এক. সাম্প্রতিক সময়ে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির ঘটনায় ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অভিবাসন প্রত্যাশীদের করুণ মৃত্যু বাংলাদেশ সহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক এর ২০১৮’র রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বে সর্বোচ্চ রেমিটেন্স অর্জনে বাংলাদেশের অবস্থান নবম। প্রায় এক কোটি বিশ লাখেরও বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানান পেশায় কর্মরত আছেন। তাদের পাঠানো রেমিটেন্সই যে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এমন ঝুঁকি নিয়ে বিদেশে পাড়ি দেয়া ঠেকাতে এখনই কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া জরুরী।
দুই. আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)’র ২০১৭ সালে’র একটি জরীপে দেখা গেছে- যেসব দেশের নাগরিকেরা ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি ঢোকার চেষ্টা করেছে সেরকম প্রথম পাঁচটি দেশের তালিকায় বাংলাদেশিরা রয়েছে। ইউরোপীয় কমিশন পরিসংখ্যান দপ্তর ইউরোস্ট্যাট এর তথ্যমতে, ২০১৪ সালের পর থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত যেসব দেশের নাগরিকেরা ইউরোপে সবচেয়ে বেশি আশ্রয় প্রার্থনা করেছে সেরকম প্রথম দিকের দশটি দেশের তালিকাতেও বাংলাদেশ রয়েছে।
তিন. উচ্চ অভিবাসন ব্যয়ে বিদেশে যাওয়ার রেকর্ড বিশ্বে বাংলাদেশের মতো আর কোন দেশের নেই। এখানে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে তিন থেকে চার গুণ বেশি অর্থ খরচ করে বিদেশ যেতে হয়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগরপথে বিদেশে পাড়ি দেয়া ঠেকাতে অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় অবশ্যই কমাতে হবে। এক্ষেত্রে এজেন্সীগুলো এবং দালালরা যাতে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করতে না পারে, সেজন্য সরকারি ও বেসরকারী পর্যায়ে সমন্বিতভাবে নাগরিকদের তথ্য-প্রযুক্তির সাহায্যে ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে সচেতন করা যেতে পারে। এজেন্সীগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা কঠোর নজরদারীর আওতায় আনা, প্রয়োজনে ক্ষতিপূরণ ও লাইসেন্স বাতিল করার মতো কঠোর পদক্ষেপও নিতে হবে। এছাড়াও আন্ত:দেশীয় কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে সীমান্তে কঠোর নজরদারী, মানব পাচার রোধে গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতা বৃদ্ধি, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা এবং বৈধপথে অভিবাসন জটিলতা নিরসন বিষয়ে জরুরী ব্যবস্থা নিতে হবে।
চার. বাংলাদেশ যদি এসব অবৈধ ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়, তাহলে সাম্প্রতিক ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির মতো মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটতেই থাকবে, যা আন্তর্জাতিকভাবে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করবে। ফলশ্রুতিতে, অভিবাসী গ্রহণকারী ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য দেশ অভিবাসী গ্রহণে কঠোর শর্ত আরোপ করবে, যার ফলে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানিখাত মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। ক্ষতিগ্রস্থ হবে অর্থনীতির প্রাণভোমড়াখ্যাত অভিবাসন খাতটি। নিরাপদ অভিবাসনের জন্য যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তা দ্রুত বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।
পরিশেষে দেশে-প্রবাসে অবস্থানরত সকলকে পবিত্র ঈদুল আজহার শুভেচ্ছা। ঈদ মোবারক।