প্রবাস মেলা ডেস্ক: গুনে গুনে ঠিক তিনদিন পরে অনুষ্ঠিত হবে ভারতের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী বাংলাদেশের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বন্ধু-প্রতীম রাষ্ট্র বাংলাদেশে নির্বাচনের মাধ্যমে ঠিক কোন ধরনের সরকার আশা করছে ভারত তা নিয়ে চলছে জল্পনা-কল্পনা। ভারতীয় রাজনীতিবিদরা বলছেন, নিজ দেশের উন্নয়নে কাজ করতে আগ্রহী এবং ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে চায়, বাংলাদেশে এমন সরকারের উপরে আস্থা রাখতে চান তারা। ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে ভিন্ন মেরুতে অবস্থান করলেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বর্তমান শাসক দলকেই এক্ষেত্রে এগিয়ে রাখছে ভারতের বাম, বিজেপি, কংগ্রেস, এমনকি তৃণমূল কংগ্রেস নেতৃত্ব।
বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনে কেমন সরকার আশা করছেন এমন প্রশ্নের জবাবে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সিনিয়র নেতা ও রাজ্যসভার সাবেক সংসদ সদস্য প্রদীপ ভট্টাচার্য বলেন, ‘বাংলাদেশের বর্তমান যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশের যে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বর্তমানে তৈরি হয়েছে দুই বিষয়কে যদি একসঙ্গে যুক্ত করা যায় তা হলে যিনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী (শেখ হাসিনা) তার বিকল্প আছে বলে আমার মনে হয় না। শেখ হাসিনা আর কিছু করুক ছাই না করুক বাংলাদেশের প্রত্যেক মানুষকে দু বেলা দুমুঠো খাবার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। প্রভূত উন্নয়ন বাংলাদেশে ঘটেছে। বাংলাদেশ অনেক অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে। একথা অস্বীকার করে লাভ নেই। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মাথাপিছু আয়ের নিরিখে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে গিয়েছে। চাষী, ক্ষেতমজুর, দিনমজুরদের আয় বেড়েছে। সবমিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিতে একটা নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে শেখ হাসিনা সক্ষম হয়েছে।
শেখ হাসিনার বিকল্প হিসেবে যারা নিজেদের তুলে ধরতে চাইছেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারা নিজেদের তেমন প্রভাব প্রতিপত্তি তৈরি করতে পারেননি। বরং তারা একটা ভারতবিদ্বেষী মনোভাব ছড়িয়ে দেয়ার অপচেষ্টা করেছেন মাত্র। সুতরাং তাদের উপরে মানুষের আস্থা কতটুকু আছে তা নিয়ে আমাদের সন্দেহ আছে। বাংলাদেশের বহু মানুষের সঙ্গে কথা বলে তাদের কাছ থেকে যে সংবাদ আমি পেয়েছি তাতে তারা এখনো মনে করেন নতুন বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার প্রয়োজন এখনো অনেক বেশি রয়েছে। সে দিক থেকে আমার ধারণা শেখ হাসিনা বিপুল ভোটে জয়লাভ করবেন।
অন্যদিকে বাংলাদেশের ভোটারদের কাছে তার আবেদন প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘দেখুন আমি একটা অন্য দেশের মানুষ, তবে আমি এতটুকু বলব যিনি পেটে খাবার দিতে পারেন, কর্মসংস্থান করতে পারেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন করতে পারেন, শিল্প নিয়ে আসতে পারেন তিনিই ক্ষমতায় আসবেন। আজ বাংলাদেশ পোশাক শিল্পে অনেক উন্নত। সারা পৃথিবী জুড়ে রপ্তানি করছে। বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে গিয়েছে এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। তাই বাংলাদেশের মানুষের কাছে আমার এই আবেদনটুকু থাকবে যিনি আপনাদের দেশটাকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, মানুষের পেটে খাবার যোগান দেয়ার চেষ্টা করছেন, সেই দেশের মানুষ আপনারা নিশ্চয়ই এমন মানুষকেই নির্বাচনে জিতিয়ে আনবেন যিনি বাংলাদেশকে নতুন একটা অধ্যায়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হবেন।’
পশ্চিমবঙ্গের একমাত্র বামপন্থী সংসদ আইনজীবী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য বাংলাদেশের নির্বাচন প্রসঙ্গে বলেন, বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্র গঠন হয়েছিল স্বৈরাচারী, সাম্রাজ্যবাদী, ইসলামবাদী, নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত ধর্মনিরপেক্ষ বিষয়ে মানুষের ভাষা, মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার জন্য। আমরা আশা করব, বাংলাদেশ তার ধর্মনিরপেক্ষতা বজায় রাখবে। আমরা দেখেছি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার এসেছে কিন্তু বহু সরকার বাংলাদেশ জন্মের যেটা মূল ভিত্তি ধর্মনিরপেক্ষতা সেটাকে ধ্বংস করার চেষ্টা করেছে। তবে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ তাদের রুখে দিয়েছেন। কিন্তু তাতে ক্ষতি হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বারবার আক্রান্ত হয়েছে।
আমরা যখন দেখেছি বাংলাদেশকে একটা ইসলামিক রাষ্ট্র হিসেবে গঠনের পরিকল্পনা করা হয়েছে তখন তার বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে লড়াই হয়েছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক দিক থেকে অনেকটা এগিয়েছে। শিক্ষার দিক থেকে এগিয়েছে। আশা করব বাংলাদেশের মানুষ এই ধর্মনিরপেক্ষতার চরিত্র বজায় রাখার চেষ্টা করবেন।এই উপমহাদেশের ধর্মনিরপেক্ষতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চলক হিসেবে বাংলাদেশ ধর্ম নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারলে ভালো লাগবে। স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশে যারা ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেবেন তারাই জিতুক এমনটা আশা করছি। আমি ব্যক্তিগতভাবে কাউকেই সমর্থন জানাচ্ছি না।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে বিকাশ রঞ্জন বলেন, ‘আপনারা আপনাদের রক্তের বিনিময়ে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র তৈরি করেছেন। যে রাষ্ট্র নির্মাণের পিছনে মূল দাবি ছিল ভাষার মতো একটা অত্যন্ত ধর্মনিরপেক্ষ বিষয়। আমাদের আশা সেই ঐতিহ্যকে আপনারা এগিয়ে নিয়ে যাবেন। এটাই বাংলাদেশের মানুষের কাছে আমাদের আবেদন। আমি বেশ কয়েকবার বাংলাদেশে গিয়েছি এবং আমার ধারণা বাংলাদেশের জনগণ ধর্মনিরপেক্ষ নীতির উপরেই বাংলাদেশের প্রশাসনকে টিকিয়ে রাখতে আগ্রহী।’
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচন কেন্দ্রিক অশান্তি প্রসঙ্গে এই বামপন্থী নেতা বলেন, নির্বাচন চলাকালীন গণতান্ত্রিক পরিবেশকে ধ্বংস করতে একটা আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করা হয়। যারা সাম্রাজ্যবাদী একটা নীতিকে বজায় রাখতে চান যারা ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শকে ধ্বংস করতে চান। তারাই চেষ্টা করবেন অশান্তি করার। বাংলাদেশের মানুষের এই অভিজ্ঞতা আছে। তারা নিশ্চয়ই তাদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সরকার নির্বাচন করবেন। ধর্মীয় আচার-আচরণ এক জিনিস আর ধর্মকে ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার আরেক জিনিস। আমরা পাকিস্তানে দেখেছি, যেখানেই ধর্মের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার চেষ্টা করা হয়েছে সেখানেই শাসকেরা বিভাজনের রাজনীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। আশা করি বাংলাদেশের মানুষ এর বিরুদ্ধে লড়বেন।’
তৃণমূল কংগ্রেসের সিনিয়র নেতা ও কৃষি মন্ত্রী শোভন দেব চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘বাংলাদেশ আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র। দুই বাংলার বাঙালির মধ্যেই রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক সাহিত্যে সবকিছুর মধ্যেই মিল আছে।
এপার বাংলায় বড় হওয়া কাজী নজরুল ইসলাম ওপার বাংলার জাতীয় কবি। হৃদয়ের সম্পর্ক আছে আমাদের সঙ্গে বাংলাদেশের। আমরা এটাই চাইবো বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্বের সম্পর্ক যেন যুগ যুগ অটুট থাকে। আমরা কখনোই যেন একে অপরের শত্রু দেশে পরিণত না হই। এমন হলে সেটা কোন বাঙালির পক্ষেই সহ্য করা সম্ভব হবে না। তাই আমরা চাই এমন সরকার ওখানে আসুক যে সরকার ভারতবর্ষের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক রেখেই এগুবেন।’
বিজেপির সাবেক রাজ্য সভাপতি ও বিজেপির জাতীয় নির্বাচন কমিটির সদস্য রাহুল সিনহা বলেন, ‘দেখুন আমি মনে করি বাংলাদেশে বর্তমানে যে সরকার চলছে সেই সরকার, এখন যেসব নতুন সরকার গড়ার দাবি নিয়ে সামনে আসছে, তাদের থেকে অনেক ভালো সরকার।
প্রসঙ্গত আগামী ৭ জানুয়ারি বাংলাদেশের দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন। নির্বাচনী উৎসবে ইতিমধ্যেই মেতে উঠেছে বাংলাদেশ। চলছে জোড় প্রচার-প্রচারণা। বিজিবি, সেনা, আনসার বাহিনীর নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়েছে গোটা বাংলাদেশ।