তানিজা খানম জেরিন: বিদায় বিষময় করোনাতঙ্ক দুই হাজার বিশ। শতাব্দীর বিভীষিকাময় করোনা রাজত্বের বিদায়। দুই হাজার বিশের শুরুটা হয়েছিল চায়নার উহান প্রদেশের করোনা সংক্রমণের খবর আতঙ্ক নিয়ে। আড়াই মাস যেতে না যেতেই আমাদের শুরু হলো ঘরবন্দী জীবনের সূচনা। বিষময় দুই হাজার বিশের বাকী সাড়ে নয় মাসও কর্মহীন। প্রতিমুহূর্ত করোনা আতঙ্কেই প্রায় গৃহ বনবাসী জীবন কাটাতে হয়েছে। দুই হাজার বিশে শুভ নববর্ষের দিন যে প্রার্থনা ও পরিকল্পনা, বছরব্যাপী বাস্তবায়নের যে সংকল্প ছিল তা দুই হাজার বিশের অদৃশ্য অনুজীব করোনা ভাইরাস আতঙ্কে সব তছনছ করে দিলো। বিশ্বব্যাপী অনেক কিছুই স্তব্ধ; লণ্ডভণ্ড হয়ে স্তম্ভিত হয়ে গেল পুরো বিশ্ববাসী। বছর-ব্যাপী দুইহাজার বিশে করোনা সংক্রমিত হলো বিশ্বের দুইশত ত্রিশটি দেশ বা অঞ্চলে সোয়া আট কোটির বেশি মানুষ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হলো; প্রায় আঠারো লাখেরও বেশি মানুষ করোনা সংক্রমণে মৃত্যুবরণ করলো। এছাড়াও বিষময় বিশ সনে বিশ্বের অনেক দেশেই এই পৃথিবীবাসীর নিয়মিত আতঙ্ক ভূমিকম্প, জলোচ্ছাস, টাইফুন, বন্যা, দাবানল, বিমান, ট্রেন, লঞ্চ নানাবিধ দূর্ঘটনা লেগেই ছিল। এই করোনাসনেও যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে লাখো মানুষ। করোনাসনে এই দুই হাজার বিশেও বাস্তচ্যুত বা প্রায় আটকোটি মানুষ উদ্বাস্তু হয়েছে। এছাড়াও খাদ্য সঙ্কটে বিভিন্ন দেশে দুই লাখ আরো নানাবিধ রোগবালাই বিভিন্ন জটিলতায় আরো সাড়ে চার লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। এই করোনাসনেও নানাবিধ বিষয়ে উত্তেজনা কম ছিলনা। আমেরিকা-ইরান, আমেরিকা-রাশিয়া-নর্থকোরিয়া ও চায়নাকে নিয়ে। করোনাকালেও প্রচণ্ড উত্তেজনা ছিল আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে।
সুস্বাগতম দুই হাজার একুশ-ভ্যাকসিন ইয়ার। করোনাসনকে বিদায় দিয়ে আগামী কাল থেকে শুরু হবে আমাদের ভ্যাকসিন ইয়ার। অর্থাৎ বছরব্যাপীই বিশ্বের সর্বত্র করোনা ভাইরাস প্রতিরোধের জন্য মহাধুমধামে চলমান থাকবে ভ্যাকসিন বিতরণ, গ্রহণ ও ভ্যাকসিন নিয়ে নানামুখী আলোচনা এবং ভ্যাকসিন সংক্রান্ত হরেক রকম খবর। বিশ্বব্যাপী থার্টিফাস্ট নাইটে অর্থাৎ নববর্ষের শুরুর ক্ষণে সকল মানবেরই এবার একটি কমন প্রার্থনা থাকবে সেটি হলো- দুই হাজার একুশ সনে করোনামুক্ত বিশ্ব হোক।
দুই হাজার বিশ সন যেমন বিশ্বব্যাপী কর্মহীনতার বছর ঠিক তেমনই আমাদের অনেক কিছু অর্জনেরও বছর সাধারণত যেকোন ভাইরাসের টিকা বা ভ্যাকসিন আবিস্কার করতে সময় লেগে যায় সাধারণত দশ থেকে বারো বছর সেখানে এক বছরের মধ্যেই আমরা ভ্যাকসিন আবিস্কার করে ফেলেছি যা ইতিমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিতরণ ও প্রয়োগ শুরু হয়েছে। আশা করা যায় বছরব্যাপী ভ্যাকসিন প্রয়োগ অব্যাহত থাকবে এবং কোভিড নাইনটিনের বিশ্বব্যাপী যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছিল বা বর্তমানেও যা অব্যাহত আছে আশা করা যায় ভ্যাকসিন গ্রহণের পর স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও করোনা প্রতিরোধের একটি স্থায়ী সমাধান হবে। যদিও অর্থনৈতিক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বিভিন্ন দেশে পাঁচ থেকে একদশক সময় লাগতে পারে তাই দুই হাজার একুশ সন হলো স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার বছর বা দুই হাজার বিশে বিষময় সমস্ত ক্ষতি পুষিয়ে পুনরুদ্ধারের বছর। শুভ হোক – পূর্ণাঙ্গ হোক দুই হাজার একুশ সন বা ভ্যাকসিন ইয়ার।
অনেক আশা ছিল যে আমরা ভ্যাকসিন বের হওয়ার পরই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারবো এবং আগত বিভিন্ন দিবসগুলো জাঁকজমকভাবে পালনের ইচ্ছা ছিল কিন্তু না; আজ থার্টি ফাস্ট নাইট যা নববর্ষকে বরণ করার যে বিশ্বখ্যাত নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ার যেখানে প্রতিবছর আধাকোটি লোকের সমাগম হতো এবার সে অনুষ্ঠানটি হবে ভার্চুয়াল সবাই বঞ্চিত হবে ক্রিস্টাল বলের স্পার্কল থেকে; করোনা সঙ্কটে বিশ্বের সর্বত্রই বর্ষবরণ হবে প্রায় একইরকম জাঁকজমকহীন অনাড়ম্বর অনুষ্ঠান তবুও সবাইকে হ্যাপী নিউইয়ার। সবার প্রতি অনুরোধ নিশ্চিন্তমনে সুস্থ্য থাকার লক্ষে করোনামুক্ত শারিরীক প্রতিরোধের জন্য ভ্যাকসিন গ্রহণ করুন অন্যকে ভ্যাকসিন নিতে উৎসাহিত করুন এবং যারা সমাজকর্মী ও মানবকর্মী তাদের নতুন বছরের ব্রত হোক বছরব্যাপী ভ্যাকসিন সংক্রান্ত যাবতীয় কাজে যার যার অবস্থান থেকে বিশ্বব্যাপী সকল মানবকে সাহায্য ও সহযোগিতা করা। ভ্যাকসিন বের হয়েছে কিন্তু করোনা সংক্রমণের ভয় এখনও অব্যাহত আছে। কোনভাবেই মুখোশবিহীন চলাচল করা যাবেনা বড় কোন সামাজিক অনুষ্ঠানের আয়োজনও করা যাবেনা এবং সর্বদাই মনে রাখতে হবে হাত ধোয়ার অভ্যাস পরিত্যাগ করা যাবেনা কোনভাবেই। সর্বদাই নিজে সুস্থ্য থাকুন অন্যকে সুস্থ্য থাকতে সহায়তা করুন। সবাইকে মনে রাখতে হবে ভ্যাকসিন গ্রহণের পর দশ থেকে চৌদ্দ দিনে শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা কার্যকরী হয় তাই উপরোক্ত সময় এবং পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্যবিধি অবশ্যই মেনে চলতে হবে।
করোনার বছরে দুই হাজার বিশ সনে বিশ্বব্যাপী আমরা হাঁরিয়েছি অনেক দেশের রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান, অনেক বৈজ্ঞানিক, অভিনেতা, সাহিত্যিক, শিক্ষক, সাংস্কৃতিক ও গণমাধ্যমকর্মী, ক্রীড়াবিদ, চিকিৎসক ও নার্স, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, আইনজীবি, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পেশাজীবির এই করোনা ভাইরাসে প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। বিষময় বছরে করোনায় যাদের প্রাণ সংহার করেছে তাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। বিশ্বব্যাপী প্রাণ হারানো হাজারেরও বেশি প্রবাসী বাংলদেশিদের প্রতিও বিনম্র শ্রদ্ধা। বিশ্বব্যাপী এই করোনা ভাইরাসের ভয়ে নানাদেশে পালিত হয়নি রাষ্ট্রীয় অনেক অনুষ্ঠান, অভিষেক, হয়নি বহু কাঙ্খিত স্কুল ও কলেজ ছাত্র-ছাত্রীদের গ্রেজুয়েশন পার্টি, তারিখ পরিবর্তন করা হয়েছে অনেক ক্রীড়া অনুষ্ঠানের। গ্রীষ্মকালীন ছুটিসহ বনভোজন, বেড়ানো অনেক কিছু আনন্দ উল্লাস থেকে বিশ্ববাসী এবার বঞ্চিত হয়েছে, হয়নি কোন মেলা, কনসার্ট, বিশাল কোন সমাবেশ। যদিও আমেরিকায় বর্বর পুলিশ কর্তৃক জর্জ ফ্লয়েডকে হাঁটু চাপা দিয়ে হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে হয়েছে তীব্র প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ। সমগ্র আমেরিকার বড় বড় শহরগুলিতে ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটারের আন্দোলনে কম্পমান ছিল প্রায় দুইমাস। দ্বিতীয় স্টিমুলাস বিল এখন পর্যন্ত বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক স্বাক্ষরিত ও চূড়ান্তভাবে পাশ না হওয়াতেও করোনা সংক্রমণের আতঙ্কের মধ্যেও বছর শেষে অনেক শহরে বিক্ষোভ – প্রতিবাদ শুরু হয়েছে।
আশা, স্বপ্ন, সুখ, দু:খ জরা- ব্যাধির এই পৃথিবীতে মানব জীবনের বসবাস বিশ্বের প্রতিটা জাতি গোষ্ঠী দেশ কাল ভেদে তার নিজস্ব বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী নববর্ষ উদযাপন করে থাকে। প্রায় দশ হাজার বছর পূর্ব থেকে চন্দ্রবর্ষ বিভিন্ন নামে প্রচলিত আছে। এছাড়াও হিব্রু বর্ষ, ফার্সীবর্ষ, চাইনিজবর্ষ, জাপানিজ বর্ষ, বাংলাবর্ষ ও বিভিন্ন দেশে নানা নামে বর্ষ গণনা এবং নববর্ষ উদযাপন করা হয়। তবে অনস্বীকার্ষ বর্তমান বিশ্বে জর্জিয়ানবর্ষ বা খ্রিস্টীয়বর্ষ বিশ্বের সবদেশেই আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত এবং সাড়ম্বরে নববর্ষ উদযাপন করা হয়। প্রতিটি মানবই নববর্ষের দিন সৃষ্টিকর্তা বা প্রকৃতির কাছে তার চাওয়া পাওয়া মনে মনে প্রার্থনা করে; সৃষ্টিকর্তা যেন সবার আশা ও আকাঙ্খা পূর্ণ করে; সবাই যাতে সুস্থ্য-সবলভাবে বেঁচে থাকতে পারে। সবাই যার যার মাতৃভূমির জন্য প্রার্থনা করে যাতে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়; দেশটি যেন হয় কল্যাণকর ও মানবিক। ভ্যাকসিন ইয়ারে সমগ্র বিশ্ববাসীর মনে যে একটি কমন সুপ্ত প্রার্থনা বিশ্ব হোক করোনামুক্ত- নতুন প্রজন্ম ফিরে পাক প্রাণ: ঘরবন্দী জীবনে ইতি হোক দুই হাজার একুশ সনের। এবারের করোনা ক্রান্তির কঠিন শিক্ষা থেকে আমাদের প্রতিটা মানবের মনন চিন্তার পরিবর্তন করে আত্মশুদ্ধ হয়ে হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে কল্যাণকর মানবিক বিশ্ব গড়ার প্রত্যয়ে এক মানব হয়ে স্ব-স্ব অবস্থান থেকে সুদূর প্রসারী টেকসই পরিকল্পনা নিয়ে নতুন প্রজন্মের জন্য নতুন বিশ্ব; আলোকিত বিশ্ব গড়ার কর্মে সর্বমানব নিয়োজিত হোক। দুইহাজার বিশের বিষময় ক্রান্তিকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরের শুভ আগমন। মুক্তির বছর, ভ্যাকসিন ইয়ার। সবাইকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা। শুভ নববর্ষ!!!
তানিজা খানম জেরিন, কলামিস্ট, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র।