটি ভিডিও গানই ইতিমধ্যে দর্শক শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন বলে দিয়া জানান।
‘কফি হাউস’ গানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট সংগীত ব্যক্তিত্ব দিলরুবা খান, এসআই টুটুল, গানের সুরকার পার্থ মজুমদারসহ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। দিয়া বলেন, এটা আমার সংগীত জীবনের অন্যতম পাওয়া। তাদের ভালোবাসা ও উৎসাহ নিয়ে শ্রোতাদের কাছে ভালো মানের গান উপহার দিতে চাই। দর্শক শ্রোতারাও দিয়া’র গানকে এগিয়ে নিতে উৎসাহ যোগাবে বলে তার প্রত্যাশা।

দিয়া প্রায় সবধরণের গান গাইতেই পছন্দ করেন। তবে আধুনিক গানই বেশি গান বলে জানান।
এছাড়া বাংলাদেশের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী ও কম্পোজার ইমরান মাহমুদুলের সুরে এবং কাজী শুভ এর সাথে একটি ডুয়েট গান এবছরই প্রকাশিত হবে বলে তিনি জানান।
প্রবাসে বাংলাদেশি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যেমন বাংলা নববর্ষ, ঈদ পুনর্মিলনী, প্রভৃতি অনুষ্ঠানে দিয়া গান গেয়ে থাকেন। দিয়া বলেন, বাংলা গানের মাধ্যমে দেশের সংস্কৃতি বিশ্বের মাঝে ছড়িয়ে দিতে চাই। বিদেশিরাও জানুক আমাদের দেশে ভালো গান হয়।

সাবেক আইজি প্রিজন এবং পিএসসি’র সদস্য মো: লিয়াকত আলী খানের মেয়ে তাজ আক্তার দিয়া। তিনি বলেন, আমি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। অনেক রক্ত, ত্যাগ এবং প্রাণের বিনিময়ে ১৯৭১ সালে বিশ্বের বুকে উদিত হয়েছিল লাল সবুজের পতাকা। বিদেশিদের কাছে এদেশের কোন প্রশংসা শুনলে আমাদের মনটা আনন্দে কেঁদে ওঠে। আমরা চাই শিল্প-সংস্কৃতি, সামাজিক-অর্থনীতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য সবক্ষেত্রে আমাদের জন্মভূমি এগিয়ে যাক। হয়ে উঠুক অপ্রতিরোধ্য বাংলাদেশ।