ইসরাত জেবিন:
আনিকা রহমান সাউথ এশিয়ান মুসলিম একজন নারী যিনি আজ নিজের যোগ্যতায় আর কাজ দিয়ে জয় করে নিয়েছে হাজারো মানুষের মন। আনিকা রহমানের জন্ম এবং বেড়ে উঠা বাংলাদেশে। খুব ছোটবেলায় তার বাবা এবং মায়ের বিচ্ছেদ তাকে শিখিয়েছে কঠিন বাস্তবতা। খুব অল্প বয়সেই তিনি বুঝে গিয়েছিলেন সমাজ নারীদের শুধু বাধাই দেয় না, পুরো পৃথিবীজুড়ে অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকারও হতে হয় নারীদেরকেই।
একজন আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী, সোশ্যাল জাস্টিস এবং পরিবেশ নিয়ে কাজ করা আনিকা রহমান যুক্তরাষ্ট্রে যান মাত্র ১৮ বছর বয়সে। ১৯৯৭ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পান। Princeton School of Public and International Affairs থেকে বিএ এবং Columbia Lwa School থেকে জেডি ডিগ্রি নিয়ে তিনি Cleary Gottlieb Steen & Hamilton এ কর্মজীবন শুরু করেন। নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান Center for Reproductive Rights এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা আনিকা রহমান। ‘নারী অধিকারই মানব অধিকার’ (Women’s Rights Are Human Rights) ক্যাম্পেইনের অন্যতম নেত্রী আনিকা রহমানের প্রচেষ্টায় এখন বিশ্বজুড়ে নারী অধিকারও মানবাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

Friends of the United Nations Population Fund (UNFPA) এর সিইও এবং প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি এমন সময় সংগঠনটির হাল ধরেন যখন আমেরিকার সরকার সংগঠনটিতে অর্থ সাহায্য বন্ধ করে দিয়েছিল। UNFPA লক্ষ্য এমন একটি পৃথিবী তৈরি করা যেখানে প্রতিটি মাতৃত্ব হবে আকাঙ্খিত, প্রতিটি শিশুর জন্ম হবে নিরাপদ এবং প্রতিটি মানুষ তার স্বপ্ন পুরণে এগিয়ে যাবে বাধাহীনভাবে। ওবামা প্রশাসন কাজ শুরু করার পর তাদের সর্বপ্রথম সিদ্ধান্ত ছিল পুনরায় সংগঠনটিতে অর্থ সাহায্য শুরু করা। প্রেসিডেন্ট হিসেবে বারাক ওবামার নেয়া এই সিধান্তের পিছনে আনিকা রহমানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

আমেরিকার অন্যতম প্রাচীন সংগঠন Ms. Foundation for Women (নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা অলাভজনক সংস্থা) এর সিইও এর দায়িত্ব নিয়ে তিনি শুধু এই প্ল্যাটফর্ম টিকে শক্তিশালীই করেননি, প্রতিষ্ঠানটিকে অর্থনৈতিকভাবে স্থিতিশীল করার পাশাপাশি এর কৌশলগত বিভিন্ন দিকে নতুন করে সাজিয়েছেন। এছাড়াও Rainforest Alliance (জীববৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করা একটি অলাভজনক আন্তর্জাতিক সংস্থা) এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সংস্থাটির গ্লোবাল ম্যানেজমেন্ট টিম এর সদস্য হিসেবেও কাজ করেছেন।

বর্তমানে আনিকা Natural Resources Defense Council (NRDC) এর চিফ বোর্ড রিলেশন অফিসার হিসেবে বাস্তুতন্ত্র এবং জীব বৈচিত্র্য রক্ষায় কাজ করছেন। তিনি মূলত লিয়াজো অফিসার (staff liaison) হিসেবে বোর্ড অফ ট্রাস্টিদের সাথে কাজ করার পাশাপাশি NRDC এর প্রেসিডেন্টকে নানা রকম সাহায্য করে থাকেন। এছাড়াও তাকে সংস্থাটির Executive Team এর সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এর বাইরে আনিকা বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল টিউটোরিয়াল (ঢাকায় অবস্থিতও একটি প্রাইভেট স্কুল) এর বোর্ড মেম্বার এবং Council on Foreign Relations এর একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য।

পুরো কর্মজীবন জুড়ে আনিকা রহমান কাজ করেছেন বিভিন্ন অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের জন্য। তিনি Sub-Saharan Africa এর Reproductive Health Lwa এর ড্রাফ্ট মডেল তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। মেয়েদের অধিকার নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা Equality No এর বিশ্বব্যাপী তরুণী এবং কম বয়সী মেয়েদের ক্ষমতায়ন নিয়ে করা একটি পাইলট প্রোগ্রামে পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। তাছাড়া New York Immigration Coalition এর ম্যানেজমেন্টের দক্ষতা বাড়ানোর জন্যও কাজ করেছেন তিনি।
তার অসামান্য নেতৃত্বকে সম্মানিত করতে Women’s eNews আনিকা রহমান কে 21 Leaders for the 21st Century হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সমাজ সংস্কারে তার অনবদ্য কাজের সম্মাননা স্বরূপ Columbia Lwa School তাকে দিয়েছে Lawrence A. Wien Pri“e। এছাড়া ২০১৮ সালে Columbia Lwa Women’s Association এর ৩৮তম বার্ষিক অনুষ্ঠানে (Annual ¸ra Bradwell Banquet – ‘আইন পেশায় নারীদের উৎসাহিত করার জন্য একটি ইভেন্ট) তাকে “Pioneer For Women’s Rights” স্বীকৃতি দেয়া হয়। এছাড়াও সাউথ এশিয়ান বার এ্যাসোসিয়েশনের (South Asian Bar Association) Legal Trailblayer পুরস্কার, সাউথ এশিয়ান ইয়োথ অ্যাকশন (South Asian Youth Action) এর Leadership Award এবং বাংলাদেশ আমেরিকান ফাউন্ডেশন (Bangladesh-American Foundation) এর Our Pride Award তিনি পেয়েছেন তার অসাধারণ কাজের স্বীকৃতি হিসেবেই।

আনিকা রহমান এবং নাহিদ তৌবিয়া জেড বুকস (Zed Books.) থেকে ২০০৬ সালে প্রকাশ করেন Female Genital Mutilation: A Practical Guide to Worldwide Laws and Polcies। এছাড়া তিনি The Nwe York Times, HuffPs, Ges Bustle এ নিয়মিত কন্ট্রিবিউটিং রাইটার (Contributing Writer) হিসেবে নানা সমসাময়িক বিষয় নিয়ে লিখেন নিয়মিত যেমন মানবাধিকার, নারীর সমনাধিকার, Reproductive Rights, Sustainable Development ইত্যাদি।

‘আমি খুব অল্পসংখ্যক সৌভাগ্যবান নারীদের মধ্যে একজন- একজন অভিবাসী, আইনজীবী, মুসলিম এবং প্রগতিশীল- যারা তাদের আদর্শকে তাদের কর্মে পরিণত করার সুযোগ পেয়েছে এবং প্রান্তিক জনসাধারণের জন্য কাজ করতে পেরেছে’। নিজের সম্পর্কে ঠিক এভাবেই বলেন আনিকা রহমান। জীবনের রূঢ় বাস্তবতা তাকে ভেঙ্গে পড়তে দেয়নি, বরং করেছে শক্তিশালী। অল্প বয়সে বাবাকে পরিবার ছেড়ে যেতে দেখে তিনি জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেননি, বরং নিজের সবটুকু দিয়ে কাজ করেছেন মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, চেষ্টা করেছেন সাধারণ নারীদের উন্নয়নে কাজ করতে। তাই জীবনও তাকে ফিরিয়ে দেয়নি। তাকে তার লক্ষ্যে ঠিক পৌঁছে দিয়েছে, সুযোগ দিয়েছে আরও বেশি করে সমাজের উন্নয়নে অবদান রাখতে।