মো: বাছের আলী
চীনকে এশিয়া মহাদেশের প্রধান আঞ্চলিক শক্তি এবং ভবিষ্যতে বিশ্বের সম্ভাব্য পরাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। পূর্ব এশিয়ার ১৩৮ কোটি জনসংখ্যা সমৃদ্ধ বিশে^র সবচেয়ে জনবহুল একটি দেশ চীন। চীনের সাম্যবাদী দল দেশটি শাসন করে। দেশটির রাজধানী বেইজিং। হংকং এবং ম্যাকাও চীনের স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চল। তাছাড়া তাইওয়ানের উপরও দেশটি সার্বভৌমত্ব দাবি করে আসছে।
চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। পৃথিবীর প্রাচীনতম জীবন্ত সভ্যতার মধ্যে চীন হচ্ছে অন্যতম একটি রাষ্ট্র। চীনারা হাজার বছর ধরে তাদের সংস্কৃতিকে লালন করছে। আপনি যখন চীনে ভ্রমণ করবেন তখন হয়তো লক্ষ করবেন আপনি যা ব্যবহার করছেন তা হয়তো চীনে সঠিক নয়। এমন অনেক কিছু দেশটিতে রয়েছে যা পশ্চিমা বিশ্বের সংস্কৃতিতে গ্রহণযোগ্য হলেও চীনা সংস্কৃতিতে তার বিপরীত। তাই কোন পর্যটক প্রথমবারের মত চীনে ভ্রমণ করলে বেশ কিছু বিষয়ে বিব্রত হওয়া স্বাভাবিক। নিচে চীন ভ্রমণে করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়গুলো তুলে ধরা হল।
অভ্যর্থনায় যা করবেন
- হ্যান্ডশেক করা চীনে একটি সাধারণ রীতি যা পশ্চিমা বিশ্বেও হয়ে থাকে।
- হ্যান্ডশেক করেই কাউকে অভিবাদন করুন।
- পূর্বে জাপান এবং কোরিয়া ভ্রমণ চীন ভ্রমণের জন্য সহায়ক হতে পারে।
- পরিচয় দেয়ার সময় সিনিয়রিটি সম্মানসূচক টাইটেল যেমন, পারিবারিক সম্পর্কিত অর ই.জি, ‘শিক্ষক’ লাউশি (laoshi), পুরুষের ক্ষেত্রে মি. xiansheng, মহিলার ক্ষেত্রে মিস. Nvshi ঠিকানা লিখুন।
- প্রথমে বড়দের পরিচয় পেশ করতে হবে। বড়দের সম্মান করার জন্য এটি করা হয়ে থাকে।
অভ্যর্থনায় যা করা যাবে না
- হ্যান্ডশেক করার জন্য কাউকে চাপ দেয়া যাবে না।
- হ্যান্ডশেকের জন্য একেবারে সরাসরি কারো কাছে চলে যাওয়া যাবে না। এতে চীনারা অস্বস্তি বোধ করতে পারেন।
- পরিচয় দিতে ‘ni hao’ (/nee haow/) এর পরিবর্তে ‘Nin hao’ (/neen-haow/ you good) দিতে হবে। এতে আপনার চীনা বন্ধু আরো আন্তরিক, ফরমাল এবং শ্রদ্ধাশীল হবে।
খবারের নিয়মাবলী, যা করতে পারবেন
- কোন অনুষ্ঠানে মদ খেতে পারেন। এটা চীনে আনুষ্ঠানিক ও নম্র বলে বিবেচনা করা হয়।
- আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানগুলোতে ডিশের সব আইটেমের খাবার গ্রহণ করতে পারেন। খাবার শেষে প্লেটে কিছু খাবার রেখে দিতে হবে।
- টেবিলের উপরে রেখেই চা পান করতে পারবেন।

খবারের সময় যা করতে পারবেন না
- খাবারের প্লেটে হাড় বা অন্যান্য জিনিস রাখবেন না। অর্থাৎ বন প্লেট অথবা টিস্যু ব্যবহার করতে পারেন। প্রয়োজনে আপনার চীনা বন্ধুর খাবার অনুসরণ করুন।
- আপনার (chopsticks) কাঠি দিয়ে খাবার গ্রহণ করবেন না। এটা চীনে অভদ্র আচরণ বলেই মনে করা হয়।
- ডিশের খাবারের সাথে আপনার নিজের খাবারের কাঠিগুলো মিশাবেন না।
উপহার দেয়া নেয়ায় যা করতে পারবেন
- উপহার দেয়া এবং নেয়ার সময় দু’হাতই ব্যবহার করতে হবে। এটা চীনা সংস্কৃতিতে নম্র আচরণ হিসেবে গণনা করা হয়।
- উপহার নেয়ার আগে প্রাথমিকভাবে কয়েকবার প্রত্যাখান করতে পারেন। আগে কয়েকবার প্রত্যাখান করা চীনা সংস্কৃতি। তাই প্রাথমিকভাবে আপনার উপহার কেউ না নিতে চাইলে হতাশ হবেন না।
- উপহার হিসেবে ছোট ছোট জিনিস যেমন, বই, মিউজিক সিডি, পারফিউমস্, সিগারেট, আপনার দেশীয় অথবা চাইনিজ কোন ব্র্যান্ডের জিনিস। এসব জিনিস উপহারে চীনে খুব প্রশংসা করা হয়।
উপহার দেয়া নেয়ায় যা করা যাবে না

- উপহার দেয়া জিনিস সাথে সাথে খুলে দেখা যাবে না, চাইনিজ সংস্কৃতিতে অতিথি স্থান ত্যাগ করার পরই উপহার খুলে দেখার রীতি রয়েছে।
- কালো অথবা সাদা র্যাপিং পেপার দিয়ে উপহার মোড়ানো যাবে না। লাল রং দিয়ে মোড়ানো যেতে পারে।
- উপহার হিসেবে ঘড়ি অথবা এ জাতীয় কিছু দিবেন না। ঘড়ি এবং এ জাতীয় চারটি জিনিস চীনে মৃত্যুর সাথে সম্পর্কিত।
ধর্মীয় এবং ঐতিহাসিক স্থানগুলোতে যা করা যাবে
- মন্দির এবং ধর্মীয় আশ্রমগুলোতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা অনুযায়ী চলতে হবে।
- মন্দিরে প্রবেশের সময় টুপি হাতে রাখতে হবে। এটা চীনে মন্দিরকে শ্রদ্ধার নিদর্শন হিসেবে দেখা হয়।
- ধর্মীয় ভিক্ষোদের কয়েক ইউয়ান দান করবেন। এটি তিব্বতি সংষ্কৃতির একটি কাজ বলে মনে করা হয়।
যা করা যাবে না
- অনুমতি ছাড়া কোন ধর্মীয় স্থাপনার ছবি তোলা যাবে না।
- তিব্বতিদের মাথায় কখনোই স্পর্শ করবেন না। তিব্বতিরা বিশ্বাস করেন মাথায় ইশ্বর বসবাস করেন।
- মন্দিরগুলোতে ইয়াক বাটার আলোতে (Yak butter lamps) আঙ্গুল ডুবাবেন না। এটা আপনার স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর
মসজিদ এবং ইসলামি এলাকাতে যা করা যাবে
- মসজিদে পুরুষ মহিলা আলাদা থাকতে হবে। ইসলামী সংস্কৃতিতে বিপরীত লিঙ্গের সাথে হ্যান্ডশেক করার কোন রীতি নেই।
- মসজিদে প্রবেশের সময় কনুই এবং পায়ের হাঁটু পর্যন্ত ঢেকে রাখতে হবে।
- মসজিদে প্রবেশের সময় মহিলাদের মাথা ঢেকে রাখতে হবে।
যা করা যাবে না
- কোন সংবেদনশীল প্রশ্ন করা যাবে না। সংবেদনশীল প্রশ্ন চীনে বিভিন্ন জাতির মধ্যে বিবেদ তৈরি করে এবং সরকারও সেগুলো পরিহার করেন।
- মসজিদ এবং অন্যান্য ইসলামী এলাকাগুলোয় মদ এবং সিগারেট জাতীয় খাবার গ্রহণ করা যাবে না।
- মুসলিম হোটেল এবং বাড়িতে হারাম জাতীয় খাবার গ্রহণ করা যাবে না।
সময়ানুবর্তিতা
- চীনারা নির্ধারিত সময়ের সর্বোচ্চ ১০ মিনিট দেরি করতে পারে। নিদির্ষ্ট সময়ে পৌছানো চীনারা সম্মানের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করেন।
- চীনে আপনার ভ্রমনের সময়ে গাইড এবং সহকর্মীকে যথাযথ সম্মান করুন।
চীনারা বিদেশিদের যেসব বিষয়ে খুব আগ্রহী
- চীনারা বিদেশিদের এমন কিছু বিষয়ে আগ্রহী যাতে আপনি বিস্মিত না হয়ে পারবেন না। তবে আপনাকে বিব্রত করার জন্য তারা এমনটি করবেনা।
- যেমন: চীনারা আপনাকে প্রশ্ন করতে পারেন আপনার বয়স কত?
- আপনি কোন বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হবেন।
- আপনি কি বিবাহিত? আপনি বিয়ে করার জন্য পরিকল্পনা করেছেন? আপনি কোথায় কাজ করেন? আপনি এখানে কত ইউয়ানে কাজ করেন?
বকশিশ
- চীনে বার, রেস্টুরেন্ট অথবা ট্যাক্সিতে বকশিশ দেয়ার রীতি নেই, সেখানে এটা আপনার কাছে কেউ আশাও করবে না। তবে আপনি যদি সিদ্ধান্ত নেন যে, কাউকে বকশিশ দিবেন তবে এতে কেউ অবাক হবে না।
জনসম্মুখে চুম্বন
- ঐতিহ্যগতভাবে চীনা সমাজে জনসম্মুখে চুম্বনকে অনুৎসাহিত করা হয়। তবে আধুনিক চীনা সমাজে এই আচরণকে স্বাভাবিক হিসেবেই দেখা হয়। চীনা রাস্তায় তরুণ-তরুণীদের হাতে হাত রেখে হাঁটার দৃশ্য একেবারেই সাধারণ। পার্কগুলোতেও প্রায় সবাইকে খোলামেলা দৃশ্যে দেখা যায়। তবে ফ্রান্সের মত সরাসরি চুম্বনের দৃশ্য চীনা সমাজে একেবারেই অনুৎসাহিত করা হয়। তাই চীনে ভ্রমণে গেলে এ বিষয়টিও আপনাকে অনুসরণ করতে হবে।