প্রবাস মেলা ডেস্ক: ভাগ্য বদলাতে দূর দেশে যান প্রবাসীরা। কিন্তু তাদের সবার ভাগ্য কি বদলায়? অনেকে যান শার্ট প্যান্ট পরে ফিরে আসেন কফিনবন্দি হয়ে। প্রবাসে বাংলাদেশিদের মৃত্যুর বড় একটি কারণ সড়ক দুর্ঘটনা। অন্য একটি বড় কারণ হৃদরোগ বা হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া। মহামারী করোনাভাইরাস হানা দেবার পর বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি এ রোগে মারা গেছেন।
দূর দেশে প্রিয়জনের মৃত্যুর খবর দেশে পরিবারের কাছে নিশ্চয় অত্যন্ত বেদনার। এমন কঠিন সময়ে মৃত ব্যক্তির পরিবার ঠিক করে উঠতে পারে না কিভাবে মরদেহ দেশে আনা যায়। যাদের আর্থিক সামর্থ্য নেই তারা তো মহা দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বৈধ উপায়ে বিদেশ গেছেন এমন যেকোনো প্রবাসীকর্মীর মরদেহ দেশে আনার দায়িত্ব সরকারের।
শুধু এতোটুকুই নয়, মরদেহ পরিবহন, দাফন, কর্মক্ষেত্র থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় এবং আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেয় সরকার। এই ক্ষতিপূরণ ৩ লাখ টাকা। সম্প্রতি করোনায় মারা যাওয়া প্রবাসী ব্যক্তির পরিবারকেও সম পরিমাণ ক্ষতি পূরণ দিচ্ছে সরকার। তবে বিদেশ থেকে মরদেহ আনয়ন ও ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য দরকার যথাযথ প্রক্রিয়ায় আবেদন।
এই আবেদন গ্রহণ করে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিষ্ঠান ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড। এই কাজে সহযোগিতা দেয় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সর্বনিম্ন ৩ দিনের মধ্যে মরদেহ আনা আইনত বাধ্যতামূলক। আর ক্ষতিপূরণ দেয়ার সময়সীমা সর্বোচ্চ ৬ মাস। প্রবাসীর পরিবারের সম্মতি থাকলে লাশ সংশ্লিষ্ট দেশে দাফনের ব্যবস্থাও করে সরকার।
একটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, করোনায় মৃত ব্যক্তির মরদেহ পরিবহন করার নিয়ম না থাকায় এসব লাশ দেশে আনা হচ্ছে না। যে দেশে মারা যাচ্ছেন সেখানেই দাফন করা হচ্ছে।
২০১৯ সালের এক হিসাবে দেখা যায়, ওই বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন হাজার প্রবাসীর মৃতদেহ এসেছে।
এসব মৃতদেহ বহন ও দাফনের জন্য স্বজনদের প্রায় দেড় কোটি টাকা দিয়েছে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড। এছাড়া সংস্থাটি আর্থিক অনুদান দিয়েছে একশো কোটি টাকার বেশি।
প্রবাসে কোনো ব্যক্তি মারা গেলে সেখানে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস বা হাইকমিশনে যোগাযোগ করতে হয়। তারা বিষয়টি দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়।

মৃত কর্মীর লাশ দাফন ও পরিবহন বাবদ ৩৫,০০০ টাকা এবং আর্থিক সাহায্য হিসাবে ৩ লক্ষ টাকা পরিবারকে প্রদানে প্রবাসী ব্যক্তির পরিবারকে নিজ নিজ জেলায় অবস্থিত জেলা জনশক্তি কার্যালয় অথবা ঢাকায় অবস্থিত ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডে কাছে আবেদন করতে হয়। এর জন্য নির্দিষ্ট একটি ফরম পূরণ করতে হয়। এই ফরম ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণবোর্দের ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়।
মৃতের লাশ দেশে পাঠাতে নিয়োগকর্তা খরচ বহন করতে অপারগতা প্রকাশ করলে ও মৃতের পরিবার লাশ দেশে আনার জন্য খরচ বহনে সক্ষম না হলে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ তহবিল থেকে অর্থায়ন করা হয়।
বিমানবন্দর থেকে লাশ গ্রহণের সময় মৃতের পরিবারকে লাশ পরিবহন ও দাফন বাবদ ৩৫ হাজার টাকার চেক দেয় কল্যাণবোর্ড।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক থেকে এই চেক প্রদান করা হয়। এজন্য মৃত প্রবাসী শ্রমিকের স্বজনকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে হয়। যার মধ্যে রয়েছে জাতীয় পরিচয়পত্র, পরিবারের সদস্য সনদ, লাশ পরিবহন ও দাফন খরচের অর্থ গ্রহণের জন্য ক্ষমতা অর্পণপত্র সঙ্গে আনতে হবে।

এসব কাগজপত্রের নমুনা কপি পাওয়া যাবে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের ওয়েবসাইটে। বিদেশে বৈধভাবে যাওয়া মৃত কর্মীর পরিবারকে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড থেকে আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়। ২০১৩ সালের ১ এপ্রিল থেকে প্রবাসে মারা যাওয়া কর্মীর প্রত্যেক পরিবার আর্থিক অনুদান হিসেবে পাচ্ছে ৩ লাখ টাকা।
যা ছয় মাসের মধ্যে পরিশোধ করার কথা। অনুদান পেতে মৃত প্রবাসী কর্মীর স্বজনকে দাখিল করতে হয় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র।
এর মধ্যে রয়েছে— ১. ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র, সিটি করপোরেশন কাউন্সিলরের কাছ থেকে দাফতরিক প্যাডে মৃতের পরিবারের সদস্য সনদ। এই সনদ সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী অফিসার, সিটি করপোরেশন এলাকার জন্য অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক সত্যায়িত হতে হবে।
২. চারশো’ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে দায়মুক্তি সনদ, অঙ্গীকারনামা ও ক্ষমতা অর্পণপত্র সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র, সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর কর্তৃক স্বাক্ষরিত ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার, সিটি করপোরেশন এলাকার জন্য অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক সত্যায়িত হতে হবে।
৩. মৃতের পাসপোর্টের ফটোকপি, বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রত্যয়নপত্র, মৃত্যু সনদের (ডেথ সার্টিফিকেট) সত্যায়িত ফটোকপি।
৪. অর্থ গ্রহণকারীর ব্যাংক হিসাব নম্বরের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের প্রত্যয়নপত্র, ব্যাংক স্টেটমেন্টের মূল কপি। নাবালক সন্তান থাকলে তার নামে খোলা ব্যাংক হিসাব নম্বর ও প্রত্যয়নপত্র (ব্যাংক স্টেটমেন্টসহ)।
৫. পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের চেয়ারম্যান, কাউন্সিলর কর্তৃক সত্যায়িত ১ কপি ছবি এবং সহকারী পরিচালক, জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস কর্তৃক ১ কপি সত্যায়িত রঙিন ছবি। এসব কাগজপত্রের নমুনা কপিও পাওয়া যাবে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের ওয়েবসাইটে।
প্রবাসী কর্মী মারা গেলে বিদেশে নিয়োগকর্তা, সংস্থা, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান থেকে মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা নেয় ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড। এছাড়া প্রবাসী কর্মীর বকেয়া বেতন, সার্ভিস বেনিফিট ও ইন্স্যুরেন্স সুবিধা পাওনা থাকলে তা আদায় করে স্বজনকে তা পাওয়ার উদ্যোগও নিয়ে থাকে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড। এজন্য মৃত প্রবাসীর কর্মীর স্বজনকে ওপরের নিয়মে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হয়। যার নমুনা কপি ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণবোর্ডে পাওয়া যায়।
ঢাকায় অবস্থিত প্রবাসী কল্যাণ ভবনে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড প্রবাসী কর্মী ও তাদের পরিবারকে সেবা দেয়ার জন্য ২০১৬ সাল থেকে ডিজিটাল হেল্প ডেস্ক চালু করেছে। এটি সরকারি ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত চালু থাকে। হেল্প ডেস্কের নম্বরে ফোন করে প্রবাসী কর্মীর পরিবার সমস্যা ও সাহায্যের কথা জানাতে পারেন।
এগুলো লিপিবদ্ধ করে সংশ্লিষ্ট শাখা, মন্ত্রণালয়, অন্যান্য দফতর/সংস্থা ও বিদেশে অবস্থিত শ্রম উইংয়ে জানানো হয়। পরবর্তী সময়ে সেবা প্রার্থীকে এ বিষয়ে তথ্য দেওয়া হয়। আবেদন নিয়ে স্বজনরা জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস অথবা ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের কার্যালয়ে যেতে পারেন।
ঠিকানা: প্রবাসী কল্যাণ ভবন, পুরাতন এলিফ্যান্ট রোড, ইস্কাটন গার্ডেন, ঢাকা। যে কোনও অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির জন্য বোর্ডের উপ-পরিচালক জাহিদ আনোয়ারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তার মোবাইল নম্বরে ফোন করেও প্রতিকার চাইতে পারেন। বোর্ডের ওয়েবসাইটে গেলে তার নম্বর পাওয়া যাবে। এর বাইরেও বোর্ডের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে ফোন করে প্রতিকার চাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।