রাসেল মিয়া, ব্রুনাই:
সম্প্রতি বাংলাদেশ হাইকমিশন ব্রুনাই দারুসসালাম দ্বারা প্রবাসী হেনস্থা সম্পর্কে একটি প্রতিবেদন দেখে না লিখে পারলাম না যার পুরো তথ্যই ভুল এবং উদ্যেশ্যপ্রণোদিত । দেশের কিছু সংবাদ মাধ্যম যাচাই না করে ভুল তথ্য দিয়ে প্রতিবেদন করছে যা বিদেশে আমাদের দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে।
আমি পেশায় পুরকৌশলী ও অর্ধযুগ যাবত ব্রুনাইতে নির্মাণ কাজের সাথে জড়িত থাকায় এখানকার শ্রমিকদের অবস্থা খুব কাছ থেকে দেখেছি ও তাদের না বলা কথা সম্পর্কে জেনেছি।
ব্রুনাইতে নির্মাণ কাজের শ্রমবাজারের বৃহদাংশ বাংলাদেশি শ্রমিকদের দখলে। তাদের কর্মদক্ষতার প্রশংসা এখানকার স্থানীয় লোকজন তো করেই এমনকি ব্রুনাইর সুলতান নিজেও অনেক প্রশংসা করেছেন। বাংলাদেশি শ্রমিকদের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এবং পূর্বে ভিসা প্রসেসিং এ তেমন জটিলতা না থাকায় কিছু অসাধু ব্যাবসায়ী ও দালাল কাজ না থাকার পরেও দেদারসে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়ে আসে। ফলে শ্রমিকদের আধিক্য দেখা দেয়, সবার নিয়মিত কাজ থাকেনা আর বেতন কমে যায়।
এদিকে ব্রুনাই স্থানীয় বেকারত্বের হার বেরে যাওয়ায় ভিসা অনুমোদন কঠিন হয় কিন্তু শ্রমিকদের জামানত ১৮০০ ব্রুনাই ডলার থেকে কমে ১৮০ ব্রুনাই ডলার হয়। পূর্বে যে টাকাগুলো শ্রমিক ব্রুনাই আসার সময় কোম্পানি তার কাছ থেকে নিয়ে নিলেও যাওয়ার সময় তাকে আর টাকাটা ফেরত দেওয়া হতো না।
বিগত বছরে বাংলাদেশ হাইকমিশন ব্রুনাই এর বেশ কিছু পরিবর্তন আসে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো অবৈধ শ্রমিক ঠেকাতে বাংলাদেশি শ্রমিক আনতে হাইকমিশনের সত্যায়ন আবশ্যক, অনুমোদনের পূর্বে কোম্পানির কাজের সাইট পরিদর্শন, কন্সুলার সেবা প্রদানে দূরে অবস্থানরত শ্রমিকদের কাছাকাছি ক্যাম্পিং করা, তাদের খোঁজখবর নেওয়া, অভিযোগ অনুযায়ী কোম্পানি থেকে বকেয়া বেতন তুলে দেওয়া, কাজ, ইন্সুরেন্স এর ব্যবস্থা করে দেওয়া।
উল্লেখ্য বিগত বছর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৫ কোটি টাকা বকেয়া বেতন তুলে দেওয়া হয়েছে। শ্রমিকগণ এখন হাইকমিশনে এসে/কল দিয়ে/ মেসেজ দিয়ে বা হাইকমিশনের শ্রম উইং পেজে কমেন্ট করে অভিযোগ করতে পারছে।
বিশেষ করে পূর্বে শ্রমিকদের অবস্থা খুবই খারাপ ছিল যা দেখার মত কেউ ছিল না। দালাল চক্রের দৌরাত্ম এত বেশি ছিল যে কোন শ্রমিক কথা বলতে পারত না আর বলতই বা কাকে। এখানে বাংলাদেশ হাইকমিশন বিগত কয়েক বছর যাবত অনেক ভালো কাজ করছে, এককথায় শ্রমিকদের রক্ত চুষে খাওয়া দালাল নিধন চলছে। কিছু দালালচক্র এবং আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যাওয়া কোম্পানি বাংলাদেশ থেকে উচ্চদরে (যা প্রায় ৩-৫ লাখ টাকা) বাংলাদেশ হাইকমিশন ব্রুনাইর এবং বাংলাদেশ শ্রম মন্ত্রণালয় এর অনুমোদন ছাড়া এয়ারপোর্ট বডি কন্ট্রাক্ট করে শ্রমিক এনে তাদেরকে অনেকদিন ধরে কাজ/বেতন দেয় না, এমনকি নিয়মিত খাওয়ার টাকা দেয়না। তার উপর ইন্সুইরেন্স এর টাকা, ২ বছর পর পর রিএন্ট্রির টাকা কাটে। আবার কেউ কেউ বকেয়া টাকা/কাজ চাইলে বা অভিযোগ করলে এসব শ্রমিকদের মারধর করে /টিকেট করে দেশে পাঠিয়ে দেয়। অসাধু দালাল চক্র/কোম্পানি এসব শ্রমিক এনে অন্য কোম্পানিতে দিয়ে নিজেরা কমিশন নামক কষ্টে আয় করা ন্যায্য বেতনের বড় অংশ নিজেরা খায় আর শ্রমিকদের খুবই কম বেতন দেয়।
এরকম একটি ঘটনায় কামরুল নামক দালাল কিছু শ্রমিক ব্রুনাই এনে তাদেরকে কাজ/ বেতন না দেওয়ায় হাইকমিশনে জিজ্ঞাসাবাদের সময় উপস্থিত শ্রমিক মারধর করে যা পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয় এবং দালাল চক্র/কিছু মিডিয়া এটাকে হাইকমিশন কর্তৃক প্রবাসী হেনস্থা বলে চালিয়ে দেয়। কিছু দালাল কুচক্রী মহল আর কেউ স্রোতের জোয়ারের টানে মিডিয়ার সহযোগিতায় এসব ঘটনাকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে যা খুবই দুঃখজনক।
এ ঘটনা সম্পর্কিত দুটি ভিডিও হাইকমিশনের পেজে আছে যার ২য় ভিডিও ভাইরাল হয়, ১ম টি দেখলে আসল ব্যাপার বুঝা যাবে যেখানে তার সম্পর্কে শ্রমিকরা সব অভিযোগ করে। সাইফুল নামের দালাল একই কাজে অভিযুক্ত, তার বিরুদ্ধে শ্রমিকদের অভিযোগ সম্বলিত ভিডিও হাইকমিশনের পেজে দেওয়া আছে এবং এসব ঘটনা বাংলাদেশের একটি বেসরকারি চ্যানেল ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে। যা পরবর্তীতে অন্যান্য গণমাধ্যম সহ ব্রুনাই গণমাধ্যমে সঠিক নিউজ হিসেবে আসে।
বাংলাদেশ হাইকমিশন ব্রুনাই পরিচালিত শ্রম উইং ব্রুনাই দারুসসালাম পেজ বা Labour Wing Brunei ID তে গেলে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে এবং পুরো ব্যাপারটা বুঝা যাবে। যেখানে শ্রমিকদের অভিযোগ/দালালদের স্বীকারক্তি/ শ্রমিকদের বকেয়া বেতন আদায় সম্বলিত অনেক তথ্য/ভিডিও দেওয়া আছে যা দেখলে অশ্রু সংবরণ করা দায়। ভিটে-মাটি বিক্রি করে/ঋণ করে যে সমস্ত মানুষগুলো বিদেশের মাটিতে পাড়ি জমায় তাদের সাথে এ কেমন অবিচার, এর দায়ভার কার এর সুবিচার কিভাবে হবে?
সবশেষে বলবো কেউ বাংলাদেশ থেকে ব্রুনাই আসতে চাইলে অবশ্যই পরিচিত কারও কাছ থেকে কোম্পানি সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে এবং হাইকমিশনে যোগাযোগ করে আসা উচিত, যেখানে মোটামুটি সব কোম্পানির তথ্যই আছে। ব্রুনাই এর বাংলাদেশ হাইকমিশনের যোগাযোগ করার নম্বর +৬৭৩-৭১৭০২৩০.