অসীম বিকাশ বড়ুয়া: আড়াই হাজার বছরেরও আগে এক বৈশাখী পূর্ণিমার চাঁদ যখন কপিলাবস্তুর শালবনে হিরন্ময় আলো ছড়িয়ে দিয়েছিল, তখন জন্ম নিয়েছিলেন এক রাজপুত্র—যিনি রাজকীয় ভোগবিলাস ত্যাগ করে মানবজীবনের জরা, ব্যাধি ও মৃত্যুর কঠিন সত্য অনুসন্ধানে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। আজ ১ মে ২০২৬। সেই একই পূর্ণিমার চাঁদ আকাশে উঠেছে, কিন্তু পৃথিবী বদলে গেছে। আজ বুদ্ধ পূর্ণিমা শুধু উৎসবের দিন নয়; বরং এক অস্থির, রক্তাক্ত পৃথিবীতে মানবতার ভবিষ্যৎ নিয়ে আত্মসমালোচনার এক গভীর উপলক্ষ।
সম্প্রতি লুম্বিনির পবিত্র ভূমি পরিদর্শন শেষে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, তা নিছক কূটনৈতিক বক্তব্য নয়; বরং বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতার নির্মম প্রতিফলন। তাঁর ভাষায়, “বিশ্ব যখন ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও পারমাণবিক হুমকির ছায়ায় কাঁপছে, তখন বুদ্ধের অহিংসার দর্শনই হতে পারে মানবতার রক্ষাকবচ।” এই উপলব্ধি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—মানুষের তৈরি ধ্বংসাত্মক অস্ত্রের চেয়ে বুদ্ধের ‘মৈত্রী’ অনেক বেশি শক্তিশালী।
কিন্তু আজ আমাদের বৌদ্ধবিহারগুলোর দিকে তাকালে এক ধরনের আত্মবিরোধিতা চোখে পড়ে। যে বুদ্ধ রাজকীয় বিলাসিতা ত্যাগ করে বৃক্ষতলে ধ্যানমগ্ন হয়েছিলেন, আজ আমরা তাকেই স্বর্ণালঙ্কার ও বাহুল্য আয়োজনের মাধ্যমে স্মরণ করছি। প্রশ্ন জাগে—এ কি সত্যিই বুদ্ধকে পূজা, নাকি আমাদের নিজস্ব সামর্থ্যের প্রদর্শন?
বিহারে থালার পর থালা খাবারের আয়োজন, উচ্চ শব্দের বাদ্যযন্ত্র কিংবা বাহারি সাজসজ্জা—এসব কি সত্যিই বুদ্ধের শিক্ষা ধারণ করে? তথাগত বুদ্ধের ধম্ম তো শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞার পথ; করুণা ও সংযমের পথ। অথচ আমরা অনেক সময় মৌনতার পরিবর্তে কোলাহলে মুক্তি খুঁজতে চাই। লিও তলস্তয়ের ভাষায়, “প্রকৃত সুখ বাইরে নয়, আমাদের ভেতরেই নিহিত।” সেই অন্তর্গত শান্তিকে আমরা কি বাহ্যিক আড়ম্বরের আড়ালে হারিয়ে ফেলছি না?
আরও এক ধরনের দ্বিচারিতা আমাদের সমাজে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বুদ্ধ পূর্ণিমার দিনেও অনেক ঘরে প্রাণিজ খাদ্যের আয়োজন দেখা যায়, অথচ বুদ্ধের শিক্ষা ছিল প্রতিটি জীবের প্রতি মৈত্রী ও সহমর্মিতা। পাশ্চাত্যের বহু বৌদ্ধ যেখানে প্রাণিজ খাদ্য পরিহার করে সংবেদনশীলতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন, সেখানে আমরা কেন পিছিয়ে থাকব?
কিছু ক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুশীলনও আজ সামাজিক প্রদর্শনের উপকরণে পরিণত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আনুষ্ঠানিকতা প্রদর্শনের চেয়ে অধিক প্রয়োজন অন্তরের পরিবর্তন। বুদ্ধের অমর বাণী—“ঘৃণা দিয়ে কখনও ঘৃণা দূর হয় না; মৈত্রী দিয়েই কেবল ঘৃণাকে জয় করা সম্ভব”—আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
একই সঙ্গে আমাদের ধর্মীয় নেতৃত্ব নিয়েও আত্মসমালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। বৌদ্ধ ভিক্ষুদের প্রব্রজ্যার মূল উদ্দেশ্য ছিল আত্মশুদ্ধি ও মানবকল্যাণের সাধনা। সেই আদর্শ থেকে বিচ্যুতি ঘটলে সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। তাই আজ প্রয়োজন বুদ্ধের মূল শিক্ষা—শীল, সংযম, করুণা ও প্রজ্ঞার পথে ফিরে আসা।
বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এ দেশ অতীশ দীপঙ্করের, এ দেশ সহাবস্থানের। বর্তমান রাষ্ট্রীয় দর্শন—“ধর্ম যার যার, নিরাপত্তা সবার”—বুদ্ধের সাম্য ও মানবতার বাণীরই প্রতিধ্বনি। তবে শুধু রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন হৃদয়ের নিরাপত্তা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মানবিক সহমর্মিতা।
তাই আসুন, ২০২৬ সালের এই বুদ্ধ পূর্ণিমায় আমরা বাহুল্য আয়োজন কমিয়ে মানবসেবায় নিজেদের নিয়োজিত করি। অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের পরিবর্তে সেই অর্থ ব্যয় করি অসহায় রোগী ও অনাথ শিশুদের কল্যাণে। বিহারে যাই নীরবে, শ্বেতশুভ্র পোশাকে, মানবতার বার্তা ধারণ করে। অন্তত একটি দিন সংযম ও নিরামিষ আহারের মাধ্যমে অহিংসার চর্চা করি।
বুদ্ধ কোনো অলৌকিকতার কথা বলেননি; তিনি মানুষকেই নিজের মুক্তির পথ খুঁজে নিতে শিখিয়েছেন। তাই আজকের এই অস্থির সময়ে আমাদের প্রত্যয়ের বাণী হোক—“অত্ত দীপো ভব”—নিজের প্রদীপ নিজেই হও।
বাংলাদেশের প্রতিটি বৌদ্ধবিহার থেকে শুরু করে লুম্বিনির শান্তিধ্বনি যেন একদিনের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। আমরা যদি সত্যিকার অর্থে বুদ্ধকে সম্মান জানাতে চাই, তবে তাঁর দেখানো আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ অনুসরণ করেই তা সম্ভব।
শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমা। জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক, শান্তি আসুক মানবহৃদয়ে।