তপন দেবনাথ, লস এঞ্জেলস, যুক্তরাষ্ট্র
অভাগাদের মধ্যে আমি একজন। দেড় বছর বয়সে আমার মাতৃবিয়োগ হয় এবং পিতৃবিয়োগ ঘটে ১৯৭৬ সালে যখন আমার বয়স এগার বছর। মায়ের কথা একেবারেই মনে নেই আমার। বাবার কথা কিছুটা মনে করতে পারি। বাবাকে নিয়েও আমার তেমন স্মৃতি নেই কারণ আমার স্মৃতি শক্তি জন্মাবার আগেই তিনি পরলোক গমন করেন। আজ থেকে ৪৩ বছর আগে পরলোকগত পিতার মুখশ্রীখানাও এখন ভালো করে স্মরণ করতে পারি না।
চারিদিকে নদী- সাগরবেষ্টিত ভোলা জেলার বোরহানউদ্দিন থানার বড় মানিকা গ্রামে আমার জন্ম। তখন থানা সদরে কোনো স্টুডিও ছিল না। জেলা সদরে থাকলেও থাকতে পারে সেটা আমার জানা নেই। শুরুতেই যেটা বলছিলাম অভাগাদের মধ্যে আমি একজন- আমার মা-বাবার একটি ছবিও নেই যা দেখে তাঁদের মুখশ্রী স্মরণ করতে পারি। ৫ ভাইবোনের মধ্যে আমি সবার ছোট। বড় ভাইবোনদের স্নেহ ভালোবাসায় বড় হয়েছি।
আমাদের আর্থিক অবস্থা তেমন স্বচ্ছল ছিল না। আজকের দিন আর ৪০/৪৫ বছর আগের দিনের তুলনা খুবই বেমানান। ঘরে ঘরে রেফ্রিজারেটর তো দূরের কথা- তখন তো বিদ্যুতই ছিল না। সেলফোন কি বস্তু তা কি কেউ জানতো? এ বস্তু নিয়ে ছবি তোলা যায় আবার সে ছবি মুহূর্তে পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে পাঠানোও যায়- যা তখনকার মানুষের কল্পনায়ও ছিল না। মাঝে মাঝে মনে হয় বাবা যদি এখন বেঁচে থাকতেন আর দেখতেন যে রেফ্রিজারেটরে মাছ রেখে ছয় মাস-নয় মাস পরেও খাওয়া যায়- তা হলে না জানি কতই আনন্দ পেতেন।
আমি রাতে বাবার সাথে ঘুমাতাম এবং তার শরীরে পা তুলে দিতাম- এ কথা আমার বেশ মনে আছে। বাবার মাছ ধরার খুব সখ ছিল। একথা বললে কিছুটা বেমানান শোনা যাবে যে আমরা মাছ-ভাত সমান সমান খেতাম। কখনো কখনো ভাতের চেয়ে মাছ বেশি খেতাম। এর প্রধান কারণ ছিল মাছের সহজলভ্যতা। পুকুর-ডোবা-নালায় প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। তখন বিদ্যুৎ ছিল না, বিধায় বরফ তৈরীরও ব্যবস্থা ছিল না যার কারণে আমাদের এলাকার মাছ ঢাকা বা অন্য কোথাও চালান হতে পারতো না। মাছ সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থাই ছিল না। একমাত্র ব্যবস্থা ছিল খেয়ে শেষ করা। জিয়ল মাছ কয়েকদিন জিয়িয়ে রাখা যেত বটে।
বাবা মাছ ধরতে গেলে সব সময় আমাকে সাথে নিয়ে যেতেন। নিজেদের বাড়ির পুকুর, বাড়ির পাশের জলাশয় সর্বত্রই তখন প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। তাছাড়া আমাদের বাড়ির পশ্চিম দিকে তেঁতুলিয়া নদী এবং পূর্ব দিকে মেঘনা নদী। এই দু’নদীর প্রচুর মাছ বাজারে পাওয়া যেত। বরফ ছাড়া টাটকা ইলিশ মাছ ভাজির কথা মনে হলে এখনো জিভে জল আসে। এক বাড়িতে ইলিশ মাছ ভাজি হলে ২/৪ বাড়িতে তার গন্ধ ছড়িয়ে পড়ত। এক টাকায় একটি মাঝারি আকারের ইলিশ পাওয়া যেত- যা এখন রূপ কথার মতো মনে হবে। সন্দেহ নেই যে যাদের বয়স আমার চেয়ে বেশি তারা আরো কম দামে দেখেছেন।
দেখতে দেখতে এই প্রবাসে প্রায় আঠার বছর কেটে গেল। মাছ খাওয়ার অভ্যাসে এখনো ঘাটতি পড়েনি। এখানে বাংলাদেশ, ভারত, মায়ানমার, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, জাপান, আমেরিকার বিচিত্র রকমের মাছ পাওয়া যায়। দামও ক্রয় ক্ষমতার মধ্যেই বলা যায়। একমাত্র ইলিশ মাছের দামটাই একটু বেশি। কিন্তু দেশের টাটকা মাছের স্বাদ এখানে পাওয়া যায় না। তারপরেও যে প্রচুর মাছ পাওয়া যায় সেটাই বড় কথা।
তো একদিন বাবার সাথে বাড়ির কাছে জলাশয়ে মাছ ধরতে গেলাম। সেখানে একটিমাত্র মাঝারি আকারের শোল মাছ ছাড়া আর তেমন কোনো মাছ ছিল না। শোল মাছটি বার বার আমাদের জালে পড়ছে কিন্তু কিছুতেই আটকাতে পারছি না। আমাদের জালটা ছিল অপেক্ষাকৃত ছোট। একবার জাল থেকে বের হয়ে মাছটা লাফ দিল। সেই লাফে আমার মুখে এমন আঘাত পেলাম যে আমার মুখ থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরতে লাগল। বাবা তো হতবাক, আমি ব্যাথায় কাবু।
আজকের দিনের কথা হলে এ-খবর ভাইরাল হয়ে যেত। আমাদের পাশের বাড়ির নূরুল ইসলাম চাচা (কিছু দিন আগে তিনি প্রয়াত হন) বড় জাল এনে সহজেই শোল মাছটি ধরে নিয়ে গেলেন। আমরা চেয়ে চেয়ে দেখলাম। বাবা আর আমি ব্যার্থ মনে বাড়ি ফিরে গেলাম। মুখের ব্যাথা কতদিন ছিল তা এখন আর তেমন মনে নেই।