মো: বাছের আলী
ইরান দক্ষিণ পশ্চিম এশিয়ার পারস্য উপসাগরের তীরে অবস্থিত একটি রাষ্ট্র। দেশটিতে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ খনিজ তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ রয়েছে। খ্রিষ্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে ইরান ছিল বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্য পারস্যের কেন্দ্র। ১৯৭৯ সালে ইরানী বিপ্লব গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাজতন্ত্রের পতন ঘটে এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্রে রূপ নেয়। ইরান একটি বহুসাংস্কৃতিক দেশ যেখানে অনেক উপজাতীয় এবং ভাষাগত পার্থক্য রয়েছে। তবে দেশটির বেশিরভাগই মুসলমান। ইরানের ইতিহাস-ঐতিহ্য, পাহাড়, নদী প্রাকৃতিক শিল্পকর্ম পর্যটকদের জন্য বেশ আকর্ষণীয়। বলা হয়ে থাকে পৃথিবীর অর্ধেক সৌন্দর্য্যরে দেশ হল ইরান। আবার কেউ বলে থাকেন ইরানের ইসফাহান শহর দেখলেই যেন পৃথিবীর অর্ধেক সৌন্দর্য দেখা যায়। যেমনটি ফরাসিতে বলা হয় ‘শাহরে ইসফাহান, নেসফে জাহান’।
প্রবাস মেলা’র ধারাবাহিক ভ্রমণ টিপসের এবারের পর্বে ইরান ভ্রমণ নিয়ে আমাদের আয়োজন।
ইরানবাসী
ইরানে অনেক রীতিনীতি এবং ঐতিহ্য রয়েছে। তারা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের প্রতি খুবই আন্তরিক এবং বড়দের সম্মান ছোটদের স্নেহ আর বিদেশিদের প্রতি খুবই অতিথিপরায়ণ। ইরানে শিষ্টাচারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। ইরানিয়ান সংস্কৃতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল সৃষ্টিকর্তাকে ভালোবাসা এবং ইরানিদের ভালোবাসা।

ইরানিদের সাধারণত দুটি আলাদা পরিচয় রয়েছে। একটি জাহের (yaher) যা সার্বজনীন। অপরিচিতদের সামনে তারা খুব আনুষ্ঠানিক এবং রক্ষণশীল পোশাক পরিধান করেন এবং প্রশংসা (tarof) গহণ করেন না। দ্বিতীয়টি হল ব্যক্তিগত যা পরিবার এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সাথে দৃশ্যমান হবে। সেখানে তারা নৈমত্তিক পোশাক পরবে এবং অনানুষ্ঠানিক সব কথাই বলবে। মহিলারা কোরআনের নির্দেশ অনুযায়ী মাথায় স্কার্ফ পরিধান করবে এবং পুরো আস্তিনসহ হাটু পর্যন্ত দৈর্ঘ্য আলগা পোশাক ও তিন চতুর্থাংশ দৈর্ঘ্য হাতাও পরতে হবে। পুরুষরা পশ্চিমা সংস্কৃতির পোশাক পরতে পারবে তবে একেবারে শর্ট যাতে না হয়।
অভ্যর্থনা
ইরানে সামাজিক মিলনামেলায় বড়দেরকে সম্মান করতে হয়। সেখানে অভ্যর্থনায় সার্বজনীনভাবে ইসলামিক রীতি অনুসারে সালাম দিতে হয়। বিদায় নেয়ার সময় খোদা হাফেজ (khoda hafey)- আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুক বলতে হয়। এছাড়াও অভ্যর্থনায় প্রথমে সালাম বিনিময়ের পর নিজের নাম বলা, তারপর অন্যের পরিচয় চাওয়া, তোমার সাথে দেখা করে ভালো লাগলো Nice to meet you! বলা পরিচিত শব্দ। আনুষ্ঠানিক পরিবেশে সমলিঙ্গীয়দের সাথে হ্যান্ডশেক করতে হবে। অনানুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে ইরানিরা মুখে তিনবার চুম্বন করে। হ্যান্ডশেকের পর সম্মান দেখানোর জন্য আপনার ডান হাত বুকের উপরে রাখতে হয়।
ইরানে বিপরীত লিঙ্গের সাথে হ্যান্ডশেক নিষেধ। বিপরীত লিঙ্গের সাথে যে কোন ধরনের শারীরিক স্পর্শও নিষেধ।
ছোটদের সাথে ইরানে হ্যান্ডশেক কে সম্মানের চোখে দেখা হয়। অনানুষ্ঠানিক পরিবেশে লোকদের ডাকনাম অথবা শেষের নাম দিয়ে সম্বোধন করতে হয়। ইরানে চোখের নিম্নমুখী দৃষ্টিকে সম্মানের চিহ্ন হিসেবে দেখা হয়, আত্মবিশ্বাসের অভাব কিংবা হতাশা হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। কারো সাথে দেখা হলে সমলিঙ্গীয়দের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ১ মিটার দুরত্ব এবং বিপরীত লিঙ্গ হলে ৩ মিটারের দুরত্ব বজায় রাখতে হবে।
পোশাক -পরিচ্ছেদ

ইরানে ব্যবসায়িক মিটিংয়ে ফরমাল এবং রক্ষণশীল পোশাক পরিধান করতে হবে। পুরুষরা ব্যবসায়িক মিটিংয়ে গাঢ় রংয়ের রক্ষণশীল পোশাক পরবে। ইরানিয়ানরা টাই পরিধান করেন না, তবে এটা কেউ পরলে নেতিবাচক হিসেবে দেখা হয় না। ভালো পোশাক পরিধান সবসময় ভালো ধারণা তৈরি করে। ইরানে মহিলাদেরকে সবসময় রুচিশীল ভদ্র পোশাক পরতে হয় কোনভাবেই যেন চুল দেখা না যায়।
খাওয়া-দাওয়া
ইরানিরা ডিনারকে খুব গুরুত্ব দিয়ে থাকে এবং এর জন্য সেখানে অনেক রীতিনীতি রয়েছে। তারা তাদের খাবার নিয়ে অনেক গর্ব করে, সাধারণত ইরানিরা তাদের স্বাস্থ্যের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খাবার প্রস্তুত করে। খাবারের টেবিলে আপনি যদি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অতিথি হন সেক্ষেত্রে টেবিলের মূল জায়গায় আপনাকেই বসতে হবে এবং আপনাকে প্রথম খাবার শুরু করতে হবে। খাবারের সময় প্লেটের সব খাবার খেয়ে নিতে হবে। ইরানিয়ান রীতিতে আপনার প্লেটের খাবার রেখে দেওয়া অত্যন্ত অভদ্র বলে বিবেচিত হয়। এর জন্য খাবার পরিবেশনের সময় নিজের চাহিদার কথা বলে প্রয়োজনীয় খাবার নিতে পারেন। আপনি যদি নিরামিষভোজী হন ইরানিয়ান খাবার আপনার জন্য কম্পোরটেবল না-ও হতে পারে। যদি দেখেন যে প্রতিটি ডিশেই গোস্ত থাকে সেক্ষেত্রে ইরানিয়ান হোস্টকে সন্তুষ্ট করে খাওয়া আপনার জন্য কিছুটা কষ্টই হতে পারে।
ব্যবসায়িক আলোচনা
ব্যবসায়িক আলোচনায় ইরানে সামাজিক সীমাবদ্ধতার কারণে পুরুষ-নারীদের আলাদাভাবে পরিচিত হতে হয়। শুভেচ্ছা বিনিময় করা ইরানে একটি সাধারণ রীতি। পুরুষরা অন্য পুরুষদের, মহিলারা অন্য মহিলাদের চুম্বন করা ইরানে সামাজিক রীতি। রাস্তায় কারো সাথে দেখা হলে সমলিঙ্গীয়দের সাথে হ্যান্ডশেক করাও দেশটিতে সাধারণ রীতি হিসেবে দেখা হয়। দেশটিতে শুভেচ্ছা বিনিময়ের সাধারণ শব্দ হল আসসলামুআলাইকুম (“salaam alaykum”)।

ব্যবসায়িক আলোচনার জন্য ৩ থেকে ৪ সপ্তাহ আগে এপয়েন্টমেন্ট নিতে হবে। ইরানে কখনোই শুক্রবারে আলোচনার দিন ঠিক করবেন না। শুক্রবারে ইরানে ছুটির দিন, এ দিনে তারা রেস্ট নিয়ে থাকে। সময়ানুবর্তিতা ইরানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তবে কিছু সময় বিলম্বের জন্যও প্রস্তুত থাকতে হবে। দেশটিতে বিপরীত লিঙ্গের সাথে শারীরিক সম্পর্ক, হ্যান্ডশেক কঠোরভাবে নিষেধ। দেশটিতে ব্যবসায়িক চুক্তি পশ্চিমা দেশের মত খুব দীর্ঘস্থায়ী নয়। মিটিংয়ে মনযোগ দিন, আপনার প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারেন। মনযোগ দিয়ে বসুন এবং ঘড়ির দিকে তাকানো পরিহার করুন, কারণ এতে অনাগ্রহ এবং একঘুয়েমী দেখা যায়। আলোচনার সময় সকল প্রয়োজনীয় ফাইল, তথ্য এবং আপনার ভিজিটিং কার্ড ইংরেজি এবং ফারসি অনুবাদে রাখার চেষ্টা করুন।
উপহার দেয়া নেয়া
ইরানে ব্যবসায়িক পার্টনারদের উপহার দেয়া একটা ঐতিহ্য হিসেবে দেখা হয়। তবে ব্যবসায়িক আলোচনার সময় দামি কিছু উপহার দেয়া ঘুষ হিসেবে বিবেচনা করে থাকে। তাই উপহার বিষয়ে আপনাকে সতর্ক হতে হবে। ফুল এবং মিষ্টি উপহার দেয়া ইরানে সবসময় ভালো আইডিয়া হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ইরানিরা বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে উপহার দিয়ে থাকে। এছাড়া ব্যক্তিগত কিংবা কোন ব্যবসায়িক সাফল্যে উপহার বা ট্রিটের আয়োজন করা হয়। অফিসে জন্মদিবসে মিষ্টি এবং কেক কাটার আয়োজন হয়ে থাকে। তবে এসব অনুষ্ঠানে উপহার নেয়া হয় না। ইরানি নতুন বর্ষে অধীনস্থ দাস, সার্ভিস প্রোভাইডারদের অর্থ, নতুন নোট অথবা সোনার কয়েন উপহার দেয়া হয়। তবে কেউ ইরানি হোস্টের বাড়িতে আমন্ত্রণ পেলে অবশ্যই ফুল অথবা পেস্ট্রি নিতে যেন না ভোলে। উপহারগুলো র্যাপিং করে দিতে হয় এবং অতিথির সামনে কখনোই উপহার খুলে দেখার রীতি ইরানে নেই।