প্রতীক তরফদার, কোলকাতা, ভারত থেকে: ২০১৫ সাল থেকে আমার জীবনের একটা বড়ো অংশ জুড়ে আছো তুমি। সরাসরি সম্পর্কের সূচনা সেই ২০০৪ সালে। গত পাঁচ বছরে তা আরো গভীর হয়েছে। কতো যে প্রাণের বন্ধু তোমার বুকে। রোজ দিন শেষে যখন একবার আমার দেশের খবর নেই, একবার নিয়ম করে তোমার খবর নিতে ভুলি না। তোমার ক্রমবর্ধমান কোভিড সংক্রামিতের আর মৃতের সংখ্যার সাথে সাথে আমার চিন্তাও বাড়ে প্রতিদিন। প্রতি বছর এই সময়ে মোটামুটি তোমার কাছেই থাকি। এইবছরও সেরকমই ভাবনা ছিলো। কিন্তু একমাস আগেও ভাবিনি যে সীমানাটাই বন্ধ হয়ে যাবে – তোমার সাথে আমাদের। আমাদের সাথে সবার। ভাবতে পারিনি এমনকি নিজের বাড়ি ছেড়েও বের হতে পারবো না একান্ত জরুরি প্রয়োজন ছাড়া।
বাংলাদেশ, তুমি সাবধানে থেকো। আমার বন্ধুদেরকে সামলে রেখো। কবে যে আবার যাবার সুযোগ পাবো- তোমার বুকে। কতকিছুই যে ফিরে ফিরে ডাকে আমায়। এতো মানুষের মিষ্টি করে ডাকা ভাইয়া বা দাদা ডাকটা কতদিন শুনিনা!!! আবার কবে কাজের ফাঁকে ফাঁকে সহকর্মীদের সাথে গল্প করবো, কাজের পর বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেবো বাংলাদেশে বসে!!!

ঈদের সময়ের ঢাকার ফাঁকা রাস্তার একটা আলাদা মাদকতা আছে। অনেকেই অপেক্ষা করে থাকেন ঢাকা খালি হবার জন্য কিন্তু এই প্রথম বোধ হয় এই ফাঁকা ঢাকাকে, পৃথিবীর অন্যান্য সব বড় বা ছোট শহরের মতোই, মানুষ মন থেকে মেনে নিতে পারছেন না। কোরোনা তুমি তাড়াতাড়ি বিদায় নিও। আমার বন্ধুরা যেনো আবার পথে নামতে পারে। স্বাভাবিক জীবনযাপন শুরু করতে পারে।

তাড়াতাড়ি সেরে ওঠো বাংলাদেশ। কতোদিন হয়ে গেলো আমার চেনা পথ, চেনা রাস্তায় রিক্সা করে ঘোরা হয় নি – পান্থপথ, গ্রীনরোড, মীরপুর রোড। কতদিন তোমার শহরের রাস্তার ধারের চায়ের দোকানে কাচের কাপে মশলা দেয়া চা খাওয়া হয়নি। কতোরাত হয়ে গেলো হাতির ঝিলে গাড়ি থামিয়ে আড্ডা দেওয়া হয়নি বা কোনো বন্ধুর বাসায় কিংবা স্টুডিওতে বসে গলা ছেড়ে গাওয়া হয়নি দুই দেশের গান! আবার কবে লং ড্রাইভে পদ্মা পাড়ে মাওয়া ঘাটে যাবো ইলিশ খেতে!!! আবার কবে চট্টগ্রামে পতেঙ্গা যাবো আর সাগর পারে বসে গরম চায়ের সাথে গরম গরম পাকোড়া খাবো আর সমুদ্র দেখবো।

বাংলাদেশে এখন আমার অন্যতম আকর্ষণ হোলো বাতিঘর আর বইঘর। ঢাকার বাতিঘরে যাবার সুযোগ তো এখনো হয়েই ওঠেনি। কবে পাবো সে সুযোগ!!!এতবছর ধরে তোমার কাছে যাই, এখনো সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখিনি, সেন্টমার্টিনির নয়নাভিরাম রূপ দেখিনি, দেখিনি হাকালুকি হাওর। তোমার অনেক শহর দেখাই বাকি রয়ে গেছে আমার!!! তাড়াতাড়ি সুস্থ হও বাংলাদেশ, সুস্থ হও আমার প্রিয় পৃথিবী যাতে আবার সব সীমানা খুলে যায়। শুরু হয় আসা-যাওয়া, বন্ধুদের কাছে পাওয়া।
এ লেখায় তোমার বুকে থাকা আমার প্রিয় মানুষগুলোর নাম লিখতে ইচ্ছে করছে কিন্তু স্বচ্ছন্দ বোধ করছি না। পাছে কারো নাম বাদ চলে যায়!!! কম মানুষের ভালোবাসা তো পাইনি এতো দিনে !!! তাদের সবার কাছে আমি চির ঋণী। সে ভালোবাসার কোনো মাপ হবে না। সাগরের জলের মতো। কতো যে ছোট বড়ো ভালো লাগার মুহূর্তের স্বাক্ষী থেকেছো তুমি আমার।

এই বছর যেহেতু পহেলা বৈশাখের কোনো উদযাপন হবেনা, রমনার বটমূল নিশ্চয়ই সকালে ছিলো ফাঁকা। মানিক মিয়া এভিনিউয়ে নিশ্চয়ই কোনো আল্পনাও আঁকা হয়নি কাল রাত জুড়ে। চৈত্রের শেষ রাতে চারুকলায় নিশ্চয়ই বাজেনি কোনো ঢাক। মঙ্গল শোভাযাত্রা বিহীন এ এক অচেনা পহেলা বৈশাখ। এরই মধ্যে একটা নতুন বিশেষ ঘটনা ঘটলো এই বছর – সীমানার দুই পারে একই দিনে বাংলা নববর্ষ আজ। এটা অন্যবছর একদিন আগে পরে হয়। এর পর থেকে আশা করা যায় নিয়মিত একই দিনে হবে এই উদযাপন তোমার বাংলা ক্যালেন্ডার পরিবর্তনের কারণে।
প্রিয় বাংলাদেশ, শুভ নববর্ষ। আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা রইলো। সবাই ভালো থেকো, সুস্থ থেকো, নিরাপদ থেকো, আনন্দে থেকো। আবার দেখা হবে।
আশায় বাঁচা চাষা
১’লা বৈশাখ, ১৪২৭